কথা ছিল সূর্য ওঠার আগে আমরা বাড়ি থেকে বেরুবো। আমরা মানে, রফিকুল আলম, গোলাম মোস্তফা, জহুরুল হক খান, আব্দুর রাজ্জাক, সরকার আলী আসগর এবং আমি।
আমাদের পরিকল্পনা ছিল অন্ধকার থাকতে থাকতে লোক জানাজানি হওয়ার আগে আমরা গ্রাম থেকে বেরিয়ে পড়বো। তা হলো না। আমাদের সঙ্গে যারা পরে যুক্ত হওয়ার অঙ্গিকার করেছে তারাই নানাভাবে গড়িমসি করছিল। যেতেও চায় আবার মনে নানা দ্বিধা দ্বন্দ্ব।
আমি ভয় পাচ্ছিলাম আমার মাকে নিয়ে। মা কোনভাবে জেনে গেলে আমার যুদ্ধে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। আমার মা অনেকগুলো সন্তানহারা একজন দুখি মা। আমাকে নিয়েই তাঁর পৃথিবী। সেই আমি মৃত্যুর সামনে বুক পেতে দিতে যাচ্ছি এ কথা জানলে আমার দুখিনি মা কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না। মাথা ঘুরে ঠাস করে পড়ে যাবে। আর না হলে এমন করুণ নাটকীয় দৃশ্যের জন্ম দেবে যা দেখে আমার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সম্ভব হবে না।
এই নিয়ে আমার ভীষণ টেনশন হচ্ছিল। আমি বার বার তাড়া দিচ্ছিলাম। গ্রাম থেকে বেরুতে পারলে যেন আমি হাফ ছেড়ে বাঁচি। অনেক পরে বেরিয়ে এলো বন্ধু আলী আসগর। তার হাতে তেলের শিশি। আসগর মাকে মিথ্যে বলেছে। বলেছে বাজারে যাবে। বাজারে যাবে শুনে আসগরের মা হাতে তেলের শিশি ধরিয়ে দিয়ে বলেছে, ঘরে একফোঁটা কেরসিন তেল নেই। তেল না আনলে রাতে অন্ধকারে ভাত খেতে হবে।
আমরা আমাদের মা-বাবা পরিবার আত্মীয়স্বজনকে অন্ধকারে রেখে আলো আনতে পথে বেরুলাম।
আসগরের মায়ের দেওয়া তেলের শিশি নিয়ে আমরা নানা ধরণের হাস্যরস এবং কৌতুক করতে লাগলাম।
আমাদের প্রাথমিক গন্তব্য কাজিপুর থানার শুভগাছা গ্রামে। সেই গ্রামে বিচিত্র দাশ নামে একজন যুবক আছে। সে আমাদের পরিচিত। বিচিত্র আমাদের গ্রামে মলয় ভৌমিকদের বাড়িতে লজিং থেকে সলপ হাইস্কুলে লেখাপড়া করে।
আমরা শুনেছি শুভগাছা গ্রাম থেকে যমুনা নদী দিয়ে ভারতের মাইনকার চর পর্যন্ত নৌকা যাতায়াত করে। সেইসব নৌকায় গোপনে লোকজন ভারতে যায়। সেই ভরসায় আমাদের শুভগাছা যাত্রা। এর আগে আমরা নানাভাবে চেষ্টা করেছি ভারতে যাওয়ার। কিন্তু নির্দিষ্ট কোন পথের সন্ধান না পেয়ে আমাদের যাত্রা বিলম্বিত হয়েছে। ১৪ এপ্রিল মুজিবনগর প্রবাসি সরকার শপথ নেওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে তরুণসমাজকে আহবান করা হয়। সেই আহবানে সাড়া দিতেই আমরা ভারতে যাওয়ার নিরাপদ রাস্তা খুজছিলাম। কিন্তু কোনভাবেই আমরা সঠিক এবং নিরাপদ রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
একবার আমরা জানতে পারলাম সুবর্ণসারা গ্রামের রফিক নামের একজন ভারতে গিয়ে আবার ফিরে এসেছে। আমরা সেই রফিকের সন্ধানে সুবর্ণসারা গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। স্থানীয় ভাষায় সুবর্ণসারা গ্রামকে মানুষ চেনে এবং ডাকে ‘সবুনসারা’ নামে। আমরা নদী পথে ছোট্ট একটি নৌকা নিয়ে সবুনসারা গ্রামে রওনা হলাম। আমরা নিজেরাই বৈঠা বেয়ে সবুনসারা গ্রামে গিয়ে হাজির হলাম। তখন দুপুর পেরিয়ে গেছে। অনভ্যাস্ত হাতে বৈঠা বাওয়ায় আমরা ক্লান্ত এবং ভীষণ ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লাম।
