উনিশশো সাতানব্বুই সালের পয়লা জানুয়ারি। রিয়াদ থেকে রওনা হই মক্কার পথে। বৃহস্পতিবার ভোররাতে বাস থামে তায়েফের মিকাতে। ইহরাম বেঁধে পথ চলি কাবার মুসাফির। প্রায় হাজার মাইল সফর করে মক্কার কাছে চোখের পাতা বুজে আসে। তন্দ্রায় দেখি বাবার মুখ। পুরান ঢাকার নারিন্দার মোড়ে দাঁড়িয়ে সোজা তাকিয়ে দেখছেন ছেলেকে! পরণে ধবধবে সাদা পোশাক। চেহারায় আলো। তিনি কিছু বললেন। তার পর ইহরামের কয়েক প্রস্থ কাপড় বয়ে চললেন নিজ পথে। আমি তাকিয়ে থাকি। ঘুম ভেঙে যায়।

স্বপ্ন তো মুহূর্তের ব্যাপার। কিন্তু বাবার চেহারা জেগে থাকে মনের পর্দায়। দু-মেয়ের মৃত্যুর পর আমি তার মাঝ বয়সের সন্তান। আমার জীবনে তিনি শান্তি ও স্বস্তির ছায়া। মায়ের কঠোর শাসন আর বাবার নরম আদরে বড় হয়েছি। শৈশবে-কৈশোরে, তারুণ্যে-যৌবনে, ঘরে-বাইরে, সুখে-দুঃখে অচ্ছেদ্য বন্ধন। অজস্র অমলিন স্মৃতি!

বাবার জন্ম জমিদারি প্রথার বেলা গড়িয়ে পূর্ব বাঙলার মুসলমানদের নানা মাত্রায় জেগে ওঠার সন্ধিক্ষণে। গ্রামীন বাঙালি মুসলিম জীবনে নড়াচড়ার শুরু হয়েছে। এ পরিবেশে কৃষির পাশে ধূপতারা বাজারে পাটের আড়ত আর সাথে ছিল বাবার সূতা ও রঙের কারবার। সালতামামি ও হালখাতা উপলক্ষে পহেলা বৈশাখে ‘এলাহি ভরসা’ লেখা সোনালি বর্ডারের কার্ড ছেপে হালুইকরের বানানো মিষ্টির মেহমানদারির সেই উৎসবের স্মৃতি আজো আবছা ভাসে মনের পর্দায়।

এক পুরুষের সীমিত অভিজ্ঞতা কিংবা তাঁত ব্যবসায়ের জটিল সমীকরণে বাবার ব্যবসায়ে ভাটির টান শুরু হয়। সাড়ে সাতশো তাঁতির ‘ময়ালে’ দুই দফার মোটা বকেয়া পাওনা আদায়ে অসফলতার দরুন ব্যবসা বন্ধ হয়। বাজারের গদির লাল বালাম বইগুলি বাড়ির বড় ঘরের কোণায় স্তূপ হয়ে থাকে। সেসবে আমার উৎসুক্য দেখে বাবা একদিন সব খাতা নষ্ট করে ফেলেন। তার পাওনা আদায়ের পরোয়ানা নিয়ে কেউ যেন কখনো খেলাফি গ্রাহকদের দরোজায় হাজির না হতে পারে! বাবার কিছু দেনা ছিল একজন পাইকারি ব্যবসায়ির কাছে। মাঠের জমি-জমা লিখে দিয়ে তিনি সে ভার থেকে নিজেকে মুক্ত করে নেন।

আমি ক্লাস ফাইভে ওঠার পর পঁচিশ দিন মীর্জাপুরের কুমুদিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। গলায় সেই অপারেশনের সুযোগ তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছিল না। বাবা ব্যবসা বন্ধ রেখে পুরো সময় মীর্জাপুরে কাটান। হাসপাতালে কেবিন ছিল না। বাবা থাকতেন বাইরের হোটেলে। সাক্ষাতকারের আগে-পড়ে সদর দরোজার বাইরে গাছের নীচে বসতেন যেন আমি তিন তলার বারান্দা থেকে দেখতে ও ঈশারায় কথা বলতে পারি। সাক্ষাতকালে বাবা হাজির হতেন আমার পছন্দের গল্পের বইসহ নানা জিনিস নিয়ে। আমি অপেক্ষায় থাকতাম বাবার হাতের পরশের জন্য। অপারেশনের রাতে হাসপাতালে কী হচ্ছে তা বাইরে থেকে জানার সুযোগ ছিল না বাবার। তিনি সারা রাত জেগে হাসপাতালের চার পাশে ঘুরে দোয়া করেন ছেলের ভালাইয়ের জন্য।

