যুমনার প্রবল স্রোত এবং স্রোতের পাক অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং ভীতিকর। জলে কিছু পড়লে চুম্বকের মতো জলের গভীরে টেনে নিয়ে যায়।
আমরা সবাই অনেকক্ষণ ধরে মোস্তফা যে জায়গায় পড়ে গেছে সেইদিকে আতংকিত মুখে তাকিয়ে আছি। ওদের নৌকা ঘুরিয়ে পেছনের দিকে যাচ্ছে। আমাদের নৌকাও স্রোতের টানে ধীরে ধীরে পেছনে ছুটে চলেছে।
আমাদের হৈচৈ শুনে নৌকার ভেতর থেকে দুই কাকীমা বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে দুই কাকা এবং বুড়ি। নৌকায় ওঠার পর থেকে দেখছি কাকীমারা মাথায় সিঁদুর পরেন না। ধর্মের চেয়ে জীবন বাঁচানো বেশি জরুরী।
বুড়ি একজনের হাত ধরে ছইয়ে ওঠে। সম্ভবত প্রথম সে এত বড় ছইয়ে উঠলো। তার আনন্দ এবং শিশুসুলভ চপলতা আমাদের সেই অস্থির সময়ে খানিক অন্য জগতে নিয়ে গেল। তার বার বার একই প্রশ্ন ‘ইন্ডিয়া আর কতদুর’? যার যেখানে ব্যথা তার হাত আনমনে সেই ব্যথার স্থানে চলে যায়। আমরা আছি আমাদের সহযোদ্ধা মোস্তফার চিন্তায়। তাকে কিভাবে যমুনা থেকে তোলা যায়। যুদ্ধের আগেই সে শহীদ হয়ে যাচ্ছে। আর বুড়ি ভাবছে কবে তারা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারবে। তখন তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে।
এইসময় আমাদের সবার দৃষ্টি থমকে গিয়ে স্রোতের পাকে মোস্তফা ভুস করে পানিতে ভেসে ওঠে। তখন আমদের সম্মিলিত কণ্ঠ চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ওই যে, ওই যে মোস্তফা’। আমাদের বেশি ভয় হচ্ছিল-ওর শরীরে ছিল চাদর জড়ানো। ওই জড়ানো চাদর নিয়ে ওকি সাঁতরে পানিতে ভেসে উঠতে পারবে? মোস্তফা ভেসে ওঠার পর দেখা গেল ওর শরীরে চাদর নেই।
ওই নৌকার মাঝিরা দ্রুত দাড় বেয়ে মোস্তফার কাছে পৌঁছে যায়। লগি এগিয়ে ধরে মোস্তফার দিকে। মোস্তফা লগি ধরে খানিক ওঠার পর বাকিরা ওর হাত ধরে টেনে তোলে। আমরা স্বস্তির ফেলে ছইয়ে বসে পড়লাম। মোস্তফা শক্ত সামর্থ যুবক। নৌকায় কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে তারপরই গা ঝাঁকি দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। আমরা দেখে হৈহৈ করে উঠলাম।
নৌকায় আবার পাল তোলা হলো। তিন পালে নৌকা আবার দ্রুত বেগে ছুটতে লাগলো।
মোস্তফা আমার নিকট প্রতিবেশি। আমাদের পাশাপাশি বাড়ি। ও আমার এক বছরের জুনিয়র। সম্পর্কে ভাতিজা। কিন্তু আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বন্ধুর মতো। ছোটবেলা থেকে ও শহরে বড় হয়েছে। ওর বাবা চাকরি করতেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে বাসায় থাকতো মোস্তফারা। ছুটি ছাটায় ওরা বাড়ি এলে আমরা দুজন গুলতি নিয়ে পাখি শিকারে বের হতাম। ওকে দেখে সেই শিশু বয়সে আমার ভীষণ হিংসে হতো। ওর পরনে থাকতো নানা ধরনের বাহারি পোশাক। পায়ে চকচকে স্যু। বোতাম লাগানো দামী ইংলিশ প্যান্ট। ঝকঝকে গেঞ্জি। সে তুলনায় আমার পরনে থাকতো ঢলঢলে হাফ প্যান্ট। ফিতে দিয়ে কোমরে বাঁধা থাকতো। ফিতের মাঝখানে অর্থাৎ সামনের কাটা অংশে তলপেট বেরিয়ে থাকতো। মোস্তফার ইংলিশ প্যান্ট আর আমার হাট থেকে রেডিমেট কেনা হাফ প্যান্টের বিস্তর ফারাক। আমার খুব লোভ হতো মোস্তফার ইংলিশ প্যান্টের মতো প্যান্ট পরতে। কিন্তু পরার সুযোগ ছিল না। মাকে অনেকদিন বলেছি। মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতো, ‘আমাকে বলে কি হবে, আমি কেমনে এই প্যান্ট কিনে দেব’?
