বাংলাদেশ তো বটেই, সারা পৃথিবীতে আরবী সাহিত্যপ্রেমী কিশোরদের অধ্যয়নতালিকায় প্রিয়বই হিসেবে যে দু-একটি সর্বশীর্ষে- এসবের মধ্যে অন্যতম ‘ছুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা’ কিংবা ‘ছুয়ারুম মিন হায়াতিত তাবিয়ীন’। আরবীতে রচিত এ অনবদ্য দুটি গ্রন্থ ফার্সি, উর্দু, পর্তুগিজ, রাশিয়ান, আলবেনিয়া, তাজিক এবং উইগুরসহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত ও প্রশংসিত হয়েছে। যে মানুষটির এমন হৃদয়ছোঁয়া বর্ণনার বদৌলতে বইগুলো আজ অজস্র শিশু-কিশোর কিংবা যুবক-তরুণের হাতে হাতে, তার সম্পর্কে আমাদের জানাশোনার পরিধি খুবই সীমিত। আজকের এ ছোট লেখাটি তাকে নিয়েই উৎসর্গিত।
সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে আরিহা নগরীতে ১৯২০ সালের ৪ঠা এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই প্রখ্যাত প্রসিদ্ধ লেখক আব্দুর রহমান রাফাত বাশা। ছোটবেলার পড়াশোনা শেষ করে সিরিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন প্রতিষ্ঠান ‘মাদারাসা খসরুউইয়াহ’তে মধ্যমস্তরের পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। তারপর মিশরের কায়রো এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং আল আযহারে ‘উসুলুদদীন’ বিভাগ থেকে উচ্চস্তরের পড়ালেখা সমাপ্ত করেন। এরপর কায়রো জামেয়ায় তিনি আরবী সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং ডক্টরেট ডিগী অর্জন করেন।
কর্মজীবনে আব্দুর রহমান রাফাত বাশা বিভিন্ন স্তরে চাকরি করেছেন। প্রথমে শিক্ষক হিসেবে তারপর সিরিয়ার আরবী ভাষা পরিদর্শক- এভাবে ধীরে ধীরে দামেশক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য বিভাগে শিক্ষক হিসেবেও যোগদান করেন। তারপর বেশ কয়েকবছর সৌদীআরবের ইমাম মুহাম্মদ বিন সউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবী ভাষা বিভাগে প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
পড়াশোনা এবং কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি কুরআনের ভাষা ও সাহিত্যে অনুরাগী ছিলেন এবং বর্ণনাভঙ্গি ও চিত্রায়নে মনোযোগী হয়েছিলেন। যুগে যুগে আরবী সাহিত্যে ইসলামের লেখক ও কবিদের অবদান সম্পর্কে তিনি গভীর গবেষণা করেছেন এবং এ বিষয়ে তার তত্ত্বাবধানে অনেকগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।
নবুওয়াতের যুগ থেকে শুরু করে আব্বাসী যুগ পর্যন্ত আরবী গদ্য ও পদ্যে ইসলামের দাওয়াত ও বাণী নিয়ে তার এ মূল্যবান কর্ম আজো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
আরবী সাহিত্য এবং নবী ও রাসুলদের স্বর্ণালী ইতিহাস সাধারণ মানুষ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ব্যাপকভাবে তুলে ধরার উদ্দেশে আমরণ নিজের মেধা ও প্রতিভা ব্যয় করে অমর হয়ে আছেন আব্দুর রহমান রাফাত বাশা। ১৩৯৫ হিজরী সন থেকে তিনি সৌদীআরবের রাজধানী রিয়াদে রেডিও প্রোগ্রামে আরবী ভাষা ও সাহিত্যের মর্যাদা এবং মাহাত্ম্য তুলে ধরতেন আরবদের উদ্দেশে।
এভাবে তিনি প্রায় ২৪০টি পর্বে সাহিত্যের প্রতি সচেতন মমতা জাগিয়ে তোলার জন্য নবীনদেরকে উৎসাহ দিয়েছেন, সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয়ে বোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
ছুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবাহ, ছুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবিয়াত, ছুয়ারুম মিন হায়াতিত তাবিয়িন, আরদুল বুতুলাত, নাহওয়া মাযহাবিন ইসলামিয়্যিন ফিল আদাবি ওয়ান নাকদি, আল উদওয়ানু আলাল আরাবিয়্যাহ উদওয়ানুন আলাল ইসলাম’সহ তার বেশ কিছু রচনা ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।
রাবেতায়ে আলমে ইসলামীর আন্তর্জাতিক সাহিত্যসংস্থা গঠনপ্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা অপরিসীম। সাইয়েদ আবুল হাসান নদভী রহ. এর তত্ত্বাবধানে তিনিও এ সংগঠনটির তৈরী ও কর্মপ্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। ১৯৮৬ সালের জুলাই মাসের ১৮ তারিখে এ মনীষী লেখকের ইন্তেকাল হয়। আলফাতেহ কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়- ওই কবরস্থানেই আরও অনেক সাহাবী এবং তাবেয়ীর কবর রয়েছে।
জীবনভর যাদের ভালোবাসায় আকুল হয়ে তিনি আরবী সাহিত্যের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তাদের কবরস্থানেই চিরশয্যায় শায়িত হওয়ার সৌভাগ্য আব্দুর রহমান রাফাত বাশা’র অমূল্য কর্মের স্বীকৃতিও বটে।