দুনিয়ায় চোখ মেলে চারপাশে দেখেছি তিনগাও পাঁচগাও আর সাতগাও। তার মাঝে পাঁচগাও আমার অস্তিত্বে নানামুখী ডাল-পালা ছড়িয়েছে। কয় গাঁও নিয়ে পাঁচগাও? কখনো তা ভাবিনি।
পাঁচগাওয়ের একটি পরিবারে আমার মায়ের জন্ম। বিয়ের পরও বহুদিন তিনি সে পরিবারে প্রতি মাসে নাইয়র যেতেন। আমি ছিলাম সেই নাইয়রের সঙ্গী। আমার চোখ খোলা আর বোল ফোটার সাক্ষী সেই পাঁচগাও।
পাঁচগাওয়ের দুই পাশে মানেহর ও কামরাঙির চর। এই দুই গ্রামের দুই প্রাইমারীতেও এক-দুই নামতা পড়েছি। মানেহরের প্রাইমারীতে টিনের ঘর ছিলো। কামরাঙির চর বাজারের দক্ষিণ পাশে বিরাট এক গাছের নিচে টুলে বসে শ্লেটে পেন্সিল ঘষেছি। কলাপাতায় বাঁশের কঞ্চি দিয়ে আঁকাজোঁকা করার কথাও মনে পড়ে।
সেই আমি বাজবী প্রাইমারী স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষা দেই। হেড মাস্টার ইসমাইল পন্ডিত আমার কাছে ছিলেন দরবেশ। তিনি আর আমার দাদা মৌলবী আযীমউদ্দীন আমাকে মুড়াপাড়া হাই স্কুলে পরীক্ষার কেন্দ্রে নিয়ে যান।
পরীক্ষার শেষ দিনের বিকালে স্কুলে এলেন একজন সুন্দর মানুষ। পরণে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী। মাথায় টুপী। তিনি গুলবখশ ভূইয়া। পরীক্ষার্থীদেরকে তিনি একটা নতুন জিনিস দেখাতে চান।
মুড়াপাড়ায় মিল হচ্ছে। মেশিন-পত্র বসেছে। ঘুরে ঘুরে দেখলাম। কিছু বুঝলাম না। সেখানে একটি বড় চুম্বকের কাছে পেরেক হাতে দাঁড়ালাম। চুম্বকটি আমার পেরেক টেনে নিলো। এতেই মজা পেলাম।
গোলবখশ ভূইয়া আমাদেরকে মিলের মাঠে দাঁড় করালেন। তিনি দেশে মিল চালু করার গুরুত্ব বোঝালেন। বললেন: তোমাদেরকে এই মিল দেখাতে এনেছি। যেনো তোমরা দেশ গড়ার বড় স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে ওঠো!
ক্লাস সিক্সে ভর্তি হই ধূপতারা সেন্ট্রাল করোনেশন হাইস্কুলে। কিছু দিন যেতেই ইংরেজীর শিক্ষক সামাদ খান স্যার একদিন ক্লাসে এসে আমাকে ক্লাস ক্যাপ্টেন ঘোষণা করেন।
পরেশ বাবু, ফয়েজ স্যার, সামাদ খান, সোম বাবু, নযীর স্যার, নূরু মৌলভী স্যারদের আদরে-শাসনে সে স্কুলে আবেগ ছড়ানো সকাল-দুপুর-সাঁঝ কাটাই। নাটক, আবৃত্তি আর খেলার মাঠের আন্তস্কুল প্রতিযোগিতায় ধূপতারা স্কুলের সুনাম ছিল।
