প্রাক-কথন :
একুশ শতকের প্রথম দিকে, ২০০২ সালে, প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হলেও আবির্ভাব ও চর্চার দিক থেকে আমিনুল ইসলাম (জন্ম : চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ২৯ ডিসেম্বর ১৯৬৩) আশির দশকের কবি। যদিও সমকালীন সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্ব-পরিপ্রেক্ষিত তাঁর কবিতায় দারুণভাবে উপস্থিত, তবু তাঁকে ঐতিহ্য-সন্ধানি এবং নস্টালজিক কবি বলা চলে। অবশ্য আপন বিবরে পরিভ্রমণের মধ্য দিয়ে তিনি হাজির হয়েছেন বিশ্ব-নাগরিক-সভায়। ব্যক্তি, স্থান, প্রতিষ্ঠান, প্রকৃতি তাঁর কবিতায় ধরা দেয় ইতিহাসের আলোয় আর ঐতিহ্যের ডানায় ভর করে। তিনি বর্ণনার ভেতর দিয়ে যেন তুলে ধরেন এমন এক অপরূপ মালা যেখানে গাঁথা থাকে জীবনের বর্ণিল সব পর্ব। কবি আমিনুলের কবিতা-কথনে এক ধরনের সরল আনন্দ-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা মিশে আছে যেন। শিল্পের আনন্দ তিনি পাঠকের সামনে হাজির করেন নিজস্ব কায়দায়। এক ধরনের ঘরোয়া কিন্তু ফরমাল; এক ধরনের সরলতায় মাখা কিন্তু শিল্পের কঠিন মারপ্যাঁচ থেকে দূরে নয়- এমন এক শিল্পসভার উপস্থাপক ও নির্দেশক হয়ে ওঠেন কবি আমিনুল কখনো কখনো। তাঁর কবিতা বুঝে নিতে হয় আবেগ আর ভালাবাসার আন্তরিক পাঠে।

২. স্বপ্নময় স্মৃতিঘেরা আটেপৌরে জীবন :
তন্ত্র থেকে দূরে (ঢাকা, শ্রাবণ প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি ২০০২) আমিনুল ইসলামের প্রথম কবিতাগ্রন্থ।মূল্যবোধের অবক্ষয়ে দেশ ও জাতি যে বিপন্ন, তা তুলে ধরতে চেয়েছেন কবি এই কাব্যে। আর কবি যেন এই পরিস্থিতিতে অক্ষম নাগরিক। ‘অক্ষম উচ্চারণ’ শিরোনামে বইটির প্রথম কবিতায় তিনি লেখেন- ‘পতনের হাত ধরে প্রলোভের গোপন শকটে/ বিপ্লবীরা চলে যায় পুঁজিবাড়ি ভোগের বাগানে।’বাংলাদেশের প্রাচীন নগরী-সভ্যতা ও ঐতিহ্য, প্রেমে ব্যর্থ মানুষের বিপন্ন আচ্ছন্নতা, পরিজন-পরিবৃত আটপৌরে সংসার জীবন, মধ্যবিত্তীয় অভিমান, নারী-বন্দনা, শৈশবস্মৃতি, রাষ্ট্রভাবনা, অবিরাম আশা, নিসর্গপ্রীতি গ্রন্থটির উপাদান ও কাঠামো। আমিনুল ‘তামাদি প্রেমের দাবি’ নিয়ে ঘুরে বেড়ান ‘জলে ও ডাঙায়’; দার্শনিক-প্রশ্ন উত্থাপন করেন- ‘কোন্ দিকে যেতে পারি আমি?’

ঐতিহ্যের পানাম নগরী ও জামদানি, মানুষের বিপন্ন আচ্ছন্নতা, হৃদয়-বিষয়ক ঝামেলা, পরিজন-সংসার আটকেপড়া জীবন, দূর থেকে দেখাকোনো নারীর অস্পষ্ট আহ্বান, মধ্যবিত্তীয় অভিমান, স্ত্রী-বন্দনার বারান্দা পেরিয়ে ‘জলকষ্টে বঞ্চিত তৃষ্ণায়’ কবিকে নতজানু হতে দেখি। তিনি বলেন- ‘সর্বলোভী মন আমার’। অনুভবে নত কবি তখন ভুলের বহরে বিছিয়ে দেন কবির জাগতিক অহংকার-
ভুলের আগাছায় আজ ভরে ওঠে উন্মুক্ত প্রান্তর
আর শস্যের শিল্পীরা মৃত্তিকার মন দ’লে
উঠানে জমাতে চায় ভেসে আসা রঙিন জঞ্জাল;
(‘বৃষ্টির গান’)
‘শীত সবুজের সিংহাসনে’ পা রেখে কবি আমিনুল ইসলাম ‘পুণ্ড্র বরেন্দ্র’ অঞ্চলের কথামালা তৈরি করেন। পেছনে ফেলে আসেন ‘ফেরিওয়ালার বিরক্ত স্বর’, ‘ক্ষুধার অন্ন আর বস্ত্রহীনের বস্ত্র’। ‘বিশ বছর পর নিজ গ্রামে’ ফিরে দেখেন ‘বিপন্ন বৈশাখ’। দিন বদলের সাথে সাথে চারিদিকে পরিচিত ‘খোসা-ভূতি-বীজ’উড়ে যেতে দেখেন। পরান্নে জাবর কাটা বুদ্ধিজীবিদের পাড়া অতিক্রম করে তিনি গিয়ে ঠাঁয় দাঁড়ান ‘ভালোবাসার দুইচালা ঘরের’ ওপাশে শ্যামাদোয়েলদের অতিচেনা ‘ফেলে আসা বটের ছায়ায়’। মনের গলিতে গড়ে তোলের স্বপ্নের অপার কুয়াশা-