মোস্তফারা যখন বাড়ি আসতো তখন ওদের বাড়িতে উৎসব লেগে লাগতো। পোলাও মাংসের ধুম লেগে যেত। মোস্তফার বাবা ছিলেন ভীষণ সৌখিন মানুষ। আমার দেখা যথার্থ সুপুরুষ। গায়ের রঙ কালো বলে তাঁর ডাক ছিল কালু। আর পোশাকি নাম আব্দুল ওহাব। তার পেটা শরীর। দেখতে ভীষণ আকর্ষণীয়। তিনি যখন সার্ট ইন করে খটখট শব্দে হেঁটে যেতেন চারপাশের লোকজন তাকিয়ে থাকতো। পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে শরীর থেকে মিষ্টি সুবাস ছড়াতো। সেই থেকে আমার মনে হতো বড়লোকদের গা থেকে এমনি মিষ্টি সুবাস ছড়ায়। ক্যামেরা জিনিসটা তার হাতেই আমি প্রথম দেখেছি। তিনি আমাদের সেই ক্যামেরায় শিশু বয়সের ছবি তুলেছিলেন। সেই ছবিতে আমার তেলহীন এলোমেলো চুলের ছবিটি আমি অনেকবার অবাক বিস্ময়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছি। গ্রামোফোন যন্ত্রটি তাঁর কল্যাণে প্রথম দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার এবং আমাদের গ্রামের আরও অনেকের। সে এক আজব জিনিস। ছোট হাতুলির মতো একটা জিনিস ঘুরিয়ে পাম্প করতে হতো। তারপর মাউথস্পিসে পিন লাগিয়ে কালো থালার মতো রেকর্ডের পাশে লাগিয়ে দিলে গান বাজতে থাকতো। উঠোন ভর্তি মানুষ সপ বিছিয়ে, কেউ টুলে, কেউ পিঁড়িতে বসে সেই আজব মেশিনের গান শুনতো।
সেই আমার প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ডে গান শোনা। সেইসময় শোনা একটি চড়া, চিকন লম্বা সুরের গান এখনও মনে গেঁথে আছে। গায়কের নাম জানি না। গানটা হলো, ‘নিমাই দাঁড়ারে। দাঁড়ারে নিমাই দেখিব তোমারে’।
একটু বড় হলে আমার নেশা চাপে সিনেমা দেখার। আমি এবং মোস্তফা দুজনই একসঙ্গে অনেক সিনেমা দেখেছি। আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন ওদের বাসা পাবনা জেলার বড়ালব্রিজ এলাকায়। আমি ট্রেনে চড়ে চলে যেতাম ওদের বাসায়। তারপর আমরা সিনেমা দেখার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়তাম। সেইসময় সুপারহিট একটি সিনেমা মুক্তি পায়। সিনেমার নাম ‘নীল আকাশের নীচে’। আমরা দুজন সেই সিনেমা দেখার জন্য রাজশাহী শহরে চলে গিয়েছিলাম।
অসহযোগ আন্দলনের আগে থেকে মোস্তফারা গ্রামে স্থায়ী হয়। আর অসহযোগ আন্দোলনের সময় থেকে আমরা সারাক্ষণ একসঙ্গে। সন্ধ্যার পর থেকে আমি জহুরুল মোস্তফা এবং সুকুর মামু আমরা এই চারজন বেশিরভাগ সময় একসঙ্গে কাটাতাম। আমাদের এই চারজনের বাড়ি কাছাকাছি। বেশির ভাগ সময় আমরা চারজন দলবেঁধে ঘুরে বেড়াতাম। সময়টা ছিল খুবই টালমাটাল। কিছুই করার ছিল না আমাদের। খাওয়া আর আড্ডা। নানা ধরনের উড়ো খবরে সয়লাব ছিল সেই সময়।
