মাথার উপর দিয়ে শব্দ তুলে মাঝ বয়সী দাড়কাঁক উড়ে যায়। কহিনূরের মুখে কোন কথা নেই। যে মানুষটি সংসারে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আলো ছড়াতো। আজ যেন সে স্থির বাকহীন নদী। সারা দিন কহিনূর বক বক করে। গা চুলকায়, মাথার লম্বা চুল ছেড়ে , গা মাথা চুলকায়, কখনো কখনো ভরা খোলপাটুয়া নদীর দিকে নির্বাক চেয়ে থাকে। মাথার কালো চুলগুলো অল্প দিনে সাদা হয়ে গেছে। সুন্দর বনের বুনো হাওয়া আর শৈতপ্রবাহে সাদা ফিরফিরে চুলগুলো এলোমেলো কোষ্টা ফেসোর মতো উড়তে থাকে। খোলপাটুয়া নদীতে জোয়ার ভাটা বহে কিন্তু কহিনূরের সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। যেন সে বোধহীন অথরবো একখণ্ড বোবা পাথর। শুধু শুধু মানুষের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। কি যেন কি খুঁজে ফেরে আর হঠাৎ কখনো সে খিলখিল করে হাসিতে আকাশ ফাটায়। অনেক সময় রোমেসা রোমেসা বলে চিৎকার করে চোখের পানি ছেড়ে দেয়। রাতে একবার বেড়িবাঁধের উপরে ওঠে আর একবার নীচে নামে, চাঁদের দিকে মুখ রেখে শতবার বিড় বিড় করে বকে। সে কাউকে চিনতে পারে না।

রাতের বোবা কাঁন্না পেরিয়ে পূর্ব আকাশে ভোরের সূ্র্য্য আলো ছড়ায়। চারিদিকে লোকজনের আনাগোনা। পথচারী লোকদের উদ্দেশ্য করে কহিনূর জিজ্ঞাসা করে আমার রোমেসা আমার প্রাণের কুমকুমকে দেখেছো?
রোমেসা কুমকুম কই ? কহিনূর রোমেসাকে আদর করে কুমকুম নামে ডাকে। স্বামী সাজেদ ঘুম থেকে উঠে। রাস্তার পার্শ্বে ছোট্র একটি পান বিড়ির দোকান। মেয়ে কুমকুমের কথা মনে হলে সাজেদও চোখের পানি থামাতে পারে না। চা পাতিতে গরম পানির বলক ওঠে আর তার বুকের ভিতরটাও চা পাতির গরম পানির চেয়ে দ্বিগুণ উত্তাপে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ টকটক করে ওঠে। সেলিম চায়ের দোকানে এসে বসে, দুটি বিস্কুট নিয়ে চাবাতে থাকে। সাজেদকে বলে – সাজেদ ভাই তুমি আমার জন্যে এক কাপ চা তৈরী করো। সেলিম এক গ্লাস পানি পান করে। সেলিমের হাতের এই সুন্দর গ্লাসটি কুমকুমের নানী কিনে দিয়েছিল। সেলিম বলে – সাজেদ ভাই আর কাঁন্নাকাটি করো না তুমি যদি কাঁন্নাকাটি করো তাহলে কহিনূর ভাবীর কি উপায় হবে। তার তো মতিমতলব ঠিক নেই। তারপর তুমি যদি এভাবে ভেঙ্গে পড়ো তাহলে তো ভাবীকে আর বাঁচানো যাবে না। আইলার বানে কুমকুম চিরদিনের মতো ভেসে গেছে। সেতো আর কখনো ফিরে আসবে না। সুখ দুঃখ হতাশা ব্যর্থতা রোগ শোক তাপ ইত্যাদির সংমিশ্রণের নামই হলো মানুষের জীবন। জীবনের মানে হলো সংগ্রাম, সংগ্রাম, সংগ্রাম আর এই জীবন যুদ্ধে যিনি জয়ী হতে পারেন তিনিই সফল ব্যক্তি।

সাজেদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলে সেলিম ভাই আমি আর দুঃখ করবো না কিন্তু তোমার ভাবী কহিনূরকে কোন ভাবে বোঝাতে পারলাম না।সেতো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। আমি যে তার স্বামী, সে আজ আমাকেও চিনতে পারছে না। সেলিম চায়ে মুখ রাখে আর ওমনি বলে ওঠে সাজেদ ভাই- অনেক সময় গভীর শোকে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে যায়। শোকে মানুষ মারাও যেতে পারে। শোকে মানুষের মনে ক্ষতের সৃষ্টি হয়।ভালো চিকিৎসা না হলে স্থায়ীক্ষত থেকে চিরদিনের মতো ভারসাম্যহীন হয়ে জীবন কাটাতে হয়। কহিনূরের স্মৃতিশক্তি হারিয়ে গেছে। তাকে ভালো চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন। সেলিম বলে – সাজেদ ভাই তুমি এক কাজ করো কহিনূরকে পাবনায় মানসিক হাসপাতাল, পাগলা গারদে ভর্তি করে দিয়ে আসো, ও ঠিক একদিন ভালো হয়ে যাবে আর স্মৃতিশক্তি ফিরে পাবে। কিন্তু সেলিম অতো টাকা
টাকা আমি কোথায় পাবো ? তুমি তো জানো আমার বাড়িঘর বলতে কিছুই নেই। টাকা পয়সা যা ছিল তাতো বানের টানে ভেসে গেছে।