ধাবমান দিনের সন্তাপে হৃদয় আক্রান্ত হলে
পরশ বুলিয়ে দেবে মাটিছোঁয়া সাঁঝের বাতাস।
নগরীর কুটিল দালানে জমলে জমুক যত তন্ত্রের ফ্যাসাদ
আমাদের সবুজের সংবিধান অলংঘিত-
পরিব্যপ্ত প্রাণের বর্ণমালা।
(‘তন্ত্র থেকে দূরে’)
কবি আমিনুল তার কবিতাযাত্রায় অবিরাম খুঁজে ফেরেন প্রেমের পরিপ্রেক্ষিত। ‘চিরায়ত নীলিমার নীড়’, ‘মিছরির ছুরি’ আর বিপন্ন ভালোবাসার কথা ভাবতে ভাবতে তিনি চেতনে-অবচেতনে আশ্রয় নিয়েছেন নজরুল-লালন-জীবনানন্দ-জসীমউদ্দীনআর রঙিলা নাও এবং নকশীকাঁথার ‘হাজার সৃষ্টির মিছিলে’। শস্যময়ী মাটির মমতাকে তিনি জেনেছেন মায়ের মতো। তাইতো সিলেটের কিশোরী নূরজাহানের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন আর অমানবিক ফতোয়াবাজির পেছনে নতমুখে দাঁড়িয়ে-থাকা এক চিলতে বাংলাদেশকে তিনি ভোলেননি। আর সম্ভবত সে কারণেই প্রতিদিনের সংসারযাত্রায় খুঁজেছেন ‘মেঠোরঙ শব্দের আবাদ’; দেখতে চেয়েছেন ‘উজান বাতাস ভেঙে সেই নীলপদ্ম ছুঁতে যাওয়া’ অবিরাম প্রেম। কোনো অপরিচিতার চিঠির মতো আচমকা আনন্দে সাজিয়ে তুলতে চান আটপৌরে জীবন। বিভাজন-বিচ্ছেদের মিছিলে তিনি বইয়ে দিতে চেয়েছেন বসন্তের বাতাস। একটি কবিতা থেকে খানিকটা পাঠ নিচ্ছি-
হঠাৎ তোমার চিঠি পেয়ে অবাক হলাম
অবিশ্বাসের চোখে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে
ঝুনা নারকেলের মতো ভুল ভাঙলো;
অবিকল সেই নীলখামের মুক্তাক্ষরগুলো
ভিন্ন মালায় জড়িয়ে রয়েছে যেন।
(‘দূর এক অপরিচিতার চিঠি’)
শৈশবে চেনা জীবন, গায়ে গায়ে লাগা প্রকৃতি, বেড়েওঠার কাল ও চেতনা, স্বপ্ন ও হতাশা, ভালোলাগার সীমানা এবং শেষত নিয়তির মতো মেনে-নেওয়া সংসার আমিনুল ইসলামের প্রথম কবিতাগ্রন্থে বিপুলভালে বিভা ছড়িয়েছে।

৩. স্মৃতির নদী, নদীর স্মৃতি :
দ্বিতীয় কাব্য মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম (ঢাকা, টিমওয়ার্ক পাবলিকেশন, ফেব্রুয়ারি ২০০৪) পাঠ করে আমরা খুব সহজেই পেয়ে যাই ‘শৃঙ্খলিত কোকিলের গান’, ‘উপচে-পড়া সবুজের শিহরণ’, ‘গোড়ানাশা পদ্মা’, বীজ-মাটি-বিষয়ক ভোরের হাওয়ায় ভেসে-আসা ‘সরল অভিজ্ঞান’ আর ‘বরেন্দ্রের ভাতের সুঘ্রাণে’ আকাশজোড়া মেঘের তলে লুকিয়ে-থাকা ‘বিড়ম্বিত নিবিড় নগ্নতা’। আন পাই কোনো এক ‘সুমনা’কে। কে এই চলে-যাওয়া সুমনা?-
সময়ের হুইসেল বাজে; ছোটে সুমনার গাড়ি; চোখ কচলাতে কচলাতে
আমার ফিরে আসা; পুরানো ছাউনির বাঁধনগুলো ক্যামন ঢিলা ঢিলা!
(‘চলে যায় সুমনা’)
‘বরেন্দ্রীর রাঙাস্তনে ওদের ঠোঁট’- কারা এরা? এই লোকেদের চোখ দিয়ে কি কবি ‘প্রেমের কবিতার পাঠ’ নিতে চেয়েছিলেন? আমিনুল ইসলামের কবিতায় ‘অক্ষরে অক্ষরে অনুসৃতি; প্রয়োজনে প্রুফরিডিংয়ের চোখে পর্যালোচনা’ দেখি আমরা। এইভাবে সুমনাকে মনে করার, রাঙাস্তনে স্থির-হওয়া ঠোঁটকে চোখে রাখার স্মৃতিকে হাতড়াতে সোনালি মহানন্দায় বারবার ফিরে যান কবি। কল্পনা ও পরিকল্পনার ভিড়ে ‘শুধু লালবাতি’ দেখতে দেখতে তিনি এগিয়ে চলেন পুরাতন প্রেমিকার অদ্ভুত ঐশ্বর্যের পরশে আঁকা ‘মাঘের চিঠি’তে; রূপকথার আড়ালে নির্মাণ করেন বয়নশিল্পের অপার তাজমহলÑ
থাক্ না ওসব কথা!
নতুন শতাব্দীর অদ্ভুত মাঘ।
শিহরিত সবুজের গোড়ায়
উত্তরের হাওয়ায় ভেসে আসে
কুড়াল ও করাতের সম্মত-উচ্চারণের প্রতিধ্বনি!