তার মমতামাখা অজস্র স্মৃতির পরাগ গায়ে মেখে পথ চলি! বাবার একটা পকেট ঘড়ি কীভাবে টিক টিক সময় বলে তা বুঝতে আমি সেটি ভেঙে কলকব্জা বের করেছিলাম। এজন্য মায়ের বেদম পিটুনি খেয়েছি। কিন্তু প্রিয় ঘড়িটা নষ্ট করেছি বলে বাবা একদম কিছু বলেননি। বরং একটু বড় হয়েই পড়ার টেবিলে গ্রামের প্রথম টেবিল ঘড়িটা আমি পেয়েছিলাম। এমনি সব কিছু যোগানো তখন বাবার জন্য বড় সহজ ছিল না। সেটা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছে।

এস এস সি পরীক্ষা দিয়ে আমি ঢাকা আসি ঊনিশ শ সাতষট্টি সালে। মে মাসের এক তারিখ সেদিন ঢাকা শহরের উপকণ্ঠে কমলাপুর রেলস্টেশন উদ্বোধন হয়। সাজানো স্টেশনের অভ্যর্থনার মধ্যে আমি পুবের মাণ্ডা গ্রামে উঠি। আমার সেই মাইগ্রেশনের পথ ধরে কিছু দিনের মধ্যে বাবা তার পুরো সংসার নিয়ে ঢাকা চলে আসেন।

বাবা গ্রামের সহজ সরল সাধারণ মানুষ ছিলেন। তবে আমি তাকে দেখেছি সাহসি সংগ্রামি পরার্থপর ত্যাগি ও ধৈর্যশীল মানুষরূপে! তার চরিত্রের জ্যোতি সব সময় আমার ভেতর আলো ছড়ায়। সততা সংযম আর সরলতার জন্য তার কাছের ও দূরের অনেকে তাকে সম্মান করতেন।

তিনি কল্যান ব্রতী ছিলেন। ভালোর প্রতি তার অন্তরের টান সহজে বোঝা যেতো। তিনি মসজিদ-মাহফিল, আত্মীয়-বন্ধুদের খোঁজ-খবর রাখতেন। অনেক ব্যাপারেই তিনি কম বলতেন। তবে আত্মীয়দের হকের ব্যাপারে তার তাগিদ সব সময় টের পেতাম।

তিনি অল্পে তুষ্ট ছিলেন। তবে মেহমানদের জন্য ভাল আয়োজন পছন্দ করতেন। তার বাজার করার শখ ছিল। শেষ দিনগুলিতেও ফকিরাপুলের বাজারে যেতেন। বাজার করে পুরো বোঝাটা মিন্তি-মুটেকে একা বইতে না দিয়ে কিছু অংশ নিজের হাতে নিতেন। মুখে এসব নিয়ে তেমন কিছু না বলে নিজ আচরণে সে সব দেখিয়ে গেছেন।

তার ব্যক্তিত্বের বিশেষ দৃঢ়তা ছিল। সহজতার মাঝে তা সহজে বাইরে প্রকাশ পেতো না। তবু তিনি আমার কাছে ছিলেন সাহস ও সংগ্রামের প্রেরণা। বাবা আমাকে কখনো বলেছেন, ‘সব সময় মাথা সোজা রাখবা! অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়াইবা না!’ এই কথাটা আমার একটি বইয়ের উৎসর্গপত্রে সিকি শতক আগে আমি নিবেদন করেছি।

বাবা শৈশবে তার মাকে হারান। শেষ বয়সে ঊনিশ শ আশি সালে আমাদের পরিবারে এক মেয়ে সদস্যের আগমন ঘটলে তিনি তার মাঝে মাকে ফিরে পান। এ মেয়েকে তার জীবনের শেষ পাঁচ বছর মা ডেকেছেন। একটি বারের জন্যেও ‘মা’ ছাড়া তাকো অন্য কোনভাবে সম্বোধন করেননি। এই ‘মা’-এর আদর ও শাসনে তিনি তার জীবনের শেষ বছরগূলি পার করেছেন আর তার সেই আনন্দ আমাদেরকে অনুভব করিয়েছেন। আরো দু’টি মেয়ে এ পরিবারে পরে শামিল হয়। তাদের প্রতিও তার আনুকূল্যে পার্থক্য বোঝা যেতো না। এমন ভারসাম্যের গুণ তিনি বুঝি তার বাবার কাছেই পেয়েছিলেন।

বাবার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলি চোখের সামনে ভাসে। ফুসফুসের ক্যান্সার ধরা পড়লো। ডাক্তার নূরুল হক তার চ্যাম্বারে বাবার সাথের মেয়েটির কাছে সে কথা লুকাতে চাইলেন। মেয়েটি বুঝতে পারলো। বললো, বলুন আমকে। আমি তার ছেলের বউ! ডাক্তারের বার্তা পাওয়া গেল। বয়স ও স্বাস্থ্যের বিবেচনায় তাকে নিয়ে কোন বাড়তি এক্সপেরিমেন্টে রাযি নন ডাক্তার!

