অনেক বেলা করে ঘুম ভাঙ্গলো। খেতে বসে প্লেটে সেমাই দেখে কৌতূহলে আমাদের একজন জিজ্ঞেস করলো, ‘কি ব্যাপার ভাই, সেমাইয়ের আয়োজন কেন?’
পরিবেশনকারি সরস গলায় বললেন, ‘ভাই, আজকা ঈদের দিন। তাই সেমাই রান্না হইছে।’
‘ঈদের দিন!’ কথাটা শুনে আমার কণ্ঠনালিতে খাওয়া যেন আটকে গেল। কখন ঈদ আসে, কখন চাঁদ ওঠে, কখন অমাবস্যা-পূর্ণিমা হয় এসবের কোনটাতেই আমাদের খেয়াল নেই। রাতে চলাচলের সময় জ্যোৎস্না রাত হলে সুবিধে এই যে পথঘাট ভাল চেনা যায়। আবার অসুবিধা হলো অন্যের নজরে পড়ে যাই আমরা। তাতে আমাদের গোপনীয়তা নষ্ট হয়।
আমাদের খেয়াল না থাকলেও প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলমান। তার নিজস্ব নিয়মে দিনের পর রাত হচ্ছে, রাতের পর দিন। বছর ঘুরে এসেছে পবিত্র ঈদ। আমাদের জীবনে কোন ঈদ নেই। আমার অবর্তমানে আমার পরিবারেও নিশ্চয়ই ঈদের কোন আমেজ নেই। আমার মায়ের কথা মনে পড়লো। নিশ্চয়ই আমার জন্য পথ চেয়ে চোখের জল ফেলছে। তার জীবনেও ঈদের কোন আনন্দ নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু আমার জন্য প্রার্থনা করছে। মায়ের কথা ভাবতেই ভেতরটা কান্নায় জেরবার হয়ে গেল। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে খাওয়া শেষ করলাম।
পরিবেশনকারীকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঈদের জামাত কোথায় হলো?’ বললেন, ‘মসজিদে’। তারপর বিমর্ষ মুখে বললো, ‘কিসের ঈদ ভাই। মানুষের মনে শান্তি নাই। আল্লাহপাক ঈদ উৎসব পালন করতে বলেছেন, তাই করা।’
কথা ঠিক। দেশজুড়ে যুদ্ধের দামামা বাজছে। এখন কিসের ঈদ উৎসব?
গ্রামটি নিভৃত পল্লিতে। এখানে মিলিটারি রাজাকার নেই। কখনও তারা মিলিটারি রাজাকার দেখেনি। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাও দেখেনি তারা। আমাদের দেখতে তাই তরুণ যুবক বৃদ্ধদের ভিড় লেগে যায়।
দুপুরের পর কমান্ডার আশরাফভাইকে বলে আমি একজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে গ্রামের ভেতর ঘুরতে বের হলাম। খুবই সাধারণ অনুন্নত একটি গ্রাম। অধিকাংশ বাড়িঘর ছনের ছাউনি। ভাঙা বেড়া। সোজা কথায় তারা দরিদ্র। আমরা দিনের বাংলাদেশ দেখতে দেখতে হালট দিয়ে হাঁটছি। একটি বড় উঠোনওয়ালা বাড়ির বাইর বাড়িতে দুজন বয়স্কা মহিলা দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। আমাদের দেখে এগিয়ে কাছে এলেন। জড়তা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারা কি মুক্তিফৌজ?’