(‘মাঘের চিঠি’)
‘অথচ আজ কোলাহলে বন্দী আমি’ লিখে কী বুঝাতে চান কবি আমিনুল? আবার যখন বলেন- ‘আমাকে জাগিয়ে রাখে শ্রাবণের অন্ধপূর্ণিমা’, তখন? না বন্দী, না জাগ্রত এক কবির শব্দ-হাতুরির আওয়াজ শুনি আমরা। নারীবাদ, আনন্দের তাড়নায় ভিড়-করা কান্না, স্বপ্নের ছলাকলা, সামাজিক অনিশ্চয়তা এমনকি কিছু মানুষের মাকড়সা-প্রবণতাকে বর্তমান কাব্যে স্থান দিয়েছেন কবি আমিনুল ইসলাম। শতাব্দী পেরিয়ে সময়ের স্রোতে মানুষ যে ‘নিষিদ্ধ প্রসঙ্গ’ পার করে, তার ভেতরে ও বাইরে ‘ভাসমান জলে’ পা ভিজিয়ে তিনি অনায়াসে উঠে পড়েন ‘দূরদর্শী জলযানে’- ‘ভালোবাসার নৌকা’য়। আর ভাবনার প্রবল স্রোতে ভেসে আসে বর্ণিল কথামালা-
গোলাপের ঘরে ঢোকে বুটজুতো পায়ে দ্যাখো জংলী ধর্ষক!
করুণ মাতমে নড়ে হাওয়া! আলীর দু’বাহু ওড়ে দেহচ্যুত;
নীলাকাশে দেখা যায় গোলার হাওয়াই। উপসাগরের জলে
এ বসন্তে লেখা হলো বোয়াল-উৎসব; চেয়ে দ্যাখো-
রক্তস্রোতে ভেসে যায় পাবদাপরাণ, বাঁশপাতা মানবতা।
(‘রাখো তোমার হোমিওপ্যাথি কাব্যতত্ত্ব’)
রাজশাহী, আমনুরা, আয়ড়ার মোড়- স্মৃতিময় এইসব প্রান্তর, কোনো এক গাইবান্ধা, ‘কার্তির্কের মঙ্গায় ভাঙাচোরা প্রাণ’, সংসদ-প্রান্তরে দাঁড়িয়ে-থাকা ভিক্ষুক ‘কুলসুম; থালাহাতে’, অনন্ত সোচ্চার মিছিল, ‘প্রান্তরের শুদ্ধ স্বরলিপি’, কাঁঠালপাতার নিবিড়তার আড়ালে নীরবে দাঁড়িয়ে-থাকা প্রাণময় রবি ঠাকুর, হার্টের রোগী, বনলতিক পাখি, তাসেম বোর্ডিং, তিতাস নদীর পাড়ের অনবদ্য গীতিকার অদ্বৈতমল্লবর্মণআর বর্তমানে ‘মাঝিশূন্য’ এককালের বিপুলা মহানন্দা- তার প্রবল উত্তরাধিকার- সব, সবকিছু যেন ঐতিহ্য-শক্তি-সীমাবদ্ধতা নিয়ে সারি বেঁধে উঠে এসেছে আমিনুল ইসলামের কবিতায়।গ্রন্থটির নামকবিতার প্রথম অংশের উদ্ধৃতি-
মুয়াজ্জিনের আজান, মোরগের ডাক এবং কাকের কলরব
সম্মিলিত আবাহনে প্রভাতের আগমন,
যেন নকীবের ঘোষণায় তসরীফ আনেন নবাব-
আমাদের আলোর অধীশ্বর!
আর সাথে সাথে পৌরকর্মচারীদের ছুটাছুটি, শশব্যস্ততা।
(‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’)

৪. ‘জোছনা জালে বন্দি মহানন্দা’ :
মহানন্দা কবি আমিনুল ইসলামের একটি প্রিয় প্রসঙ্গ। শৈশবের এই নদীটি ঘুরে-ফিরে আসে তার কবিতায় নানান অজুহাতে। যদিও দিনি জানেন- ‘সার্চে ক্লিক করেও পাওয়া যাবে না মুছে যাওয়া দিন’।কিন্তু নদীর কাহিনি সাজিয়ে কবিতা লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন আমিনুল। শেষ হেমন্তের জোছনা (ঢাকা, মুক্তদেশ প্রকাশন, একুশে বইমেলা ২০০৮)- তৃতীয় কবিতা-গ্রন্থেও এই কবি নদীগতপ্রাণ।তার কবিতায় ‘বৃদ্ধার স্তনের উপমায়/ ফাল্গুনের সব নদী’ নর্তকীর ঘুঙুরের মতো খেলা করে। এই কাব্যের নদী-বিষয়ক কবিতাগুলো যথাক্রমে- ‘ ‘নদীর গল্প’, ‘নদী ও খালের গল্প’, ‘নদী- এক’, ‘নদী- দুই’, ‘নদী- তিন’, ‘নদী- চার’, ‘হয়তো সে কোনো বিবিধ ব্যর্থতা’, ‘খেলা’, নদীকূলে বাস’, ‘বিবাদ’, ‘রাইসরিষার কাব্য’, বিমুগ্ধ জোছনারাশি’, ‘শেষ হেমন্তের জোছনা’। একটি কবিতা থেকে উদ্ধৃতি নিচ্ছি-
আমার একটি নদী ছিল; হাওয়া আর স্রোতের খেলা তুঙ্গে উঠলে,
কোনো এক শ্রাবণে সবকিছু সিকস্তি হয়ে যায়। অবশ্য হেমন্তের
কাশবনে স্রোত ও হাওয়ার সমঝোতা হলেও আমার আর জলবর্তী
উঠোনে ফিরে যাওয়া হয়নি।
(‘নদী- এক’)
বৃক্ষ-বন্দনা এই কাব্যের আরেকটি প্রবণতা। ‘বৃক্ষ- এক’, ‘বৃক্ষ- দুই’,‘বৃক্ষ- তিন’, ‘বিষবৃক্ষের বাগান’, ‘শিমুলচিহ্নিত ভালোবাসা’, ‘ভালোবাসায় ফিরে আসা’, ‘বটবৃক্ষের ছায়া’। অভিভাবকীয় বৃক্ষের (অথবা বৃক্ষমানবের) প্রতি কবির প্রবল টান অনুভব কবি এইসব পঙক্তিতে- ‘ফারাক্কার বালু এসে গ্রাস করে সবুজ মিছিল; ফুলের/ টবে জলের হাহাকার। আর বৈরী উঠোনে তোমাকে/ ঘিরেই রচিত বটবৃক্ষের ছায়া; পদ্মার স্রোত সাহস/ দিলে রাঙা মাটি দেয় শেকড়ের সঞ্চয়। তাইতো/ তোমাকে দেখলে আষাঢ়ের ঘাসের মতো বেঁচে ওঠে/ সরেন মাঝিরা; তোমাকে কাছে পেলে মুখ খোলে/ গোদাগাড়ীর রূপকথার বুড়ি; তোমাকে কাছে পেলে সুরের জাল বিছিয়ে দেয় গম্ভীরা-আলকাপ কবিগান।’ (‘বটবৃক্ষের ছায়া’)- এই কবিতায় বৃক্ষতুল্য মানব-বন্দনার অন্তরালে কবি বর্ণনা করেন একটি জনপদের মানবিক সামর্থ্য, চেতনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নিবিড় কথামালা। প্রকৃতির প্রতি বিশেষভাবে নিবেদিতপ্রাণ কবি তার কাব্যযাত্রার এই পর্বে পাখি-বন্দনায় বেশ মশগুল। ‘পাখিবিদ্যা’, ‘পাখিজীবন’, ‘পাখি সমাচার’, ‘প্রকৃতির খবর’, ‘আকাশের আর্কাইভ থেকে’, ‘কবরস্থানের পাখি’ কবিতাগুলো তার প্রমাণ নিয়ে হাজির রয়েছে।আমিনুল এখানে নদী-পাখি-আকাশ ও প্রকৃতির অপার রহস্যে যেন এক ঘোর-লাগা কবিতা-প্রহর পার করেছেন। লিখেছেন তিনি-
তবু এই ঘোরলাগা সন্ধ্যায়
জোছনা কুড়োবো বলে
সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে
মাইক্রো-ক্রেডিটের মতো মন বিছিয়েছি।
(‘শেষ হেমন্তের জোছনা’)

৫. কবিতা-অভিযাত্রায় নির্মিতি-প্রবাহ ও বিবর্তনধারা:
কবি আমিনুল ইসলামের একটা বিবৃতি এখানে নোট রাখা দরকার। তিনি বলেছেন- ‘কবিতায় এতদিন যাবৎ ব্যবহৃত হয়নি- এমনসব শব্দ এবং প্রশাসনিক পরিভাষার জগতের অর্থগর্ভ প্রত্যয়কে যুৎসই দ্যোতনায় ব্যবহার করতে চেয়েছি। আবার আমি কোনো দশকওয়ারী কাব্যতত্ত্বে বিশ্বাসী নই বলে কোনো দশকের প্রকরণের হুবহু অনুসৃতি নেই আমার কবিতায়।’ (‘আমার কবিতা : কাছের কেন্দ্র- দূরের পরিধি’, কবিতা সমগ্র, ঢাকা, অনন্যা, পরিবর্ধিত সংস্করণ ২০১৬) তার কবিতা-অভিযাত্রায় আমরা একে একে যুক্ত হতে দেখি কুয়াশার বর্ণমালা (ঢাকা, মুক্তদেশ প্রকাশন, ২০০৯), পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি(ঢাকা, গতিধারা, ফেব্রয়ারি ২০১০), স্বপ্নের হালখাতা (ঢাকা, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ফেব্রুয়ারি ২০১১) জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার (ঢাকা, অনন্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১২), শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ (ঢাকা, লেখাপ্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৩), জোছনার রাত বেদনার বেহালা(ঢাকা, অনন্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৪) কবিতা-গ্রন্থ। এইসব কাব্যে কবি রঙতুলিতে সাজিয়ে তুলেছেন বাঙালির চিরায়ত ও প্রাণের উৎসব-পার্বন, জীবনের বয়ে-চলা অসীম যন্ত্রণা, স্মৃতির প্রবল আয়না, পিতা-মাতার স্তুতি, পৃথিবী নামক ‘অনিঃশেষ পাঠশালা’, স্বপ্ন ও শূন্যতা, মানসিক দূরন্ত দ্বন্দ্ব, নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা, প্রেম-দাম্পত্য ও সংসারে প্রবাহিত বাতাস ও বেদনা,সংসারের নিয়ত ষড়যন্ত্র, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ব্যক্তিতা ও আত্মবন্দনা, নগরজীবনের জটিলতা, নারীর মন, বিশ্বায়ন এবং গ্রাস-হতে-থাকা গ্রামীণ জীবন, রাতের অপার রহস্য, ‘বহুমূত্র বর্তমান ভেঙে পড়া ভবিষ্যৎ’, মানুষের শেয়াল-কার্টুন-প্রবণতা, কবির সম্ভাবনা ও স্বপ্ন, গল্প না-ফুরানো গল্প, আমাদের সব ‘অদ্ভুত ব্যর্থতা’, বেহিসেবি জীবনের সত্য-ছবি, প্রজন্মের উদ্দেশ্যহীন-অভিযাত্রা, সামাজিক পরিবর্তনের হাওয়া এমনকি বয়ে-চলা অস্বাভাবিকতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভরতা, জাতীয় কবির প্রতি আমাদের দায়- কবিতার প্রাসঙ্গিকতা, রাজনীতি ও লোকাল প্রশাসন, ভাবনার ‘মঞ্চ এবং প্রতিমঞ্চ’, বিনিয়োগ ও জাতীয়-আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, কল্পনার নবায়ন, আঁধারে উঁকি-দেওয়া অসামান্য কোনো চোখ, রাষ্ট্রযন্ত্র ও ‘বিশ্বস্ত দীর্ঘশ্বাস’, দৃশ্যের আড়ালের দৃশ্য, ‘পিছিয়ে যাওয়া মানুষ’, বিশ্ব-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও ভাব-বিনিময়ের সম্পর্করেখা, বাঙালির