আমি তোমার কাছ থেকে একটু ভালোবাসা খুঁজি। অথচ তুমি যখন আমায় ঘৃণা কর তখন তোমার আগে-পরের সমস্ত ভালোবাসা আমার নিকট কালো মেঘের মত মনে হয়। তুমি ও আমি জন্ম থেকেই আলাদা।
মায়ের গর্ভ ছেড়ে তুমি যখন আতুর ঘরে কাঁদছিলে। ঠিক ঐ সময়ে তোমার বাবা খুঁশি হয়ে আজান দিতে উদ্যত হলো। আহা! কি মধুর কণ্ঠে হাত দু’খানি কানে বেঁধে সু-মিষ্ট সে ভাষ্যটুকুন বলেছিল। আর আমার কি হয়েছিল? আমি আতুর ঘরে কান্নারত। ওদিকে মায়ের চোখে পানি, বাবার চোখে সহস্র অভিমান, আত্মীয়-স্বজন সকলে কটুভাষী। সু-মধুর সে ধ্বনি হয়তো আমার ভাগ্যে জোটেনি।
তোমার জন্য বাজার থেকে আনা হয় মিষ্টির বড় হাড়ি। অন্যদিকে আমার কারণে বাড়ীতে চুলা জ্বলেনি তিন দিবসের কালে। তোমাকে পরানো হয়েছিল নতুন কাপড় ও নরম-কোমল রুমাল খানি। আমি তখন মায়ের ছেড়া কাঁথায় রক্ত চোখের পানি। তোমাকে খাওয়ালো মধু-মিষ্টি-দই। আমি তখন খেয়েছি বাম হাতের আঙ্গুলের ধূলা-মাটি-রক্তই।
ক’দিন যেতে তোমাকে সাঁজালো রঙিন পোশাকে। আর আমাকে দিল মায়ের পুরানো কাপড়ের আঁচল জড়ায়ে। তুমি পেলে নতুন জামা এবং আমি পুরানো। তোমার বাবা তোমাকে নিয়ে কাঁধে ছুটে দিগি¦দিক। আমার বাবা আমায় দেখে কষ্ট পায় সারাদিন। তুমি থাক হাসি-খুশি, ওদিকে আমি মরি মহা দুঃখে। তিন বেলা আহার তোমার ,আর এক বেলাতেই সুখ আমার।
তুমি স্কুলে যাওয়া শুরু করলে। আমি রান্না ঘরে মায়ের সাথে কাজ শিখি। একদিন আমাদের বাড়ীতে আসলো এক শিক্ষক মশায়। তিনি আমাকে দেখে বাবাকে বললেন- তোমার মেয়েকে স্কুলে দিতে পারো। ওর অনেক বুদ্ধি, দেখবে তোমার সম্মান বাড়াবে সে। বাবার মন একটু নরম হলো। সুজোগ হলো আমার স্কুলে যাওয়ার । তুমি ক্লাসের সবার সেরা আর আমি পড়াশোনায় গাধা।
দিন আসে দিন যায় আমিও তোমাদের সব কিছু বুঝে ফেলি। দিন-রাত চব্বিশটি ঘণ্টা খাতা-কলম-বই নিয়ে পড়তে থাকি। ক্লাস ফাইভ শেষে দেখি আমি-ই সেরা। তোমার তখন লজ্জা তাড়া। অনেক দিন পরে এই প্রথম বাবার মুখে হাসি দেখেছি। চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারিনি, বোধহয় আমার জন্ম স্বার্থক হল। সুখের কাঁন্নায় বুকটি ভাঁসিয়েছি।
রবের দিকে তাঁকিয়ে ভেবে ছিলাম.. তোমার খেলার শেষ কোথায়? প্রশ্ন করে কোন উত্তর পায়নি।
তুমি দেখতে একটু বড়। আর আমি নারীত্ত্বে প্রবর্তনরত। লজ্জা আমায় জড়ায়ে নেয় অতি দ্রুত। ওদিকে তুমি তাড়াহুড়ো করে লজ্জাহীন হয়ে উঠেছো। আমি সূর্যের চাহনি দেখিতে পাই না। অন্য পাশে তুমি আকাশের সব চিন।