আমিনুল, জয়নুল, দাউদ, হুমায়ুন, বাসুদেব, শীতল, নির্মল, সোবহান, রশীদ, মনসুর, কাদির, সুধীর, বিনয়, ইসমাইল, ফযলু, আখতার, দেওয়ান আলী, আলমাছ, আহমদ, শংকর– আরো বন্ধুদের নিয়ে সব কিছু চলছিলো ঠিকঠাক। চৌষট্টির দাঙ্গার সময় বড় একটা ধাক্কা খাই। কিছু বন্ধু দেশের সীমানা ছাড়িয়ে চলে যায় ভারতে। কেউ কেউ পরে ফিরে আসে। তবে স্কুল চত্বরে আগের মতো তাদের সাথে আর দেখা হয়নি। অন্য বন্ধুরা ছিল। আগের মতোই নিভারনের বিখ্যাত সন্দেশ ছিল। ছিল স্কুলের অবারিত খেলার মাঠ।
ঊনিশ শো পঁয়ষট্টি সালে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় আমি স্কুল ক্যাপ্টেন। তখন হেড মাস্টারকে নিয়ে ধূপতারা স্কুলে গোলযোগ দেখা দেয়। দীর্ঘ দিনের পুরনো ত্যাগী শিক্ষক পরেশ বাবু। কিন্তু কী-সব নিয়ে এলোমেলো অবস্থা। সবটা বোঝার সাধ্য ছিল না। লেখাপড়া ঝামেলামুক্ত রাখতে বছরের মাঝখানে জুলাই মাসে মুরব্বীরা আমাকে নিয়ে ভর্তি করান পাঁচগাও হাইস্কুলে।
পাঁচগাও-এর পরিবেশ আমার জন্য পুরা নতুন ছিল না। কিন্তু স্কুল তো নতুনই। ধূপতারা স্কুলের পরিচিত বন্ধুরা কাছে নেই। তবে অল্প ক’দিনেই পাঁচগাও স্কুল আদরের আঁচল পেতে দেয়। মামুন, নাসির, মান্নাফ, আঙুর, মুনিব, বাহাউদ্দীন, অশ্রু, কাইজার, কবির, আবদুল মাবুদ, শাহাবুদ্দীন, মোরশেদ, খোরশেদ, নসু, হীরালাল, সুবোধ, সৈয়দুর, রেনু, বেবি, হোসনেআরা, সানাউল্লাহ, হাবিব, মুজাফ্ফর। কত নতুন বন্ধু জুটলো।
পাঁচগাও হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক নৃপেন দত্ত স্যার। তিনি ধূপতারা স্কুলের হেডমাস্টার পরেশচন্দ্র দাসগুপ্তের ছাত্র। পরেশ বাবুর মতো ফর্সা নধরকান্তি তিনি ছিলেন না। কিমাম দেয়া পানও খেতেন না। তবে প্রথম দিনের পরিচয়েই বুঝেছি এই হেড স্যারও পরেশ বাবুর মতো কড়া মানুষ। চোয়ালের সুদৃঢ় গড়ন। সোজা তাকাতে ভয় লাগে। স্কুলের পুরো পরিবেশে সেই ব্যক্তিত্বের একটা ছাপ লেগে ছিলো।
স্কুলের ক’জন শিক্ষকের কথা বেশী মনে পড়ে। মোহাম্মদ মোফসেন স্যার বাংলা পড়াতেন। একবার দৈনিক পাকিস্তানে তার একটি গল্প ছাপা হয়। তিনি পত্রিকার কপি হাতে ক্লাসে এলেন। ছাপার হরফে সংবাদপত্রের পাতায় আমার পরিচিত কারো নাম এই প্রথম দেখলাম।
কিছুদিন পর তিনি ডাঙ্গা হাইস্কুলে চলে যান। এরপর বাংলার শিক্ষক ছিলেন মিয়া মোহাম্মদ মহব্বতউল্লাহ। তার ক্লাসও আমার কাছে আকর্ষণীয় ছিলো।
অংকের ক্লাস নিতেন সুধীরচন্দ্র মন্ডল স্যার। খিদিরকান্দী থেকে সুধীর বাবু ধুতির কোঁচার একাংশ ফতুয়ার পকেটে গুঁজে পায়ে হেঁটে আসতেন। গোলগাল চেহারা। হাসি-হাসি মুখ। কিন্তু অংকের স্যার বলে কথা! তাকে ভয় না পেয়ে উপায় আছে!
