ফুলজোড় নদীর পাড় ধরে আমরা হেঁটে যাচ্ছি ‘শৈলী শাপলা’ গ্রামে। সেখানে গেলে আমরা জানতে পারবো আমাদের দল কোথায় অবস্থান করছে। বন্ধু আসগর আগে আগে আমি এবং মলয় পেছনে। মলয় আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ করবে সে। কিন্তু তাতে আসগরের প্রবল আপত্তি। তার আপত্তির মূল কারণ মলয় মুক্তিযুদ্ধে গেছে এটা জানাজানি হলে ওর পরিবারের উপর নির্যাতনের নির্মম খড়গ নেমে আসবে। মলয়ের বাবা বাবু শীবেন্দ্রনাথ ভৌমিক আমাদের গোটা এলাকায় অত্যন্ত পরিচিত মানুষ। এমনিতে সংখ্যালঘুদের উপর পাকিস্তানিদের আক্রোশ একটু বেশি। তারউপর সেই পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধ করছে তাহলে ব্যাপারটা দুয়ে দুয়ে চার হয়ে যায়। অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়। আসগরের আপত্তিটা মূলত সেই কারণে।
আমাদের গ্রামে একটি মাত্র হিন্দু পরিবার। সেটা মলয়দের পরিবার। ওই পরিবারের সঙ্গে আমাদের সবারই সুসম্পর্ক। অন্যদের তুলনায় আসগরের ঘনিষ্ঠতা একটু বেশি।
বাবু শীবেন্দ্রনাথ ভৌমিক পণ্ডিত একজন ব্যক্তি। তার ছোট দুভাই অনেক আগেই কলকাতা পাড়ি জমিয়ে তারা রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত। শীবেন কাকাকে তারা বহুবার কলকাতায় যেতে অনুরোধ করেছে। কিন্তু শীবেন কাকা রাজী হননি। তিনি বলেছেন, ‘আমি আমার জন্মভূমি ছেড়ে কোথাও যাবো না। মরলে জন্মভূমিতেই মরবো।’ একই কথা তিনি যুদ্ধের সময়ও বলেছেন। বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে থাকার সময় অনেকেই তাঁকে পালিয়ে ভারতে যাওয়ার পরামর্শ দিলে তিনি রাজী হননি। বলেছেন, ‘জন্মভূমিতেই তিনি মরতে চান।’
আমাদের এলাকায় অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন হেডমাস্টার হিসেবে দাপটের সঙ্গে তিনি অবস্থান করতেন। সবাই তাঁকে সমীয় করতো। রাশভারি স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কণ্ঠস্বর ছিল গুরুগম্ভীর। আমরা তাঁকে ভীষণ ভয় করতাম। পারতো পক্ষে আমরা তাঁর সামনে যেতে চাইতাম না। পরে দেখেছি আমাদের ধারণা ভুল। তাঁর মনটা শিশুর সরলতায় পরিপূর্ণ। উদার, নীতিবান এবং প্রকৃত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন একজন খাঁটি মানুষ। প্রতি বছর তিনি ঘটা করে দুর্গা পূজার আয়োজন করতেন। পূজার ওই কয়দিন আমাদের আনন্দের সীমা পরিসীমা থাকতো না। রাতদিন আমরা ক’জন বন্ধু ওই বাড়িতেই পড়ে থাকতাম। কাকীমা আমাদের সন্তানের মতো আদর স্নেহ করতেন। আমার