সাজজাদ হোসাইন খান একজন জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত ছড়াকার। তবে নিভৃতচারী। হালকা হাততালি বা অহেতুক প্রশংসা থেকে যোজন যোজন দূরে তিনি অবস্থান করেন। ষাটের দশকের সকল ছড়াকারই তার প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তার লেখা পাঠককে আবিষ্ট করে। রাজনৈতিক সংকটকালে তিনি যেসব ছড়া লিখেছেন তাতে তার দেশপ্রেমের আকুতি শোনা যায়। তার রাজনৈতিক ছড়াগুলো কখনও কখনও জনগণকে উদ্বুদ্ধও করে।
বাংলাসাহিত্যে ছড়ার গুরুত্ব সেই আদিকাল থেকেই রয়েছে। নানাভাবে ছড়া উত্থাপন করা হয়েছে সম-সাময়িক প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে। সে সব ছড়া একদিকে অর্থনেতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন অপরদিকে শিল্পরসেও পরিপূর্ণ। সে কারণে ছড়া সকলের কাছে প্রিয় হয়েছে। ব্যাপকভাবে পঠিত হয়েছে। নানা সমস্যা ও সংকটের দিক-নির্দেশনা দিয়েছে।
সাজজাদ হোসাইন খান এ ক্ষেত্রে সফল ছড়াকার। তার ছড়া সর্বজনগ্রাহী এবং সু-পাঠ্য।
সাজজাদ আমার বন্ধু। তার ছড়ারও ভক্ত আমি। বিশ্বস্ত পাঠকও। ছড়াসাহিত্য আন্দোলনে তিনি আমার একজন শক্তিশালী সহযোদ্ধা।
ছড়াপাঠক মাত্রই সাজজাদ হোসাইনকে গভীরভাবে ভালবাসেন। আদর্শবান এই ছড়াকারের ছড়া সুস্থজীবন গঠনে সংগঠকের ভূমিকা পালন করে। ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের ব্যাপারে তিনি আপোষহীন। তার লেখায় উগ্রতা নেই। শিল্পকে আটঘাট করে রেখেই লিখে চলেছেন। ভিন্ন মতাবলম্বীরাও তার লেখার প্রশংসা করেন। সাজজাদের সার্থকতা এখানেই।
ষাটের দশকের মাঝ সময় থেকে আমরা ছড়াসাহিত্যকে নিয়ে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করি। তৎকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা যখন এ জাতির জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল তখন আমরা ছড়াকে সমাজ বদলের হাতিয়ার রূপে রূপান্তরিত করতে নিরলস কাজ করে যাই। আমাদের ছড়ার বক্তব্য তখনকার রাজনৈতিক, সুধি ও সাংস্কৃতিক মহলের সমর্থন পায়। আমরা দেশের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে সক্রিয় ছিলাম। জনমত তৈরিতে ছড়াকে ব্যবহার করেছি। ৬৯-এ আমাদের ছড়া ও ছড়ার আবেদন অত্যধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ছড়ার প্রচলিত আদলও ভেঙ্গে পড়ে। নতুন নতুন আঙ্গিকে এবং বক্তব্যে ছড়া সমৃদ্ধ হয়। দলে ভারী হয়ে ওঠে ছড়াকারগণ। তাদের দৃপ্ত পদচারণায় সারাদেশ আশান্বিত হয়।
স্বাধীনতার পরে ছড়াসাহিত্যের গতি আরো বৃদ্ধি পায়। যে আশা ও আকাঙ্খা নিয়ে বাংলাদেশ নামে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়- দেখা গেল তা পূরণ হচ্ছে না। উপরন্তু দেশময় অরাজক পরিস্থিতি, দুর্ভিক্ষ, অবিচার, অত্যাচার, ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত, আধিপত্যবাদী শক্তির চারণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সে সময় ৬০-এর ধারাবাহিকতায় ছড়কারগণ তাদের লেখাকে আরো শানিত করে ঐ সবের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদী কণ্ঠ আরো উচ্চকিত হয়। সাজজাদ হোসাইন খান এই প্রতিবাদী বহরে বীরযোদ্ধার মতো এগিয়ে আসেন। আমরা তার এই ভূমিকার জন্য গর্ববোধ করি।
সাহিত্যাঙ্গনের বিভিন্ন শাখার মনীষীদের মধ্যে পরস্পরের আড়চোখা দৃষ্টি লক্ষ করা যায়। বিভাজন দেখা যায়। কিন্তু ছড়াকারদের মধ্যে অন্তত এটি দেখা যায় না। বিভাজন নয়, বরং প্রিয়ভাজন ও শ্রদ্ধাভাজনের শিক্ষার অনুশীলন হয়। কতিপয় কবি ছড়াকারদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন সময়ে। পারেননি। ছাড়াকারদের মধ্যকার অটুট বন্ধন এখনও রয়েছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। রাজনৈতিক মতাদর্শ যার যাই-ই-থাকুক না কেন ছড়ার ব্যাপারে এখানে কোনো বিভেদ নেই। বিভেদ কখনও হবে না! হলে ছড়াসাহিত্য বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।