বিলেরপাড়ে বিরাট বাড়ি রফিক সাহেবের। আমরা তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি শুনে তিনি অনেক পরে আমাদের সামনে আসলেন। আমরা আমাদের উদ্দেশ্যের কথা জানাতেই তিনি সোজাসাপটা বলে উঠলেন, না না, আমি ভারত যাইনি। বলেই তিনি আর আমাদের সময় না দিয়ে সোজা উঠে গেলেন। আমরা এত কষ্ট করে এত পথ পাড়ি দিয়ে তার কাছে গিয়েছি সেসব তিনি কোন মূল্যই দিলেন না। আমরা হতাশ মুখে কিছুক্ষণ বসে থেকে অগত্যা উঠে পরলাম। খুধায় বৈঠা তুলতে পারছিলাম না। তার উপর রফিক সাহেবের চাঁছাছোলা ব্যবহারে আমাদের কষ্ট কয়েকগুণ বেড়ে গেল। আমরা উপায় খুঁজছিলাম। কি করা যায়। কোথায় খাওয়া পাওয়া যাবে। এইসময় আমাদের একজন বলল, এই গ্রামে আমাদের কুদ্দুস ভাইয়ের শশুর বাড়ি। কুদ্দুস ভাই সম্পর্কে আমাদের চাচাতো ভাই। কৃষি দপ্তরে চাকরি করেন। তিনি এই গাঁয়ে বিয়ে করেছেন। আমরা গহীন অন্ধকারে মৃদু আলোর দেখা পেলাম। আশায় বুক বেঁধে আমরা মুহূর্তে খুঁজে বের করে ফেললাম কুদ্দুসভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি। ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে আমরা কুদ্দুসভাইয়ের শশুরবাড়ির লোকজন খুঁজতে লাগলাম। পাওয়া গেল তাদের। আমরা আমাদের পরিচয় দিলাম। তারা আমাদের অবস্থা দেখে বুঝে ফেলেছেন আমরা অভুক্ত। সময়টা এমন দুপুরের খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে। আমাদের ৬ জন মানুষকে খাওয়াতে হলে আবার নতুন করে চুলোয় রান্না চড়াতে হবে।
আত্মীয়দের একজন নিম্ন কণ্ঠে আমাদের ডিঙ্গি থেকে নামতে বললেন। এবং খাওয়ার কথা বললেন। আমরা তাতেই খুশি। নামবো নামবো করছি। সেইসময় আমাদের দলনেতা রফিক মামু আকস্মিক বলে উঠলেন, না না, আমরা খেয়েছি।
এই কথা শোনার পর তারা আর কোন জোরাজুরি করলেন না। একটু পর আমরা ডিঙ্গি ছাড়লাম। বিলের মাঝখানে এসে হাতের বৈঠা ঠাস করে ছুঁড়ে দিয়ে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলো জহুরুল। বললো, এই যে রাখলাম বৈঠা, আপনি একলাই ডোঙা বাইয়া নিয়া যাবেন। আমরা কেউ বৈঠা ধরবো না। ভদ্রতা দেখাইতে কে কইছে আপনারে কি আমার ভদ্রলোক। খুধায় জান বাড়াইয়া যাইতাছে আর উনি ভদ্রতা দেখাচ্ছেন। কি সুন্দর আওয়াজ, না না, আমরা খেয়েছি। জহুরুল কথাগুলো বলছিল ভেংচিয়ে। জহুরুল যেভাবে রফিক মামুকে আক্রমণ করছিল আমরা আর কেউই তাঁকে এভাবে বলতে পারতাম না। তিনি আমাদের সবার সিনিয়র। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। বাকি আমরা সবে কলেজে ঢুকেছি। রফিক মামু সম্পর্কে আমার মামা। আমি ডাকি মামু। অনেক গুণের একজন মানুষ। মেধাবী, মঞ্চের ভাল অভিনেতা, ভাল গান গাইতে পারেন। অসম্ভব ভদ্র একজন মানুষ। জহুরুলের সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক। এই জন্য জহুরুল যা মন চায় বলে যাচ্ছে।
জহুরুল যেভাবে তাঁকে আক্রমণে করেছে জবাবে তিনি কোন কথা বলেননি। অসহায় ভাবে একবার শুধু বলেছেন, আমি দেখলাম তারা একবার বলেছে। আবার বলুক। এই কথায় জহুরুল আরও গর্জে উঠলো, গালমুখে বলল, আপনাকে ভদ্রতা দেখাইতে কইছে কেডা? নামেন নৌকা থেকে। নামেন বলছি।
বিলের অথৈ পানি। কোথায় নামবে? আমি পরিস্থিতি সহজ করতে বললাম, চলো, সামনে কোন দোকান পেলে আমরা মুড়িমুড়কি কিনে খাবো।
আমার এ কথার পর বৈঠা আবার সচল হলো। বিলের পর আমরা খাল দিয়ে একটি গ্রামে ঢুকলাম। গ্রামের নাম সেন-ভাঙ্গাবাড়ি। বিখ্যাত সেন পরিবারের জন্ম এই গ্রামে। তাদের নামানুসারে এই গাঁয়ের নাম সেন ভাঙ্গাবাড়ি। তাদের একজন বিখ্যাত কবি রজনিকান্ত সেন। শুনেছি বিখ্যাত চলচ্চিত্রাভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের পূর্ব পুরুষ এই গ্রামের বাসিন্দা।
