জহুরুলকে বিদায় দিয়ে আমরা বিষণ্ণ মনে ক্যাম্পের পথে রওনা হলাম। বার বার অজানা আশংকা মনে এসে আছড়ে পড়ছে। পথে কত রকম বিপদ-আপদ ওঁত পেতে আছে। আমরা তবু ভালয় ভালয় বিপদ সংকুল পথ পারি দিয়ে আসতে পেরেছি। জহুরুলকে বিপদ মাথায় নিয়ে বাড়ি যেতে হবে আবার তাকে ক্যাম্পে ফিরে আসতে হবে। ভাবতে গা কাঁটা দিয়ে উঠছে। অথচ কত অবলিলায় জহুরুল রাজি হয়ে গেল। এর নাম কি সম্পর্ক! এর নাম কি ভালোবাসা! আমারতো মনে হয় জহুরুল ছাড়া আমাদের আর কেউ এই প্রস্তাবে রাজি হতো না।
আমরা মৌন মুখে পথ চলছি। মাইকারচর শহর পেরিয়ে আমরা শরণার্থী শিবির ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছি। সড়কের দুপাশে তাবু আর তাবু। তাবুর সংখ্যা আরও বেড়েছে। প্রতিদিনই বানের পানির মতো দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসছে মানুষজন। তারা জ্বলন্ত উনুন থেকে উত্তপ্ত কড়াইয়ে এসে পড়ছে। এখানে না আছে থাকার পরিবেশ, না আছে খাওয়ার পরিবেশ, না আছে ঘুমানোর পরিবেশ। গঞ্জের ভিড়ের মতো গিজ গিজ করছে মানুষ। সবগুলো মুখই রোদে পোড়া, কালচে, চিমটে ধরে আছে। সুটা বেগুনের মতো চামড়ায় ভাঁজ। যেন প্রাণহীন, অন্তসার শূন্য। চারপাশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। নর-বরের গন্ধে আর মাছিদের ভন ভন শব্দে কান পাতা দায়। দুর্গন্ধে বমি উসকে ওঠে। কলেরা মহামারি হাঁটু গেরে বসেছে। প্রতিদিন বিনা চিকিৎসায় শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। যারা বেঁচে আছে তাদের দিকে তাকানো যায় না। সড়কে যে বালকের দল খেলা করছে তাদের কারও শরীরে এবং চেহারায় প্রাণের স্পন্দন নেই। হাড্ডিসার শরীর নিয়ে কোন রকমে বেঁচে আছে। রেশনের গন্ধযুক্ত চাল খেয়ে এর চেয়ে ভাল থাকার উপায় নেই।
আমি চারপাশ তাকিয়ে অখিলদাকে খুঁজছিলাম। দু’একজনকে জিজ্ঞেস করে অখিলদার খবর জানতে চাইলাম। কেউ চিনতে পারলো না। এত এত মানুষের ভিড়ে কে কাকে চিনবে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছিল না। নাক চেপে দ্রুত সেখান থেকে আমাদের চলে যেতে হলো।
আবার সেই ট্রেনিং ক্যাম্পের একঘেয়ে জীবন। সকালে দুই মুঠো চিড়া খেয়ে পিটি-প্যারেড। দুপুরে অখাদ্য খিচুড়ি আবার রাতে সেই দুই মুঠো চিড়া। এইভাবে চললে যুদ্ধের আগেই শহীদ হয়ে যেতে হবে।
এরই মধ্যে মড়ার উপর খাড়ার ঘা এসে পড়লো। পাকিস্তানি মিলিটারি আমাদের ক্যাম্প আক্রমণ করলো। দুপুরের আগে আমরা পিটি প্যারেড শেষ করেছি মাত্র। সেইসময় বিকট শব্দে ক্যাম্পের আশে-পাশে মর্টারের শেল এসে পড়তে লাগলো। তাৎক্ষণিক আমাদের করনীয় নিয়ে দ্বিধায় পড়লাম আমরা। তাকিয়ে দেখি ক্যাম্পের সবাই উত্তর দিকে [ভারতের দিকে] আন্দাকুন্দা দৌড়। আমরাও ভোঁ দৌড়। মোস্তফা রান্নার একটি বড় ডেকচি মাথায় নিয়ে ছুটছে। আমরা জান বাঁচাতে পিছে পিছে ছুটছি। ছুটতে ছুটতে একটি নদীর পাড়ে এসে আমাদের থেমে পড়তে হলো। অদ্ভুত সুন্দর নদীটির নাম, ‘সোনাভরি মুকতলা’। ভীষণ খরস্রোতা নদী। এটি ব্রম্মপুত্র নদীর একটি শাখা নদী। বাংলাদেশে দাঁতভাঙা ইউনিয়নের পাশ দিয়ে রৌমারী পাখি উড়া হয়ে টাপুরচরের মধ্য দিয়ে ভারতের জিঞ্জিরাম নদীতে গিয়ে মিশেছে।