ইউনিয়ন পরিষদের রিলিফে যে চাউল দেয় তা দিয়ে দুজনের কোন মতে অতিবাহিত হয়। তার উপরে কহিনূরের চিকিৎসার খরচ কোথায় পাবো ? তিন বেলার আহার তার মুখে তুলে খাওয়াতে হয়। সে ইচ্ছা করে কখনো খেতেও চায় না। শুধু কাঁদে, রোমেসা আর কুমকুম বলে ডাকে। আমাকে বলে- আমার বুকের মানিক এনে দাও। আমি ভালো হয়ে যাবো। কিন্তু যে একবার পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যায়, সে কি আর কখনো ধরাধামে ফিরে আসে ? তাকে কি আর কখনো ফিরে আনা যায় ? এটাতো প্রভূর অমোঘ নিয়ম। প্রকৃতি কারোর ধার ধারে না। সে তার নিয়ম মাফিক নিজস্ব গতিতে চলে। তাইতো বলে প্রকৃতি বড়ই নিষ্ঠুর। তার সংগ্রামী ছোবলের কাছে সবাই হার মানে। সাজেদের দোকানে খরিদ্দার আসে। পানে চুন খয়ের মিশায়, জর্দার কুচি ছড়ায়, ভুরভুরি গন্ধে মন ভরে ওঠে। খরিদ্দার চা চায়, খরিদ্দার বিদায় হয়। সাজেদ বলে- সেলিম ভাই আমাদের বাড়ি ঘরের ভিটে মাটির কোন চিহৃ নেই। বাড়ি ঘর গ্রাম বিল একাকার হয়ে গেছে। আমরা কবে নাগাদ বাড়িঘরে ফিরে যাবো ? সরকার তো ইউনিয়নের বাঁধের কোন সুব্যবস্থা করলো না। গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেম্বারকে বললে তারা মুখের পরে জবাব দেয়, একটু শীত কমলে ভাটিগার গোণে বেড়িবাঁধ বাঁধা হবে। আমাদের জন্য সরকার নতুন বাজেট আনবেন। আমাদের বাড়ি ঘর তৈরীর সুব্যবস্থা করবে। সাজেদ বলে সেলিম ভাই এই যে কনকনে শীত পড়ছে। এই শীতের মৌসুমে আমরা শীত বস্ত্রের দারুন কষ্ট ভোগ করছি। দৈনন্দিন কত খাদ্য খাবারের অসহ্য কষ্ট ভোগ করছি। খেয়ে না খেয়ে এই বেড়িবাঁধের উপরে খোলা আকাশের নীচে দিন রাত কাটাচ্ছি। বিলঝিল ভর্তি লোনাপানি, কোথাও সবুজের একটু চিহৃ পর্যন্ত নেই। লবণপানি হলো ফুল ফসল শস্যের জন্যে অভিশাপ। ওভাবে বলোনা সাজেদ গ্রাম্য মহাজনরা, ঘের মালিকরা জমির মালিকদের নিকট থেকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময় লবণপানির ঘের বা মৎস্য চাষের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।