আমি মনে মনে তোমার সাহায্য চেয়েছি। কারণবশত তুমি চেয়েছ আমার নারীত্ব। আর সমাজ দিয়েছে আমাকে অবহেলা। যদিও প্রতিটি ধর্ম আমাকে দিয়েছে সম্মান। ইসলাম ধর্ম আমার পদযুগলে জান্নাত রচনা করেছে। অন্যরা দিয়েছে মাতার মর্যাদা।
পুরুষের মত আমারও দুই হাত, দুই পা, দুই চোখ, দুই কান এবং নাক-মুখ হুবুহ একই। কিন্তু পার্থক্য ঐ জায়গায়, আমি যখন বাহু দিয়ে ওড়নাটা চেপে ধরি, ঠিক তুমি তখন হস্ত যুগল আকাশ পানে তুলে বুকটাকে প্রশস্ত করে দাও। আমি চলতে পথে মাটির দিকে চেয়ে থাকি, আর তুমি সূর্যের সাথে আলিঙ্গন করে চলো।
আমি পদযুগল গুঁছিয়ে লজ্জাকে লুঁকাই। অন্য পাশে তুমি লজ্জার মাথা খেয়ে ছুটছো। তুমি রোপন করো বৃক্ষ চারা। আর আমি চারা গাছের রক্ষণাবেক্ষনের মাতা।
তুমি আমার কাছে সুখ-শান্তি-কামনা খুঁজে ফের। ওদিকে আমি পুরুষের বাসনায় দিবা-নিশী ব্যাকুল। নারী তত্ত্বের সকল প্রকাশ পেতে শুরু করেছে আমার মাঝে। তোমার কিন্তু পুরুষ হতে এখনো অনেক বাকি ?
আমার বাবা আমাকে বন্দি করার চেষ্টা করে। তাঁর কত ফন্দি! কাপড়-চোপড় বেশি বেশি পরো, নেকাব-বোরকায় নিজেকে পুরো লুঁকিয়ে রাখ। কিন্তু কেন ? এসবের প্রয়োজন কি, আমি তো মনের পর্দার কিছুই বুঝি না। তবে বাইরের আবরণের কি বুঝবো। আমি অনেক কিছু হতে চাই। আমাকে কেন বেঁধে রাখবে? কই ইসলাম ধর্ম তো আমাকে কখনও অসম্মান করেনি। যুদ্ধ-সংগ্রাম-আন্দোলনে ইসলাম আমাকে অবহেলা করেনি। হযরতে সুমাইয়ার রক্তেই ইসলামের যাত্রা শুরু।
এখানে উদ্দেশ্য ছিল একটাই-শালীনতা এবং ভদ্রতা। আমিও সেই আদর্শকে সম্মান করি। আমিও চাই উম্মুল খাদিজা রা. এর মত নিষ্কলঙ্কিত হতে। হযরত মাতা আয়েশা রা. এর মত যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে। হযরত আমেনা রা. ও মরিয়মের মত সম্মানিত গর্ভ আশা করি আমি।
আমাকে আর লজ্জা দিও না। খোলা পোশাকে আর যেতে বলো না পল্টন ও টি এস সি তে। আমি তোমাদের মাতা, আমাকে সম্মান করতে শিখ। আমাকে পরতে দিও সাবলীল ও মার্জিত কাপড়। আমার বিপদে এসে তোমার শক্ত বাহু দিও উন্মুক্ত করে।
আমি কি কেবল শুধু প্রজনন কেন্দ্র ? না না তা হতে পারে না। আমি দেশ-জাতি-বিশ্ব গঠনে তোমার সমতুল্য। সূয যখন তোমাকে-আমাকে সমান ভাবে পথ দেখায়, অক্সিজেন যখন কাউকে কম-বেশি পার্থক্য করে না, মহা গ্রন্থে রব সুরা নিসা আর নূরের কথা বলে।
তবে তোমরা কেন রাখবে আমায় দরজা বন্ধ করে। কেন যুবকের চোখে হবো আমি চাহনি। কেন হতে হয় আজ ধর্ষিতা। কেন হবো সীমান্তের বলি। কিসের জন্য আমাকে রাখ পতিতালয়ে। লজ্জার মাথা খেঁয়েছ কি পুরুষ জাতি। তোমার বোনকে লাঞ্চিত করে নিকৃষ্ট ঘৃণ্য পাপী। আর কত কথা বললে তুমি হবে সংগ্রামী, আর তোমার বোনেরা পাবে সম্মান..