পাহাড়ি আঁকা বাঁকা রাস্তা ধরে আমাদের ট্রাক ছুটে চলেছে। নির্জন ফাঁকা রাস্তা। জন মনিষ্যির দেখা নেই। মাঝে মাঝে ইন্ডিয়ান আর্মির গাড়ি বহর পাশ কেটে চলে যায়। পাশ কেটে যাওয়ার সময় জয়বাংলা বলে তারা আমাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে। আমরাও চেঁচিয়ে জয়বাংলা বলে কুশল বিনিময় করি। আবার নিস্তব্ধতা। ঘন পাহাড়ি জঙ্গল ভেদ করে আমাদের ট্রাক ছুটছে। চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। যেন গোটা ভারত পাহাড় দিয়ে ঘেরা। কোন সমতল ভূমি নেই। আমাদের গন্তব্য সম্পর্কে আমাদের কিছু বলা হয়নি। কোথায় যাচ্ছি আমরা। আমাদের যাত্রার শেষ কোথায়? কিছুই জানি না। আমার কিশোর মন থেকে থেকে স্মৃতি কাতর হয়ে পড়ছে। বেশি মনে পড়ছে মায়ের কথা। একদিন আমাকে না দেখলে যে মানুষ অস্থির হয়ে পড়ে সেই মানুষ আমার অবর্তমানে কেমন আছে? সে কি সারাক্ষণ আমার পথ চেয়ে চোখের জল ফেলছে। কাঁদতে কাঁদতে কি তাঁর চোখের জল শুকিয়ে গেছে? আর কি কোনদিন মায়ের সঙ্গে দেখা হবে না? সেই শিশির মাখা ভোর কি জীবনে আর ফিরে আসবে না? আহা সেই সোনালি শৈশব আর কি কোনদিন ফিরে পাবো না?
এইসব ভাবতে ভাবতে আমার মনটা ভারী হয়ে আসে। চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে। দৃশ্যটি বন্ধু আসগরের নজর এড়ায়নি। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, বাড়ির কথা মনে পড়েছে বুঝি? আমি মাথা নেড়ে স্বীকার করলে আসগর আমাকে জড়িয়ে ধরে সাহস যোগায়। বলে, ‘এত ভাবছিস কেন? দেখিস জয় আমাদের হবেই।’
তারপর পাহাড়ের গায়ে ঝর্ণা দেখে আসগর আমাকে সেইদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আমার দেহমন চঞ্চল হয়ে ওঠে। তীব্র বেগে পাহাড়ের গা বেয়ে ঝর্নার পানি ছিটকে নিচে পড়ছে। ঝর্ণার দৃশ্য দেখে আমার মনটা ভাল হয়ে যায়। এমন অভাবনীয় চমৎকার দৃশ্য এর আগে আমি দেখিনি। আমি ভেবে পাই না, এত পানি কোত্থেকে আসে। আমার মন ঝর্ণার ভাবনায় ডুবে যায়।
দুপুর বারোটা নাগাদ একটি খোলা জায়গায় আমাদের ট্রাক থামলো। কাছা-কাছি একটি নয়নাভিরাম শহর। জানলাম শহরটির নাম তুরা। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা শহর খুব আকর্ষণীয় শহর। আরও জানলাম আমাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তুরা ট্রেনিং ক্যাম্পে। আমাদের দুপুরের খাওয়ার জন্য বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে। আমি শুকনো রুটি চিবুতে চিবুতে মুগ্ধ চোখে তুরার শহর দেখছি। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা তুরা শহর। এমন মনমুগ্ধকর সৌন্দর্য না দেখলে বর্ণনা করে বোঝান অসম্ভব। মনে হলো আমার জীবন সার্থক। মুক্তিযুদ্ধে না এলে এমন মনমুগ্ধ দৃশ্য আমি দেখতে পেতাম না। বিল্ডিঙয়ের মতো তলা ভাগ করা শহর। গাড়িগুলো যেন প্যাঁচ মেরে একতলা থেকে দ্বিতলে উঠছে। আবার দ্বিতল থেকে ত্রিতল। এইভাবে ক্রমশ উপরে উঠে যাচ্ছে। আমি অবাক বিস্ময়ে আত্মভোলার মতো দেখছিলাম। এ দেখার শেষ ছিল না। কিন্তু আমাদের পিছুটান আছে। আমাদের কাধে মহান দায়িত্ব। সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে থাকলে আমাদের চলবে না। আমাদের আরও অনেকদূর যেতে হবে।
