ভূমিকা
হিজরী তৃতীয় শতকে, স্পেন যখন উমাইয়া শাসনাধীন, সে সময় সেখানে সমান্তরাল আরবী সাহিত্য সাধনা শুরু হয়। নিঃসন্দেহে, ইসলামের ইতিহাসের মতোই আরবী সাহিত্যের ইতিহাসেও স্পেন একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। এখানকার সাহিত্যিকদের হাত ধরে আরবী সাহিত্যে একটি বিশেষ ধারার কবিতার প্রবেশ ঘটে, যা আমরা الموشح নামে জানি। স্পেনীয় ভাষায় মুখে মুখে রচিত লোক-গীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আরবী কবিরাও আগ্রহী হন আরবীতে লোকসঙ্গীত রচনায়, এটাকেই আরবীতে الموشح বলে। কিন্তু অনেকের মতে স্পেনে এর প্রচার-প্রসার ঘটলেও সেখানেই যে এর উৎপত্তি, এমনটা নয়। উৎপত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত আমরা নিম্নের আলোচনায় জানব। তবে এটা অনস্বীকার্য যে, الموشح কবিতা স্পেনকে ইতিহাসের পাতায় বিশেষ স্থান দিয়েছে।

الموشح-এর পরিচয়
الموشح এর বহুবচন হলো الموشحات। ইবনু সিনা আল-মালিক এর সংজ্ঞায় বলেছেন—
“الموشح كلام منظوم على وزن مخصوص بقواف مختلفة” (ভিন্ন অন্ত্যমিল ও বিশেষ ছন্দ সম্বলিত কাব্যিক বাক্যগুচ্ছই হল মুওয়াশশাহ)। মুহাম্মাদ বিন আবী শানাব-এর প্রদত্ত সংজ্ঞায় “قصيدة منظومة للغناء” (সঙ্গীতের উদ্দেশ্যে রচিত কবিতা)। স্পেনীয়দের কাছে আলংকারিক ও ছান্দিক বৈচিত্র্যে এই প্রকার কবিতা যথেষ্ট কঠিন ছিল। তবে আধুনিক আরবী সাহিত্যের একটি অভিধানে বলা হয়েছে- الموشح হলো সাহিত্যে একটি বহিরাগত রূপ যেটাকে আরবী কাব্য গ্রহণ করেছে। একটি নির্দিষ্ট ধারায় রচিত হলেও এতে ছন্দ- অলঙ্কারের কোনোরূপ বাধ্যবাধকতা নেই; যেটা কবির চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।

الموشح শব্দটি এসেছে توشيح শব্দ থেকে, যার অর্থ কারুকার্য করা বা সৌন্দর্যায়ন করা। ইতিহাসবেত্তারা এর তুলনা দিয়েছেন وشاح বা ঘাগরার সঙ্গে যাতে দুই রকম রত্ন পরস্পর গ্রথিত করে কারুকার্য করা থাকে। ঠিক তদ্রুপ الموشح কবিতাতেও ভিন্ন ছন্দ-অন্ত্যমিলের ফলে তা ব্যতিক্রমী উৎকর্ষ বহন করে।

موشّح –এর মধ্যে তিনটি অংশ থাকে। যথা— خرجة, قفل, مطلع। مطلع হলো কয়েকটি ছত্রের প্রথম সমষ্টি। এই অংশে ছত্রের সংখ্যা দুই থেকে আট পর্যন্ত হতে পারে। যদি আটটিই ছত্র থাকে তাহলেتام موشّح বলে, না থাকলে বলে أقرع। আবার প্রতিটি ছত্রের অন্ত্যমিল একও হতে পারে, বিভিন্নও হতে পারে। مطلع অংশটির একটি নির্দিষ্ট নিয়ামানুসারে পুনরাবৃত্তি হয়। যেখানে পুনরাবৃত্তি হয় সেই অংশটিকে বলে قفل। قفل ছত্রসংখ্যা নির্দিষ্ট থাকে না। তবে অধিকাংশ موشّح পাঁচটি পাওয়া যায়। আর শেষ قفل টিকে বলা হয় خرجة।
وزن বা ছন্দের দিক থেকে موشّح পাঁচ প্রকার। প্রথমত, গতানুগতিক ছন্দে রচিত। দ্বিতীয়ত, বিশুদ্ধ ছন্দের মধ্যে কেবল একটি অক্ষর বা একটি শব্দের পরিবর্তন থাকবে। তৃতীয়ত, একাধিক ছন্দের সমন্বয় ঘটবে। চতুর্থত, বিশুদ্ধ ছন্দের বাইরে অপর এমন কোনো ছন্দ থাকবে যা কেবল পাঠ করলে শ্রুতিতে উপলব্ধ হবে। পঞ্চমত, কোনো ছন্দই থাকবে না; অক্ষর দীর্ঘ, হ্রস্ব বা যুক্ত উচ্চারণের মাধ্যমে শুধু সুরের বৈচিত্র্য থাকবে।

