কাব্যের জলসাঘর

বিকেলের মরচে ধরা রোদ নিভে গেলে
হলুদ সন্ধ্যায় জমে উঠে কাব্যের জলসাঘর
সঞ্চালকের ভাষায় বলা হয়ে থাকে শুভ সন্ধ্যা

লক্ষির বাহন পিগম পিগম সুরে
ডেকে উঠা কালিসন্ধ্যা থেকে শুরু করে
গা হতে পলেস্তরা উঠে যাওয়া
ধূসর রঙের খানিকটা রাত অবধি
তোমারই চোখে খোঁজে বেড়াই কবিতার বরষা
সৃষ্টিতত্বের আঙুল ছোঁয়ে যায় তোমার
অরুণাভ ওষ্ঠ-অধর, বহমান যৌবনের অলি-গলি

অপলক চেয়ে থাকি লোভাতুর নয়নে যতই হও দূরগামী
কিন্নর কন্ঠে ডাকি-নয়নে নয়ন রেখে, হাতে রেখে হাত
কাব্যের শরীরে পংক্তির বীজ বুনে জলসাঘর করি মাত
অতপর ফসল তুলি সাধ্যমতো
বুকের খাঁজকাটা সিন্ধুকের লকাবে

দু‘চোখের আষ্টে-পৃষ্ঠে এঁকে নেই কামনার সব চিত্রাবলী
নিয়মের নেকাবে ঢেকে গেলে মুখ
সন্ধ্যার পাঁজরে জমা করি বিরল সব সুখ।
…………………………………………..

সুখের ময়ূরপঙ্খী

শরতের রাতে নির্ঘুম একাকি
বাতায়ন অদূরে গহীন বিজনে
লুটিয়ে পড়েছে শুক্ল পক্ষের নীল জোসনা
মনন-মগজের তুলিতে রঙের বর্ণচ্ছটা
তুমি আমার ক্যানভাস

আঙুলের ইশারায় বিদিশার নিশার মতো
যখনই ফুঁটিয়ে তুলেছি তোমার রেশমি চুলের মেঘ
সহসা দেখি স্বপ্নের নদীতে সোনার ময়ূরপঙ্খী

চারদিকে রঙের ফানুস-নক্ষত্রের ঝিকিমিকি
ময়ূরপঙ্খীর মেঝেতে শ্বেত-শুভ্র কাশফুলের শয্যা
তোমার মেঘকালো কেশের অরণ্যের
সুঘ্রাণে মদির হতে হতে দেখি
চোখের তারায় ফোঁটে রয়েছে হাজারো নক্ষত্রের ফুল
সাত সমুদ্র তের নদীর মোহময় বয়ে চলা দু‘চোখের ভাষা
আমিও ফুল্লধারায় একাকার হয়ে বয়ে যাই নিরবধি
চার চোখের দৃষ্টির ভেতর ফোঁটে ওঠে কথার ফুলঝুরি

তোমার শে^ত-শুভ্র সিল্কি ঠোঁটের পাপড়িরেখায়
স্মিত হাস্যের কলরস-সোহাগি আহবান
গোলাপ পরাগমাখা দু‘ঠোঁটে এঁকে দেই হিমার্ত আদর
স্বপ্ন নদীর ঢেউয়ের উপর দুলে ওঠে সোনার ময়ূরপঙ্খী
মধুচন্দ্রিমায় ভরে ওঠে আমাদের কাক্সিক্ষত রাত

রেশমি কেশগুচ্ছকে আলতো করে সরিয়ে দিয়ে
পালক নরম কানের লতি দু‘টি ছুঁয়ে দেই পেলব স্পর্শে
সফেত গ্রীবায় আঁকি চুম্বন ট্যাটু. . .

স্থুলপদ্মে মুখ লুকাতে গিয়ে লোবান সুগন্ধিতে হই আহত
রমণীয় ভাঁজে ভাঁজে মনন-মগজের সবটুকু রঙের
বর্ণচ্ছটা ঢেলে দিতে হয়ে উঠি উন্মুখ
আবক্ষ আলিঙ্গনের মদিরতায় তোমাকে করে সঙ্গী
চাঁদ ঝলমলে স্বপ্ন নদীতে ভাসাই সুখের ময়ূরপঙ্খী।
…………………………………………..

