মাঝিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। সীমান্ত ঘেঁষা এই ছোট্ট শহরটি খুবই অনুন্নত। শহরের মাঝ দিয়ে অপ্রশস্ত কাঁচা রাস্তা। দুপাশে সাধারণ ধরণের দোকানপাট। কিছুদূর যেতে দেখলাম টিনের তৈরি একটি সিনেমা হল। সেখানে হিন্দি সিনেমার ব্যানার ঝুলছে।

সেখানথেকে আড়াই মাইল দূরে আমাদের ক্যাম্প। আমরা জিজ্ঞেস করে করে এগুচ্ছি। কিছুদূর যাওয়ার পর একজনকে দেখে আমরা চমকে উঠলাম। আমাদের গ্রামের অখিলদা। ফেলা ঘোষের ছেলে আমাদের প্রিয় অখিলদা। তাঁকে দেখে চমকে ওঠার কারণ এই বিদেশ বিভূয়ে গ্রামের কারও সঙ্গে হঠাৎ এভাবে দেখা পাওয়া।

অখিলদা আমার তিন/চার বছরের সিনিয়র। মিষ্টি চেহারা। দেখতে ভারী সুদর্শন। ফর্সা একহারা গড়ন। অমায়িক। অতিমাত্রায় সরল। এই যুগে আমরা যাকে বোকা বলি। অখিলদার সরলতার গল্প আমাদের এলাকায় বহুল প্রচারিত।

ট্রেনে চড়ে কলেজে গিয়ে ক্লাস করতো অখিলদা। তার মতো আমাদের গ্রামের আরও কয়েকজন তরুণ ট্রেনে চেপে সিরাজগঞ্জ কলেজে লেখাপড়া করতো। অখিলদা ঘোষপাড়ার দ্বিতীয় কলেজ স্টুডেন্ট। এর আগে ওই পাড়ার অধীরদা গ্রাজুয়েশন করেছেন। যেদিন ঘোষপাড়া পাকিস্তানি মিলিটারি আক্রমণ করে সেইদিনই তারা অধীরদাকে প্রথম গুলি করে হত্যা করে। অধীরদার মৃত্যু আমাকে ভীষণ শোকাহত করে। তিনি অত্যন্ত সজ্জন, মেধাবী এবং মানবিক মানুষ ছিলেন। তাঁর হত্যাকাণ্ডে আমাদের গ্রামের সবাই শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

সেই থেকে ঘোষপাড়ার সবাই পালিয়ে যার যার মতো বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেয়। অখিলদারা দেশ ছেড়ে ভারতের মাইনকারচর এসে আশ্রয় নিয়েছে।

অখিলদারা যে ট্রেনে চেপে কলেজে যেত সেই ট্রেনকে স্থানীয় ভাষায় মাইছা ট্রেন বলা হতো। ওই ট্রেনে লাহিড়ী মোহনপুর, দিলপশার, বড়ালব্রীজ, চাটমোহরের বিভিন্ন পাথার অঞ্চল থেকে মাছ আসতো সিরাজগঞ্জ শহরে। সেই জন্যে ওই ট্রেনের নাম মাইছা ট্রেন। সলপ স্টেশনে মাইছা ট্রেন এসে থামতো ভোর সাতটায়। সেই ট্রেন ধরতে খুব ভোরে উঠে নাকে মুখে কিছু একটা গুঁজে প্রায় তিন মাইল পথ পায়ে হেঁটে স্টেশনে ছুটতে হতো। ক্লাস শেষে ফিরতে ফিরতে রাত। অখিলদা তাই নাস্তা হিসেবে সঙ্গে রুটি নিয়ে যেতেন। আর নিতেন একটি হ্যারিকেন। হ্যারিকেন কেন? হ্যারিকেন এই জন্য যে, কলেজ থেকে ফিরতে রাত হতো। পথে সাপ পোকার-মাকরের ভয়। ফেরার পথে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে বাড়ি ফিরতেন। কলেজে যাওয়ার সময় স্টেশনের আশে পাশে কোন দোকানে হ্যারিকেন রেখে যেতেন। এই নিয়ে অন্য সঙ্গিরা তার সঙ্গে ভীষণ মজা করতো। কেউ কেউ মজা করে বলতো, ‘বাবা অখিল, তোমার হ্যাজাক লাইট জ্বালাও। আমরাতো আন্ধারে কিছুই দেখতাছি না।’ আরেকজন আরও একটু রস ঢেলে বলে উঠতো, ‘আমিতো আমাদের কথা ভাবছি না, আমি ভাবছি অখিল বাবাজির কথা। বাবাজি আন্ধারে গর্তে পড়ে ঠ্যাং ভাঙলে আমরা কাকীমাকে কি জবাব দেব?’

