রাতে মাঝিরা নিরাপদ স্থানে নৌকা ভিরিয়ে আশ্রয় নেয়। ভোরে আবার যাত্রা শুরু হবে। যমুনা নদীর পেট চিরে ছোটখাটো খাল বেরিয়ে গেছে সেই খালের ভেতর নৌকা ঢুকিয়ে আমরা ভোরের অপেক্ষা করছি। নৌকার ছইয়ে শুয়ে উপরের আকাশ দেখছি। যমুনার পানি ছুঁইয়ে আসা হিমেল বাতাসে শরীরে কাঁপন ধরায়। আকাশে লক্ষ কোটি তারা আমাদের মতো জেগে আছে। মানুষের টুকটাক কথা ভেসে আসছে কোন অপেক্ষমাণ নৌকা থেকে। দূরে গুলির শব্দ। এ শব্দ আমাদের মুক্তিসেনার। রাতে মিলিটারিরা ভয়ে বের হয় না। খোলা আকাশের নিচে শুয়ে কত কথা মনে পড়ছে। বাড়ির কথা। ভাইবোনদের কথা। মামাতো ভাই সাত্তারের কথা। বেশি মনে পরছে রফিকুল দুলাভাইয়ের কথা আর মেজোবোন হাজেরা বুবুর কথা।
এপ্রিলের মাঝামাঝি আমার মেজো দুলাভাই রফিকুল আলম প্রতিরোধ যুদ্ধে টিকতে না পেরে পালিয়ে আমাদের বাড়িতে এলেন। তিনি ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে [ইপিআর] চাকরি করতেন। সেইসময় তাঁর পোস্টিং ছিল রাজশাহী অঞ্চলে। সেখানে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিয়ে মরণপণ লড়াই করেছেন। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর ভারী অস্ত্রের কাছে টিকতে না পেরে পালিয়ে আমাদের বাড়িতে এলেন।
গভীর রাতে মানুষজনের টুকরো টুকরো কথা আর রান্নাঘরের টুংটাং আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। এসএসসি পাস করার পর আমার আলাদা ঘর হয়েছে। অনেক স্বাধীনতা এসেছে জীবনে। আমার জীবন চলছে ইচ্ছে স্বাধীন ভাবে।
আমি ঘুম থেকে জেগে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোন ধারণা মাথায় আসছিল না। অগত্যা আমি দরজা খুলে বাইরে এলাম। মাকে দেখলাম ব্যস্ত হয়ে রান্না ঘরের দিকে যাচ্ছে। আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ব্যাপার কি মা, কি হয়েছে? এতো রাতে রান্নাবারি করতাছ ক্যা’?
মা কিছু বলার আগে পাশ থেকে মেজোবুবু হাজেরা হাসি মুখে বললেন, ‘তোর দুলাভাই এসেছে’। ব্যাপারটা বুঝতে আমার সময় লাগলো। এতো রাতে দুলাভাই আসবে কেন? ঘরে গিয়ে দেখি বিমর্ষ মুখে রফিকুল দুলাভাই বসে আছেন। একটু দূরে বাবা উদাসভাবে বসে দোয়াদরুদ পড়ছেন। আমি দুলাভাইয়ের পাশে গিয়ে বসলাম। আমার এই মেজো দুলাভাই ভীষণ রসিক স্বভাবের। মজার মজার কথা এবং জোক বলতে ওস্তাদ। তাঁর জোক শুনে আমরা ভাইবোনরা হেসে লুটোপুটি খেতাম। সেই হাস্যরসিক দুলাভাইকে গম্ভীর মুখে দেখে আমার বুকটা ধক করে উঠলো। খারাপ কিছু হয়নিতো। দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে এসেছেন। এর মধ্যে দুদিন কেটে গেছে। ঠিকমতো খাওয়া গোসল হয়নি। মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। ভীষণ বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তাঁকে।