পরিবারে শুরু হলো কঠিন কষ্টের সময়। তখনো তিনি ধৈর্যে অবিচল। কখনো গভীর রাতে জেগে দেখি, আরামবাগের সেই বারান্দায় নিশব্দে একা বসে তিনি তাকিয়ে আছেন নটরডেম কলেজের পাশের বড় বড় গাছগুলির দিকে। রাতের আঁধারে সেখানে তিনি কী দেখেন! কী ভাবেন! দূরের চরাচরে কোথায় তার দৃষ্টি? আমি শৈশবের স্মৃতি হাতরাই আর বাবার কাঁধ ধরে দাঁড়াই। বাবা বলেন, নাহ্! তেমন কিছু না। তোমরা ঘুমাও গিয়ে! সকালে অফিসে আছে না!

অসহায় দাঁড়িয়ে থাকি। শেষ ক-দিন বাবা ঘন ঘন দিন-তারিখ জিজ্ঞেস করেন। তারপর… চার বারো উনিশশো চুরাশির এগারো রবিউল আউয়াল ফজরের পর নির্দেশ জারি করেন: তোমরা সবাই কাজ সেরে দুপুরের মধ্যে ফিরে এসো!

যোহরের সময় আমরা তিন ভাই বাবার পাশে দাঁড়াই। বিছানা ছেড়ে তিনি হেঁটে বাথরুমে গিয়ে ওযূ করে এসে জায়নামাযে বসেন। আমি যোহরের নামাযে ইমামতি করি। দুই ভাইয়ের পাশে বাবা। পরিবারের তিন বউ আর তৃতীয় প্রজন্মের প্রথমা নিতুকে নিয়ে মা দাঁড়ান পরের সারিতে। নয় সদস্যের গোটা পরিবার নামায শেষে আল্লার কাছে অসহায় হাত মেলে ধরি। রাহমানুর রাহিমের কাছে দয়া ও ক্ষমার জন্য মিনতি করি।
আছরের পর বাবার হাত ধরে ইস্তেগফার পাঠ করি। বালিশে মাথা রেখে তিনি ধীরে ধীরে ডুবে যান ঘুমের নদীতে। তবু ঠোঁটের ফাঁকে জিহবা সঞ্চালিত হয়। কণ্ঠে অস্পষ্ট উচ্চারণ: আল্লাহ!

স্বজনেরা ছুটে আসেন। বাড়িভর্তি মানুষ। সন্ধা সাতটার দিকে বাবা হঠাৎ গভীর ধ্যান ভেঙে জেগে মাথা তোলার চেষ্টা করেন। আমি মাথার নিচে আলগোছে হাত রাখি। কী শক্তিতে তিনি ডান হাত উঁচুতে তুলে শাহাদাত আঙুল আন্দোলিত করে অবিচল উচ্চারণ করেন: আল্লাহর প্রতি আমরা সন্তুষ্ট! আল্লাহ আমাদের ওপর সন্তুষ্ট…।

আর দেরি নয়! স্মিত প্রশান্তিতে চলে যান রফিকে আ’লার কাছে! ‘হে প্রশান্ত আত্মা! তোমার পালনকর্তার কাছে ফিরে চলো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। ইবাদতকারীদের দলভুক্ত হয়ে প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।’ (সূরা ফযর : ২৭-৩০)

বারো রবিউল আউয়াল নবী দিবসের সাধারণ ছুটির দিনে যোহরের নামাযের পর বাবার জানাযা হয় বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদে। তাকে নিয়ে যাই জুরাইন কবরস্তানে।

এমন দিনে বিদায় নিলেন, তার ইনতেকালের কারণেও এক দিন আমার অফিস কামাই হয়নি! এভাবেই কারোর কোন অসুবিধা না করে বাবা চলে গেছেন পরপারে।

মক্কার পথে বাস চলে। আমি তালবিয়া পাঠ করি। দোয়া করি: রাব্বিরহামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা! হে রব! তুমি রহম করো বাবার প্রতি, যেরূপ তিনি তার দয়ার হৃদয় বিছিয়েছেন আমার শৈশবে, যখন আমি ছিলাম অসহায়!

হারামের কাছে বাস থামে। তাওয়াফ ও সাঈতে সাক্ষ্য দেই: ইয়া আল্লাহ। তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নাই। তুমি শরিকহীন একক ও একমাত্র প্রভূ। তোমারই রাজত্ব আর তোমারই সকল প্রশংসা। জীবন তুমিই দাও আর মৃত্যুও আসে তোমার কাছ থেকে। সবকিছুর ওপর তুমি সর্বশক্তিমান। তোমার দানে বাধা দেয়ার কেউ নেই। কেউ ঠেকাতে পারে না তোমার ফয়সালা। প্রভূ হে! তোমার শাস্তি থেকে তোমারই দয়া ও ক্ষমার মাঝে আশ্রয় চাই। আমাদেরকে দান করো সব ধরনের ভালাই, আর রক্ষা করো সকল মন্দ থেকে। তোমার হাবিবের মর্যাদা সমুন্নত করো আর আমাদের জন্য মনযুর করো তার শাফায়াত। তুমি ক্ষমা করো আমাদের বাবা ও মাকে। রহম করো তাদের প্রতি!