দ্বিতীয় দিন বাধ্য হয়েই উন্মুক্ত প্রান্তরে টয়লেট সারতে বসে গেলাম। উন্মুক্ত প্রান্তর ছাড়া যেহেতু আর কোন পথ নেই তখন কি আর করা। আমরাও লজ্জা শরম ঝেড়ে ফেলে খোলা প্রান্তরে প্রাকৃতিক কাজ সেরে ঝর্ণার পানিতে প্রক্ষালন করলাম। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। সার ধরে বসে ছোট বড় সবাই স্বাভাবিকভাবে ঝর্ণার পানিতে শৌচ কর্ম সম্পাদন করে আবার সেই ঝর্ণার পানিতেই হাতমুখ ধৌত করলাম। ঝর্ণার পানি যেহেতু স্থির নয়, ধাবমা, তাই ঝর্ণার পানি সবসময় পুত-পবিত্র। প্রবল বেগে কল -কল শব্দে পানি নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে। এই ঝর্ণার পানিতেই আমরা গোসল এবং খাওয়ার পানি হিসেবে ব্যবহার করতাম। এ কথা শুনে কারও হয়তো গেন্নায় গা রি রি করছে। আমাদের তখন এছাড়া বিকল্প কোন ব্যবস্থা ছিল না। তাছাড়া ঝর্ণার পানি নিরন্তর চলমান, স্বচ্ছ এবং নির্মল। খেতে কোন অস্বস্তি হয়নি আমাদের।
দ্বিতীয় দিন আমি ফেঁসে গেলাম ফেটিক ডিউটিতে। ফেটিক ডিউটি হলো ট্রেনিংয়ের বাইরে কোন কাজ। দ্বিতীয় দিনও প্রথম দিনের মতো নাস্তার আগেই হুইসেল বেজে উঠলো। আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমাদের মধ্য থেকে ত্রিশজনকে আলাদা করা হলো, যাদের দায়িত্ব হলো রান্নার আয়োজন এবং খাবার পানির ব্যবস্থা করা। এটা বাই-রোটেশন সবাইকে করতে হতো। দ্বিতীয় দিন আমার পালা পড়লো।
রান্না-বান্নার জন্য দুজন নির্ধারিত কুক আছেন। তারা ভারতীয় সেনাহবাহিনীর সদস্য। আমরা সব জোগাড়-যন্ত করে দেব। তারা শুধু রান্না করবে। আমাদের কয়েকজন সকালের নাস্তার জন্য আটা মাখতে লেগে গেল। আর আমরা কয়েকজন বালতির হাতলের ভেতর লাঠি ঢুকিয়ে লাঠির দু’প্রান্ত দু’জন কাধে করে ঝর্ণা থেকে পানি এনে ড্রামে জমা করতে রাখতাম। তিনবেলা ১২৬ জন মুক্তিযোদ্ধার খাওয়া, প্লেট ধোয়া এবং হাত ধোয়ার জন্য যে পরিমান পানি দরকার সব আমাদের সংগ্রহ করতে হতো।
ঝর্ণা থেকে পাড়ে ওঠা খাড়া পথ। কুচি কুচি পাথর ছড়ানো। হাঁটতে গেলে পায়ে লাগে। সাবধানে হাঁটতে হয়। বালটি ভর্তি পানি নিয়ে পাড়ে উঠতে বার বার পাথরে হোঁচট খেয়ে পা কয়েক যায়গায় ছুলে গেল। ফোসকা পড়লো কয়েক জায়গায়। ক্যাম্পের দেওয়া জুতা তখনও ব্যবহার শুরু করা যায়নি। চেঞ্জ না করলে সেটা পরা অসম্ভব। এক পাটি জুতার মধ্যে আমার একজোড়া পা দিতে হবে। রান্নার কাজটি কষ্টকর একই সঙ্গে মহা বিরক্তিকর। কিন্তু উপায় নেই। বাই-রোটেশন একবার সে ডিউটি করতে হবে সবাইকে। বিকেল থেকে পায়ে ব্যথা। খুঁড়িয়ে হাঁটছি। ভেতরে হাসপাতাল আছে। সেখান নিয়ে গেল বন্ধু আসগর। ডাক্তার তুলো দিয়ে ওয়াশ করে মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করিয়ে দিল, একই সঙ্গে এক কৌটা মলম এবং ব্যাথার ট্যাবলেট হাতে ধরিয়ে দিল। রাতে বিছানায় শুতে গিয়ে বুঝলাম ব্যাথাটা কয়দিন ভোগাবে।
