আমরা যখন শুভগাছা পৌঁছলাম তখন গোটা গ্রাম নিরব নিস্তব্দ। কোথাও কোন জনমুনিশ্যির সাড়া নেই। মনে হচ্ছে গভীর গহীন রাতে আমরা কোন নির্জন দ্বীপে এসে পড়েছি। কোথাও প্রাণের স্পন্দন নেই। কোথাও আলোর দেখা নেই। যুদ্ধের সময় ব্লাকআউট হয়। মনে হচ্ছে তেমন অবস্থা। যদিও দেশে কোথাও কোথাও যুদ্ধ চলছে। তার ঢেউ এসে পড়েছে এই জনপদে। এই গ্রামই যে শুভগাছা আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না। রাস্তায় লোকজন যেভাবে আমাদের মাইল দেখাতে গিয়ে হাইকোর্ট দেখিয়েছে তাতে এই গ্রামই শুভগাছা সেটা নিশ্চিত হতে আমরা দ্বিধায় পড়ে গেছি। কাউকে ডেকে জিজ্ঞেস করবো তেমন কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা রাস্তার পাশে একটি বাড়ির আঙ্গিনা দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের কথাবার্তার আওয়াজে পাশের বাড়ির একজন গলাখাকারি দিয়ে উঠলে আমরা উল্লসিত হই। মানুষের সাড়া মিলেছে। আমরা ওই ঘরের পাশে গিয়ে খুব তাজিমের সঙ্গে তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাইজান, এই গাঁয়ের নাম কি শুভগাছা? ভাইজান স্বীকার করলেন, হ্যা শুভগাছা। সত্যি সত্যি আমরা উল্লসিত হয়ে উঠলাম। যেন বাঁচা গেছে। আমরা শুভগাছা এসে গেছি।
-আপনারা শুভগাছা কার বাড়ি যাইবেন? লোকটির প্রশ্নে আনন্দের আতিশয্যে আমরা সবাই বলে উঠলাম, বিচিত্রদের বাড়ি।
লোকটি বললো, সামনে যান। দেখবেন একটি তালগাছওয়ালা বাড়ি। ওটাই বিচিত্রদের বাড়ি।
আমাদের এবার অন্ধকারে তালগাছ খোঁজার পালা। পেয়ে গেলাম তাল্গাছয়ালা বাড়ি। কোনরকম ভাবনা চিন্তা ছাড়াই আমরা গলা ছেড়ে বিচিত্রকে ডাকতে শুরু করলাম।
আমাদের ডাকা-ডাকিতে একজন গলা কেশে উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কারা? কোত্থেকে আইছেন?
আবার আগের মতো সম্মিলিত কণ্ঠে বললাম, আমরা কানসোনা থেকে আসছি। কানসোনার কথা শুনে তিনিও উঠে এলেন। বিচিত্রকে ডেকে তুললেন। তিনি বিচিত্রর বড়ভাই। আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য জেনে তারা ভীষণ অবাক। আমাদের খাতির যত্ন করতে লাগলেন বেশ।
আমাদের দেখে বিচিত্র এতটাই অবাক হয়েছে যে ওর মুখে কোন কথা আসছে না। অমায়িক ভাবে হাসছে। এমনিতে বিচিত্র সরল প্রকৃতির এক কিশোর। কিন্তু খুব দায়িত্বশীল। কৃষ্ণবর্ণের বিচিত্র দাশ শুধু ধবল দাঁত বের করে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছিল। আমরা ভীষণ ক্ষুধার্ত এই কথা শোনার পর বিচিত্র ওর দাদা এবং আরও যারা আমাদের দেখতে এসেছিল সবাই ব্যস্তভাবে ভেতরে চলে গেল।
খাওয়ার আয়োজন শেষে আমাদের ডাকতে এসে বিচিত্র দেখে আমরা সবাই ঘুমের রাজ্যে ঢলে পড়েছি। সবাইকে সে ডেকে ওঠায়। খাওয়ার তাগাদা দিতে থাকে।