আমাদের সাঁতরিয়ে সোনাভরি মুকতলা নদী পার হতে হবে। নদী খুব চওড়া নয় কিন্তু ভীষণ স্রোতিস্বিনি। আমার সাহসে কুলোচ্ছে না। আমাদের মধ্যে প্রথম ঝাপিয়ে পড়লো মোস্তফা। ডেকচি ধরে অনায়াসে সে পার হয়ে গেল। একে একে সবাই ঝাপিয়ে পড়লো নদীতে। সব শেষে আমি। আমার সঙ্গিরা সবাই পাড়ে উঠে গা মুছছে। আমি তখন মাঝ নদীতে স্রোতে খাবি খাচ্ছি। আর এগুতে পারছি না। দম নিতে পারছি না। আমি ভেসে চলেছি স্রোতের টানে। আর গলা ফাটিয়ে সাহায্য চাচ্ছি বন্ধুদের। বাঁচার আকুতি জানাচ্ছি। মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। কিন্তু বন্ধুরা মৃত্যুকে সে সুযোগ দেয়নি। সুকুর মামু এবং বন্ধু আসগর নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাতঁরে এসে আমাকে উদ্ধার করে। মৃত্যু দানব রূপে দরোজা পর্যন্ত এসে অবশেষে ফিরে যেতে বাধ্য হলো। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
সোনাভরি মুকতলা নদী থেকে আরও দু’মাইল উত্তরে গিয়ে নয়াবন্দর প্রাইমারি স্কুল প্রাঙ্গনে আমরা ক্যাম্প স্থাপন করলাম। স্কুলের সামনে মাঝারি মানের একটি খেলার মাঠ। সেই মাঠের চারপাশ ঘিরে তাবু টাঙ্গিয়ে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা ক্যাম্প তৈরি করে ফেললাম। নয়াবন্দর বাংলাদেশেরই অংশ। এ কথা শুনে আমার বিস্ময় ধরে না। কয়েকমাইল ভেতরে ভারতের পেটের মধ্যে ঢুকেও আমরা বাংলাদেশ পাচ্ছি। সেই কারণে খানিকটা আহ্লাদিত আমরা। এখনও জন্মভূমি আমাদের ছেড়ে যায়নি।
খবর নিয়ে জানা গেল পাকিস্তানিদের মর্টার শেলিংয়ে রউমারির কিছু স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। প্রাণহানি ঘটেনি।
নয়াবন্দরে ভালই কাটছিল আমাদের। তাবুর ভেতর ঘুমটা আরান্দায়ক ছিল।
দুদিনপর এক ভোরে হুইসেলের শব্দ। এ শব্দের অর্থ আমাদের এক্ষণই লাইনে দাঁড়াতে হবে। সৈনিকদের ভাষায় ফলোইন করতে হবে। হুইসেল শোনামাত্র পড়ি-মরি করে উঠে কোম্পানি ওয়াইজ লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। আস্তে আস্তে ফর্সা হচ্ছে চারপাশ। সূর্য উঁকি দিচ্ছে পুবাকাশে। দেখলাম মাঠের একপাশে কয়েকটি ট্রাক। দু’টো জীপ গাড়ি পাশে। আমাদের লাইনের সামনে আমাদের স্থানীয় কমান্ডার এবং অচেনা কয়েকজন ব্যক্তি। সেই ব্যক্তিদের চাল-চলন এবং চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল তারা সেনাবাহিনীর লোক। তারা হ্যান্ড মাইকে বলতে থাকলেন, ‘রেজিমেন্টের জন্য লোক নেওয়া হবে। তাদের ফ্রন্ট ফাইটার হিসেবে ট্রেনিং দেওয়া হবে। যারা সেই রেজিমেন্টে ভর্তি হতে চাও তারা সামনে এসে দাড়াও। চারদিকে পিন পতন নিরবতা। আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছি। এই সময় আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োকনিষ্ঠ সাইফুল ইসলাম মিন্টু, যাকে আমরা যুদ্ধে আনতে চাইনি সেই প্রথম এগিয়ে সামনে গিয়ে সামনে দাঁড়ালো। আমরা দেখে হতবাক। বলা নেই কওয়া নেই নিজে নিজে মাতব্বরি করে আমাদের দল থেকে আলাদা হয়ে গেল?
বয়োকনিষ্ঠ হলেও গায়ে গতরে বেশ তরতাজা ছিল মিন্টু। দেখতে দেখতে সামনের লাইন বেশ লম্বা হয়ে গেল। সেখান থেকে মাপ এবং ফিগার দেখে একশো জনের একটি দল বাছাই করা হলো। তারপর কালবিলম্ব না করে তাদের ট্রাকে তুলে নিয়ে চলে গেল। আমরা সেইভাবে মিন্টুকে বিদায় জানাতে পারলাম না। খুব তাড়াহুড়া করে নিজের কাপড় গুছিয়ে নিল মিন্টু। তারপর সবার সঙ্গে কোনরকমে হাত মিলিয়ে বেরিয়ে গেল দ্রুত। আমরা বেদনাক্রান্ত মুখে তাকিয়ে রইলাম। সেই আমাদের ভাঙ্গনের শুরু। প্রথম বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল মিন্টু। যুদ্ধের সময়গুলতে আর কখনও মিন্টুর সঙ্গে আমাদের দেখা হয়নি।
মিন্টুর শূন্যতা আমাদের বিমর্ষ করে দিল। কোন কিছুতে আমরা প্রাণ পাচ্ছিলাম না। সারাক্ষণ মনে হচ্ছিল কি যেন নেই। কি যেন নেই।