মর্তিমরণ মধ্যবৃত্ত ও গরীব লোকদের। ধনীদের পোয়া বার। লবণপানির ঘের করার কারনে আজ আমরা সর্বশান্ত নিঃস্ব ভিটে-মাটিহীন। তাই বলতে হয় আজ আমরা শোক তাপে ক্ষুধা দারিদ্রের অনলে দোমড়ানো মোচড়ানো কাগজের দলা হয়ে গলাম, একেবারে মূল্যহীন। এই দুর্দিনে কোন কাজে আসলোনা ঘের মালিকদের। তবে মনে রেখো সাজেদ ভাই আর কোনদিন আমরা লবণপানি হতে দেবো না গাবুরা ইউনিয়নে। ঘেরের কথা যারা বলবে তাদের তাড়িয়ে নদী পার করবো। জীবন দেবো কিন্তু লবণপানির ঘের হতে দেবো না। আমরা এখন বুঝেগেছি জীবনের মূল্য আর ঘের মালিকদের অতি উৎসায়ী ষড়যন্ত্র। এই ইউনিয়নের মধ্যে লবণপানির ঘের হওয়ার কারনে জমিতে কোন প্রকার শাক সবজি ফলে না। কি খেয়ে আমরা বাঁচবো ? আমরা প্রতিদিন যে পানি টুকু পান করি তা লবণপানি ছাড়া কিছুই না। আমরা লবণপানি পান করছি, নাতো প্রতিদিন বিষপান করছি। লবণপানি নদী থেকে বেড়িবাঁধে কেঁটে তোলার কারনে বেড়িবাঁধ দূর্বল ছিল। আর সেই সুযোগে শতশত কুমকুমকে হারিয়েছে ইউনিয়বাসী। করো লাশ মিলেছে, করোর বা লাশও মেলেনি স্রোতে ভেসে নিয়ে গেছে গহীন সাগরে বা আশ্রয় হয়েছে হাঙ্গর কুমুরের পেটে শেষ সমাধি। আজ আমাদের বুকে পেরেক বিদ্ধ হয়ে গেছে আর প্রতিনিয়ত রক্ত ঝরছে। সেলিম ভাই দেখো তো তোমার ভাবী কহিনূর আসছে না কি। তার সঙ্গে ভাব বিনিময় করো তো তোমাকে চিনতে পারে কিনা। সেলিম ভালো ভাবে তার কাছে শুভেচ্ছা বিনিময় করে বলে ভাবী তুমি কেমন আছো ? ভাবী কহিনূর কোন উত্তর দেয় না। শুধু এক মনে মনে বকতে থাকে, কোন কথা শোনে না, কোন কথা বোঝে না, যেন এক পাগলা হাতি।

মাথা চুলকায়, মাথার চুল ছিড়ে আনে আর বলে আমার মাথার মধ্যে পোঁকা বক বক করছে, আমার কুমকুম রোমেসাকে এনে দাও। নদীর জোয়ার আসে, ভাটা ফিরে যায়, হাটের মানুষ বাড়ি ফেরে কিন্তু আমার কুমকুম ফেরে না কেন ? তাকে এনে দাও, আমার মাথা ভালো হয়ে যাবে। সেলিম কহিনূরের ফুঁফাতো শ্বাশুড়ির একমাত্র ছেলে, তাকেও সে চিন্তে পারলো না।
তখন সেলিম ভাবলো তাহলে তো ভাবী পাগল হয়ে গেছে তার কন্যার শোকে। তাকে তো ভালো ডাক্তার দেখাতে হবে। সাজেদের তো কোন টাকা পয়সা নেই, সে কোথায় পাবে এতো টাকা। এই কথাগুলো মনে মনে ভাবছিল সেলিম।
তুমি ভেবো না সাজেদ ভাই সেলিম বলে আমি ভাবীকে পাবনা হেমায়েত পুর পাগলা গারদের চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাবো এবং সকল ব্যবস্থা আমি করে দেবো। আর নেবো না কেন, সাজেদ ভাই সেতো আমার ভাবী। এই নাও সাজেদ ভাই আমার কাছে দশ হাজার টাকা আছে। এই টাকাগুলো ভাবীর চিকিৎসার জন্যে দিলাম। ভাবীর জন্য মঙ্গলবারে হাট থেকে একটা নতুন শাড়ী কাপড় এবং ফলমূল কিনে আনবে। আগামী সপ্তাহে আরো কিছু টাকা নিয়ে খুলনা পৌছায়ে-পাবনা হেমায়েত পুর পাগলা গারদে যাবো। ভাবীর চিকিৎসা করে আনবো। এতোক্ষণ সাজেদের চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে পানি ঝরছিল। এতোগুলো টাকা তার ভাবীর চিকিৎসার জন্যে দিলো। দুনিয়ায় এখনো ভালো মানুষ আছে। মানুষের দুঃখে যে এগিয়ে আসে, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সে তো মহামনব।

সাজেদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল – সেলিম তোমার মন এতো বড় তা আগে আমার জানা ছিল না। তোমার কাছে চির কৃতজ্ঞ। সাজেদ বিদায় নিলো আর সেলিম তার বাড়ির দিকে রওনা হলো। ধীরে ধীরে সন্ধ্যার অন্ধকারে তলিয়ে গেল গাবুরার দ্বীপ। আকাশে পূর্ণিমারচাঁদ ঝলমল করে ভেসে উঠল। নদীর বুকে চাঁদের লুকোচুরি খেলা আর বিলের পানিতে আকাশের চাঁদ আলো অন্ধকারে মুক্তদানার মতো হেসে উঠল। চাঁদের মুখে মুখ রেখে আকাশ নদী বিল জ্যোৎস্না পাহারা দেয়। কহিনূর বিড় বিড় করে বকে। খিলখিল করে হাসে। হাতে পায়ে পরা লোহার শিঁকল বেজে ওঠে। ভরা নদীর সাথে কথা বলে কহিনূর- আমার বুকের মানিক কুমকুম কই ? চাঁদের দিকে মুখ রেখে হাত বাড়ায় ডাকে কহিনূর, বাববার ডাকে কুমকুম !