মহাকাশের বস্তুগুলোর দূরত্ব ও দূরত্ব মাপার একক

আমরা মহাবিশ্বের তুলনায় কতই ক্ষুদ্র। আমরা প্রায়ই বলি, আমার অফিস ১০ কিলোমিটার দূরে, আমার স্কুল ১ কিলোমিটার দূর বা ১০ মিনিটের হাঁটার রাস্তা। কিন্তু মহাবিশ্বের গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সির দূরত্বের হিসেব বের করার সময় আমরা বলি সূর্য পনের কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্হিত বা এত আলোক বর্ষ বা এত এত লক্ষ কোটি কিলোমিটার দূরে অমুক তুমুক গ্যালাক্সি অবস্হিত বা আমাদের পৃথিবী হতে সবচেয়ে কাছে দৃশ্যমাণ গ্যালাক্সি আলফা সেন্টরি ৪.৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্হিত।

বিজ্ঞানীদের এমন সব বিশাল বড় বড় দূরত্বের হিসেব করতে বা সে সব সংখ্যা লেখার জন্য কিছু কৌশল ব্যবহার করতে হয়েছে। যেমন : ১০০ কে ১০ দিয়ে গুণ করলে হয় ১০০০। কিন্তু তাকে লেখা হয় ১০৩। এখানে দশের উপর ছোট সংখ্যা ৩ টা হলো ঘাত।

ঘাত মানে শক্তি। গনিতে- ঘাত দ্বারা কোনো সংখ্যাকে ঐ সংখ্যা দিয়ে কতবার গুন করতে হবে তা নির্দেশ করা হয়। যেমন: ৫৪ = ৫x৫x৫x৫ = ৬২৫।

এভাবে লেখার ফলে বার বার শুণ্য লেখার প্রয়োজন হচ্ছে না। আর বড় সংখ্যা বা হিসেব সহজে কম জায়গায় কম সময়ে লেখা যাচ্ছে। যেমন : আমাদের মহাবিশ্বের বয়স দেড় হাজার কোটি বছর বা ১৫ লিখে ৯ টা শূণ্য দিলে যা হয় তত বছর হলো মহাবিশ্বের বয়স। ঘাত ব্যবহার করে মহাবিশ্বের বয়সের সংখ্যাটা লিখলে হবে ১৫ x ১০৯ বছর।

আবার আকাশের হংসমন্ডল-এর ৬১ নং তারা ৬১ সিগনি ১০৩ x ১০১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্হিত। এভাবে সংখ্যা দিয়ে লিখলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বড় বড় হিসেব করা সহজ হয়।

কিন্তু তারপরও আরো বড় হিসেব বোঝানোর জন্য আরেকটা দূরত্বের একক জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যবহার হয়। এটা হলো আলোক বর্ষ।
শূণ্যস্থানে আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকে এক আলোকবর্ষ বলে। আর আলো প্রতি সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল বা ৩ লক্ষ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে।
১ আলোববর্ষ = আলো এক বছরে যে দুরত্ব অতিক্রম করবে,তাকেই ১ আলোকবর্ষ বলা হয়ে থাকে।
আলোকবর্ষ কেন ব্যবহার করার কারণ আছে ।
ধরুন আপনি হতে সেন্ট মাটিন যাবেন। তখন আপনাকে ঢাকা হতে সেন্টমার্টিন যেতে ৫০৮ কিলোমিটার যেতে হবে।
যখন আপনি আমেরিকার নিউইয়র্ক যাবেন ঢাকা হতে, তখন আপনাকে ১২,৭৪৯ কিলোমিটার যেতে হবে।
অতএব আপনি যদি এভাবে যত দুরত্বে যাবেন,ততই কিলোমিটার এর সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।
পৃথিবী থেকে সূর্যে যেতে আপনাকে লিখতে হবে ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল বা ১৫ কোটি কিলোমিটার। আর এভাবে আরো যত দুরে যাওয়া যাবে,ততই এর দুরত্ব বাড়তে থাকবে। এই দূরত্ব শূণ্য ব্যবহার করে লেখাও কষ্ট সাপেক্ষ হয়ে যাবে।
এজন্য আলোক বর্ষ ব্যবহার করা হয়।

আলোক বর্ষ হল একটি দৈর্ঘ্য পরিমাপের একক, যা দিয়ে জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত দূরত্ব মাপা হয়। এক আলোক বর্ষ সমান ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার বা ৯.৪৬১×১০১৪ কিলোমিটার। এক ট্রিলিয়ন লিখতে হলে ১ লিখে ১৪ টা শূণ্য লিখতে হয়।
সুতরাং আলোক বর্ষ এককটা বেশি বেশি শূণ্য লেখার কাজটাকে কমিয়ে হিসেব করার কাজকে সহজ করে দিলো।
আমরা এখন বলি আমাদের কাছে তারা আলফা সেন্টরি ৪.৩ আলোক বর্ষ দূরে। উজ্জ্বল দানব তারা আর্দ্রা ৫২০ আলোক বর্ষ দূরে।

আবার আকাশের হংসমন্ডল-এর ৬১ নং তারা ৬১ সিগনি ১০৩ x ১০১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্হিত বা ১১.৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্হিত। আজ যদি এই তারার আলো নিভে যায় তাহলে সে খবর পেতে প্রায় ১১ বছর ৪ মাস লেগে যাবে।
ঠিক তেমনি সূর্য হতে আমাদের কাছে আলো আসতে সময় লাগে ৮ মিনিট। সূর্য নিবে যায় বা আলোহীন হয়ে যায় তাহলে আমরা নিজেদের অন্ধকার অবস্হায় পাবো ৮ মিনিট পর।
এভাবে উজ্জ্বল দানব তারা আর্দ্রা ৫২০ আলোক বর্ষ দূরে থাকা অবস্হায় নিভে গেলে তার খবর পাবো আমরা ৫২০ বছর পর।
পৃথিবী হতে আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ের শেষ মাথার দূরত্ব ৫২হাজার আলোক বর্ষ। তার মানে হলো আমরা এমন একটা আকাশযানে করে যাই যেটা এক বছরে আলোর দূরত্বের গতি চলার পর ৫২ হাজার বছর পর আমরা ছায়াপথের শেষ মাথায় পৌছতে পারবো। সুতরাং আমাদের মহাবিশ্ব কতই না বড় আর কতই না ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র।

(জেনে রাখা ভালো : এই আলোক বর্ষ ছাড়াও আরেকটা দূরত্বের একক আছে যাকে বলা হয় পারসেক। ৩.২৬ আলোক বর্ষে ১ পারসেক হয়। এবিষয়ে পরে আলোচনা করবো।)