ছড়াকারগণ সহনশীল এবং একের প্রতি অপরের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক রচনা করেন। তাই কোনোভাবেই তাদেরকে কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারেনি। প্রসঙ্গক্রমে একটি উদাহরণ উল্লেখ করতে চাই। ষাট দশকের শেষের দিকে আখতার হুসেন, রশীদ সিনহা ও আমি মিলে একটি ছড়ার সংকলন বের করার উদ্যোগ নেই। মূলত উদ্যোক্তা আমিই ছিলাম। সংকলন বের করার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন হয় সেটিও যোগাড় করি আমি। লেখা সংগ্রহ থেকে শুরু করে সকল কিছুই প্রায় আমাকেই করতে হয়। তবে সম্পাদনার ব্যাপারে এবং মুদ্রণের ব্যাপারে দায়িত্বভার দেয়া হয় রশীদ সিনহা ও আখতার হুসেনের উপর। মজার বিষয় হলো, আমরা তিনজনই ছিলাম কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পৃক্ত। আমি ছিলাম পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি এম.এল-এর সাথে, আখতার হুসেন মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে এবং রশীদ সিনহা ছিলেন নাসিম আলীর নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে। থাকে হাতিয়ার গ্র“পের সাথে।
এই তিনটি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের সাথে কারোরই কোনো মিল ছিল না। বরং মারমুখী দা কুমড়ো সম্পর্ক। এর মধ্যেই কমিউনিস্ট পার্টিসমূহের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে আমরা আমলে না এনে ছড়া সংকলন চিচিং ফাঁক-বের করি। এ সংকলনে যিনি যে আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন তার স্বপক্ষে ছড়া লিখেছেন। এখানে কেউ কারো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আরো মজার কথা সংকলনটি যখন সকলের হাতে যায়- স্পটে প্রশংসা করেন এবং উচ্চমূল্য দিয়ে ক্রয়ও করেন। উল্লেখিত কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দও প্রশংসা করেন। আমাদের এই তিনজন ছড়াকাদের চিন্তা ভাবনা ও আদর্শের ব্যাপারে এখনও ভিন্ন মনোভাব আছে। কিন্তু আমার ছড়ার গর্বে ওরাও গর্বিত এবং ওদের ছড়ার গর্বে আমিও গর্বিত। ছড়াকারদের মধ্যকার নিবিড় বন্ধনের প্রতীক হিসেবে আমাদের তিনজনের কথা উল্লেখ করলাম, নিজেদের বাহাদুরি প্রকাশ করার জন্য নয়।
ইদানিং ছাড়াকারদের মধ্যে অনেকে বিভাজনের চেষ্টা করছেন। কারণ ছড়া অনেক শাখাকে টপকে গেছে। বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশের পদক ছড়াকাররা লাভ করছেন। অন্য শাখার মনীষীরা এটা ভালো চোখে দেখছেন না। একজন ছড়াকার যে কোনো পুরস্কার পেলেই সবাই ভাবেন তিনিই পেয়েছেন। এই একাত্মতাবোধ সাহিত্যের অন্য শাখার মনীষীদের মধ্যেখানের নেই। আমাদের ঐক্য ইস্পাত দৃঢ়।
এই ঐক্য রক্ষার ব্যাপারে সাজজাদ হোসাইন খানের অবদানও কম নয়। ছড়ার ব্যাপারে তিনি কারোর সাথে আপোষ করেন না। কোনো ছড়াকার নিগৃহীত হন বা অবহেলার শিকার হন সেটা তিনি মেনে নিতে পারেন না। সাজজাদ এখনও জাতীয় কোনো পুরস্কার লাভ করেননি। হয়তো করবেন। তাকে কেউ বাদ দিতে পারবে না। তিনি একজন শুদ্ধচারী ছড়াকার। আদর্শের ধ্যানী। ছড়ার অন্তপ্রাণ।
এ পর্যন্ত তার অনেক বই বেরিয়েছে। সে সব বইগুলোতে রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ, আগ্রাসন, অবক্ষয় বিরোধিতায় কখনও কঠোরভাবে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন, আবার জন্মভূমির প্রতি গভীর ভালবাসায় মেতে উঠেছেন। এদেশের নদ-নদী, ফল ফলারি, পাখ-পাখালি, চন্দ্র-সূর্যকেও হৃদয়ের গভীরে টেনে এনেছেন। একজন সব্যসাচীর মতোই তিনি নিজের জায়গা অলংকৃত করেছেন। বন্ধু সাজজাদ তাই আমার মতো দেশের সকল ছড়াকার পাঠক এবং বিদগ্ধজনের কাছে অতি প্রিয়জন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। আমি তাকে অভিনন্দন জানাই। দীর্ঘায়ু কামনা করি।