আমরা হেসে মাথা নেড়ে স্বীকার করলাম। একজন ফর্সা মতো স্বাস্থ্যবতি মহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপন মনে বললেন, ‘কোথাকার কোন মায়ের পুত কোথায় আইসা পইড়া আছে। জান বাজি রাইখা দ্যাশের লাইগা যুদ্ধ করতাছে। ওগোরে মায়ের বুক যে কেমন করতাছে ওই মায়েরাই জানে।’
পাশের মহিলা এবার আমাদের খেতে অনুরোধ করলেন। আমরা বিনয়ে অপারগতা প্রকাশ করলে তারা বিস্ময়ে কারণ জানতে চাইলেন। বললাম, ‘যেখানে সেখানে আমাদের খাওয়ার নিষেধ আছে। কিছু মনে করবেন না। আমাদেরতো শুত্রুর অভাব নেই। আমাদের বড় ভয় দেশীয় শত্রুদের। মানে রাজাকারদের। তাদেরতো আলাদা করে চেনার উপায় নেই। তারাও আমাদের মতো বাঙালি। এইযে আপনারা, কে যে তাদের লোক আর কে যে আমাদের লোক সেটা আমরা কিভাবে বুঝবো? আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন আমরা যেন মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করে দেশবাসীকে স্বাধীন দেশ উপহার দিতে পারি।’
আমাদের আলাপের সময় আরও ক’জন গ্রামবাসী ভিড় করলে আমরা সেই স্থান ত্যাগ করি।
ফেরার পথে একজন অল্প অল্প চেনা লোকের সঙ্গে দেখা। সে আমাকে চেনে। আমার এলাকার মানুষ। এই অঞ্চলে তার শশুর বাড়ি। যুদ্ধের বেশিরভাগ সময় শশুর বাড়িতে অবস্থান করছে। মাঝে মাঝে নিজের এলাকায় যায়। সেই আমাকে ভয়ংকর একটি খবর জানালো। বললো, ‘তোমার বাড়ির লোকজন জানে যুদ্ধে তুমি মারা গেছ। এই খবরে তোমার মা ঘন ঘন জ্ঞান হারাইতাছে।’
শুনে আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। ‘কি বলছেন আপনি! আমাকে আপনি ঠিকঠাক চেনেন?’
বললো, ‘হ্যা চিনি। আপনার বাপের নাম ইয়াসিন খাঁ? বাড়ি কানসোনা’?
‘হ্যা সবইতো ঠিক আছে। আপনি কে? আপনার বাড়ি কোথায়?’
বললো, ‘আমাকে তুমি চিনবা না। আমার বাড়ি গুপিনাথপুর’।
বললাম, ‘গুপিনাথপুর আমি চিনি। হাড়িভাঙ্গার পরের গ্রাম। এখানে আপনি কোথায় থাকেন?’
‘পাশের গ্রামে আমার শশুর বাড়ি। যুদ্ধের সময় থেকে এখানেই আছি। আমাদের এলাকাতো নিরাপদ না। এই এলাকাটা ভীষণ নিরাপদ। তাই এখানেই থাকি।’
আমি অস্থির ভাবে আস্তানায় ফিরে এলাম। প্রথমে বন্ধু আসগরকে ব্যাপারটা খুলে বললাম।
আসগর আমার গ্রামের, আমার স্কুল জীবনের বন্ধু। আমরা বাড়ি থেকে একসঙ্গে বেরিয়েছি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে। আমার সব বন্ধুরাই আমার মাকে ভালবাসে সম্মান করে। আসগর আমাকে নিয়ে গেল কমান্ডার আশরাফভাইয়ের কাছে। সব খুলে বললো। আশরাফভাই সব শুনে বললেন, ‘তোমাদের বাড়ি এখান থেকে কতদূর?’