২৫ মার্চ রাতে ঢাকা ক্রাকডাউনের পর থেকে এমন অবস্থা। তার আগে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকে সলপ হাইস্কল মাঠে যুদ্ধের ট্রেনিং হতো প্রতিদিন বিকেলে। রামগাঁতির গিয়াস ভাই, সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। তিনি সবাইকে ডামি রাইফেল দিয়ে আগ্রহীদের ট্রেনিং দিতেন। সেই সময়কার একটি ঘটনা এখনও আমার মনে ভীষণ দাগ কেটে আছে। হঠাৎ মনে পড়ে গেলে একা একাই হেসে ফেলি।
ব্যাপারটা তাহলে খুলে বলি। আমাদের এলাকায় একটি গ্রাম আছে নাম ‘হাড়িভাঙ্গা’। সেই গ্রামটি লাঠিয়াল গ্রাম হিসেবে এলাকায় ব্যাপক পরিচিত। দেশি অস্ত্র দিয়ে মারামারিতে তাদের সঙ্গে আশে পাশের কোন গ্রাম কুলিয়ে ওঠে না। সবাই ওই গ্রামের মানুষকে সমীহ করে চলে। সেই গ্রামের কয়েকজন লাঠিয়াল বাঁশের হলঙ্গা নিয়ে সলপ হাইস্কুল মাঠে ট্রেনিং দিতে আসতো। হলঙ্গা এক ধরণের দেশীয় অস্ত্র। বাঁশের মাথা চোখা করে তৈরি এই অস্ত্রকে আমরা স্থানীয়রা বলি হলঙ্গা। হাড়িভাঙা গ্রামের কয়েকজন লেঠেল মালকোঁচা মেরে কোমরে গামছা বেঁধে হলঙ্গা নিয়ে ট্রেনিং দিতে আসতো। তারা নানা রকম শারীরিক কসরত দেখাতো। এমন ভাবে তারা হলঙ্গা নিয়ে কসরত করতো মনে হতো সামনা-সামনি পাকিস্তানি আর্মি পেলে এখনই ফটাস করে গেঁথে ফেলবে। কিন্তু সেটা যে অবাস্তব এবং হাস্যকর সেটা বোঝা গেল ২৪ এপ্রিল করতোয়া ব্রিজে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে।
এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখ পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ এলাকা শত্রুমুক্ত ছিল। আমরা নিরাপদেই সময় পার করতাম। পাকিস্তানি আর্মি উত্তরবঙ্গে আসার একমাত্র রাস্তা নদী পথ, যমুনা পেরিয়ে আসতে চেষ্টা করে। তারা আরিচা ঘাট থেকে গানবোট এবং ফেরীর নিয়ে নগরবাড়ি ঘাটের দিকে আসতে থাকলে তৎকালীন সিরাজগঞ্জের এসডিও শামসুদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেয়। কিন্তু পাকিস্তানি আর্মিদের ভারী অস্ত্রের সামনে মুক্তিযোদ্ধারা বেশিদিন টিকতে না পেরে তারা পিছু হটে বাঘাবাড়ি ঘাটে এসে পজিশন নেয়। সেখানেও তারা টিকতে না পেরে পজিশন উইথড্র করতে বাধ্য হয়।। পাকআর্মিরা সিরাজগঞ্জ শহরের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। অগত্যা মুক্তিযোদ্ধারা উল্লাপাড়া থেকে দেড় মাইল পূর্বে করতোয়া ব্রিজের কাছে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা ব্রিজের কাছে রেল উপড়ে ফেলে তারপর ব্রিজের পূর্বে শাজাহানপুর গ্রামের নানাস্থানে টেন্স খুঁড়ে পজিশন নেয়। এই দৃশ্য দেখতে আমি মোস্তফা, জহুরুল, আসগর, রাজ্জাক, সুকুর মামু, খোকন, মিন্টুসহ আরও কয়েকজন কানসোনা থেকে দুইমাইল হেঁটে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বচক্ষে দেখার জন্য প্রচণ্ড কৌতূহল নিয়ে শাজাহানপুর ছুটে আসি।
বিভিন্ন জায়গায় বাঁশঝাড়ের আড়ালে গর্ত খুঁড়ে মুক্তিবাহিনী হেলমেট মাথায় হাতে রাইফেল নিয়ে বীরের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে আমার মন আনন্দে আবেগে টগবগ করে ফুটতে থাকে। এরাই আমাদের বীর। এরাই আমাদের স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী।