প্রতিরূপ

অদূরে স্নানঘরে তোমার জ্যোতিদেহে
ঝরনা জলের বিচ্ছুরণ-অনুরণন
মধুকরের গুঞ্জরণ হয়ে বাজে

ক্ষণকাল পরে খুলে যায় বদ্ধঘরের দ্বার
প্রশান্তির হাসিতে তোমার ¯িœগ্ধ কলস্বর
স্ফুরিত ঠোঁটে কুশলাদি জিজ্ঞাসার চিহ্ন

মসৃণ কাঁধে তখনো ক‘ফোটা কেশ নিংড়ানো জল
নেচে নেচে জানিয়েছিল উদ্বেল-আহবান
তোমার ইতস্ত: বিচরণ শেষে খোপা খুলে চুলে
ভেজা ভেজা গন্ধ স্বর্গীয় সৌরভ ছড়ায়
তখন মায়ার পরশে মোহময় প্রেম
বেজে উঠে জীবনের প্রতিরূপে।

তখন তোমার দু‘চোখের প্রিজমে দেখি
রংধনুর সাত রঙের প্রতিফলন
গোলাপী পায়ে অনন্ত কিশোরীর নিক্কন
অফুরন্ত যৌবনের উপমা তোমার বক্ষের সুগঠন

চোখে মুখে কাব্য-কলার চিরন্তন ফাণুস
দূর্লভ কুহিনুর তুমি, ভোরের হাওয়ায়
ভেসে চলা শিউলি ফুলের সুগন্ধি সুভাস
কন্ঠে তোমার সুকন্ঠী পাখির কলতান
লতানো লতার ঢেউ তোমার ভাজে-পরতে
সাথে ফুল পাখি নদী জলে মাখামাখি তুমি
উপমায় উদ্ভাসিত জীবনের প্রতিরূপ।
…………………………………………..

হেমন্ত ও তুমি

কাঞ্চনপুরের বেড়িবাধের গুল্মলতা ছুঁয়ে সবুজের রেখাটি নান্দনিক
হয়ে উঠে তুমি ভ্রমণ সারথি হলে। অদূরে শুকনো খালের তলানী সেচে
মাছ ধরার কসরতে কিশোর দঙ্গল কাঁদাজলে মাখামাখি, শ্মশানঘাটে
অশুথ-মহুয়ার বনে রৌদ্রের ফিনকি চুয়ে ঢেউ তুলে লাল ঝুটির
টিয়ে পাখির মিষ্টি-মিহিন কলস্বর। মনপোড়া ঘুঘুটিও টানা বিলাপ
তুলে-হুতি ঝি গো পুড়ো পুড়ো-

তিতাসের কোল ঘেষে সবুজ বনো ঝোপে ঝোপে পতঙ্গের খুনসুটি
হলদে পাকা ধান ক্ষেতে নবান্নের আগাম সুর বাজে, তুমি মুগ্ধ-বিমুহিত
পড়ন্ত বেলার আরক্তিম সূর্য মোহনীয়-মায়াবী মুগ্ধতায় স্ফুরিত হয়
ফুলের উপর রঙের খেলা খেলে তোমার চোখে-মুখে।

শরতের রূপালী জলের চিবুকে হেমন্ত যেমন রাখে তার মরমি আঙুল
তেমনি কাতৃকের বিজন বিকেলে তোমার অরুণাভ অধর-ওষ্ঠ ছুঁয়ে
পেলবতা পান করি উচ্ছাস-উল্লসিত হয়ে।

আর স্ফুরিত চোখ মেলে ধরি হেমন্তের গোল আয়নায়-দেখি
জোছনার কিরণঝরা মুখ, কাঁচুলি খোলা বুক ও খোপা খোলা চুল
লাজুক চোখের পাতাতে নেচে উঠে লালচে রোদের রেণু
হীরা-চুন্নি-পান্নার গুঞ্জরণ শুনি তোমার কলহাস্যের ধ্বনিতে।
…………………………………………..