এসএসসি পরীক্ষার আগে সুধীর স্যারের বাড়িতে ক’দিন অংক করতে গিয়েছি। আমার সাথে মানেহরের আবদুল মাবুদ ও পাটিতা পাড়ার হীরালালসহ আরো ক’জন।
তখন খিদিরকান্দীর কাছে রংপুর বাজারে ‘আলোমতি’ যাত্রা দল আসে। চার দিকে হৈ হৈ। আমাদের ভেতরও চাপা উত্তেজনা। কিন্তু নানীর কড়া শাসনে রাতে বাড়ি থেকে বেরোনোর অনুমতি নেই। আবদুল মাবুদদের মৌলবী বাড়ি। সেখানে আরো বেশী কড়াকড়ি।
শেষে আমিই স্যারকে শখের কঠিন আবদারের কথাটা বললাম। কড়া অংকের স্যার সহজে রাযী হলেন। ব্যবস্থাও করলেন। পরীক্ষা খুব কাছে। দু’এক বেলা রাতেও অংক শেখা দরকার। তাই এক সন্ধ্যায় স্যারের বাড়ি হাজির হলাম।
স্যার অংক করালেন। নাড়ু-মুড়ি নাশতা করালেন। শেষে সাথে করে রংপুর বাজারে যাত্রা দেখতে নিয়ে গেলেন। পরের সকালে ফের অংকের পাঠ নিয়ে মামা বাড়ি ফিরলাম।
পাঁচগাও হাইস্কুলের সারাটা অবয়ব জুড়ে ছিলো দু’জন মানুষের বিশেষ প্রভাব। একজন ফজলে রাব্বি খন্দকার। অন্যজন ফিরোজ মাস্টার। খন্দকার ফজলে রাব্বি বাইরের পরিচয়ে স্কুলের কেরানী। কিন্তু প্রতিষ্ঠাকাল থেকে তিনি ছিলেন স্কুলের মধ্যমণি।
১৯৪৩ সালে এই স্কুল চালু হয় পাঁচগাও এমই স্কুল নামে। তখন তিনি ছিলেন স্কুল কমিটির সেক্রেটারী। শেরে বাংলা ফজলুল হকের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী মানেহর গ্রামের তফাজ্জল হোসেন আমান সাহেব কমিটির সভাপতি। তিনি ঊনিশশ চুয়ান্ন সালের নির্বাচনে শেরে বাঙলার কৃষক শ্রমিক পার্টির টিকেটে এম এল নির্বাচিত হন।
ফিরোজ স্যারও স্কুলের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই যুক্ত ছিলেন। ফজলে রাব্বি খন্দকার কিংবা ফিরোজ স্যার আমার ক্লাসে কখনো আসেননি। তবে তাদের অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্বের প্রভাব ছিল সকলের মাঝে! তাদেরকে শিক্ষক-জ্ঞানে সম্মান করতাম।
পাঁচগাও হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার মাস দুই পর সেপ্টেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়। তখন ফজলে রাব্বি খন্দকার ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে স্কুল-মাঠে সভা করেন। তাতে অন্যান্যের মাঝে আমাদের ক্লাসের আতাউর রহমান খান আঙুর ও খন্দকার মাজহারুল হক কাইজারও বক্তৃতা করে। আমারও ইচ্ছা হয় কিছু বলি। কিন্তু তখন আমি স্কুলে একেবারে আনকোড়া। সে ইচ্ছাটা প্রকাশ করা হয়নি।
মাত্র পৌণে দু’বছর পাঁচগাও হাইস্কুলে পড়েছি! তবু পাঁচগাওয়ের কথা ওঠলেই জীবনের অতি উজ্জ্বল স্মৃতিরা ভেতর থেকে ডানা ঝাপটায়।
পাঁচগাওয়ের বন্ধুদের কারো সাথে নিয়মিত আর কারো সাথে মাঝে-মধ্যে যোগাযোগ হয়। কারো সাথে কখনো জীবনের কোনো চৌরাস্তায় হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। আমরা তখন হয়ে যাই সেই ‘তখনকার’ আমরা। আমাদের সেই নানা রঙের দিনগুলি!
এখন সেই আমাদের নানা বর্ণের ঘর-সংসার। স্ত্রী-সন্তান-নাতি-নাতকুরের ভীড়ে কখনো পুরনো বন্ধুদের কাছে পেয়ে শরীর থেকে হঠাৎ বয়স ঝরে যায়।দায়িত্বের ভার-ভারিক্কি ঝেড়ে মুছে চপল বালক হয়ে যাই।
এখনো অপেক্ষায় থাকি, নাসির একটা কড়া গালি দিয়ে গলা ছেড়ে ডাকবে: ঘরের ভেতর কী করতাছস? নাম্ জল্দি! কিংবা মামুন এসে দরজায় বেল টিপতেই মেয়ে চীৎকার করবে: আব্বু, তোমার ‘তুই বন্ধু’ এসেছে!
পাঁচগাও স্কুল-মাঠের সেই সবুজ দুর্বা ঘাস এখনো হৃদয়ে আদর বুলায়। স্কুলের দক্ষিণ-পুব কোণের সেই টিউবওয়েলটি কি এখনো আগের মতোই আছে! তৃষ্ণা নিয়ে কিংবা এমনিতেই কতোদিন গেছি সে নলকূপের কাছে।
আর কামরাঙির চর বাজারের সেই চায়ের দোকান ও মুদিখানা! দুপুরে টিফিনের সময় কিংবা খিতিশ স্যারের ক্লাস পালানো বিকালে কতদিন গিয়ে বন্ধুদের নিয়ে উকিল নানার চা-দোকানে দুধের সর খেয়েছি।
সে-সবকিছু কি আগের মতো আছে? মানেহরের গুবাক তরুর সারি! কী করে ভুলি সে-সব!
পাঁচগাও স্কুলের স্মৃতির পরাগ আজও হৃদয়ে বয়ে বেড়াই। এই স্কুল থেকে ১৯৬৭ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থী মনোনীত হই পঁয়ত্রিশ জন। প্রথম দিনে মনোনীত চার জনের তালিকায় আমার নাম ছিলো। এরপর ক’দিন ধরে সে অংক বড় হতে থাকে। এটা ছিলো হেড স্যারের কৌশল।
স্কুল থেকে বিদায়ের অল্প ক’দিন আগে মৌলভী আফজাল হোসেন স্যার আমাদেরকে একটি দোয়া লিখিয়ে দেন। পরীক্ষার আগে অন্তত এক হাজার বার দোয়াটি পড়তে বলেন। আমরা পড়তে থাকি: ‘বিসমিল্লাহি ইয়া ইলাহাল আলামিন। ইয়া খায়রান নাসেরিন। নাসরুম মিনাল্লাহে ওয়া ফাতহুন কারীব। ওয়া বাশশীরিল মু’মিনীন। আল্লাহু খাইরুল হাফেযিন। হাসবুনাল্লাহু নিয়ামাল ওয়াকিল। নিয়ামাল মাওলা ওয়া নিয়ামান নাসির। ওয়া মাইয়্যা তাওয়াক্কাল আলাল্লাহু ফা-হুয়া হাসবুহু আল্লাহুল মুসতায়ানা আলা মা-তাসিফুন।’
তিলাবো গ্রাম থেকে প্রতিদিন ক’মাইল পায়ে হেঁটে স্কুলে আসতেন মৌলভী স্যার। তার সাথে আর আমার দেখা হয়নি। কিন্তু তার শেখানো সেই দোয়া এখনো ভয়ে-বিপদে, জীবনের নানা পরীক্ষায় উচ্চারণ করি। আর ফিরে তাকাই পাঁচগাও হাইস্কুলের দিকে।
সেই সব কল্যানকামি মুখ। যাদের কাছে জীবনের পাঠ নিয়েছি। যারা আমাদের জন্য স্বাধীন বিচরণের জন্য বড় মাঠ তৈরি করেছেন। যারা মুক্ত আকাশে উড়াল দেয়ার সাহস ও স্বপ্ন তৈরি করে দিয়েছেন।
পাঁচগাওয়ের বন্ধুদের কী ভোলা যায়? মামাবাড়ির কাছের স্কুল। নাসিরকে তাই ‘মামা’ ডাকতাম। তেজী ঘোড়ার মতো চঞ্চল নাসির জীবনে কোথাও কোন জায়গায় স্থীর দাঁড়ায়নি। ধূপতারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হলো। উনিশশো একানব্বই সালে আঙুরের সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে তারা দু’জন এলো। বললাম, আমি নির্বাচনের সময় এলাকায় যাব না। সে কিংবা আঙুর কেউই কিছু মনে করেনি।
এরপর এক সময় নাসির আমেরিকা চলে যায়। দেশে ফিরলে কখনো ছিপ হাতে শীতলক্ষায় মাছ ধরতে যেতো। বাসায় এসে পাড়া মাতাতো।
এক ঈদে এলো। অনেক গাল মন্দ করলো। ‘শালারা তোমরা মজা করে ঈদ করছো আর সৈয়দুর পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে সাইদাবাদে শুয়ে আছে!’