হ্যারিকেন হাতে আমার মেজোভাই আনোয়ার এবং মামাতো ভাই সাত্তার এসে দাঁড়ালো। সাত্তারের হাতে পায়ে মাটি লেগে আছে। কি ঘটতে যাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। সাত্তার বললো, ‘দুলাভাই চলেন। গর্ত খোঁড়া হয়েছে।’ দুলাভাই উঠে বেড়ার গায়ে হেলান দিয়ে রাখা রাইফেলটি হাতে নিলেন। তাঁর হাত থেকে আমি রাইফেলটা নিলাম। রাইফেল হাতে নিতেই আমি বাঁকা হয়ে গেলাম। আর একটু হলে কাত হয়ে পড়ে যেতাম। ওরে বাপরে বাপ। কি ভারী। এইটা দিয়ে যুদ্ধ করে কিভাবে? আমিতো ঠিকমতো তুলতেই পারছি না। দুলাভাইকে বললাম, ‘এতো ভারী। এই অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করেন কিভাবে’? দুলাভাই বললো, ‘দুদিন প্রাকটিস করলে তুইও পারবি। তখন আর এতো ভারী মনে হবে না’।
আমাদের বাড়ির পিছনে ঘন জঙ্গল। দিনেরবেলাও ওই জঙ্গলে যেতে আমরা ভয় পাই। জঙ্গলের মধ্যে একটি বড় গাবগাছ। আমরা জানতাম ওই গাবগাছে ভূত থাকে। এখন অবশ্য ভূতের ভয় করছে না। সেই গাবগাছের একপাশে মাটির ঢিপি। তার কাছেই হাঁটু সমান মাতির গর্ত। সেই গর্তের মধ্যে মোটা পলিথিনে জড়িয়ে রাইফেল এবং গুলির থলে রেখে মাটি দিয়ে গর্ত বুজে দেওয়া হলো। দুলাভাই আমাকে সতর্ক করে বললেন, ‘শোন, আমি যে এখানে এসেছি কাউকে বলবি না। বললে কিন্তু আমারও বিপদ তোদেরও বিপদ। মনে থাকবে’? জোর দিয়ে বললাম, ‘থাকবে। আমি কাউকে বলবো না’।
তখন পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ হানাদার মুক্ত। শোনা যায় নানাদিক থেকে পাক আর্মি সিরাজগঞ্জ দখলের চেষ্টা করছে। কেউ বলে বগুড়া থেকে পাকাআর্মি আসছে। কেউ বলে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ট্রেনে করে আর্মি আসবে। বেশি শোনা যাচ্ছে আরিচা থেকে নৌপথে আর্মি আসার চেষ্টা করছে।
সেইসময় কে একজন বললো নদীর ওপার নেওয়ারগাছা মিলিটারি ক্যাম্প করেছে। কি এক অদ্ভুত খেয়ালে নদীর দিকে আমি একাই মিলিটারির ক্যাম্প দেখতে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম। এপার সনতলা ওপার নেওয়ারগাছা। মাঝখানে করতোয়া নদী। আমি এপার সনতলা গ্রামে নদীর পাড় বরাবর বসে ওপার নেওয়ারগাছার দিকে তাকিয়ে আছি। না। কোথাও মিলিটারির নাম গন্ধ নেই। মনে হলো আমিতো বেকুবের মতো এখানে বসে আছি। মিলিটারি এলে মানুষজন হুড়মুড় করে পালাতো। ওপারের দেখা যাচ্ছে মানুষ দিব্যি স্বাভাবিক ভাবে ঘোরাফেরা করছে। আমি নিজেকে মনে মনে বেকুব বলে ধিক্কার দিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম। সনতলা অনেক বিখ্যাত এবং ঐতিয্যবাহি একটি গ্রাম। এই গ্রামে অনেক বিখ্যাত মানুষের জন্ম। আলোচিত দুএকজনের নাম বললেই আপনারা বুঝতে পারবেন সনতলা গ্রামের গুরুত্ব। এই গ্রামে জন্মেছেন ফতেহ লোহানী, ফজলে লোহানী, কামাল লোহানী, এইচ টি ঈমামসহ আরও অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি। ষাট দশকের দর্শকপ্রিয় বাংলা সিনেমা ‘এতটুকু আশা’, ‘দর্পচূর্ণ’ এবং ‘দীপ নেভে নাই’ এর মতো সিনেমা যারা দেখেছেন তারা স্বীকার করবেন ফতেহ লোহানী কোন মাপের অভিনেতা ছিলেন। ফজলে লোহানী বিটিভিতে ‘যদি কিছু মনে না করেন’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান করে বিখ্যাত হয়ে আছেন।
কামাল লোহানীর ছোটভাই বেলাল লোহানী আমার ক্লাসমেট। আমরা ক্লাস সিক্স থেকে এসএসসি পর্যন্ত একসঙ্গে পড়েছি। দারুন সখ্য ছিল ওর সঙ্গে।
অনেক বড় গ্রাম সনতলা। খান পাড়া, শেখ পাড়া আর নমশূদ্র পাড়া নিয়ে তিনটি পাড়া। আমি সড়ক পথ ছেড়ে নমশূদ্র পাড়ার মাঝ দিয়ে শর্টকাট রাস্তা ধরে বাড়ি ফিরছি। গ্রামের শেষ মাথায় এসে আমার স্কুলের এমএসসি স্যার মনেশ্বর চন্দ্র সরকারের সঙ্গে দেখা। তিনি স্কুলে আমাদের ইলেকট্রিক ম্যাথ করাতেন। আমাকে তিনি বিশেষ স্নেহের চোখে দেখতেন। স্যার আমাকে দেখে নাম ধরে ডাক দিলেন। গ্রামের শেষ মাথায় স্যারের বাড়ি। বাড়িতে বড় বড় টিনের ঘর। উঠোনে অনেক বড় খড়ের পালা। অবস্থাপন্ন পরিবার। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় গিয়েছিলে’?
স্যারকে মিথ্যে বলতে পারলাম না। বললাম, ‘শুনেছিলাম, নেওয়ারগাছায় মিলিটারি ক্যাম্প করেছে। সেই ক্যাম্প দেখতে এসেছিলাম। স্যার আমার কথা শুনে হেসে ফেললেন। এতক্ষণ স্যারকে খুব বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। তাঁর হাসি মুখ আমাকেও উতফুল্ল করলো। হাসি-খুশি স্যারকে বিমর্ষ মুখে দেখে আমারও ভাল লাগছিল না। স্যার আগের মতো বিমর্ষ মুখে বললো, ‘আমরাতো চলে যাচ্ছি। এখানে থাকা আমাদের জন্য নিরাপদ না’। আমি মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললাম, ‘জি স্যার। হিন্দুদের উপর পাকিস্তানি মিলিটারিদের ভীষণ আক্রোশ। তা স্যার, কোথায় যাবেন’?
‘ইন্ডিয়া ছাড়া আর কোথায় যাব। তারপর হঠাৎ স্যার বললেন, ‘আমার একটা উপকার করবে’?
বললাম, ‘কি উপকার স্যার’?
স্যার বললেন, ‘আমার অনেকগুলো ভেড়া। ভেড়াগুলো কি করবো বুঝতে পারছি না। তুমি ওগুলো নিয়ে গেলে ভাল হয়। দেখাশোনা করে রাখবে’।
‘কয়টা ভেড়া স্যার?’
‘ত্রিশটার মতো হবে’। স্যার বললেন।
‘ত্রিশটা! আমি বিস্ময়ে থমকে তাকালাম। বললাম, ‘স্যার ত্রিশটা ভেড়া রাখার মতো জায়গা আমাদের নেই।’
স্যার জোরাজুরি করতে লাগলেন। আমি বললাম, ‘স্যার, ভেড়াগুলো আপনার কোন প্রতিবেশির কাছে রেখে যান’।
স্যার বললেন, ‘আমার তেমন কোন প্রতিবেশি নেই যে এতগুলো ভেড়া রাখতে পারবে’।
আমি বললাম, ‘স্যার, দেশ কবে স্বাধীন হয় ঠিক নেই। এতদিন আমি এতগুলো ভেড়া দেখে রাখতে পারব না। তাছাড়া আমাদের বাড়ির পিছনে বিশাল ঘন জঙ্গল। দিনেরবেলা শিয়াল ঘোরাফেরা করে। ক’দিনেই সব ভেড়া শিয়ালের পেটে চলে যাবে’।
স্যার এবার বললেন, ‘তুমি ভেড়াগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার কথা কেন ভাবছ? ধরে নাও। ওগুলো আমি তোমাকে উপহার দিলাম। তুমি আমার প্রিয় ছাত্র। আমার অন্তত এইটুকু সান্ত্বনা থাকবে যে আমার পোষা প্রাণীগুলো আমার প্রিয় ছাত্রের কাছে আছে এবং ভাল আছে’।
স্যার আমার আর কোন অজুহাতই আমলে নিলেন না। তিনি কথা না বাড়িয়ে বাড়ির ভেতর গেলেন। যখন বেরিয়ে এলেন তখন ভিন্ন এক দৃশ্য আমি দেখলাম। স্যার আগে আগে আসছেন আর ভেড়াগুলো স্যারকে ফলো করছে। এই প্রাণীদের অদ্ভুত জোটবদ্ধতা দেখে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। স্যার আমাকে বললেন, ‘তুমি এইভাবে আগে আগে যাবে, দেখবে ওরাও নিঃশব্দে তোমাকে ফলো করছে’।
আমি অবাক হয়ে ভেড়াদের কারবার দেখছি। ভেড়া যে এত সুশৃঙ্খল দল্ববদ্ধ প্রাণী সেটা আমার আগে জানা ছিল না। আমি আগে আগে যাচ্ছি আর ভেড়াগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমাকে অনুস্মরণ করছে।
ভয়ে ভয়ে বাড়িতে এলাম। সারা পথ শুধু আল্লাহ্ আল্লাহ্ করেছি যেন বাবার সঙ্গে দেখা না হয়। ভেড়াসহ আমাকে দেখলে বাবার মাথায় রক্ত চড়ে যাবে। তারপর তিনি লংকা কাণ্ড বাঁধিয়ে বসবেন।
আমি কাচারি ঘরে ভেড়াগুলো রেখে দরজা বন্ধ করে বাড়ির ভেতরে যেতেই বড় ভাবী আমাকে বললেন, ‘কাচারি ঘরে ম্যা ম্যা করে কি’? আমি না বোঝার ভান করে সরে গেলাম ওখান থেকে। ধরা পড়ে যাচ্ছিলাম প্রায়। কিন্তু ধরা শেষ পর্যন্ত পড়তেই হলো। রাতে তারস্বরে গলা ফাটিয়ে ভেড়াগুলো চিৎকার শুরু করে দিল। সমানে ভ্যা ভ্যা আওয়াজ। কান পাতা দায়। বাবা কাচারি ঘরে গিয়ে দেখে এসে কিছুক্ষণ খাম হয়ে বসে রইলেন। তাঁর এভাবে বসে থাকা মানে প্রচণ্ড রাগে হাঁস-ফাঁস করছে। খাম হয়ে বসে আগে রাগ সামাল দিচ্ছেন। মাকে গম্ভীর গলায় ডেকে বললেন, ‘কাচারি ঘরে গিয়ে তোমার ছেলের কাণ্ড দেখে এসো’।
‘কি কাণ্ড’?
বাবা রাগে দাঁত চিবিয়ে বললেন, ‘ভেড়ার ভ্যা ভ্যা আওয়াজ শুনতে পাচ্ছ না?’
আমি আমার ঘর থেকে বাবার কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। মা সরাসরি আমার ঘরে এসে ভেঙ্গে পড়া কণ্ঠে বললেন, ‘এসব কি করেছিস বাবা? তোর কি আক্কেল পছন্দ কোনদিন হবে না?’
আমি মা’র কাছে সাহাই গাইতে চেষ্টা করছিলাম। ‘কি করবো বলো, মনেশ্বর স্যার আমার কোন কথাই শুনলেন না। জোর করে ভেড়াগুলো আমাকে দিয়ে দিলেন’।
বাবা সঙ্গে সঙ্গে যাত্রার ক্যাচিংয়ের মতো তাৎক্ষণিক বলে উঠলেন, ‘স্যার দিয়ে দিলেন আর উনি গাধার মতো ভেড়াগুলো সঙ্গে করে নিয়ে এলেন। ওদের তুই খেতে দিবি কি? এখন যা, আগে ওদের চিৎকার চেঁচামেচি থামা’।
আমি রাগমুখে কাচারি ঘরে এসে কিছুক্ষণ ধমকিয়ে ভেড়াগুলোকে থামাতে চেষ্টা করলাম। না। তাতে কাজ হলো না। আমাকে কাছে পেয়ে ওরা দ্বিগুণ শক্তিতে চেঁচাতে লাগলো।
ভেড়া নিয়ে মহাযন্ত্রনায় পড়ে গেলাম। রাগে দুঃখে নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হলো। ওরা যে রাতে কোরাস গান করে সে কথা মনেশ্বর স্যার আমাকে বলেননি। এখন কি করা যায়। ভেবে কন কূল কিনারা পেলাম না। মামাতোভাই সাত্তার বললো, ‘চিন্তা করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি তোর ঝামেলা কমিয়ে দেব’।
বললাম, ‘কিভাবে?’
ও বললো, ‘সময় এলেই বুঝতে পারবি’।
সাত্তারের কথার মর্মার্থ পরদিনই বুঝতে পারলাম। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে রাত আটটার দিকে বাড়ি এলাম। মূলত ভেড়াগুলোর জন্যে বাড়ি আসা। ভেড়াগুলো দেখাশোনা করে আবার বের হবো। কাচারি ঘরে গিয়ে ভেড়া গুণে দেখি ভেড়া একটি কম। ২৯টি। আমি বাড়ির ভেতরে এসে মাকে বললাম, ‘মা, ভেড়া একটা কম। তোমরা কি কোন আওয়াজ পেয়েছ?’
মা বললেন, ‘কিসের আওয়াজ?’
বললাম, ‘শিয়ালে নিল কিনা সেই আওয়াজ’।
ভাবী মুচকি হেসে বললেন, ‘বাগানে গিয়ে দেখ। শিয়াল বোধহয় পুরোপুরি খেয়ে সাবার করতে পারেনি। বাড়ির দক্ষিণ পাশে অনেক বড় আমবাগান আমাদের। আমি হ্যারিকেন হাতে আমবাগানে গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম এবং সাত্তারের গতকালের কথার মর্মার্থ বুঝতে পারলাম। দেখলাম রফিকুল দুলাভাই আর সাত্তার গাছের ডালে ঝুলিয়ে ভেড়ার চামড়া ছুলছে। ছোলা প্রায় শেষের দিকে। আমি সামনে গিয়ে বললাম, ‘দুলাভাই, এইটা কোন কথা হলো?’
দুলাভাই আমার কথার পাত্তা না দিয়ে বললেন, ‘ভেড়ার মাংসে অনেক ফজিলত। ইব্রাহিম পয়গম্বর ছেলেকে কোরবানি করতে এসে ভেড়া কোরবানি করেছিলেন। সেই থেকে পশু কোরবানি চালু হয়েছে। যুদ্ধে যেতে হবে। বাঁচি না মরি ঠিক নাই। ভেড়ার মাংস খেয়ে স্রস্টার নৈকট্য পাওয়ার চেষ্টা করি। তুই খামখা মন খারাপ করিস না’।
‘আমি স্যারকে কি বলব?’
‘বলিস শিয়ালে খেয়েছে’। বলেই তাঁর অট্টহাসি বাগানময় ছড়িয়ে গেল।
রাতেই রান্না হলো সেই মাংসের। বড়ভাবী রান্না করলেন। কিন্তু তিনি সেই মাংস খেলেন না। বাড়ির অন্য আর কেউ খেল না। সাত্তার রফিকুল দুলাভাই আর মেজভাই আনোয়ার মজা করে খেল।
পরেরদিন সত্যি সত্যি একটি ভেড়া শিয়ালে নিয়ে গেল। দুদিনের সব কথা বাবার কানে যাওয়ার পর পরই বাবা সব ভেড়া নিয়ে স্যারের বাড়ি দিয়ে এলেন।
অবশেষে ভেড়ার ঝামেলা কেটে গেল। ২৪ এপ্রিল করোতা ব্রীজে [স্থানীয় উচ্চারণে ঘাটিনা ব্রীজ] পাকিস্তানিদের সঙ্গে প্রতিরোধ যুদ্ধ হলো। যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী টিকতে পারলো না। সেই রাতে খেতে বসে আমি দুলাভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘দুলাভাই, যুদ্ধের অবস্থা কি? আমাদের জেতার সম্ভাবনা কতটুকু?’
দুলাভাই বললেন, ‘ফিফটি ফিফটি’।
তাঁর কথা বিশ্বাস হচ্ছিল না। বললাম, ‘দুলাভাই, গতকাল ঘাটিনা ব্রীজের যুদ্ধে ওদের ভারী অস্ত্রের আওয়াজে মনে হচ্ছিল দুনিয়া গায়েব হয়ে যাচ্ছে। সেই ভারী অস্ত্রের সামনে আমরা শেষপর্যন্ত টিকে থাকতে পারব?’
‘না পারার কি আছে? আমাদেরও ভারী অস্ত্র সংগ্রহ করতে হবে’।
‘কিভাবে? কোথায় পাবো, কে দেবে আমাদের ভারী অস্ত্র?’
‘কূটনৈতিক ভাবে চেষ্টা করতে হবে’।
‘সেটা কেমন?’
‘আমাদের সরকার চেষ্টা করবে’।
‘আমাদের সরকার মানে? আপনি আমাদের সরকার কই পাইলেন?’
‘তুই জানিস না আমাসের প্রবাসী সরকার গঠিত হয়েছে? তাজউদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী’।
‘না, জানি না’।
‘তাহলে কি জানিস? রেডিও শুনিস না?’
‘রেডিও কোথায় পাব?’
দুলাভাই তখন ব্যাপারটা বিস্তারিত বললেন আমাকে। কুষ্টিয়া জেলার বৈদ্যনাথতলায় ১৭ এপ্রিল প্রবাসী সরকার শপথ নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি। যেহেতু বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি তাই সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি করা হয়েছে। আর তাজউদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী। বৈদ্যনাথতলার নাম এখন মুজিব নগর। দুলাভাই অবাক কণ্ঠে বললেন, ‘এ খবরতো বিবিসি, আকাশবাণী, এমনকি আমাদের স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ঘন ঘন প্রচার করেছে। তুই স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র শুনিসনি?’ দুলাভাই বিস্ময়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।
বললাম, ‘না, শুনিনি’।
তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘তাহলেতো তুই মাতৃগর্ভে আছিস। যুদ্ধের কিছুই টের পাচ্ছিস না। তুই চরমপত্র শুনলে হাসতে হাসতে ফিট হয়ে যাবি।’
‘চরমপত্র কি?’
‘একজন সাংবাদিক চরমপত্র নামে একটি কথিকা পড়ে। কি যে মজা না শুনলে বিশ্বাস করতে পারবি না।’
সেইসময় আমাদের গ্রামে মাত্র দু’টি বাড়িতে রেডিও ছিল। আমার ছোট চাচার বাড়ি আর কল্যাণদের বাড়ি। আমি চাচাতো ভাই বাবলু ভাইয়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বললাম। বাবলুভাই আমার রাজনীতির দীক্ষা গুরু। তার হাত ধরেই আমার রাজনীতিতে প্রবেশ। সেইসময় তিনি সলপ ইউনিয়ন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি। আমি ভাল শ্লোগান দিতে পারতাম। যে কারণে বাবলুভাই কোথাও জনসভা থাকলে আমাকে সঙ্গে নিতেন। আমি আগে-আগে শ্লোগান ধরতাম পেছন থেকে অন্যরা আমার সঙ্গে তাল মেলাতো।
বাবলুভাই সব শুনে বললেন, ‘আমিতো নিয়মিত স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র শুনি। তুই শুনিসনি? ঠিকআছে। আজ সন্ধ্যায় আসিস। আর কাউকে বলবি না। লুকিয়ে-লুকিয়ে শুনি। তুই একাই আসিস।’
আমি যুদ্ধের আরও খবর জানতে চাইলে বাবলুভাই বললেন, ‘যুদ্ধের খবর ভাল। বেঙ্গল রেজিমেন্ট আমাদের মুক্তিযুদ্ধে জয়েন করেছে। বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন মেজর, নাম জিয়া, তিনি সবাইকে যুদ্ধে যোগদানের আহবান জানিয়েছেন।’
‘মেজর জিয়া কে?’
‘সেনাবাহিনীর একজন মেজর। সে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।’
‘বলেন কি! তাহলেতো মহা খুশির খবর।’
রাতে নৌকায় বসে বন্ধুদের এই খবর দিলাম। সবাই উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। যেন আর ভয় নেই। যুদ্ধে আমরা জিতে যাচ্ছি। সেদিন রাতেই আমাদের যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারটা মোটামুটি ফাইনাল হয়ে গেল।

ঘাটিনা ব্রীজ প্রতিরোধ যুদ্ধের পরদিন শাজাহানপুর গ্রামে মিলিটারি এসে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে লাগলো। আমরা আগুনের লেলিহান শিখা দেখে পালিয়ে নিরেপদে আশ্রয় নিলাম। সন্ধ্যায় বাড়িতে এলে বাবা বললেন, ‘উঠোনে গর্ত করে ধান চাল মাটি চাপা দিয়ে রাখতে হবে। যেভাবে ওরা ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে তাতে না খেয়ে মরতে হবে। ধানচাল বাঁচাতে পারলে না খেয়ে অন্তত মরতে হবে না।
রাতেই শুরু হলো উঠোনে গর্ত করার কাজ। এ ব্যাপারে মামাতো ভাই সাত্তার একাই একশো। শরীরে তার অসুরের শক্তি। মেদহীন পেটা শরীর। কোদাল দিয়ে একাই মাটি কাটছে। গা দিয়ে দর দর করে ঘাম ঝরছে। সাত্তার একাই গর্ত খুঁড়ছে। আর আমরা সবাই তামাশা দেখছি। কোমর পর্যন্ত খোঁড়ার পর আরও একজনকে গর্তে নামতে হলো মাটি ভর্তি টুকরি উপরে তুলে দেওয়ার জন্য। তখন আমাকেও হাত লাগাতে হলো টুকরি ধরে মাটি তুলে পাশে জড় করতে। লম্বায় দশ হাত প্রস্থে তিন হাত আর গভীর এক মানুষ সমান গর্ত করে বস্তা ভর্তি ধান আর কোলা ভর্তি চাল থরে থরে সাজিয়ে রাখা হলো। এইসময় মা’র একটি কাণ্ড নিয়ে বাবা রসিকতা করে আমাদের ভাইবোনদের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, ‘তোদের মায়ের কাণ্ড দেখ।’ আমরা লক্ষ্য করলাম মা তার কিছু সেলাই করা কাঁথা নিয়ে এসে পলিথিন পেপারে মুড়িয়ে গর্তে রাখছে। আমরা মাকে মুখে সমর্থন করলাম না কিন্তু তাঁকে বাঁধাও দিলাম না। বাবার কাছে এগুলোর মূল্য না থাকলেও মায়ের কাছে এবং আমাদের কাছেও এসবের মূল্য অপরিসিম। স্বর্ণের অনেক গহনাও রাখা হলো গর্তে। তারপর মাটি চাপা দেওয়া হলো। রাতেই গর্ত ভরাট করে লেপে উঠোন আগের অহস্থায় আনা হলো।
দুদিন পর এক সকালে উঠে শুনি রফিকুল দুলাভাই চলে গেছে। তিনি কোন পথে যুদ্ধে গেলেন এই তথ্যটা বাড়ির কেউ বলতে পারলো না। সাত্তার বললো, যাওয়ার সময় বাড়ির পেছনের গর্ত থেকে রাইফেল তুলে নিয়ে গেছেন। মেজো বোন হাজেরা বুবুর মন খারাপ। বিষণ্ণ মুখে সে শুধু বাড়ির বাইরে দূরের পথপানে তাকিয়ে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধ ছিল দেশের প্রতিটি মানুষের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ সবাইকে কম বেশি আঁচড় দিয়ে গেছে। কেউ কেউ সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে।
হাজেরা বুবুর জন্য আমার মন খারাপ হতো। দুলাভাই যদি যুদ্ধ থেকে ফিরে না আসে। তাহলে কি হবে বুবুর? এই ভাবনাটা আমাকেও আক্রান্ত করতো তখন।
আমরা যে রাতে বিড়ির আগুন ছুঁয়ে শপথ নিলাম যুদ্ধে যাব তার পরদিন মামাতোভাই সাত্তার আমাকে বললো সেউ যুদ্ধে যাবে। আমি বললাম, ‘ভালই হলো। এক সঙ্গে যাওয়া যাবে।’
সাত্তার বললো, ‘না। আমি আলাদা দলে যাব। আমাদের গ্রামের একজনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল গতকাল। কথা হয়েছে। আমি ওর সঙ্গে যাব।’
‘তা কবে যাবি ঠিক করেছিস?’
সাত্তার বললো, ‘কাছে একদম টাকা পয়সা নাই। কিভাবে যাব তাই ভাবছি।’
আমি বললাম, ‘টাকা পয়সাতো আমার কাছেও নাই। দেখি কি করা যায়। বাবলুভাইয়ের কাছে বলবো ভাবছি’।
সন্ধ্যায় বাবলুভাইয়ের সঙ্গে লুকিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারের অনুষ্ঠান এবং চরমপত্র শুনে মনটা অনেক সতেজ করে তারপর বাবলুভাইকে বললাম, ‘বাবলুভাই, আমরা মুক্তিযুদ্ধে যাব ঠিক করেছি। আপনার ইচ্ছা কি?’
বাবলুভাই আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘কারা কারা যাচ্ছিস তোরা?’
বললাম, ‘আমি, সুকুর মামু, মোস্তফা, জহুরুল, আসগর, খোকন, মিন্টু আরও হয়তো কেউ কেউ যাবে। রাজ্জাকও যাবে বলেছে। আপনি যাবেন না?’
বাবলুভাইয়ের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। জবাব দিতে ততো-মতো করছিলেন। বললেন, ‘তোদের মতো আমার অতো সাহস নেই। গুলির আওয়াজ শুনলে আমার হাত পা কাপে’।
এবার আমার কণ্ঠ চড়ে গেল। ‘এসব কি বলছেন আপনি? আপনি আমাদের নেতা। আপনি যুদ্ধে না গেলে কর্মীরা হতোদ্যম হয়ে পড়বে না?’
আমার কথায় বাবলুভাই কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর এমন একটি কথা বললেন, যা শোনার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। বললেন, ‘আমি যুদ্ধে গেলে আমার মা নির্ঘাত হার্ট ফেল করবে।’ শুনে আমার নিজেরই হার্ট বন্ধ হবার যোগাড়। বাবলুভাই আমার চাচার নিজের সন্তান নয়। দত্তক। পালক পুত্র। তার জন্য যদি পালক মা হার্ট ফেল করে তাহলে আমরা যারা মায়ের নাড়ি ছেঁড়া ধন তাদের মায়ের কি অবস্থা হবে? মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। আমি আর কোন কথা না বলে চলে আসি। টাকার কথা বলতে গিয়েছিলাম। সেকথা বলার রুচি হলো না।
সাত্তার আমাকে জিজ্ঞেস করলো, টাকার কোন ব্যবস্থা করতে পারলি? বাবলুভাইকে বলেছিলি?’
সাত্তারকে বললাম,’চিন্তা করিস না। টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
সেদিন ছিল সাপ্তাহিক হাটবার। আমাদের ঐতিহাসিক কৃষকগঞ্জ বাজার বুধবার এবং শনিবার হাট বসে। বাবা মায়ের ঘরে গিয়ে দেখলাম বস্তায় সরিষা ভরা। দুইমণই বস্তার সরিষা সাত্তারের মাথায় তুলে দিলাম। বস্তা মাথায় নিয়ে সাত্তার বাঁকা হয়ে গেল। বললাম, ‘নিতে পারবি?’ বললো, ‘আল্লাহ্ ভরসা।’
সরিষা ১২০ টাকা বিক্রি করে দুজন ভাগ করে নিলাম। সাত্তার পরদিন আমার মাকে গিয়ে বললো, ‘ফুফু, আমি বাড়ি যাব।’ মা সাত্তারকে দোয়া করলেন।
সাত্তার আমার মাকে মিথ্যে বলে যুদ্ধে চলে গেল। আমি কিছুই বলতে পারলাম না। কাউকে কিছু না বলে এক ভোরে অনিশ্চিত জীবন বেছে নিলাম। শুরু হলো যুদ্ধ জীবন।