তুমি

তুমি আমার মেঘ ছুঁয়ে যাওয়া কোমল সারথি
হৃদয় আকাশের নীল পরী তোমায় নিয়ে মাতি।

কাঞ্চনজঙ্ঘার মেঘ ছুঁতে গিয়ে ছোঁয়েছি ঠোঁটের শিশির
তুমি আমার মঙ্গল কাব্য প্রহর দিবা নিশির।

সজল চিন্তার মোহিনী তুমি আমার হৃদয় নিয়া
জড়িয়ে রাখিও মেঘের ছোঁয়ায় কোমল পরশ দিয়া।

তোমার জন্যই বিষন্ন আকাশে ফোটাই তারার ফুল
তোমার জন্য দুঃখবোধে ভাঙে নদীর কোল।

হৃদয় তারা সাজিয়ে তোমাতে প্রসন্নতা খুঁজি
তোমার সিনায় সিনা চেপে জীবনটাকে বুজি।
…………………………………………..

স্বল্পদৈর্ঘ্যরে অনুভূতিকে ছুঁয়ে

অতঃপর তুমিতো আছোই স্বল্পদৈর্ঘ্যরে অনুভূতিকে ছুঁয়ে
যদিও অক্সিজেন ঋণে যাপিত সময় মালতি সন্ধ্যায়
রংতা কাগজের মতো ঝুলে থাকে বিষন্ন বাতাসে

চৈত্রদহনে খরায় পোড়া জামিন আর নিমগ্ন নিশ্বাসে পোড়া হৃদয়
প্রজাপতি দুপুরে বসন্ত বাতাসের সুর এবং সৌরভ ভুলে
আষাঢ়ে-আশি^নে কিংবা ডাহুকডাকা সন্ধ্যায় সমানে সমান

দেড় যুগের আদি-অন্ত পাশাপাশি যাপনের
ফলাফল দোল খায় চিন্তার বারান্দায়
নির্বাসনের ছাড়পত্র হাতে লালচে সন্ধ্যাকে তাড়িয়ে দিয়ে
দেহাতি চরাচরে নেমে আসে মৌন রাত
এর গভীরতা বুকের স্পন্দনকে কেড়ে নিয়ে
অনুভূতির সূক্ষ্ণ বলয় পার করে
মিশে যায় ছাই রং আকাশে

আগুন-জলের এ সংসারে-
জলহীন জীবনে কিঞ্চিত সান্তনা
তুমিতো আছোই স্বল্পদৈর্ঘ্যরে অনুভূতিকে ছুঁয়ে।
…………………………………………..

সুখ

লাটাই ছেড়া ঘুরির মতো
বাতাসে উড়েছে ক্ষয়িষ্ণু সুখ

ছায়া কিংবা কায়া হয়ে
দরজায় ঝালট দেওয়া বসার ঘরে
শতরঞ্জি পাতা শোবার ঘরের মখমল বিছানায়
অতবা তিতাস তীরের সবুজ তৃণাদির উপর
বেসুমার পড়ে থেকেছে গোলাপি রং সুখ
কুশীলব অন্তরালে নাড়ছে আলো-আঁধারির কলকাঠি

ভালোলাগার নিজস্ব অনুভবে তোমাকে
অভিসিক্ত করেছি সুখ নামে
আর বসতবাড়িসহ বিচরণ ভূমিটাকে সুখনগর

দিন-রজনীর প্রভেদ ভুলে তোমার অপসৃত ছায়ার
পিছু নিয়েছি কায়া হয়ে

নিস্তরঙ্গ জলের ভূগোলে খেয়েছি হাবু-ডুবু
দক্ষ মাঝির দিক্ষা নেইনি বলে
অতলের খোঁজ পাইনি আজও

সময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে শত চেষ্টায় ভাঙতে পারিনি
ওষ্ঠের সীমানা প্রাচীর
তোমাকেও দেখেছি নোম্যান্স ল্যান্ডের শাসন মেনে
সামাজিক আয়নায় রেখেছো মুখ

বাতাসে উড়ে চলা সুখ, তৃণাদিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে
থাকা সুখ, জলের ভূগোলে ভেসে চলা সুখ
ও ওষ্ঠের প্রাচীরে নেচে উঠা সুখের সন্ধানে নিরন্তর
বয়ে চলা বাতাসের মতো
আমার মাধ্যমিক জীবনের প্রাত্যাহিক ছুটে চলা।
…………………………………………..