আবার আমাদের ট্রাক চলতে শুরু করলো। প্রায় ঘণ্টা তিনেক চলার পর বড় রাস্তা ছেড়ে একটি সুড়ঙ্গ পথে ট্রাক ঢুকে পড়লো। তারপর বড় একটি গেটের কাছে আমাদের ট্রাকগুলো থেমে পড়লো। আমরা ট্রাক থেকে নেমে গাছের ছায়ায় গিয়ে বসে পড়লাম। ট্রাকের ঝাঁকুনিতে সবাই ক্লান্ত। আমাদের আগে আরও কয়েকটি ট্রাক ভর্তি যুদ্ধেচ্ছু তরুণের দল এসেছে। তারাও গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে। সব মিলে আমরা হাজার খানেক তরুণ গাছের ছায়ায় পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায়। আমাদের দলনেতা তৌহিদ ভাই আমাদের বললেন, এখানে শারীরিক পরীক্ষা হবে। যারা শারীরিক পরীক্ষায় টিকবে তারাই ট্রেনিংয়ে চান্স পাবে। আর যারা টিকবে না তারা বাদ যাবে। এই কথা শোনার পর আমার ভেতরে সমুদ্রের ঝড় শুরু হয়ে গেল। আমার শরীর হীম হয়ে আসছিল। বুক ধড়-ফড় বেড়ে যাচ্ছিল। যদি পরীক্ষায় না টিকি? যদি বাদ পড়ে যাই? তাহলে কি হবে? আমার বেশি ভয় আমার শরীর নিয়ে। আমি খুবই হ্যাংলা পাতলা। হাত-পা চিকন চাকন। থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল তুলতেই আমার ঘাম ছুটে যায়। দুজন ইন্ডিয়ান আর্মি হুইসেল দিয়ে আমাদের লাইনে দাঁড়াতে বললো। তখনই খেয়াল হলো ক্যাম্পের দেওয়াল ঘেঁষে দূরে ছোট একটি একতলা ভবন। সেই ভবনের দিকে মুখ করে আমরা চার লাইনে দাঁড়ালাম। সিরিয়াল ধরে চার লাইন থেকে একজন একজন করে ভেতরে ঢোকানো হচ্ছে আর সে একটু পর হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসছে। বাকিরা আগ্রহ ভরে তাকে জিজ্ঞেস করছে। সে কোন জবাব না দিয়ে শুধু হাসছে। কেউ কেউ হাসতে হাসতে বলছে, ‘ভেতরে যাও, গেলেই দেখতে পাবে।’
আমার সামনে প্রায় শ তিনেক যোদ্ধা। কখন আমার পালা আসবে। আমার ভেতর তির তির করে অস্থিরতা কামড়াচ্ছে। আমার প্রথম ভাবনা আমি বাদ পড়তে পারি। আর যদি বাদ পড়ি তাহলে কি উপায় হবে? আমার দ্বিতীয় ভাবনা সবাই ওই ঘর থেকে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসছে কেন? তাহলে কি ওরা টিকে গেছে? এমন অস্থির ভাবনায় আমি হাবুডুবু খাচ্ছি। মনে হচ্ছে পা দুটি লোহার শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। সামনে এগুতে পারছি না। এমন অস্থির অসংলঙ্গ ভাবনায় খাবি খেতে খেতে কখন যে আমার সিরিয়াল এসে গেছে টের পাইনি। সাদা চুনকাম করা একতলা ভবনে ঢুকে দেখি দুজন লোক। সম্ভবত তারা ডাক্তার। গায়ে সাদা এয়াপ্রন। আমাকে দেখেই তটস্থ হয়ে এগিয়ে এলো। হিন্দি ভাষায় বললো, ‘কাপড় খোল দো।’ আমি বুঝতে না পেরে ভ্যাবাচেকা মুখে প্রশ্নবোধক ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলাম। একজন দ্রুত আমার সার্টের বোতাম খুলে ফেললো। বললো, ‘প্যান্ট খোল দো।’
পাগল নাকি। প্যান্ট খুলতে বলে। লোক দুজন আমার কাজে বিরক্ত। সম্ভবত একই অভিজ্ঞতা তারা আমাদের সবার কাছ থেকে পেয়ে গেছে এই কারণে বিরক্ত। আর্মির নিয়মানুযায়ী এই ধরনের পরীক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক। আমি প্যান্ট-জাঙ্গিয়া খুলে উদোম হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ডাক্তার দুজন টর্চ লাইট দিয়ে আমার লজ্জার স্থানগুলো ভাল করে পরীক্ষা করছিল। খেয়াল করছিল আমার কোন জটিল ব্যাধি আছে কিনা। কিংবা ছোঁয়াচে ধরনের কোন রোগ। দেখা শেষ হলে তাদের নির্দেশে দ্রুত কাপড় পরে ফেললাম। ঢোকার পর সেখানে রক্ষিত বাঁধানো খাতায় নাম ঠিকানা লিখে ছিলাম। একজন ডাক্তার আমার নামের পাশে টিক চিহ্ন দিলে পোশাক পরতে পরতে দৃশ্যটি আড় চোখে দেখে আমার মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। তাহলে আমি টিকে গেছি। আমিও হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলাম। লাইনে অপেক্ষমাণ বন্ধুরা আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করতে লাগলো, কি হলো ভেতরে? কি জিজ্ঞেস করলো? অন্যদের মতো আমিও হাসতে হাসতে জবাব দিলাম, ‘যাও। গেলেই দেখতে পাবে।’