আসগর বললো, ‘এখান থেকে ২০/২৫ মাইল দূর হবে।’
আশরাফভাই কিছুক্ষণ ভাবলেন। আমার বিশ্বাস তিনি আপত্তি করবেন না। তিনি আমাদের দুজনকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। বিশ্বাসও করেন প্রচণ্ড। খুবই ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন একজন মানুষ আশরাফভাই। পেশায় একজন শিক্ষক। নামকরা ফুটবলার। সিরাজগঞ্জ মহকুমা রায়গঞ্জ থানায় তিনি ব্যাপক পরিচিত এবং জনপ্রিয়। আরও একটি বিশেষ গুণ খুব ভাল গান করেন তিনি। প্রশিক্ষণের সময়গুলোতে প্রতিরাতে তিনি আমাদের গান শুনিয়ে প্রভূত আনন্দ দিয়েছেন।
তিনি ভেবে চিন্তে অবশেষে বললেন, ‘ঠিক আছে। দুদিনের জন্য তোমাদের ছুটি মঞ্জুর করা হলো। তোমরা ফিরে এসে রায়গঞ্জ থানার ধানগড়া ইউনিয়নে ‘শৈলী শাপলা’ গ্রামে আমাদের সঙ্গে মিলিত হবে।’
আনন্দ বেদনায় দোল খেতে খেতে আমরা দু’জন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
দুপুর থেকে হাঁটতে হাঁটতে আমরা রাত আটটা নাগাদ বাড়ি এসে পৌঁছলাম। আমরা ইচ্ছে করেই রাত করে এসেছি। যাতে আমাদের আগমন কেউ টের না পায়। গ্রামে ঢুকেই আমি আবেগ আক্রান্ত হয়ে গেলাম। এই আমার প্রিয় গ্রাম, কানসোনা। এখানেই কেটেছে আমার শৈশব কৈশোর। এই গাঁয়ের মাটিতে আমার অস্তিত্ব বোপিত। আবার কি শেকড়ে স্থায়ীভাবে বাস করতে পারব?’
গ্রামে ঢুকে পরস্পরকে সতর্ক করে আমি এবং আসগর যার যার বাড়ির পথ ধরলাম। বাড়িতে ঢুকে উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাদের উঠনটি বেশ বড়। চারপাশে অনেকদিকে অনেকগুলো ঘর। সবগুলো ঘরে বাতি জ্বলছে। আমার পাশ দিয়ে মেজবোন হাজেরা হেঁটে গেল। মেজবোনের স্বামী রফিকুল আলম তিনিও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। মেজবোন পাশ দিয়ে হেঁটে গেল আমাকে খেয়াল করলো না। আমার গায়ে কালো চাদর। চাদরের নিচে স্টেনগান। লম্বা চুলে মুখে চাপ দাড়ি। দেখতে অবিকল বনমানুষ। মাকে দেখলাম বড়ঘরে পানদানি থেকে পান বানাচ্ছে। আমি খুবই মৃদু কণ্ঠে মা বলে ডাক দিলাম। কারও কানে আমার সেই ডাক পৌঁছল না। কিন্তু আমার মায়ের কানে ডাকটা ঠিকই পৌঁছল। ‘আমার বাজান আইছে-আমার বাজান আইছে’ বলতে বলতে মা যেন উড়ে এলো সেই ডাক শুনে। এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপা কান্নায় থর থর করে কাঁপতে লাগলো। ‘তুই বাইচা আছস বাজান। আমার সোনার চান বাইচা আছে।’ বলে আমার গা হাতিয়ে অবিরাম সে কেঁদে চললো। মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির অন্য লোকগুলো জড় হলো আমাকে ঘিরে। সবার চোখেমুখে অপার কৌতূহল। বাড়ির ছেলে মুক্তিযোদ্ধা তারা যেন নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছে না। হাজারটা প্রশ্ন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। মা সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললো, ‘ছেলেটা কত পথ হাইটা বাড়িত আইছে। আগে ওকে চারটে খাইতে দে।’
খেতে দিয়ে মা আমার দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। বলে, ‘কেমন পাগলের মতো চেহারা বানাইছস। দাড়ি চুল কাটস না ক্যা?’
‘কোথায় দাড়ি চুল কাটবো? আমরা কি লোকালয়ে বেরুতে পারি?’
মা হঠাৎ প্রশ্ন করলো, ‘কবে যুদ্ধ শেষ হবে?’