আমাদের তাবুতে কয়েকজন গায়ক ছিলেন। রায়গঞ্জের আশরাফ ভাই, সিরাজগঞ্জ কালিয়া হরিপুরের হামিদ ভাই আর সুকুর মামু। তাদের গানের জন্য উস্কে দিতেন তৌহিদ ভাই। হামিদ ভাই নজরুলগীতি গাইতেন। আশরাফ ভাই কলকাতার হেমন্ত মুখোপাথ্যায়, মান্না দে এঁদের গান গাইতেন। সুকুর মামু নজরুলগীতি এবং আধুনিক সবধরনের গানই গাইতেন।
গান শুনতে শুনতে পায়ের জ্বালা যন্ত্রণার কথা ভুলে গেছি। মগ্ন হয়ে আছি গানে। এইসময় হুইসেল। হুইসেলদাতা কণ্ঠ তুলে বললো, যারা কুক পার্টিতে ছিল কেবল তারাই ফলোইন করবে। শুনে মেজাজটা যাচ্ছে রকমভাবে কষে গেল। শরীর খারাপ। শুয়ে শুয়ে আরাম করে গান শুনছিলাম ব্যাটাদের সহ্য হলো না। আমরা কুক পার্টির ত্রিশজন লাইনে দাঁড়ানোর পর আমাদের প্রধান কুক বললেন, ‘বাংলাদেশ থেকে কাদের সিদ্দিকী এবং তার সঙ্গে ৩০/৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা এসেছে। তাদের খাওয়ার জন্য রান্না করতে হবে।’
আমরা লেগে গেলাম আটা মাখার কাজে। সুখের আরাম হারাম করার জন্য যতটা বিরক্ত হয়েছিলাম কাদের সিদ্দিকীর নাম শুনে মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠলো। কাদের সিদ্দিকী ততদিনে আমাদের কাছে নায়ক হয়ে উঠেছেন। দেশের ভেতর থেকে বিশাল বাহিনী গড়ে তুলেছেন, ‘কাদেরীয়া বাহিনী।’ তাঁর বাহিনীর ভয়ে পাকিস্তানি মিলিটারিরা তটস্থ। সন্মুখ সমরে তাঁর বাহিনীর কাছে অনেক পাকিস্তানি মিলিটারি বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে। অনেকে আত্মসমর্পণ করেছে। এসব কাহিনী বিভিন্ন রেডিওর খবরে নিয়মিত প্রচার হচ্ছে। সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী আমাদের ক্যাম্পে এসেছেন। তাঁকে খানা তৈরি করে খাওয়াবো এ যেন পরম সৌভাগ্য আমাদের। আমরা অতি উৎসাহে কাজে লেগে গেলাম। খুব কম সময়ে মধ্যে গরম গরম পরোটা আর ভেজিটেবল সস্প্যানে ভরে নিয়ে গেলাম তাঁদের তাবুতে। তাবুর বাইরে কালো পোশাক পরা দুজন পাহারাদার ছিল অস্ত্র হাতে। আমাদের থামিয়ে তারা আমাদের হাত থেকে খাওয়াগুলো নিয়ে আমাদের চলে যেতে বললেন। আমরা সবাই বিস্ময়ে নিরবে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা কত আশা করে এসেছি কাছে থেকে কাদের সিদ্দিকীকে দেখবো। আর সে কিনা আমাদের চলে যেতে বলছে। আমরা তবু ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। সেন্ট্রি দুজন এবার ধমকের সুরে আমাদের চলে যেতে বললেন। অগত্যা আমরা বিষণ্ণ মনে তাবুতে ফিরে এলাম। এতো কাছে এসেও বীরযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীকে দেখতে পেলাম না এই আফসোস কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারছিলাম না। রাতে ভাল করে ঘুমাতে পারলাম না এই কারণে।
সকালে গরম পরোটা আর মগ ভর্তি চা খেয়ে দলবেঁধে ট্রেনিংয়ে চলে গেলাম। পায়ের ব্যথা অনেকখানি কমে গেছে। হাঁটলে অল্প অল্প বোঝা যায়। সেদিন আমাদের স্টেনগানের ফায়ার শিখানো হলো। ছোট হাল্কা অস্ত্র এই স্টেনগান। অস্ত্রের গায়ে ছোট ছোট ছিদ্র। লম্বা ম্যাগাজিন। এক ম্যাগাজিনে ৩০ থেকে ৩৫টা গুলি লোড করা যায়। অটোমেটিক এই অস্ত্র কাছের শত্রুদের ব্রাশ ফায়ার করে মেরে ফেলার খুবই কার্যকরী। তবে দুরের শত্রুদের ঘায়েল করা কঠিন। গুলির রেঞ্জ খুব অল্প। বেশিদূর যায় না। তবে স্টেনগান দিয়ে ফায়ার করার মজাই আলাদা। শরীরে এতটুকু ঝাঁকুনি লাগে না। হাল্কা বলে বহন করাও সহজ। দেশে এসে আমরা অনেকদিন গায়ে চাদর জড়িয়ে চাদরের নিচে স্টেনগান নিয়ে লোকালয়ে ঘুরতে বেরিয়েছি।
আমি মনে মনে ঠিক করে ফেলি যুদ্ধে আমি স্টেনগানই ব্যবহার করবো। এলএমজি এবং রাইফেল দিয়ে যেভাবে দুরের শত্রুকে নির্মূল করা যায় স্টেনগান দিয়ে সেটা সম্ভব নয়। তবে কাছের শত্রুকে নির্মূল করা সহজ। দেখা যাক ভাগ্যে কি আছে। অস্ত্র দিয়ে টার্গেট ঠিক করে গুলি করার পরই আমাদের সেই অস্ত্র খুলে আবার জোড়া লাগানো শেখানো হয়। এটাও যুদ্ধের বড় ট্রেনিং। মাঝে মধ্যে অস্ত্র খুলে পরিস্কার করতে হয়। ফুলতুরু বলে ফিতার মতো লম্বা একটি জিনিস আছে। মাথায় গোলাকার নরম একটি গিটঠু। তাতে গান অয়েল দিয়ে ব্যারেল পরিস্কার করতে হয়। দেশের ভেতর যুদ্ধের সময় গান অয়েলের অভাবে আমরা নারিকেল তেল আর কেরোসিন মিশিয়ে অস্ত্র পরিস্কার করতাম। ফুলতুরুর একমাথা ব্যারেলে ঢুকিয়ে বার বার টেনে বের করে ব্যারেল পরিস্কার করতে হয়। কাজটা নিয়মিত করতে হতো। বিশেষ করে একটি যুদ্ধের পরপরই।
দুপুরে খাওয়ার পর সামান্য রেস্ট। তারপর ফেটিক খাটতে যেতাম। আর্মির ভাষায় বলা হতো ফেটিক। সোজা কথায় গতর খাটনি। সৈনিকদের নাকি বসিয়ে রাখলে শরীরে রসবাত ধরে। তাই তাদের অলয়েজ দৌড়ের উপর রাখতে হয়। আমরা ভোঁতা দা দিয়ে পাহাড়ের জঙ্গল কেটে পরিস্কার করতাম। কাজটি প্রতিদিনই করতে হতো। খুবই কষ্ট হতো। একেতো ভোঁতা দা তারউপর জঙ্গলে নানা ধরনের কীট পতঙ্গ। বিশেষ করে জোঁক ধরতো হঠাৎ হঠাৎ। আমরা যেগুলোকে চীনা জোঁক বলি। এই জোঁকের ভয়ে আমি সর্বদা সন্ত্রস্ত্র থাকতাম। পাহাড়ের জঙ্গল পরিস্কার করাটা খুবই বিরক্ত লাগতো আমার। দুইঘণ্টা ফেটিক ডিউটি করে আমরা তাবুতে ফিরে আসতাম। এসে গরম গরম চা খেয়ে আবার মার্কপাসট করে ময়দানে এসে কোম্পানি অয়াইজ লাইন দিয়ে দাঁড়াতাম। সামনে মাটির উঁচু ঢিপির মতো ছোট মঞ্চ। সেখানে মাইকের স্ট্যান্ড লাগানো। সেখানে ভারতীয় আর্মি অফিসার এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা উদ্দীপনামূলক বক্তৃতা করতেন। সবশেষে আমরা জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে আবার লাইন ধরে তাবুতে ফিরে আসতাম। তারপর সেদিনের মতো ট্রেনিং শেষ।
তৃতীয় দিন আমরা গিয়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছি। আমাদের শামীম কোম্পানি শুরুর দিকে থাকে। তারপর অন্যরা। প্রায় ৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা লাইন ধরে ধরে দাঁড়িয়ে আছি। মাইকে ঘোষণা হলো আজ আমাদের সামনে উদ্দীপনামূলক বক্তৃতা করবেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। শুনে মনটা চঞ্চল হয়ে উঠলো। গতকাল তাঁকে এবং তার দলের যোদ্ধাদের রুটি বানিয়ে খাইয়েছি। কিন্তু মুখোমুখি দেখার সুযোগ হয়নি। আজ তাঁকে কাছে থেকে দেখতে পাবো। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
এইসময় কাদেরিয়া বাহিনীর ২০/৩০জন যোদ্ধা এসে ময়দানের একপাশে দাঁড়ালেন। তাদের সবারই পরনে কালো পোশাক। তারা দুইলাইনে দাঁড়ালেন। এই সময় কালোপ্যান্ট কালোসার্ট কোমরে পিস্তল দুর্দান্ত এক তেজি তরুণ বেরিয়ে এলেন। তিনিই কাদের সিদ্দিকী। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখছি।
হঠাৎ চমকে তাকালাম আমি। কাদেরিয়া বাহিনীর যোদ্ধারা এমন নাটকীয় কায়দায় কাদের সিদ্দিকীকে গার্ড অব অনার প্রদান করলেন যা শুধু ব্যতিক্রমই নয় ভীষণ দৃষ্টিনন্দন। এমন গার্ড অব অনার আমি আগে কখনও দেখিনি। গার্ড অব অনার শেষে কাদের সিদ্দিকী মঞ্চের কাছে এসে দাঁড়ালেন। ময়দানে কয়েক হাজার যোদ্ধা পলকহীন তাঁকে অবলোকন করছে।
প্রতিদিনের মতো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের রেকর্ড অংশ বিশেষ বাজিয়ে শোনানো হলো। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর ময়মনসিংহ থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া কাদের সিদ্দিকীর ব্যক্তিগত জীবন এবং তাঁর যোদ্ধা জীবনের কাহিনী বিস্তারিত তুলে ধরলেন। সবশেষে তাঁকে মাইকের সামনে আহ্বান করলেন কিছু বলার জন্য। কাদের সিদ্দিকী মাইকের সামনে এসে দাঁড়াতে মুহুর মুহুর জয়বাংলা শ্লোগানে তুরার পাহাড় কেঁপে-কেঁপে উঠছিল। তাঁর প্রথম বাক্যটি আমাকে মুগ্ধতায় আবিষ্ট করলো। শুধু আবিষ্ট করলো না, অন্তরে গেঁথে রইলো। যা আজও স্পষ্ট মনে আছে। তিনি শুরুতেই বললেন, ‘আমার পরিচয়ে আমাকে বীর বলা হয়েছে। আমি বীর নই। বীর আমার মা, আমার মাতৃভূমি। আমার মাতৃভূমির ডাকে আমি যুদ্ধে এসেছি মাতৃভূমিকে পাকিস্তানি জল্লাদদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য।’
তাঁর এই দৃঢ়চেতা উচ্চারণে করতালিতে ময়দান প্রকম্পিত হতে থাকলো। আরও অনেকক্ষণ তিনি অগ্নিঝরা বক্তৃতা করলেন। সবশেষে বললেন, ‘আপনারা হতাশ হবেন না। জয় আমাদের সুনিশ্চিত। স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের প্রানপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে আনবো।’
সেইরাতেই আমরা তিন ট্রাক অস্ত্রগোলা বারুদ তুলে দিলাম। তিনি রওনা হওয়ার আগে সমবেত যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বিপুল বিক্রমে জয়বাংলা বলে গর্জে উঠলেন। জবাবে আমরাও গলা ফাটিয়ে বিদায়ী সালাম জানালাম, ‘জয়বাংলা।’