একটি জায়গায় এসে যোদ্ধাবেশে ছাত্রনেতা লতিফ ভাইকে পেলাম। [মির্জা আব্দুল লতিফ। লতিফ মির্জা নামে গোটা উত্তরবঙ্গে তিনি ব্যাপক পরিচিত]। আমি যেহেতু স্কুল জীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, সেই সূত্রে লতিফভাইয়ের সঙ্গে আমার তখন থেকে পরিচয়। আমাকে তিনি ভীষণ পছন্দ করতেন। আমাদের দেখে নির্দেশ দেওয়ার মতো ভঙ্গিতে বললেন, ‘বাড়িত যা। গিয়া আমাদের জন্য তাড়াতাড়ি রুটি বানায়া আন’।
তখন বেলা দেড়-দুইটা হবে। আমরা দ্রুত ফিরে এসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে আটা সংগ্রহ করি। তখনকার সময় গ্রামের মানুষ গমের আটার রুটি খাওয়ায় তেমন অভ্যস্ত ছিল না। আটা সংগ্রহ করতে তাই অনেক বেগ পেতে হলো। মোস্তফাদের বাড়িতে আমার মা এবং মোস্তফার মা মিলে রুটি বানিয়ে তাওয়ায় সেঁকে আমাদের হাতে দিল। আমরা সেই রুটি নিয়ে গ্রাম থেকে বেরিয়েছি মাত্র তখনই গুলির শব্দ। এমন ভয়াবহ শব্দ যেন আকাশ ভেঙ্গে গজব নেমে আসছে। এমন শব্দ আগে কখনও শুনিনি। ভয়ংকর শব্দ। ঠা ঠা করে একনাগাড়ে শব্দরা ছুটছে। পরে জেনেছি এবং দেখেছি এই ভয়ংকর অস্ত্রের নাম মেশিনগান।
সারা চরাচর লোকে লোকারণ্য। দিকবিদিক পালাচ্ছে মানুষ। এ দৃশ্য বর্ণনা করে বোঝানো অসম্ভব। বয়স্ক নারী পুরুষের কষ্ট চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। ছুটতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছে। তাদের যারা ধরে নিয়ে যাচ্ছেন তাদেরই কষ্ট বেশি। না পারছেন সঙ্গে নিতে না পারছেন ফেলে যেতে। সামনে একজনকে দেখলাম গুলি লেগে পড়ে কাতরাতে। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। ভয়ে হাত-পা সিটকে ধরে আসছিল। চাচা আপন জান বাঁচা-এই ভেবে পাশে তাকিয়ে দেখি আমি একা। সবাই চলে গেছে। আমিও ভোঁ দৌড়। পেছনে তখনও আসমান ভাঙ্গা খান খান শব্দ। কোনদিক না তাকিয়ে লোকজনের পেছনে ছুটছি। বাড়ির কথাও মাথায় আসেনি। এক দৌড়ে গ্রামের দু’মাইল দক্ষিণপূর্ব কোণে ‘রুকনাই’ বিলের পাড়ে এসে থামলাম। তখনই সেই মজার ঘটনাটি ঘটে। পেছনে তাকিয়ে দেখি সেই লেঠেল ভাই। যে কিনা সলপ হাইস্কুল মাঠে ট্রেনিংয়ের সময় হলঙ্গা নিয়ে নানান কসরত করতো। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে, ‘কি ভয়ংকর শব্দরে বাবা। আর একটু হলে শব্দের চোটে আমি কাপড় নষ্ট করে ফেলতাম’। কথাটা শুনে তাৎক্ষণিক এতো মজা পেয়েছিলাম যে কষ্টের মধ্যেও হাহা করে উচ্চস্বরে হেসে ফেলেছিলাম।