মায়ের মৃত্যুর পর তিনি সংবেদনশীল মায়ের ভূমিকায় আমাকে তিনি আগলে রেখেছেন। আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবতাম, কলকাতায় বেড়ে ওঠা একজন মানুষ কিভাবে পাড়াগাঁয়ের নিভৃত একটি অঞ্চলে জীবনটা কাটিয়ে দিলেন। কত যে গুণী ছিলেন তিনি বলে শেষ করা যাবে না। ভাল গান করতেন। ভাল রান্না করতেন। তাঁর রান্না পায়েশের স্বাদ আজও যেন জিভের ডগায় লেগে আছে। আমার মাতৃসম কাকীমা স্বর্গবাসী হন এই কামনা।
আসগর চায়নি মলয়ের কারণে ভৌমিক পরিবারের কোন ক্ষতি হোক। এইজন্যে তার এতো আপত্তি। তাইতো মলয় আমাদের সঙ্গে অনেকদূর যাওয়ার পরও আসগরের অস্বস্তি কাটছে না। একা একাই সে এই নিয়ে তার অস্বস্তির কথা বলে যাচ্ছে।
বিকেল নাগাদ আমরা রায়গঞ্জ থানার ধানগড়া ইউনিয়নের ‘শৈলী শাপলা’ গ্রামে পৌঁছলাম। গ্রামের নামটি যেমন সুন্দর গ্রামটিও ততোধিক সুন্দর। ছায়াঘেরা শান্ত গ্রামটি আমাদের উদার ভাবে গ্রহণ করলো। আমরা সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম আমাদের বাহিনী আরও ৪/৫ মাইল উত্তরে অন্য একটি গ্রামে অবস্থান করছে।
একটানা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তবু আবার ছুটতে হলো। ক্লান্তি নিয়ে অবসাদে বসে থাকা আমাদের চলে না।
নির্দিষ্ট গ্রামে গিয়ে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা পেয়ে গেলাম। দেখা হওয়ার পর একচোট বুক মেলানোর ধুম পড়ে গেল। আমরা যে অনন্তকালের জন্য অমোঘ বন্ধনে বাঁধা পড়েছি। জনম জনমের সাথী আমরা।
সন্ধ্যায় আশরাফভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলাম তাঁর আস্তানায়। দেখা হতেই উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে আমাকে এবং আসগরকে বুকে টেনে নিলেন। অমায়িক অথচ ভীষণ দৃঢ়চেতা মানুষ কমান্ডার আশরাফভাই। শান্ত, মিষ্টিভাষী, এক কথায় অতুলনীয়। আন্তরিক গলায় মা-বাবার কুশল জানতে চাইলেন। স্বজনদের খোঁজ খবর নিলেন।
হঠাৎ মলয়ের দিকে চোখ পড়তে কৌতূহলে তাকালেন। আমরা মলয়কে পরিচয় করিয়ে তার পারিবারিক সবই খুঁটি-নাটি বললাম। একই সঙ্গে মলয়ের যুদ্ধে আসার অদম্য ইচ্ছার কথা, পথের ঘটনা তাঁকে সব খুলে বললাম আমরা। সব শুনে আশরাফভাই কিছুক্ষণ গুম মেরে রইলেন। তারপর ভাবনা মুখে বললেন, ‘ও যুদ্ধে এসেছে এটা প্রচার হলে ওর পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসবে।’ আমাকে এবং আসগরকে বললেন, ‘ওর নাম আজ থেকে ‘শফিক’। অন্তত তোমরা দুজন ওর আসল নামে ডাকবে না, ঠিকআছে?’