নীল জলের জলসাঘর

জলের ছায়ায় পেতেছিলাম সাধের পদ্মাসন
নীল জলের জলসাঘরের তুরঙ্গে
সযত্নে শিরস্ত্রাণ রেখে
তিতাসের জলতরঙ্গে তুলেছিলাম পাতার বাঁশির সুর

বেলাশেষে কালিসন্ধ্যায় পরাণের সুর তুঙ্গে উঠলে
ভাটি রাতে দেখি লক্ষিন্দরের ভাসমান ভেলায়
বেহুলার জীবন সঙ্গীন

রাধাসম সারথি-
হর্ষ-বিষাদের এ খেলা সাঙ্গ হলে
মণসার অভিসম্পাত শিরে নিয়ে
তুমি কি ভাসবে সেই একই ভেলায়?
…………………………………………..

মাটির বিগ্রহ

হেঁটেছো তো পথ অনেকখানি
আলো-আঁধারের দিক রেখায়
কালের ধোয়াশা মেখেছো গায়
ধরেছো হাত ছাতিমের ছায়ায়
দুপুরের নির্জনতাকে সাক্ষি করে

কখনও আবার সুখকে গিলে খেয়েছে বিষন্ন সময়
কতবার উড়ন্ত সাপের মতো কালো মেঘ এসে
চাঁদকে ঠেলে দিয়েছে আঁধারের গুহায়
স্বপ্নের কত কথা যে গুমড়ে মরেছে
রংতা কাগজের মোড়কবন্দি হয়ে

একাকিত্বের রং নীল হয়
আমিও বুঝেছি অবেলায়
ঝাপসা চোখে চেয়ে চেয়ে দেখেছি
কিভাবে মানুষ আকড়ে ধরে থাকে জীবনের রথ

বুঝেছি মানুষ শুধুই মাটির বিগ্রহ
কেবল প্রেমের শক্তিতেই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার
…………………………………………..

জলজ জীবন

তিতাস আমার শৈশবের নদী
এর জলের একাংশ কোন এক অলৌকিক মোহমমতার ধারায়
প্লাবিত করে সুখনগরের বিস্তৃত ফসলের মাঠ-ঘাসের ক্ষেত
জলের মগ্নতায় ভেসে ভেসে আমিও হয়ে যায় সে রাতের সারথি

এ জলের সূচিকরণ ঢেউয়ের প্রহার হৃদয়ের তীর ভেঙে করে একাকার
তখন নিলাম্বরী জলের ভেতরই খুঁজি শান্তির নীড়
সোনারং বাঁশের গায়ে প্রিয়ার মতো জড়িয়ে ধরা সজিব লতা-গুল্ম
যৌবনের প্রতীক হয়ে ছুঁয়ে দেয় ভেজা দুটি পা

টলমলে নির্মল জলে ভাসা সুখনগর তখন পদ্ম ফুলের নির্জন জলাশয়
চারপাশে রঙ-বেরঙের কানপনা, দারকিনা মাছ আর জলজ
কীট-পতঙ্গের সংসার-শান্ত, উপদ্রপহীন, ভাবনাহীন জীবন

পদ্ম ফুলের অগণিত পাপড়িই তোমার
গোলাপী সেমিজ-ইলাস্ট্রিক ব্যান্ডে বাধা সালোয়ার
শাপলা পাতার উপর ভাসমান যৌথ দেহতরী
অদূরে জলশয়ের তীর ঘেসে ঘন-সবুজ বনানী
জলের ছোঁয়ায় উদ্দীপ্ত যৌবনা

তরী তটে ভিড়াবার তাড়া নেই-নেই কোন অনুশাসন
আহা! আমাদের যদি হতো ঘাসের জীবন, মাছের জীবন
জলজ কীট-পতঙ্গের সংসার!
লক্ষহীন, উদ্দেশ্যহীন জলের অন্তরালবর্তি মৃদু রাতে তির তির
ভেসে যেতাম অচীন সায়রে দু‘টি জলজ মানব-মানবী

মাড়াইনি তো কারো পাকা ধানের ক্ষেত-দেইনি ছাই ভাড়াভাতে
কার এমন কি আসে যায় আমাদের এ জলজ সংসারে
সমভিব্যবহারে যদি ফুঁটে অসংখ্য শাপলা-পদ্ম।