খাওয়া এবং ঘুম দুটোই তখন আমাদের ভীষণ প্রয়োজন। খাওয়ার কথা শুনে আমাদের কেউ কেউ তড়াক করে লাফিয়ে উঠে হাত মুখ না ধুয়ে খেতে বসে গেল।
খেতে বসে দেখা গেল আমরা ৮ জন। রফিক মামু-যিনি আমাদের নেতা। যার ডাক নাম সুকুর। আমি ডাকি সুকুর মামু বলে। তার পাশে সরকার আলি আসগর, রাজ্জাক, এই বন্ধুটি গায়ে গতরে বেশ নাদুস নাদুস। বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে সহজ সরল। মনে কোন ঘোর প্যাঁচ নেই। সোজা কথায় সাদা মনের মানুষ। এই সরল বন্ধুকে নিয়ে সবাই মজা করে। তবু সে রাগ করে না। রাজ্জাকের পাশে মোস্তফা, জহুরুল তারপর আমি।এক পাশে শাজাহান এবং সাইফুল ইসলাম মিন্টু।
শাজাহানকে দেখে আমরা সবাই অবাক। মনে খটকাও লেগেছে ভীষণ। সামান্য কিছু লেখাপড়া জানে শাজাহান। মুলত সে তাঁত শ্রমিক। খুবই সাধারণ একজন। যাকে সহজ কথায় আমজনতা বলা যায়। সে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে। কোনদিন যাকে আমরা মিছিলে দেখিনি। আমাদের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনায় তার অংশগ্রহণ ছিল না কখনও। তাকে যুদ্ধ-যাত্রায় দেখে আমাদের সবাই পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিলাম। একই সঙ্গে আমরা মনে মনে খুশি হচ্ছিলাম। দেশের স্বাধীনতার জন্য ছাত্র-জনতা সবাই ছুটে এসেছে।
সবার বয়োকনিষ্ঠ সাইফুল ইসলাম মিন্টু। ক্লাস এইটের ছাত্র। যুদ্ধে যেতে আমরা ওকে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করেছি কিন্তু ও শোনেনি। আমরা তারপর আমাদের যাত্রাপথে ওকে আর দেখিনি। ভেবেছি ফিরে গেছে। যাত্রা পথে আর দেখা না হওয়ার কারণ আমরা ৮ জন একসঙ্গে পথ হাটিনি। দুজন দুজন করে আমরা ভাগ-ভাগ করে পথ হেঁটেছি। দলবেঁধে হাঁটলে যে কেউ সন্দেহ করতে পারে। এই জন্যে আমরা দুজন দুজন ভাগ ভাগ করে-করে পথ চলেছি। তাছাড়া লম্বা পথ চলতে কে কখন এগিয়ে গেছে আবার পিছিয়ে পড়েছে সে খোঁজ কে রাখে।
খেতে বসে পরস্পরকে দেখছি। আমাদের আরও একজন বন্ধু আসার কথা ছিল, আসাদুজ্জামান খোকন। ওর জন্যে আমাদের অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। পরে সে আমাদের বললো, কাল আমাদের সঙ্গে ও শুভগাছায় মিলিত হবে। দেখা যাক আসে কিনা। আমি অবশ্য খোকনের আশা ছেড়ে দিয়েছি।
পরদিন আমরা যমুনা থেকে নেমে আসা খালে গোসল করছি। খালের উপর বাঁশের তৈরি একটি সাঁকো। সেই সাঁকো পেরিয়ে আসছে খোকন। আমরা বিস্ময়ে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলাম। খোকন কথা রেখেছে। আমার ধারণা মিথ্যে প্রমাণ করে অবশেষে খোকন ঠিকই আমাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে এলি?
খোকন বললো, ট্রেনে সিরাজগঞ্জ ঘাট। ঘাটে নেমে তারপর হাঁটা দিলাম।
বললাম, ভয় করলো না? যদি মিলিটারির হাতে ধরা পরে যেতিস?