এই সময় না চাইতে জল পেয়ে গেলাম। আমরা খাল দিয়ে ডিঙ্গি বেয়ে যাচ্ছি। খালের পাড়ে একটি ছোট্ট দোকান। সেখানে কয়েকজন বসে আড্ডা দিচ্ছিল। তাদের একজন আমার ক্লাসমেট ফজল। আমি ফললকে দেখতে পাইনি। ফজল আমাকে দেখতে পেয়ে বললো, দোস্ত তুমি? এদিকে কোথায় গিয়েছিলে? আমি যেন অকূলে কূল খুঁজে পেলাম। বললাম, দোস্ত কথা পরে হবে। আগে পারলে আমাদের কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করো। খুধায় জান বেরিয়ে যাচ্ছে। ফজল এবং তার সঙ্গিরা আমাদের জন্য ব্যস্ত হয়ে ডিশে অল্প কিছু ভাত আর মুড়ি এনে রাখলো। আমরা গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম। আহ। যেন অমৃত। খাওয়ার পর ফজলকে ধন্যবাদ দিয়ে আমাদের পরিকল্পনার কথা বললাম। এ ব্যাপারে ফজলের তেমন আগ্রহ দেখলাম না। তা যাই হোক, সে আমাদের জীবন বাঁচিয়েছে, তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমরা আবার বৈঠা হাতে তুলে নিলাম।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর এই নদী পথের সন্ধান পেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়েছি। দুপুরে আমরা একটি দোকান থেকে মুড়িমুড়কি কিনে খেয়ে পানি খেলাম পেটপুরে। একটু দম নিয়ে আবার হাঁটা। আমরা যাচ্ছি সিরাজগঞ্জ শহর থেকে অনেক পশ্চিমে গ্রামের রাস্তা দিয়ে। যাতে রাজাকার এবং পাকআর্মির মুখোমুখি হতে না হয়।
খবর নিয়ে জানলাম আমাদের গ্রাম থেকে আমরা মাত্র দশ মাইল পথ এসেছি। শুভগাছা আরও সাত মাইল দূরে।
মুড়িমুড়কি খেয়ে আমরা হৃষ্ট মনে পথ চলছি। মাইল সাতেক যাওয়ার পর আমরা আবার একজন গ্রামবাসীকে জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই, শুভগাছা কতদূর? তিনি হাততুলে এমন সরলভাবে বললেন, এইতো, ভাবখানা যেন আমরা শুভগাছা এসে গেছি।
সূর্য দিগন্তে নেমে যাচ্ছে। আমাদের শরীরে ক্লান্তির ভার চেপে বসতে চাইছে। কিন্তু পথ কিছুতেই ফুরাচ্ছে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। আমরা চিন্তিত হলাম, আমরা ভুল পথে যাচ্ছি নাতো। আবার একজন গ্রামবাসীকে শুভগাছার কথা জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললেন, এইতো সামনে। এবার ওই অঞ্চলের গ্রামবাসীর উপর রাগ ঝারতে ঝারতে আমরা এগিয়ে যেতে থাকি।
এই সময় আমাদের একজন হঠাৎ বলে উঠলো, আচ্ছা, গিয়ে যদি বিচিত্রকে না পাই। তার এই কথায় আমাদের মধ্যে হতাশা চেপে বসে। কথাটা একেবারে ফালতু কথা না। বিচিত্র হিন্দু পরিবারের সন্তান। পাকআর্মি এবং দেশীয় রাজাকাররা হিন্দুদের উপর বেশি নির্যাতন করছে। দলে দলে হিন্দুরা দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। আকাশবাণীর খবরে জানা গেছে প্রায় এক কোটি শরণার্থী দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। সেই হিসেবে বিচিত্রদের পরিবার ভারতে পালিয়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু না। আমরা সবাই উচ্চস্বরে আল্লাহকে ডেকে বিচিত্রকে পাওয়ার জন্য দোয়া করছি আর পথ চলছি।
বিচিত্রকে না পেলে কি করবো আমরা? এই পথ ফেরা কি চাট্টিখানি কথা? ফিরবো বা কোন মুখে? যুদ্ধে এসে খালি হাতে ফিরে যাব? আমরা সমস্ত অনিশ্চয়তা দুপায়ে মারিয়ে এগিয়ে যেতে থাকি।
প্রায় চল্লিশ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে রাত ১১ টা নাগাদ আমরা শুভগাছা পৌঁছলাম। ততোক্ষণে আমরা আর আমরা নেই। শরীর ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু আনন্দের সংবাদ হলো বিচিত্রকে পাওয়া গেছে। সেই আনন্দে আমরা সমস্ত ক্লান্তি ভুলে গেলাম।
বিচিত্র আমাদের জন্য খাওয়ার আয়োজন করতে লাগলো। আমরা যে যেখানে বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছি সেখানেই গা ছেড়ে দিয়েছি। একটু পর দেখা গেল আমাদের কেউ জেগে নেই। কেউ খড়ের গাদায় হেলান দিয়ে কেউ বেঞ্চিতে কেউ দুব্বায় হাত পা ছেড়ে অঘোরে ঘুমুচ্ছে।