মলয়কে কাছে ডেকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ওর আগ্রহ নিয়ে নানাভাবে জানতে চাইলেন। মলয়য়ের দৃঢ় মনোভাব দেখে আসরাফভাই ভীষণ খুশি হলেন। আমাকে এবং আসগরকে দায়িত্ব দিলেন মলয়কে প্রশিক্ষণ দিয়ে যোদ্ধা হিসেবে তৈরি করতে।
আশরাফভাই তাকে দলে নিয়েছে এই আনন্দে মলয় যেন উড়ছে। তার আগ্রহেই সেইরাত থেকেই ট্রেনিং শুরু হয়ে গেল। আমি এবং আসগর দুজনই তার প্রশিক্ষকের ভূমিকা পালন করেছি। তবে আমার ভূমিকা কিঞ্চিৎ বেশি ছিল। আমিই বেশি সময় দিয়েছি। সত্যি কথা বলতে কি মলয় নিজেই সময় বের করে নিয়েছে। তার আগ্রহের কারণে পজিশনের নাম, অস্ত্রের বিভিন্ন পার্টসের নাম অতি দ্রুত সে রপ্ত করে ফেলে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে সে পরিপূর্ণ যোদ্ধা হিসেবে প্রস্তুত হয়ে যায়। শুরু হলো মলয় ওরফে শফিকের যুদ্ধ জীবন।
দিন কয়েক পরে আমরা তখন সিরাজগঞ্জ থানার মধ্যে অবস্থান নিয়েছি। এক সন্ধ্যায় দেখলাম আমাদের ছোটবড় সব কমান্ডাররা অচেনা কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে শলা পরামর্শ করছেন। সেই অচেনাদের একজনকে আমার ভীষণ মনে ধরলো। অতি সুদর্শন। সুঠাম দেহী। টানা একজোড়া চোখ। ফর্সা গোলগাল চেহারার মানুষটির মাথায় স্বাধীন বাংলার পতাকা বাঁধা। পতাকা এমনভাবে বাঁধা, পতাকার রক্তরাঙ্গা সূর্যের মধ্যে বাংলাদেশের ম্যাপটি কপাল বরাবর ফুটে আছে। মুহূর্তে এই মুক্তিযোদ্ধার আমি প্রেমে পড়ে গেলাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম তাঁর বাড়ি সিরাজগঞ্জ শহরের হসেনপুর মহল্লায়। নাম মোজাম্মেল হসেন। আরেক নাম মোজাফফর। স্বাধীনতার পর রক্ষীবাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রক্ষী বাহিনী বিলুপ্ত হলে তিনি মেজর হিসেবে সেনাবাহিনীতে পদায়ন হন।
মোজাম্মেলভাইয়ের দল আর আমাদের দল একীভূত হয়ে গেল। কমান্ডার হলেন মোজাম্মেলভাই। এর দুদিন পর সিরাজগঞ্জ শহরের অদূরে ‘ভাটপিয়ারী’ হাইস্কুল আক্রমণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। ভাটপিয়ারী হাইস্কুল ক্যাম্পে নিয়মিত অনিয়মিত বাহিনী মিলিয়ে প্রায় দেড়শ জনের দল ছিল সেখানে। মোটামুটি শক্তিশালী ক্যাম্প। এখান থেকেই পাকআর্মি বিভিন্ন গ্রামে অপারেশন পরিচালনা করে। সিরাজগঞ্জ শহরের সঙ্গে এই ক্যাম্পের শক্ত যোগাযোগ। এই যোগসুত্র ছিন্ন করতেই আমাদের ভাটপিয়ারী ক্যাম্প আক্রমণের পরিকল্পনা।
৩১ অক্টোবর আমরা ভাটপিয়ারী মিলিটারি ক্যাম্পে আক্রমণ করি। সালটা মনে থাকার কারণ ‘সিরাজগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ’ এই নামে একটি গ্রন্থে যুদ্ধের তারিখ উল্লেখ করা আছে। আমাকে এই তথ্য জানিয়েছেন বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা লেখক সাইফুল ইসলাম।
রাত দু’টোর দিকে আমরা ভাটপিয়ারী স্কুল ঘিরে ফেলি। আমাদের বাহিনী তিনভাগে বিভক্ত হয়ে আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। স্কুলের পাশ দিয়ে বড় রাস্তা। সবাই এটাকে ওয়াপদার বাঁধ বলে। সেই বাঁধের আড়ালে আসরাফভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা পজিশন নিলাম। আর একটি বাহিনী মোজাম্মেল ভাইয়ের নেতৃত্বে স্কুলের পশ্চিম পাশে পজিশন নেয়। আর একটি বাহিনী স্কুল থেকে দক্ষিণে সরে গিয়ে ডিফেন্স পজিশনে তারা অবস্থান নেয়। তাদের কাজ হলো সিরাজগঞ্জ শহর থেকে পাকিস্তানি মিলিটারি ওদের সাহায্যে এগিয়ে এলে তারা তাদের প্রতিরোধ করবে।