বলে, আমাকে পাবে কিভাবে? ট্রেনে উঠেই আমি টয়লেটে ঢুকে পড়েছি।
খোকনের অদ্ভুত বুদ্ধির কথা শুনে আমরা হা হা করে হেসে উঠলাম। আমাদের এই বন্ধু কারিগরি কাজে ছিল ভীষণ দক্ষ। হাইস্কুলে পড়ার সময় কাঠ দিয়ে সুন্দর করে বইয়ের তাক বানিয়ে ছিল। আমাকেও একটা তাক বানিয়ে দিয়েছিল। টর্চলাইটের ব্যাটারি দিয়ে পড়ার ঘরে বাল্ব জ্বালিয়ে পড়তো। আমরা নাটক করতাম। মঞ্চের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজের দায়িত্ব পড়তো খোকনের উপর। এই জাতীয় খুঁটিনাটি কাজ সে খুব সুচারু রূপে সম্পাদন করতে পারতো।
সন্ধ্যায় বিচিত্র আমাদের নিয়ে গেল দালালের বাড়ি। সেইখানে দালালের সঙ্গে আমাদের ভারত যাওয়ার ব্যাপারে কথা হলো। এই দালাল সাহেবের নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন অনেকগুলো নৌকা ভারত যাতায়াত করে। বেশিরভাগ যাত্রী শরণার্থী। তারা পাকআর্মির ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে যাচ্ছে।
দালাল আমাদের জানালেন নৌকা ভাড়া হিসেবে আমাদের মাথা পিছু ত্রিশ টাকা দিতে হবে। আমরা দর কষাকষি করলাম ভাড়া কমাতে। দালাল বললো, অন্যদের কাছ থেকে আমরা বেশি নেই। আপনারা যুদ্ধ করতে যাচ্ছেন জন্যে আপনাদের কাছ থেকে কম নিচ্ছি।
সমস্যা বাঁধলো মিন্টু এবং তার চাচাতো ভাই শাজাহানকে নিয়ে। এই দুজনের কাছে কোন টাকা নেই। এই দুজনের টাকাও আমাদের দিতে হবে। বাড়তি খরচ করার মতো আমাদের কারো কাছে যথেষ্ট টাকা নেই। কি করা যায়? আমরা ভেবে কোন পথ পাচ্ছিলাম না।
মাত্র ৬০ টাকা নিয়ে আমি পথে নেমেছি। এই টাকাও অনেক ধান্ধাবাজি করে যোগাড় করতে হয়েছে। যুদ্ধের সেই সময় আমার মামাতো ভাই জুটমিলের শ্রমিক সাত্তার আমাদের বাড়িতে এসেছিল। আর বাড়ি যাওয়া হয়নি। সাত্তারও যুদ্ধে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। সাত্তার একদিন আমাকে বললো, সেও যুদ্ধে যাবে। একটাই সমস্যা টাকা। টাকা কোথায় পাবে? টাকার ব্যাপারটা নিয়ে আমরা ভাবতে থাকি। আমি বাবা-মার শয়ন ঘরে গিয়ে দেখি বড় বস্তায় সর্ষে রাখা। হাটের দিন সাত্তারকে বললাম, হাটে নিয়ে এই সর্ষে বিক্রি করতে হবে। মজার ব্যাপার হলো সেদিনই হাটবার। ভাবামাত্র সাত্তারের মাথায় দিলাম তুলে সর্ষের বস্তা। মা দেখতে পেয়ে ছুটে এসে আমাকে বারণ করতে লাগলো। ভয় দেখাল, তোর বাপ জানলে তোকে মেরে ফেলবে। বললাম, তুমি না বললে বাবা জানবে না। একটি শরণার্থী পরিবার এসেছে ঢাকা থেকে। তাদের একজন বয়স্কা রুগি আছে। তার চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার। চিকিৎসা করতে না পারলে তাঁকে বাঁচানো যাবে না। এই কথার পর আর কিছু বলতে হয়নি। হাটে নিয়ে সেই সর্ষে ১২০ টাকা বিক্রি করে আমি ৬০ টাকা সাত্তার ৬০ টাকা ভাগাভাগি করে নেই। সাত্তার সেই রাতেই মুক্তিযুদ্ধে চলে যায়। মুক্তিযুদ্ধে সাত্তার শহীদ হয়। আহতাবস্থায় সাত্তার পাকআর্মির হাতে ধরা পরে। নির্মম নির্যাতন করে সাত্তারকে হত্যা করে পাকআর্মি। জিপের পেছনে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে ময়মনসিং শহরে ঘুরিয়ে হত্যা করে সাত্তারকে। দেশের স্বাধীনতার জন্য আমার ভাই সাত্তার জীবন উৎসর্গ করেছে। এই দেশকে আমরা কিভাবে ভুলবো?
আমাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত হলো আমরা একজনকে তার যাওয়ার খরচ বহন করবো। এখন তোমরা ঠিক করো কে যাবে আর কে থাকবে। মিন্টুর সোজাসাপটা কথা আমি প্রয়োজনে হালের বৈঠা ধরে ভাসতে ভাসতে যাব। তবু আমি যাব। শাজাহান এবার আবেগি কণ্ঠে বলে উঠলো তুই কোন দুঃখে যাবি? আমি কি কম দুঃখে যাচ্ছি। এই কথা বলার পর সে এমন একটি কথা বলে উঠলো মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যার কোন সম্পর্ক নেই। আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম তার কথা শুনে। পারিবারিক একটি সমস্যার কথা বলে চোখের পানি মুছতে লাগলো। আমরা হাসবো না কাঁদবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
শেষ পর্যন্ত দুজনকেই আমরা আমাদের খরচে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভোরে বিশাল বজরা নৌকায় আমরা গিয়ে উঠলাম। মাঝিরা আলী আলী বলে নৌকা ছেড়ে দিল। মা বাবা ভাইবোন আত্মীয়স্বজন অরক্ষিত রেখে আমরা চললাম মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে।