ভোরবেলা মাঝিরা নৌকা ছাড়লো। প্রতিবারই নৌকা ছাড়ার আগে নৌকার আগা গোলইতে পানি দিয়ে সম্মিলিত কণ্ঠে আলী আলী বলে জিকির করে। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে মাঝিরা বলে, ‘আলীর নাম জপলে সাহস বাড়ে। আপদ বিপদ হয় না।
খাল থেকে নদীতে এসেই মাঝিরা নৌকায় পাল তুলে দেয়। পাল ছাড়া এতো বড় নৌকা দাড় টেনে বেশি দূর নেওয়া সম্ভব না। পালে হাওয়া লেগেছে। ঢেউ ভেঙ্গে নৌকা ছুটছে। মাঝিদের মুখে হাসি। কিন্তু আমাদের মুখে হাসি নেই। রাতে রান্নার সময় আমাদের কুক শাজাহান জানিয়েছে, বাজার শেষ। বাজার না করলে চুলোয় হাড়ি চড়বে না। বাজার নিয়ে আমরা চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন। নৌকায় ওঠার আগে আমরা যে বাজার করেছিলাম তাতে আমাদের বাজার শেষ হওয়ার কথা নয়। এতো তাড়াতাড়ি কেন বাজার শেষ হলো, এই ব্যাপারটা আমাদের ভীষণ ভাবনায় ফেলে দিল। শাজাহান বিব্রত মুখে বললো, ‘বেশি বেশি চাল-ডাল রান্না করতে হয়েছে। সেই কারণে চাল-ডাল তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেছে।’
‘বেশি বেশি রান্না করতে হয়েছে কেন?’ সমস্বরে জিজ্ঞেস করলাম আমরা।
শাজাহান সহজভাবে বললো, ‘সবাই বেশি বেশি খাইছো এই জন্যে বেশি বেশি রান্না করতে হইছে।’
তার কথার যুক্তি আছে। বেশি-বেশি খাইলে বেশি-বেশি রান্নাতো করতেই হবে। এই সময় অভিজ্ঞ হালের মাঝি আমাদের বললেন, ‘ওনার কোন দোষ নাই। আপনারা আসলেই বেশি বেশি খাইছেন। নৌকায় থাকলে খাওন বেশি লাগে। হজমও তাড়াতাড়ি হয়।’
‘আশ্চর্য কথা। এরকম কেন হয়?’
‘তাতো বলতে পারবো না। তবে আজ চল্লিশ বছর ধরে নাও চালাইয়া বুঝছি নাওয়ে থাকলি খোরাকি বেশি লাগে।’ হালের মাঝির কথাটা শতভাগ খাঁটি। খুবই মনে ধরে আমার। আমি নিজেও বাড়িতে যে পরিমাণ ভাত খেয়েছি নৌকায় তার দ্বিগুণ খাই। আমি নিজেই নিজের খাওয়া দেখে অবাক হই। শুধুমাত্র ডাল আর আলু ভর্তা দিয়ে দুই থাল ভাত খেয়ে ফেলি এবং মনে মনে অবাক হই। বাড়িতে খাওয়া নিয়ে কত বাছ-কুছ করেছি। মাছ-মাংস ছাড়া মুখে খাওয়া ঢুকতো না। কতদিন মাছ-মাংস না পেয়ে খাওয়া ছেড়ে রাগ করে উঠে গেছি। সেই আমি শুধু ডাল আর দন্ধুল ভাঁজি বা আলু ভর্তা দিয়ে পেট পুরে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি। আবার নৌকায় বসে মমতা মাখানো মিষ্টি বাতাসে কিছুক্ষণ পরই আবার খিধে লেগে যায়। নৌকায় থাকলে কেন এমন হয় নিশ্চয়ই এর কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু আমরা ভেবে না পেয়ে শুধু শুধু অস্থির হয়েছি। মাঝিদের আমরা বলেছি বাজার-টাজার দেখে নৌকা ভিড়াতে। মাঝিরা বলেছে এখানে আশে পাশে কোন বাজার-ঘাট নেই।
সকাল থেকে আমরা না খাওয়া। ঘরে চাল না থাকলে ক্ষুধা নাকি ঘন ঘন লাগে। কথাটা বাবা বলতেন হাস্য রসাত্মক ভাবে। কিন্তু কথাটা যে কতটা নির্মম সত্য এখন টের পাচ্ছি হাড়ে-হাড়ে। আজ আমাদের বাজার নেই। চুলো জ্বলছে না। তাই ক্ষুধা যেন তীব্রভাবে চেপে ধরছে।
যমুনা নদীর আশেপাশে তেমন কোন গ্রাম চোখে পড়ছে না। যেখানে নেমে আমরা চাল-ডাল সংগ্রহ করবো। বেলা ক্রমশ মাথা বরাবর উঠে হেলে যাচ্ছে পশ্চিমে। খাওয়ার কোন ব্যবস্থার তখনও দেখা যাচ্ছে না। ক্ষুধা এবং হতাশা যেন পাল্লা দিয়ে চেপে ধরছে আমাদের।
যমুনার বুক জুড়ে রঙ-বেরঙয়ের পাল উড়ছে। গলা ছেড়ে লম্বা সুরে গান ধরেছে কেউ। অপরূপ প্রকৃতি মনোলোভা ভাবে তার সৌন্দর্য বিছিয়ে রেখেছে। কিন্তু এসব কিছুই ভাল লাগছে না। ক্ষুধার্ত শিশুর কাছে রঙিন খেলনার চেয়ে দুধ অতি প্রয়োজনীয় বস্তু। কবি সুকান্ত লিখেছেন ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’ খুধার পেটে অবর্ণনীয় সুন্দর গোলাপও যেন ভয়ংকর কুৎসিত। যমুনার চারপাশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাই মোটেও আকর্ষণ করছে না আমাদের।
হঠাৎ দূরে যমুনার বুকজুড়ে বড় একটি চর চোখে পড়ে আমাদের। সেই চরে নতুন বসতি গড়ে উঠেছে। চরের বাড়িঘর গুলো আমাদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। আমরা মাঝিদের সেই অচেনা চরে নৌকা ভিড়াতে বলি। নৌকা ভিড়ালে আমরা ঝটপট নেমে পড়ি। চরের বাড়িঘর দেখেই বোঝা যায় নতুন গড়ে উঠছে বসতি। বাড়িঘর সাজানো গোছানো নয়। গাছপালা নেই। ছায়াহীন। চড়া রোদে খা খা তেজ। বাড়িঘরের নমুনা বলে দেয় মানুষগুলো দীনহীন। আমরা এলোমেলো পথে হেঁটে চলেছি। নির্দিষ্ট কোন পথ নেই। বাড়ির উঠোন দিয়ে হাঁটা পথ। হাঁটতে হাঁটতে কোন বাড়িতে যুবতী কাউকে দেখলে খোকন নিচুস্বরে তোতলিয়ে বুড়ি-বুড়ি বলতে থাকে। আর আমরা ক্ষুধার পেটেও মুখ চেপে হাসতে থাকি। আমাদের এই বন্ধুটি সুক্ষ্ম রস সৃষ্টিতে ভীষণ পারঙ্গম। নানা ধরণের গ্রাম্য প্রবাদ বলতেও তার জুড়ি নেই। হাঁটতে হাঁটতে আমরা কয়েকজন যুবককে পেয়ে গেলাম। তারা কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এলো আমাদের কাছে। আমরা সরল কথায় তাদের বললাম, ‘ভাইসব, আপনারা জানেন, দেশে যুদ্ধ চলছে। পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা চালাচ্ছে। আমাদের মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি করছে। তাই আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ভারত যাচ্ছি ট্রেনিং নিতে। লজ্জার কথা কি বলবো, যে হিসেবে আমরা চাল-ডাল কিনেছিলাম সে হিসেব ছিল ভুল। রাতের মধ্যে আমাদের সব চাল-ডাল শেষ হয়ে গেছে। সকাল থেকে আমরা না খাওয়া। কিছু চাল-ডাল দিয়ে আমাদের সাহায্য করলে খুব উপকার হয়।
দুর্যোগে বাঙালির মানবিকতার দৃষ্টান্ত অনন্য এবং পরীক্ষিত। সেই সাধারণ যুবকরা ছুটে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে চাল সংগ্রহ করে নিয়ে এলো। তরকারি হিসেবে কয়েকটি মিষ্টি কুমড়ো এনে দিলো। আমরা তাতেই মহাখুশি। যুবকদলকে ধন্যবাদ জানিয়ে নৌকায় ফিরে এলাম। বুড়ি নৌকার ছইয়ে পা ছড়িয়ে বসেছিল। খোকন দেখে বুড়ি বুড়ি আওয়াজ তুলতেই আমাদের বাঁধ ভাঙ্গা হাসি। ইশারায় বুড়িকে আমাদের রান্নার আয়োজন করতে বলা হলো। ততক্ষণে মাঝিদের রান্না শেষ। আমাদের চাল নেই। মাঝিরাও তাদের জন্য রান্না করেনি। আমরা না খেয়ে আছি তারা নাকি আমাদের সামনে খেতে পারবে না। তাদের চাল-ডাল থেকে আমাদের কিছু দেবে সেই পরিমাণ চাল-ডালও তাদের ছিল না। কাকীমাদের রান্না আর আমাদের রান্না একই সঙ্গে শুরু হলো। তাদেরও বাজার শেষ হয়ে গিয়েছিল। দুই কাকীমা, আমাদের শাজাহান আর বুড়ি তাদের সম্মিলিত চেষ্টায় দ্রুতই রান্নার কাজ সমাপ্ত হলো। মিষ্টি কুমড়ো ভাঁজি আর ভাত। গোগ্রাসে খেলাম। খেলাম না বলে গিললাম বলাটাই সঙ্গত। এতো মজা পেলাম যেন এতো মজা আর কোনদিন পাইনি। সত্যি রান্না বড় সুস্বাদু হয়েছিল। তার চেয়ে বড় সত্য ক্ষুধার মুখে সবই অমৃত মনে হচ্ছিল। সবাই চেটেপুটে খেলাম। মাঝিরা বলছিল নৌকায় আমাদের এইবেলাই শেষ খাওয়া। সন্ধ্যা নাগাদ আমরা মাইনকারচর পৌঁছে যাবো।
খাওয়ার পর আমরা ছইয়ে গিয়ে বসলাম। তখন অবশ্য আমাদের দর্শন দৃষ্টি বদলে গেছে। প্রকৃতি আমাদের দৃষ্টিকে মুগ্ধতা ফিরিয়ে দিয়েছে। চারপাশের পরিবেশ আমাদের আন্দোলিত করতে শুরু করেছে। যমুনার বুকে শত শত পাল তোলা নৌকা আমাদের মুগ্ধতা বাড়িয়ে দিয়েছে। উত্তর দিগন্তে কালো একটি রেখার মতো কালচে ভাব আমাদের কৌতূহলী করে তোলে। মাঝিরা বললো, ওটাই মাইনকারচর পাহাড়। আমরা একসঙ্গে উল্লাস করে উঠলাম। ‘আমরা এসে গেছি।’
রেখাটি ঘন কালো মেঘের মতো ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। এই প্রথম আমার পাহাড় দর্শন। আমার ষোল বছরের জীবনে গ্রাম ছাড়া দুবার গিয়েছি সিরাজগঞ্জ শহরে। এইতো দেখার স্মৃতি। বলা যায় কুয়োর ব্যাঙ আমি। পাহাড় দেখে আমার রোমান্স উথলে উঠছিল। মনে হচ্ছিল নয়ন মন সার্থক। যুদ্ধে না এলে এতো কিছু আমার দেখা হতো না।
আমাদের উচ্ছ্বাসের চেয়ে কাকীমা, বুড়ি এবং তাদের দাদাদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। যেন বহুকাল পরে বহু বাঁধা অতিক্রম করে তারা জন্মভূমিতে ফিরছে। কাগজে ম্যাপ করে এনেছে তারা। কিভাবে মাইনকারচর থেকে তারা কলকাতা যাবে। কলকাতায় তাদের নিকট আত্মীয় আছে। সেখানে গিয়ে উঠবে তারা। আমাদের ব্যাপারটা অনিশ্চিত। শুধু জানি আমাদের যেতে হবে রৌমারী ক্যাম্পে। সেখানে আমাদের থাকা খাওয়ার কি ব্যবস্থা, সেটা আমরা জানি না।
বুড়িদের বাক্স পেটরা গোছানো শুরু হয়ে গেল। ধীরে ধীরে পাহাড় নিকটে আসছে। আমাদের মধ্যেও মৃদু উত্তেজনা।
সন্ধ্যার আগে আমাদের নৌকা মাইনকারচর এসে ভিড়লো। একটি খরস্রোতা নদী দুভাগ করেছে শহরটিকে। পূর্ব পার পাহাড় ঘেরা জনপদ। পশ্চিম পার নদী ঘেঁষে ছোট্ট শহর। আমরা ব্যাগ গুছিয়ে এসে দেখি বুড়িরা চলে গেছে। যাওয়ার আগে কিছু বলেও গেল না। এই নিয়ে আমাদের আক্ষেপ ছিল না কারও। আমরা মাঝিদের বলে বিদায় নিলাম। বৃদ্ধ হালের মাঝি আমাদের মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন। বললেন, ‘সাবধানে থাকবেন। মনে রাখবেন, দেশ আপনাদের মুখের দিকে তাকাইয়া আছে।’ বৃদ্ধ মাঝির কথায় আমাদের চোখ টলমল করছিল। জবাবে আমরা কেউ কিছু বলতে পারছিলাম না। নিঃশব্দে আমরা ক্যাম্পের দিকে রওনা হলাম।