সঙ্গিদের এতো যে হাসি-ঠাট্টা তবু অখিল রাগ করতো না। শুধু অমায়িক ভাবে হাসতো। অখিলের বাবা ফেলা ঘোষ ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছে, ‘আপাতত হ্যারিকেন দিয়ে চালাও। ব্যবসা ভাল হলে টর্চলাইট কিনে দেব।’ অখিল তাই আর কথা বাড়ায়নি।

অফ পিরিয়ডে অখিল নিরিবিলি কোন স্থানে বসে সঙ্গে আনা রুটি খেয়ে নিতো। একদিন প্রচণ্ড ক্ষুধায় ক্লাস শেষ হওয়ার পরই রুটি খেতে শুরু করে। ততক্ষণে পরের ক্লাসের টিচার এসে হাজির। এবং রোল কল শুরু করে। পেছনের বেঞ্চে বসে শুকনো রুটি চিবুচ্ছিল অখিল। এইসময় তার রোল এসে পড়ে। রুটি চিবুতে চিবুতে অখিল ‘ইয়েস স্যার’ বলে উঠলে শব্দটি স্যারের কাছে অস্বাভাবিক এবং বিটকেলে ধরণের মনে হওয়ায় স্যার অখিলকে উঠে দাঁড়াতে বলেন। অখিল বিব্রত মুখে উঠে দাঁড়ায়। স্যার হাসি মুখে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি কিছু খাচ্ছ নাকি?’ অখিল সরল ভাবে স্বীকার করে, ‘জি স্যার, রুটি খাচ্ছি।’

স্যারসহ ক্লাসের সবাই উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। অখিলের কথায় ক্লাসে হাসির রোল পড়লে বিব্রত অখিলের সারল্য কথায় সবাই আবার চুপ হয়ে যায়। অখিল বলে, ‘স্যার, আমি অনেকদূর থেকে ক্লাস করতে আসি। ভোরে ঘুম থেকে উঠে ট্রেন ধরার জন্য আমাকে কয়েক মাইল হেঁটে এসে ট্রেন ধরতে হয়। সকালে খাওয়ার সময় পাই না। প্রতিদিন টিফিন এবং হাত খরচ দেওয়ার সামর্থ্য আমার বাবার নেই। তাই রুটি নিয়ে এসে অফ পিরিয়ডে রুটি খাই।’ অখিলের সরল বক্তব্যে এবং তার পড়ালেখায় আগ্রহ দেখে পুরো ক্লাস স্তব্ধ-হতবাক হয়ে যায়। যারা ওর কথায় হাসাহাসি করছিল তারা লজ্জাবনত তাকায়। স্যার আবেগ সংবরণ করতে না পেরে উঠে কাছে এসে অখিলের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন। আর বলেন, ‘তোমার লেখাপড়া নিয়ে কোন সমস্যা হলে নিঃসংকোচে আমাকে বলবে’। পরে সেই স্যারের ঐকান্তিক চেষ্টায় অখিলের বেতন অর্ধেক মউকুফ করা হয়।

আমাদের দেখে অখিলদার চোখমুখ উচ্ছ্বসিত হয়েই আবার ফ্যাকাসে হয়ে যায়। কিন্তু আমরা বিদেশ-বিভুয়ে গ্রামের একজনকে পেয়ে তাঁকে বুকে টেনে নেই। অখিলদারা ভাল নেই। তাদের শরণার্থী জীবন বড় দুর্বিষহ। অখিলদা মুখ ফুটে এসব কথা না বললেও তাঁর চোখে-মুখে সেই আভাসই ছিল স্পষ্ট।

তার বিষণ্ণতা আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হলো যখন আমরা ক্যাম্পে যেতে যেতে পথের দুপাশে শত শত ঘিঞ্জি তাবু টানানো খুপরি দেখলাম। আর দেখলাম অনাহারে রোগে শোকে ক্ষয়ে যাওয়া অর্ধমৃত মানুষ। সেই পথটুকু পারি দিতে আমাদের নাক চেপে ধরতে হয়েছে। যত্রতত্র মলতাগের কারণে ডায়েরিয়া হাঁটু ঘেরে বসেছে। মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছে শরণার্থী ক্যাম্পে। কি যে অবর্ণনীয় জীবন দেখেছি, না দেখলে সেটা যে কারও বিশ্বাস করা কঠিন।

বিষণ্ণ এবং বিধ্বস্ত মন নিয়ে ক্যাম্পে এসে পৌঁছলাম। তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। আমরা ক্যাম্পে পৌঁছে মুখচেনা একজনের সহযোগিতায় নিজেদের নাম এন্ট্রি করলাম। আমাদের জন্য রাতের খাবার বরাদ্দ হলো দু’মুঠ চিড়া আর আধা মুঠ চিনি। তাই খেয়ে চাপ কলের পানি খেলাম দুই গ্লাস। ক্যাম্পের প্রথম খাওয়া খেয়েই আমরা হতোদ্যম হয়ে গেলাম। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো থানার পাশে ডাকবাংলায়। ডাকবাংলা শুনে ভেতরে ভেতরে উল্লসিত হবেন না। কোন আসভাব ছিল না সেখানে। মেঝে ঝাড়ু দিয়ে লুঙ্গি বিছিয়ে মাথার নিচে ব্যাগ দিয়ে শুয়ে পড়লাম। শোয়া মানে কোনরকম শরীর টান করা। মোমবাতি নেভাতে যতক্ষণ দেরি কানের কাছে রাগ সঙ্গীতের শব্ধ পৌছতে ততো দেরি হলো না। কোটি কোটি মশা ঝাঁকে ঝাঁকে এসে রাগ সঙ্গীত গাইতে গাইতে আমাদের ঘিরে ফেললো। অসহায় আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না আমাদের।