আমার বাম পাশে মলয়। মলয়ের প্রথম যুদ্ধ। ভয় মিশ্রিত রোমান্স। সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না। অস্ত্রের একটি গুলি বেরিয়ে যাওয়ার পর কোন ভয় থাকবে না। মৃত্যু ভয়ও তখন অতি তুচ্ছ হয়ে যায়। তখন শুধু সামনে ছুটতে ইচ্ছে জাগে। আসগর আছে আশরাফভাইয়ের কাছাকাছি। সবাই যার যার মতো পজিশন নিয়ে কমান্ডার মোজাম্মেলভাইয়ের হুইসেলের অপেক্ষায়। একসময় অপেক্ষার অবসান হয়। কমান্ডার জয়বাংলা ধ্বনি দিয়ে ফায়ার শুরু করলে আমাদের অস্ত্রগুলো আকাশ-বাতাস কাপিয়ে গর্জে ওঠে। একটানা প্রায় আধাঘণ্টা গুলি চলার পর দুপক্ষই গুলি থামিয়ে দেয়। চারপাশে তখন পিন পতন নিরবতা। হঠাৎ শুরু হলো দুই পক্ষের কথা আর গালাগালি। আমার এই অভিজ্ঞতা একেবারেই নতুন। আগের দিনে যখন তরবারির যুদ্ধ হতো তখন দুইজনের মধ্যে ডায়লগ আদান-প্রদান হতো। অস্ত্রের যুদ্ধেও ডায়লগ আদান প্রদানের ঘটনা আমাকে রীতিমতো অবাক করে দেয়। ভীষণ মজা পেয়ে যাই। গালাগালিতে আমিও অংশ নেই। বলতে গেলে সবাই গালাগালিতে জড়িয়ে পড়ি। পাকিস্তানিরা ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বজ্রকন্ঠে ‘জয়বাংলা’ বলে চেঁচিয়ে উঠি। গালাগালিটা ওরাই আগে শুরু করে। মা তুলে গালাগালি। উর্দুতে বলে, ‘মাদার………, হাতিয়ার ডালদো।’ জবাবে আমদের বাহিনী গালাগালি করে তার জবাব দেয়। বলে, ‘কুত্তার বাচ্চারা, সারেন্ডার কর। নইলে আজ তোদের জ্যান্ত কবর দেওয়া হবে।’
দারুন জমেছিল খেলা। কিন্তু সেই খেলা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। শুরু হয়ে যায় দুপক্ষের গোলাগুলি। পাকিস্তানিরা বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়ছে। আমরা টার্গেট করে হিসেব করে গুলি ছুড়ছি। আমাদেরতো ওদের মতো অতো গোলা বারুদ নেই। আমাদের তাই হিসেব করে টার্গেট ঠিক করে ফায়ার করতে হয়।
প্রায় দুই ঘণ্টা থেমে থমে যুদ্ধ চলছে। কিন্তু কোনভাবেই ওদের কাবু করা যাচ্ছে না। ওরা বাংকারের ভেতর থেকে ফায়ার দিচ্ছে। ফলে ওদের কোনভাবে ঘায়েল করা যাচ্ছে না।
সেইসময় কয়েকজন সাহসী গেরিলাকে বেছে বিশেষ অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এমন পরিকল্পনা আগেই করা ছিল। স্কুলঘরের পেছনে আখের ক্ষেত। সেই আখের ক্ষেতের ভেতর দিয়ে ক্রলিং করে ওই দুর্ধর্ষ গেরিলারা স্কুলের উপর দিয়ে বাংকারে গ্রেনেড নিক্ষেপ করবে। সেই সাহসী যোদ্ধাদের কথা ভাবলে আজও আমি শিহরিত হই।
আমরা সবাই অধীর অপেক্ষায় কখন গ্রেনেড বিস্ফোরণ হবে। আমরা কান খাড়া করে ফায়ার দিয়ে যাচ্ছি। ফায়ার বন্ধ করা যাবে না। ওদের এইদিকে ব্যস্ত রাখতে হবে। সেই ফাঁকে আমাদের গেরিলারা পৌঁছে যাবে স্কুলের উত্তর পাশে।
অনেকক্ষণ কেটে গেল। গ্রেনেড বিস্ফোরণ হচ্ছে না। আমাদের টেনশন বাড়ছে। আমাদের গেরিলা যোদ্ধারা কি পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়ে গেছে? গ্রেনেড বিস্ফোরণ হচ্ছে না কেন?