প্রবাদ-নিমগ্নতা, ‘ভাঙা গণতন্ত্র’, নদীর নিজস্ব কথামালা (!), অচেনা পথের বেঁধে-দেওয়া বন্ধনহীন গ্রন্থি, কুয়াশাঘেরা নীড় ও ‘হারিয়ে যাওয়া পিপাসা’, বৃক্ষবন্দনা আর ‘নদীমাতৃক প্রচ্ছদে’ আঁকা ‘ডায়েরি ও গোলাপ’। তিনি যেন আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখে পাঠাচ্ছেন কবিতা থেকে কবিতান্তরে। যে চিঠি ‘সুন্দরবনের সুরসভায়’ গিয়ে ছুঁয়ে দেবে ‘নির্দলীয় ভালোবাসার’ ‘মন অথবা মোহনা’। কবি আমিনুল কেবল খুঁজে ফেরেন ‘আমাদের ভালোবাসার দিন’। কবিতা-অভিযাত্রা তাই হয়ে ওঠে আমিনুল ইসলামের শিল্প-যাপনের ‘প্রথম সাঁতার’।

৬. মানুষের সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্ব :
আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট (ঢাকা, লেখাপ্রকাশ,একুশে বইমেলা ২০১৫) ব্যক্তির বিকাশ ও দ্বিধা, প্রকৃতি, সৃষ্টিরহস্য ও বিধাতাভাবনা সমকালীন বৈশ্বিক রাজনীতি, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং প্রেম প্রধান প্রধান প্রসঙ্গ ও অনুসঙ্গ। ‘অজুহাতের স্টেশনে’ বসে মানুষ যে কী রকম ‘অদ্ভুত অপেক্ষা’র প্রহর যাপন করছে, সেই দিকে কবির তীক্ষ্ম চোখ তীর্যকভাবে তাক করা। ‘তথাপি পাথর হয়ে’ থাকা সংবেদনশীল লোকেরা ‘আবেগ-শাসিত ভূগোলে’ নদীর স্রোতের সেতারের ‘মতো অথবা ‘বনের গুঞ্জন, বাতাসের শিস, স্তব্ধতার বাণী’র বারতা কাঁধে নিয়ে পৌঁছে যায় একাকিত্বের ‘বিবর্তনবাদের আলো’য়। কবি আমিনুল অনুভবের চোখ দিয়ে দেখেন- ‘চারপাশে কেউ নেই’। ‘বাঘ-হরিণের সংসার’ কবিতায় তিনি এঁকেছেন সাংসারিক অভিযোগ আর জীবনের প্রবল দৌড়ের গল্প। যেখানে ‘জোছনা নেই- জলসার আসরও নেই’ ঠিক সেইখানে কবি আমিনুল বর্ণিল শোভায় সাজিয়ে তুলেছেন মোঘল সা¤্রাজ্যের ইতিহাসের ছবি আর সম্রাটদের চোখের চৌকশতার অনাবিষ্কৃত বাগান। প্রতীক্ষা আর প্রেমভাবনা এখানে আমিনুলের কবিতা অনেক বেশি বিজ্ঞান ও যুক্তি আশ্রয়ী। যদিও তিনি জানেন যে সব সময় যুক্তি দিয়ে পৃথিবী চলে না। হতাশা আর ক্লান্তি দুহাতে দূরে সরাতে কবিকে এই পরিণত পর্বে এসে প্রকৃতি-বন্দনায় আস্থাশীল হতে দেখি। ‘নীলসাদা প্রচ্ছদে ভাঁজ হয়ে শুয়ে আছে সুন্দর’ কিংবা ‘ভোরের হাওয়া এসে খেলা করে মেঘভাঙা চুলে’ বলে তিনি তাঁর নিয়মিত পাঠককে নিয়ে যান ‘বনের ওপর ঝুলে থাকা চাঁদ’ দেখানোর লোভনীয় বারান্দায়। আমিনুল ইসলামের একটি প্রিয় প্রসঙ্গ‘ভালোবাসা’ এখানে আরো সুসংহত। ফিলিস্তিন-ইসরাইলের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংকট, জাতিগত বিভেদ ও মানবতা, গণতন্ত্র প্রভৃতি প্রসঙ্গে আমিনুলের আবেগ এইপর্বে আরো ঘনীভূত হতে দেখা যায়। বিশ্ব-পর্যটক কবি আমিনুল একেবারে আক্ষরিক অর্থেও এখানে যোগাযোগ ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে কবিতার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বিজ্ঞান-পরিভাষা তাই তাঁর কবিতার প্রকাশকৌশলের সহজ-বিচরণের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেয়। অপ্রাপ্তি-চেতনা এই কবির আরেকটি প্রিয় প্রসঙ্গ। ‘জল ও পিপাসা’ তাঁর পিপাসা-প্রকাশের দারুণ শব্দমালা। তবে পরিতৃপ্তির কাহিনিও কম বলেন না তিনি। ‘আক্রান্ত বাগান’ শীর্ষক এক কবিতায় লেখেন- ‘এই খাটটি আমার অনেক উচ্ছল সঙ্গমের টেপ রেকর্ডার; এই ডালিম গাছটি আমার অনেক পরিতৃপ্ত প্রভাতের লালসবুজ ছবিভরা অ্যালবাম’। তাঁর ‘আপেল কাহিনি’ কবিতাটিতে স্থান করে নিয়েছে আদম-হাওয়া প্রেম-প্রসঙ্গ, তাদের সম্পর্কের ‘ন্যায়বোধ’ আর সৃষ্টির সেরা জীবের প্রবাদপ্রতীম সব দিনলিপির ভ্রমণ-ভাষ্য। ‘সত্য বলা না বলা’ কবিতায় লিখেছেন এক প্রবাদসম বাক্য- ‘রাষ্ট্রের অনুগ্রহ কে না চায়!’ আমরা জানি, ২০১৩ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিক মো ইয়ান (ছদ্ম নাম; এর অর্থ- কথা বলো না) রাষ্ট্রীয় পেষণের বিরুদ্ধে কলম পিষেছেন। এই প্রবল ব্যক্তিতা ও মুক্তির অনুভব মেলে আমিনুল ইসলামের কবিতায়। এই আধুনিক সভ্যতার প্রবলতায় তিনি দেখেছেন মহাদেশীয় হিংস্রতা। বিশ্বায়ানের বাজার যে সাধারণ মানুষের জন্য কতোটা কষ্টদায়ক, তা উপলব্ধি করেছেন তিনি। ‘বুশের অধরে বাঘের লালা- নেতানিয়াহুর ঠোঁটে গোখরের বিষ’; ‘ভাইয়ের জন্য হোমোসেক্সুয়াল দিন/ বোনের জন্য লেসবিয়ান রাত’ লিখে তিনি পাঠককে জানাতে চান আমাদের লাভের সীমানা। সাহিত্যিক ঐতিহ্য যে এখন ‘ফোরকালার’ নির্ভরতা লাভের প্রত্যাশায় ব্যাকুল, তার কিছু ছায়া ও ছবি মেলে এখানে। শেষত আমরা এখানে পেতে থাকি ‘ফোরকালার উরুর ডিজিটাল মোহনা’, ‘ফোরকালার অধঃপতন’, বারুদ আর বিষে মাখা ‘ফোরকালার আদিমতা’। বিশ্বনিরাপত্তা, মিডিয়া ও মানবতা যে কী রকম বিপন্নতা-আচ্ছন্ন, তা আঁচ করেছেন কবি আমিনুল। অতঃপর তিনি জেনে গেছেন ‘ইয়েস স্যার! জ্বী স্যার! ওকে স্যার’মার্কা একালের দর্শন, প্রশাসনিক দুর্নীতি আর চোরের মহারাজ্যের ব্যাপারিাদি। বেঁচে থাকার স্বপ্নে ব্যাকুল কবি আমিনুল শেষপর্যন্ত পিতার অভিভাবকত্ব আর প্রভাবের সামাজিক ঐতিহ্যের কাছে নতজানু হয়েছেন। পিতার শারীরিক অনুপস্থিতিতেও তিনি টের পেয়েছেন প্রভাব ও প্রবল ছায়া। মায়াও। লিখেছেন- ‘আমার পা দু’টি তোমার জুতোর মাপের হলেও তাদেও বিচরণের জগৎ অভিন্ন নয়’। পিতার স্মৃতি আর প্রজন্মের অধোগতির এই পরিচিত চিত্র কী সত্যিই সভ্যতার জন্য শ্রেয়? না-কি সেখানেও থাকবে কোনো ‘অডিট আপত্তি’? এই কাব্যে আমিনুল ইসলাম সাজিয়ে তুলেছেন মানুষের সীমাবদ্ধতা, শূন্যতা আর সব হাহাকারের কথামালা।

৭. প্রেম-প্রযুক্তিও কবিতা :
আমিনুল ইসলাম আবেগপ্রবণ কবি। বাস্তবতাকে তিনি পর্যালোচনা-সমালোচনা ও যাপন করেন আবেগের প্রবলতায়। কিন্তু নেতিয়েপড়া কিংবা থিতিয়ে-যাওয়া তাঁর স্বভাব-বিরুদ্ধ। তিনি সব সময় সকল প্রকারের প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েও হেঁটে যান প্রাণভরে। কবিতা তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী। অফিসের কাজের ফাঁকে কখনো ঢুকে পড়ে কবিতা। কখনো বা কবিতার ফাঁকেই তিনি উল্টে-পাল্টে দেখেন ফাইলের পর ফাইল। কোনো সভার মঞ্চে কিংবা দর্শক সারিতে, রেস্ট হাউজের ভিআইপি কক্ষে অথবা চলার পথে কোনো রেস্তোরাঁয় তাঁর কলম চলে- যেন কবিতার সাথে তাঁর সংসার, যেন কবিতা তাঁর কলিগ। যৌবনের ভক্ত এই কবি প্রেমকে নানানভাবে উদযাপন করেছেন। উপভোগ করেছেন প্রেমের যন্ত্রণাও। ব্যর্থতা কিংবা সফলতার বিচার কখনো তাঁর কবিতার বিষয় হয়ে ওঠেনি। তিনি কেবল বলতে চেয়েছেন প্রেমিকের কথা, প্রেমিকার কথা। পরিস্থিতি ও ফলাফল নয়, আমিনুলের ভাবনায় সব সময় প্রেম থাকে ঠিক ঠিক জায়গায় সমস্ত অনুভূতি ও আনন্দ নিয়ে।

স্রোতবাহী নদী তাঁকে খুব টানতো। শৈশবে ও উদ্দাম কৈশোরে দেখেছেন নদীর স্রোত ও নদীর সাথে সম্পৃক্ত জীবনধারা। যৌবনে দেখেছেন নদীর বিদ্রোহী রূপ। নদীর ভাঙনে তাঁদের গ্রাম তলিয়ে গেছে। চারপাশের গ্রামের পর গ্রাম বিলীন হয়েছে উত্তাল পদ্মায়। নদী থেকে অনেক দূরে নতুন বসতি গড়তে হয়েছে আমিনুলের পরিবার-পরিজনকে। নদী-নারী ও প্রেম আমিনুলের কবিতায় কখনো নরম কখনো তেজী। প্রণয়ী নদীর কাছে (ঢাকা, লেখাপ্রকাশ, এপ্রিল ২০১৬) কবিতাগ্রন্থে আমিনুল ইসলাম সাজিয়েছেন ভালোবাসার ‘প্রমুগ্ধ পঙক্তিমালা’। ‘আকাশের সেলফোন’, ‘লোকসানী জুটমিলের মতো পোস্টপেইড বিল’ পেরিয়ে তিনি অনুভব করেছেন- ‘ভালোবাসা অন্তরঙ্গ অনিয়মের নদী’। নিয়ম দিয়ে, সম্পর্ক দিয়ে, সাধনার শক্তি কিংবা তৈল দিয়ে ভালোবাসার সুতো যে নির্মাণ করা যায় না- এর ফ্রেব্রিকস যে একেবারেই আলাদা, তা তিনি বুঝতে পেরেছেন। গ্রন্থের প্রথম কবিতায় লিখেছেন-
‘ভালোবাসো না, অথচ অনুরাগের চিত্রকল্প হয়ে
ঘুরঘুর করো সংবেদনশীলতার চারপাশে
লাল ব্যঞ্জনা কাতুকুতু দেয় রাতজাগা কবির কামনায়
এমনটি চলতে থাকলে, তুমিই বলো,
আমি কতক্ষণ ঠেকিয়ে রাখবো প্রমুগ্ধ পঙক্তিমালা?’