‘সেটাতো মা এখনই ঘোষণা দিয়ে বলতে পারছি না।’
আমার এই কথা শুনে মায়ের চোখে মুখে গভীর হতাশা ঘিরে ধরলো। আর কিছু বললো না। শুধু শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগলো।
বাবা বাড়ি ছিল না। হাটে গিয়েছিল। হাট থেকে ফিরে আমাকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কিছু বলতে পারলেন না। তার চোখ ভিজে আসছিল বার বার। অনেক পরে তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘তুমিতো এসে আমাদের বিপদের মধ্যে ফালাইলা। তোমাকে ধরতে আগামীকালই মিলিটারি আইসা বাড়ি আক্রমণ করবে। বাড়িঘর জ্বালাইয়া দিবে। আমাদের সবাইকে গুলি কইরা মারবে।’
বললাম, ‘আমি কালই চলে যাব। আমি শুধু মা’র সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আমি জানতে পারলাম, তোমরা নাকি শুনেছ আমি যুদ্ধে মারা গেছি। আমি যে বেঁচে আছি সেটা জানাতেই আমার বাড়ি আসা। আমি রাতে বাড়িতে থাকবো না। অন্য জায়গায় থাকবো। তোমরা আমাকে নিয়ে ভেব না। তোমাদের নিজেদের কথা ভাবো।’
রাতে গ্রামের দক্ষিণে সুকুর মাহমুদ ফুপার বাড়িতে থাকলাম। সকালে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি দেওয়ান জয়নাল আবেদিন খবর পেয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। জঙ্গলের ভিতর বসে আমরা যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে নিচু গলায় কথা বললাম। সেদিনও থাকতে হলো মায়ের অনুরোধে।
পরদিন ভোরে সূর্য ওঠার আগে আমরা বাড়ি থেকে বের হলাম। বিদায়ের সময় মা খুব কান্নাকাটি শুরু করলো। বাবা বললেন, ছেলেটাকে প্রাণ ভরে দোয়া করো। কাইন্দা ওর মনটা ভার কইরা ইও না।’
আমি আর আসগর একসঙ্গে হাঁটতে শুরু করলাম ‘শৈলী শাপলা’ গ্রামের উদ্দেশ্যে। বাড়ি থেকে মাইল দেড়েক দূরে শাজাহানপুর রেললাইন পেরিয়ে ওপার গিয়েছি মাত্র। পেছন থেকে কে যেন আমাদের নাম ধরে ডাকছে আর দ্রুত বেগে ছুটে আসছে আমাদের দিকে।
আমরা বিস্ময়ে তাঁর আগমনের দিকে তাকিয়ে আছি। কাছে এলে দেখলাম, ননতু। মলয় ভৌমিক নামে সমধিক পরিচিত। বর্তমানে সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। নাট্যকার, নাটক নির্মাতা এবং মঞ্চাভিনেতা।
মলয় হাঁপাতে হাঁপাতে গর্জন শুরু করলো আসগরের উপর। ‘তুই আমাকে রেখে এলি কেন? আমি না তোকে কাল রাতেই বলে রেখেছি, আমি যুদ্ধে যাবো।’
আসগর বললো, ‘তুই ফিরে যা। তোকে আমরা নেব না।’
‘কেন?’ মলয় জোরালো ভাবে প্রশ্ন করলো।
আসগর বললো, ‘তোর কারণে কাকা-কাকীর উপর অত্যাচার হোক, তাদের গুলি করে মেরে ফেলুক, সেটা আমরা কিছুতেই চাই না’।
মলয় অনড়। সে যাবেই। সে স্পষ্ট বলে ফেললো, ‘আমার জন্য আমার বাবা মায়ের যাই হোক, পাকআর্মি তাদের অত্যাচার করুক, গুলি করে মেরে ফেলুক। ওসব নিয়ে আমি মোটেও ভাবছি না। আমি যুদ্ধে যাবই।’