সন্ধ্যা নাগাদ গোলাগুলি থেমে যায়। সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ার পর মানুষ বাড়ি-ঘরে ফিরতে শুরু করে। রাতে মিলিটারিরা লোকালয়ে থাকে না। ভয় পায়, কোনদিক থেকে যদি চোরাগোপ্তা হামলা হয়। রাতেই আমরা খবর পেলাম পাকিস্তানি মিলিটারি ট্রেনে করে সিরাজগঞ্জ যাচ্ছিল। ব্রিজের কাছে রেল উপড়ানো দেখে তারা থেমে পড়ে। তারা ট্রেন নেমে সামনে রেল উপড়ানো জায়গায় আসা মাত্র মুক্তিবাহিনী আচমকা গুলি শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন মিলিটারি গুলি লেগে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তারপরই তারা পজিশন নিয়ে ভারী অস্ত্র দিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়তে থাকে। তাদের ভারী অস্ত্রের কাছে টিকতে না পেরে মুক্তিবাহিনী পিছু হটে যায়। খবরটা শুনে আমরা হতোদ্যম হয়ে পড়ি।
পরদিন বেলা দশটা নাগাদ মিলিটারি এসেছে শুনে আমরা পালাতে শুরু করলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম শাজাহানপুর গ্রাম থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। তারমানে মিলিটারি এসে শাজাহানপুর গ্রামের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে। যেহেতু ওই গ্রাম থেকে মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করেছে সেইহেতু যত রাগ ওই গ্রামের উপর। তারা দূর থেকে সেলিং করছে। সেদিন আরও একটি মজার কথা শুনে মনে মনে হাসলাম। পাকিস্তানি মিলিটারি বাঘাবাড়িঘাট থেকে শেল নিক্ষেপ করছে। আমরা ‘রুকনাই’ বিলের পাড়ে লুকিয়ে শেলের বিকট শব্দে কেঁপে উঠি। শেল আমাদের মাথার উপর দিয়ে চু…চু শব্দে উড়ে দূরে গিয়ে বিকট শব্দে ফাটছে। দ্বিতীয় সেই শব্দ শুনে আমাদের গ্রামের নবা ভাই ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘চিন্তা নাই। সেয়ানে সেয়ানে যুদ্ধ হইতাছে। মুক্তিবাহিনীও পাল্টা জবাব দিতাছে’। শেল পড়ে যে আবার বিকট শব্দে ফাটে-তার এই অজ্ঞতা আমরা কেউ শুধরে দেই না। শুনলে তিনি হতাশ হবেন। থাকনা তার মতো আশা নিয়ে।
ক’দিন পর আবার মিলিটারি আসে। এবার তারা আমাদের গ্রামের ঘোষপাড়া আক্রমণ করে। কয়েকজন ঘোষকে গুলি করে হত্যা করে। তাদের একজন অধীর ঘোষ। ঘোষপাড়ার প্রথম গ্রাজুয়েট। অত্যন্ত সজ্জন অমায়িক ব্যক্তি। আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। তাঁর মৃত্যুর খবরে আমি ভীষণ মুষড়ে পড়ি।
দুপুর নাগাদ মিলিটারি চলে যায়। রাতে বাড়িতে থাকা আমরা নিরাপদ মনে করছিলাম না। মোস্তফা, জহুরুল, সুকুর মামু এবং আমি নৌকায় চড়ে বিলে গিয়ে আড্ডা দিয়ে সময় পার করতাম। এক আড্ডার রাতে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেব। সুকুর মামু বললেন, ‘শুধু মুখে বললে হবে না। আগুন ছুঁয়ে শপথ করতে হবে’। সবাই তাতে একমত। কিন্তু সমস্যা হলো আগুন পাব কোথায়?
আমরা সেইসময় সবাই ধুমছে বিড়ি ফুঁকতাম। অগত্যা আমরা বিড়ির আগুন ছুঁয়ে শপথ নিলাম, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেব’।