ওর ধাক্কায় ঘর থেকে বের হলাম। পরীবাগের বাসা থেকে রামপুরা গিয়ে আঙুরকে সাথে নিয়ে মামুনের গুলশানের বাসায় গেলাম। সেখান থেকে রাতে গেলাম সৈয়দুরের বাসায়। বড় মেয়েটি কাছে এলো। বললাম: মা আমরা তোমার চাচা। তোমাদের পাশে আছি!
সেই ঈদ আমার জন্য অন্য রকম আনন্দের হয় নাসিরের কারণে।
নাসির নিজেই আমেরিকা থেকে ফিরলো পক্ষাঘাত নিয়ে। এ অবস্থায় নাসিরের মেয়ের বিয়ে হয়। সেই বিয়েতে পাঁচগাও হাইস্কুলের পুরনো বন্ধুরা অনেকে জড়ো হই। বহু বছর পর নূরজাহানসহ আরো ক’জনের সাথে দেখা হলো।
নাসির এখন আর ডাকতে আসে না। তবু অনবরত তার ডাক শুনি, ‘কী-রে, কী করতাছস?’
স্কুলে আমাকে বেশী জ্বালিয়েছে খন্দকার বদরুল হাসান মামুন। আমার অর্থনীতির ক্লাসের সময় মামুন সুধীর বাবুর কাছে ইলেক্টিভ ম্যাথ পড়তো। কখনো সে একা ছাত্র। ক্লাস ছিলো অনিয়মিত। মামুনের পাল্লায় পড়ে তখন নরম মেজাজের খিতিশ স্যারের ক্লাস থেকে কতদিন ‘ছুটি’ নিয়েছি।
এই মামুনটা বাইরে খুব শান্তশিষ্ট। কিন্তু ভেতরে দারুণ দুষ্ট। ওদের পাল্লায় পড়ে এসএসসি পরীক্ষার এক পূর্ব-রাতে নারায়নগঞ্জের আমলাপাড়ায় নাটক দেখে ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন পরীক্ষার দেরীতে হলে যাই।
সেই মামুন এখনো আমার পিছু ছাড়েনি। জীবনে যখন যেখানে গেছি, যেখানে থেকেছি, ঢাকার কমলাপুর, নারিন্দা, ওয়ারি, গ্রীণরোড, পরিবাগ কিংবা ইরান-তুরাণ-সৌদি আরব– সবখানে মামুনের স্মৃতি আমাকে তাড়া করেছে।
ঢাকায় এসে লজিং-এ উঠেছিলাম কমলাপুরের কাছে মান্ডায়। সেখানে জায়গীরের ব্যবস্থা করি আবদুল মাবুদের জন্য। আমরা দু’জন ওয়াপদায় চাকুরীর দরখাস্ত করি। আবদুল মাবুদ ইন্টারভিউ কার্ড পায়। চাকুরী হয়।
আমার কার্ড পৌঁছে ইন্টাভিউর পর। এই পরীক্ষার জন্য টাইপিং-এর স্পীড বাড়াতে বশিরউদ্দীন কমার্শিয়াল কলেজে ক’দিন খুব খেটেছিলাম। মনটা বেজায় খারাপ হয়।
আবদুল মাবুদ ক’বছর পর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চাকুরী ছেড়ে চলে যায় কুয়েত। ফিরে এসে এখন নরসিংদী জেলার ব্রাহ্মণদিতে ঘর-সংসার করছে। কখনো হঠাৎ ধূমকেতুর মতো উদয় হতো।
বাহাউদ্দীন বরাবরের মেধাবী সুবোধ ছেলে। মামুনের মতো সেও ইঞ্জিনীয়ার। মামুন মেকানিক্যাল আর কাজী বাহাউদ্দীন ইলেট্রিক্যাল। মামুন সৌদি আরব গিয়েছিল সাতাত্তরে। কিছুদিন পর ফিরে আসে। বাহাউদ্দীনও এক সময় পাড়ি দেয় সৌদি আরব।
ব্যাংকের কাজ নিয়ে ঊনিশ শো পঁচানব্বুই সালে আমিও সৌদি আরব যাই। ছয়টি উপসাগরীয় দেশে ঘুরে বেড়াই। একবার রিয়াদ থেকে হাজার মাইল দূরে আল-জউফ সফর করি। তখন দুমাতুল জন্দল থেকে সাকাকার পথে বাহাউদ্দীনের বাসায় যাই। বাহাউদ্দীন বাসায় নেই। হাসপাতালে ভর্তি।