‘অথচ’ শব্দটি দিয়ে কবিতা আরম্ভ করা আমিনুল ইসলামের একটি বিশেষ প্রবণতা। আবার ‘অথচ’ দিয়ে কবিতার সমাপ্তিরেখাও টানেন তিনি। কোনো কথা বলার আগেই ‘অথচ’ কেন? এইটে বুঝতে হলে আমিনুলের কবিতা পুরোটা পাঠ করতে হয়। চোখ বুলিয়ে গেলে কিংবা দু-এক পঙক্তি ছেড়ে ছুড়ে কোনোরকমে পড়া শেষ করলে, কবিতার ‘অথচ’ শব্দের প্রয়োগ-প্রযুক্তি অনুধাবন করা যাবে না। আমরা কিছু কথা বলে তারপর ‘অথচ’ বলতে অভ্যস্ত। কিন্তু যদি তা না হয়, তাহলে বুঝতে হবে কিছু না-বলা কথা আছে কবিতা শুরুর আগে। কবি হয়তো ওই কথাগুলো গোপন রেখেছেন পাঠকের অনুভূতিকে শানিতে তোলার জন্য। পাঠকের সচেতনতা যে কবির কাম্য, সে কথা আমরা পাঠ করি দার্শনিক কবি আমিনুল ইসলামের নির্মাণশৈলীতে। ‘যখন অসময়,- সুসময়’ কবিতাটির শুরু এরকম-
অথচ অভাবিত বন্যা এসে ভাসিয়ে দেয় আমার পাকা আউশের ক্ষেত আর
তলে তলে রেখে যায় উর্বরতার কোমল ঐশ্বর্য। প্লাবিত চোখের সামনে
সবুজের সমারোহে ভরে ওঠে বানধোয়া মাঠ। আমি বদনাম করবো নাকি
প্রশংসা- সেটা ভাবতে গেলে সবকিছু একবার পাকিস্তান- একবার ভারত
হয়ে ওঠে।
কবি আমিনুল ‘লোকালয়ভর্তি ডিজিটাল চোখের সামনে’ দিয়ে ভেসে-বেড়াতে দেখেন ‘ইয়েস-স্যার-মার্ক’ সুখ-সন্ধানী মানুষদের। ভারতপন্থী-পাকিস্তানপন্থী-চীনপন্থী-আমেরিকাপন্থী রাজনীতির দর্শন ও ধারা চারপাশে দেখেন হয়তো মুখোশে ঘেরা। মনে মনে কখনো ভাবেন চে গুয়েভারা কীভাবে সশস্ত্র অভিযাত্রার পথে পা বাড়িয়েছিল। সংগ্রামের সমাপ্তিতে যে চে থামতে চেয়েছিলেন, তাও কবির জানা। কিন্তু কে দেবে থাকার নিশ্চয়তা? কবিই-বা কোথায় পাবেন দাঁড়িয়ে যাবার নির্ভরতা! আমিনুল তাই ‘শপ্তডানার সাঁতার’ কবিতায় ‘সম্মুখে জিইয়ে রেখে আছোঁয়া গন্তব্য’, অনেক কথা বলে কবিতা শেষ করেন ‘অথচ’ শব্দযুক্ত সিম্পল একটি বাক্য দিয়ে- ‘অথচ তুমি সামনে এসে থামাও না আমার শপ্তডানার গতি।’ কার প্রতি এই অভিযোগ? কবি কী খুঁজে চলেছেন শিল্পের সাধনায়? প্রেম না-কি প্রভেদ? তাঁর চাওয়া ‘ভালোবাসার একমাত্র গন্তব্য’ কি কেবল ‘গাবতলা মোড়ের কাজী অফিস অথবা ঝাউতলা মোড়ের প্রসূতিকেন্দ্র’? প্রেম কি শুধু বিয়ে আর সন্তান-ধারণ ও প্রসবের ঘটনার মধ্যেই বৃত্তাবদ্ধ? সংসার মানে কি বছর বছর পরিবারের সদস্য বৃদ্ধি করা? প্রেম মানে হতাশা আর টানাপড়েন? না, আমিনুল বোধহয় সে কথা মানেন না। তাঁর কাছে প্রেম মানে নারী-পুরুষের স্রেফে যৌনতার বাইরেও আরো কিছু। একটি কবিতা থেকে খানিকটা পাঠ নিচ্ছি-
ইয়েস, ভালোবাসা একধরনের বিলাসিতাও বটে- শীতে বৃষ্টিবিলাস
অথবা শ্রাবণে বসন্তবাসনা, যা প্ররোচিত করে ছেড়ে দিতে সিংহাসন,
অথবা গড়ে তুলতে স্বপ্নের সৌধ যা দেখে প্রযুক্তিসম্রাট জুকারবার্গও
বলে উঠেন, ‘ভালোবাসায় কতটা অনুপ্রাণিত হলে এই ধরনের একটি
নিদর্শন গড়া যায়!- আমার প্রত্যাশার চেয়েও বিস্ময়কর এই সৃষ্টি!’