আমাদের অস্থিরতা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। তাহলে কি আমাদের পরিকল্পনা মার খেয়ে যুদ্ধে আমরা হেরে যাব? আমাদের এলোমেলো ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে বিকট শব্দে পর পর কয়েকটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলে আমরা জয়বাংলা বলে গগন বিদারী হুংকার দিয়ে উঠলাম। আনন্দে আমাদের রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠলো। ক্রমাগত আরও গ্রেনেড বিস্ফোরিত হতে থাকে। আর এদিকে পাকিস্তানিদের মরণ চিৎকার শুরু হয়ে যায়। তারা চেঁচিয়ে আল্লাহর নাম করে তার সাহায্য চাচ্ছে। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কোরআনের সুরা পাঠ করছে। আমাদের একজন চেঁচিয়ে বললো, ‘ওই কুত্তারা, আল্লাহ্ কি তোদের একলার? আমাদের না?’ ওদের মরণ চিৎকার আমাদের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়।
ভোর হচ্ছে। চারপাশ ফর্সা হচ্ছে। আলো ফুটছে। ওদের তখন গোলাগুলি থেমে গেছে। আমরা টার্গেট করে ফায়ার করে যাচ্ছি। গুলি লেগে ওদের কেউ কেউ লুটিয়ে পড়ছে। সে দৃশ্য আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমরা তখনও জয়বাংলা বলে ক্রমাগত গর্জন করে যাচ্ছি।
এইসময় ওরা অস্ত্র উঁচিয়ে স্কুলের মাঠে এসে দাঁড়ায়। আত্মসমর্পণ করে। আমরা তখন অস্ত্র বাগিয়ে চারদিক থেকে ওদের ঘিরে ফেলি।
কমান্ডারের নির্দেশে দ্রুত ওদের আমরা নিরস্ত্র করে ফেলি। গুণে দেখা গেল রাজাকার, পাকআর্মি, পাকিস্তানি পুলিশ, রেঞ্জার্স মিলিয়ে ৯৬জনকে জীবিত বন্দি করতে পেরেছি আমরা। তাদের সবাইকে পিঠমোড়া করে বাঁধা হলো। দুর্ধর্ষ গেরিলাদের একজন মুক্তিযোদ্ধা হালিম, সেই বেশি তৎপর ওদের খাল্লাস করতে।
আমাদের এই সফল যুদ্ধে দুজন মুক্তিযোদ্ধা গুলি লেগে আহত হয়েছে। একজনের নাম আমিনুল ইসলাম চৌধুরী। সিরাজগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারন সম্পাদক। আরেকজনের নাম মোতালেব হোসেন। তাদের চিকিৎসার জন্য কাঁধে তুলে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হলো দূরের এক গ্রামে। ততক্ষণে বেয়নেটের আঘাতে সব শত্রু নিধন হয়ে গেছে।