নিঃসন্তানভাবী বললেন: ‘আপনি জউফ আসবেন জেনে বাহাউদ্দীন বাগান পরিষ্কার করেছে। ঘরের আসবাবপত্র ও কার্পেট পাল্টেছে। নতুন একটা গাড়িও অর্ডার করেছে। ইচ্ছা ছিলো জউফের প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিয়ে তার বন্ধুকে সম্বর্ধনা দেবে। কিন্তু আল-খাফজি থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে সে এখন হাসপাতালে।’
চোখে পানি এলো। আমি বাহাউদ্দীনকে হাসপাতালে দেখতে যাই।
পাঁচগাও স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে স্মৃতির ডালা খুললে বন্ধ হবার নয়। পুরিন্দার হাবিবুর রহমান কবির। কবিতা লিখতো। সৈয়দুর একবার তাকে নিয়ে ব্লাকবোর্ডে লিখলো: ‘আমাদের স্কুলে কবির নামে কবির আবির্ভাব’।
সেই কবিরকে প্রথম দেখি পুরিন্দায়। আমি তখন সবে ধূপতারা স্কুলে সিক্সে ভর্তি হয়েছি। খন্দকার সাদেকুর রহমানের দাওয়াতে প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী এস এম আমজাদ হোসেন ও রাজস্ব মন্ত্রী আবদুস সালাম পুরিন্দা প্রাইমারী স্কুলে আসেন।
স্কুল মাঠে সভা। মন্ত্রী দেখতে ধূপতারা স্কুল থেকে আমরা ক’বন্ধু পুরিন্দা যাই। সেখানে আমার বয়সি একটি ছেলে বক্তৃতা করে তাক লাগিয়ে দেয়। শিক্ষামন্ত্রী তাকে একশো টাকা আর রাজস্ব মন্ত্রী পঞ্চাশ টাকা পুরষ্কার দেন।
আমার মনে হচ্ছিল, ওর জায়গায় যদি আমি হতে পারতাম! সেই কবির পাঁচগাও হাইস্কুলে আমার সহপাঠি। কবিতা শুনাতে কখনো আমার সাথে একান্তে বসে।
কবিরের সবচে কাছের বন্ধু ছিলো সানাউল্লাহ। ষাটের দশকের আলী ইমাম, শাহাদাত বুলবুলদের সাথে সানাউল্লাহ কণক নামে ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার পরিচিতি হয়।
জাতীয় সঞ্চয় বিভাগের চাকুরীর পাশাপাশি কণক সাহিত্য চর্চা জারি রেখেছে। কিন্তু কবির পুরিন্দা স্কুলের শিক্ষক হিসাবে জীবন পার করে দিল।
কবিরের সাথে শেষ দেখা খিদিরকান্দীর আমাদের আরেক সহপাঠি খুরশিদের মেয়ের বিয়েতে। তখন আমরা আবার বিয়ে বাড়ির সমারোহে এড়িয়ে একান্তে কিছু সময় কাটাই।
আমার এক ক্লাস উপরে পড়তেন মতিউর রহমান ভূইয়া। মতিউর রহমান গোপিন্দি নামে কবিতা লিখতেন। পাঁচগাও হাইস্কুল থেকে বের হয়ে তিনি শেখ বোরহানউদ্দীন কলেজে ভর্তি হন।
আমি এক বছর পর সেই একই কলেজে ভর্তি হই। তখন তিনি কলেজের সাহিত্য সম্পাদক। পরের বছর আমি সে কলেজের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হই।
আমাদের স্কুলের মতি ভাই গবেষণা ও সাহিত্য চর্চায় ‘অনুপম হায়াত’ নামে বিখ্যাত হয়েছেন। তার সাথে সৌহার্দের একটা চমৎকার সম্পর্ক পাঁচগাও থেকেই তৈরি হয়।