কবিতালেখার মতো প্রেমও সংবেদনশীল হৃদয়ের মহৎ বিলাসিতা।
(‘প্রেম অথবা প্রভেদ’)
‘মাঝবয়সী স্তনের মতো ঈষৎ ঝুঁকে থাকা’ পর্বত, ‘বাজার অর্থনীতির’ অপারগ হাত, প্রিয় কোনো মানুষের ‘পাটিগণিতের মন’, ‘সম্পর্কের মুদিখানার ছাদ আড়াল’ করা কোনো অজানা ভালোবাসার আকাশ, ‘একনদী জলে’র আচ্ছন্নতা কিংবা অপার কোনো স্বপ্নময়তা কবি আমিনুল ইসলামকে কবিতা লেখার সময় নানানভাবে প্ররোচিত-প্রভাবিত করে। কলম হাতে নিবিড় কবি ভেসে-যাওয়া এলোমেলো স্রোতে দেখতে পান ‘সবখানি ঝড় বন্দি হয়ে আছে জলে ভেজা একটি আঁচলে’।

৮.বিছানো সিথান :
ভালোবাসার ভূগোলে (ঢাকা, অনিন্দ্য প্রকাশ, মে ২০১৭) ব্যক্তিগত অনুভূতি আর বেদনার কথা সাজিয়েছেন কবি। এখানে কবি আমিনুল ভালোবাসার প্রসঙ্গ ও যৌক্তিকতা, ভালোবাসার স্থিতি-রঙ ও ব্যর্থতা, সাম্রাজ্যবাদে প্রেমের প্রকৃতি, সম্পর্কের টানাপড়েন প্রভৃতিকে জায়গা করে দিয়েছেন সামাজিক ঐতিহ্য আর ব্যক্তিক-স্মৃতিকাতরতার রঙিন রুমালে। কবিতার রাতজাগা অজুহাতে, ‘পূর্ণতার আঙিনায়, আবাদি ভূগোলে’, ‘হৃদয়-ক্ষরণের ঘ্রাণ’ নিয়ে শুনেছেন কবি ‘ভুল পাঠশালায় অবজ্ঞায়িত’ ‘ভালোবাসার পদাবলি’। প্রেমকাতর কবি বাঁচবার ব্যাকুলতাও প্রকাশ করেন এখানে। ‘হে মহানন্দা’ কবিতায় লিখেছেন-
হে প্রেয়সী, আজ যেখানে আমার বাস,
সেটা দোমুখোদের রাজত্ব
সেখানেই আন্ডারগ্রাউন্ড লেফলিস্ট আমি
সফল হতে এসেছি
গভীরে বিশ্বাস করে কাছে নাও
সম্পর্কের রাজ্যে
প্রতিবিপ্লবী হওয়ার ঝুঁকি থেকে বাঁচাও আমাকে!
ভালোবাসার নানান গতি ও ফের কবিকে ভাবিয়েছে বহুকাল। দেখেছেন ভালোবাসার কৃত্রিম কিছু আলোও। অতঃপর হাজার প্রশ্নের ভিড়ে, ‘পরকিয়ায় আসক্ত যমুনা’ পেরিয়ে আমিনুল ইসলাম এক স্থির উত্তরে পৌঁচেছেন। আর তা হলো- ‘ভালোবাসা ক্রনিক লসের কোনো আদমজী জুট মিল নয়’। প্রেমের বণিক-স্বভাব মাঝে মধ্যে কবিকে ক্লান্ত করেছে বটে; কিন্তু তিনি সোনাভান, বেহুলা, রাধা-কুষ্ণ, নর-নারীর প্রেম, মানবিক সভ্যতা আর ইতিহাসের মিশেলে কবি আমিনুল তৈরি করেছেন তার দেখা ভূগোলে ভালোবাসার অবস্থান-পরিসর। কিন্তু রহস্যের সমাধান কি এতো সহজ? না। আঁধারের যে চিরন্তনতা, তাকে আমরা কী করে ভুলি? নারী-পুরুষের সম্পর্কটা যে প্রকৃতি নিয়ন্ত্রিত, সে কথা-ই বা কী করে না ভেবে নীররে নিরালায় বসে থাকি আমরা? এই গ্রন্থের শেষ এবং দীর্ঘ কবিতা ‘ অন্ধরাতের এক্সরে রিপোর্ট’ কবিতা থেকে পাঠ নিচ্ছি-
আজ এই রাতে তুমি জানো- আমি জানি-
আমাদের ব্যর্থতার অজ্ঞাতপূর্ব কারণসমূহ;
শরীর প্রস্তুত ছিল- ছিল মনও- যাকে বলে ফুললি ওয়ার্ম আপ্ড;
কেন তবে হলো নাকো?
বয়ে-আসা ঢল কেন হলো নাকো পাহাড়িয়া নদী?
অথবা তুমি কি শুনেছিলে কোনো না-খেলার বাঁশি?
কিংবা আমি কি ভুলপক্ষে ছিলাম?
সকল জবাব দেখো-
ফুটে আছে সচিত্র রিপোর্ট হয়ে আলো-আঁধারির অক্ষরমালায়!

শেষকথা :
আমিনুলের কবিতায় আবেগ আছে। বলার ব্যাকুলতা তার প্রকাশ-প্রবণতার একটা সহজ ও দৃষ্টিগ্রাহ্য দিক। মানুষের স্বাভাবিক আসা-যাওয়া আর পরিবর্তন-বিবর্তন তার চাওয়া-পাওয়ার সীমানা ছুঁয়ে যায় সবসময়। যোগ্যতা আর কৌশলের দৌড়ে প্রকৃতঅর্থে আমরা যে জীবনানন্দীয় ‘বিপন্ন বিস্ময়; লালন করি, তার খানিকটা পাওয়া যায় এই কবির চিন্তা ও ভাষ্যে। অবশ্য চীনদেশীয় কথাকার মো ইয়ানের না-প্রকাশের ‘শৈশব-যাতনা’ তিনি ভোগ কিংবা উপভোগ না করলেওকবিতা নির্মিতির উৎকর্ষে অবগাহনের সুযোগ স্থাপন করেছেন পঙক্তিমালার রঙে ও রেখায়।