আমাদের দুয়েক ক্লাস নিচে পড়তো আবুল কাসেম ফজলুল হক। ফজলুল কাসেম নামে পরিচিত এই গল্পকারের সাথেও পাঁচগাও স্কুলেই ঘনিষ্টতা তৈরি হয়।
পাঁচগাও স্কুলের প্রসঙ্গ আসলেই স্মৃতির পাতায় ভাসে একের পর এক ছবির মিছিল। সে মিছিলে কতো হীরন্ময় মুখ! সে সব নিয়ে বড় জায়গা জুড়ে আলোচনা হতেই পারে!
এই জীবনে কত ছন্দ বদল হয়েছে। এক ডাল থেকে আরেক ডালে ঘুরেছি। কতো ঠিকানা বদল করেছি। কতো স্মৃতি মুছে গেছে। কিন্তু পাঁচগাও হাই স্কুল! সে স্মৃতি এক সাগর পানি দিয়েও ধুয়ে ফেলা যাবে না।
একাশি সালে আমি একটি দৈনিক সংবাদপত্রের চীফ রিপোর্টার। এক সন্ধ্যায় ফরিদ সাহেব এলেন। তিনি সরকারের তথ্য দফতরের কর্মকর্তা। বললেন, পাঁচগাও হাইস্কুলে প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার যাবেন। কাউকে এসাইনমেন্ট দিলে ভালো হয়। বললাম: এ-তো আমার স্কুল! এ অনুষ্ঠান ‘কভার’ করতে আমিই যাবো!
সেই অনুষ্ঠানের আয়োজনে স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কে এম সাদেকুর রহমানের ছেলে কে এম মাহমুদুর রহমানসহ অনেকে ছিলেন। আমার ভেতর তখন অন্য তোলপাড়! মনে পড়ে, ধূপতারা স্কুলের মাঠে একবার কবি জসীমউদ্দীন এসেছিলেন। তখন আমার আনন্দ ছিলো প্রাইমারী স্কুলের এক ক্ষুদে বালক হিসাবে। পাঁচগাও হাইস্কুলে দেশের প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠানে যোগ দেই সাংবাদিক হিসেবে। কিন্তু ভেতরে তখনো এক ক্ষুদে বালকের আবেগ।
উনিশশো নব্বই থেকে পচাঁনব্বই পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের মৌচাক শাখার ব্যবস্থাপক ছিলাম। সে সময় একদিন এক প্রবীণ এলেন। কথায় কথায় জানলাম, তার ঠিকানা রাজারবাগের ‘পাঁচগাও হাউস’।
ঢাকা শহরে ‘পাঁচগাও হাউস’ একটিই। এই হাউসের মালিক দীন মুহাম্মদ ভূইয়া পাঁচগাও হাইস্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। পাঁচগাও হাইস্কুল ঘিরে তার হৃদয়জুড়ে প্রচন্ড আবেগ। প্রবীণের সেই আবেগের সাথে নবীনের ভালোবাসা মিশে চমৎকার ভাব জমে ওঠে।
তিনি মাঝে-মধ্যেই আমাকে মৌচাকে দেখতে আসতেন। কাজ ছাড়াও আসতেন। কখনো আদর করে বাসায় নিয়ে আপ্যায়ন করেছেন। একবার আমেরিকা ঘুরে এসে আমাকে ‘ওয়াটারম্যান’ কলম উপহার দিলেন। প্রবাসী ছেলে দেশে এলে তাকে এনে পরিচয় করান।
একদিন বাসা থেকে ভাঙা কাঁপা গলায় ফোন করেন। দিনের শেষে ‘পাঁচগাও হাউস’-এ যাই। তিনি বিছানা থেকে দুর্বল হাত বাড়িয়ে দেন। আমি তার আদর গায়ে মাখি। এর কিছুদিন পর তিনি ইনতেকাল করেন।
দীন মুহাম্মদ ভূইয়ার কাছে পাঁচগাও হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার অনেক গল্প শুনেছি। সে গল্পের সাথে মিল ছিলো আরেক জনের কাহিনীর।
আশির দশকে ফজলে রাব্বি খন্দকার মাঝে-মধ্যে নারিন্দা মনির হোসেন লেনে তার ছেলে খন্দকার মুনাজেরের বাসায় উঠতেন। তখন আমাদের বাসাও ছিলো কাছেই শরৎগুপ্ত লেনে। তখন খন্দকার সাহেবের সাথে কথা হতো। পাঁচগাও স্কুল সম্পর্কে তার কাছ থেকে তখন কিছু তথ্য টুকে নেই। তিনি বলছিলেন স্কুল কীভাবে হলো সেই গল্প।
ধূপতারা হাইস্কুলের কথাও ওঠে। এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১২ সালে। বৃটিশ রাজার কেন্দ্রীয় রাজ্যাভিষেক উপলক্ষে ১৯১১ সালে দিল্লীতে দরবার বসে। সেই দরবারে ঢাকা কেন্দ্রিক পূর্ব বাঙলা ও আসাম প্রদেশ রদ হয়। পূর্ব বাঙলার কৃষকদের জমির অধিকার ফিরে পাবার স্বপ্ন টুটে যায়। আর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারী রক্ষার খুশিতে ধূপতারার জমিদাররা বৃটিশ রাজার দিল্লী দরবার অনুষ্ঠাস্নের স্মৃতি রক্ষার জন্য ‘সেন্ট্রাল করোনেশন’ বা কেন্দ্রীয় রাজ্যাভিষেক হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
পাঁচগাও হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার গল্প আলাদা। এই স্কুলের জন্ম হয় এলাকার কৃষক-প্রজা জনসাধারণের উদ্যোগে। পাঁচগাও স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য একটি লিফলেট ছেপে হাট-বাজারে বিতরণ করা হয়। সেই লিফলেটে তখনকার দিনের কাঠের ব্লক করে শেরে বাঙলা ফজলুল হকের স্বাক্ষর মুদ্রিত ছিলো।
পাঁচগাও হাই স্কুল গ্রামে-গ্রামে কতো কৃষকের ঘরে শিক্ষার আলো জ্বেলেছে। কত আলোকিত মানুষ সৃষ্টি করেছে। শিক্ষিত মানুষের গ্রাম হিসেবে পাঁচগাও-এর পরিচয় তো পাঁচগাও হাইস্কুলের কারণে।
জাতির উন্নয়নে বড় বড় মিল-কারখানা গুরুত্বপূর্ণ। তার চাইতে একটি ছোট পাঠশালার ভূমিকা বড়।
পাঁচগাও হাইস্কুলের মতো স্কুলগুলির আলো ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশের নানা জায়গায়! এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাগণ কতো বড় কাজ করেছেন! সে দানের সুফল জারি থাকবে অনন্তকাল। কবরে বসেও এই কল্যাণ বৃক্ষের অমৃত- ফল তারা ভোগ করবেন।

(পাঁচগাও হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার তিয়াত্তর বছর পর ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম পুনর্মিলনী। সে উপলক্ষে স্মারক সম্পাদনার দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। সে স্মারকের এ লেখাটি এখানে সামান্য পরিবর্তন করে ‘আপনি’ বন্ধুদের সাথে শেয়ার করেছি।)