الموشح-এর উৎপত্তি
হিজরী তৃতীয় শতকের ( খ্রীষ্টিয় নবম শতকের) শেষভাগে স্পেনে এই বিশেষ কাব্যরীতির উদ্ভব ঘটে। কিন্তু স্পেনে উৎপত্তির এই তত্ত্বটিকে ابن خاتمة (ইবনু খাতেমাহ), ابن بسّام (ইবনু বাসসাম), ابن خلدون (ইবনু খালদুন), مقرّي (মুক্বিররী)-র মতো বিদ্বজনেরা ভ্রান্ত বলে পরিগণিত করেছেন। অনেকের মতে موشّح এর প্রথম দেখা মেলে ابن المعتز (ইবনুল মু’তায)-এর দীওয়ানে। স্পেন ভূখন্ডে কবিতাসাহিত্যের এই ধারাটির বিকাশের পিছনে মুখ্য ভূমিকা কার তা নিয়ে মতানৈক্য বিদ্যমান। কারও মতে محمّد بن حمّود القبرّي (মুহাম্মাদ বিন হাম্মূদ আল ক্বাবরী), কেউ বলেছেন ابن عبد ربّه (ইবনু আবদে রাব্বিহী)। তবে حجازي (হিজাযী) তার المسهب في غرائب المغرب গ্রন্থে উদ্ভাবক রূপে উল্লেখ করেছেন তৎকালীন গভর্নর আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আল-হাকামের সময়ের অন্যতম কবি مقدم بن معافى القبرى (মুক্বাদ্দাম বিন মুয়াফী আল ক্বাবরী)- র নাম। তার পর এর অগ্রগতির পথ প্রশস্ত হয় ابن عبد ربّه ও কর্ডোভার বিশিষ্ট কবি يوسف بن هارون الرمادي (ইউসুফ বিন হারূন আল রামাদী)-এর হাত ধরে। এরপর الموشح তার মৌলিকত্বে, গঠন ও রচনা বৈচিত্র্যে একটি স্বতন্ত্র কাব্যধারা রূপে পূর্ণতা পায় عبادة بن قزّاز (উবাদাহ বিন ক্বাযযায)–এর ছোঁয়ায়। এমনকী الموشح-এর উপর ইবনু সিনা আল মালিক একটি বই লেখেন, যার নাম— “دار الطراز في عمل الموشحات”। ইবনুল খাতীবের جيش التوشيح- এর মতো বিভিন্ন গ্রন্থে, স্পেনেই الموشح এর উৎপত্তি বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে একটি গোষ্ঠী الموشح-এর উদ্ভাবক রূপে باسل الفوزان (বাসিল ফাওযান)–এর নামোল্লেখ করেছেন।

الموشح-এর উন্নতি
অন্যান্য বিষয়ের মতোই الموشح-এর ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটেছিল অর্থাৎ প্রথম যুগের রচনার নিদর্শনগুলিকে যুগ মুছে দিয়েছে। এরপর দীর্ঘসময় প্রাথমিক যুগের মুকাদ্দাম বা তার সমসাময়িক কবিদের রচিত কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি। কিন্তু আরবী সাহিত্যিকরা ব্যাপক আকারেই তার চিত্র নতুনভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়। ফলে তা আরবী কবিতার الخمر,الطبيعة, الغزل প্রভৃতি ভাবের মিশ্রনে সঙ্গীতরূপে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রথমদিকে ছোটখাটো সমাবেশে চিত্তবিনোদনের জন্য রচনা করা হলেও পরবর্তীতে আরবী কবিতার গতানুগতিক বিষয়বস্তুকেও আপন করে নেয় মুওয়াশশাহ। বলা বাহুল্য, প্রচলিত স্পেনীয় ভাষার অনুকরণ না করে এর সম্পূর্ণটাই আরবী ভাষায় লেখা বা বলা হতো। উদ্ভাবনের পর দীর্ঘকাল স্তব্ধ হয়ে গেলেও الموشح-এর যাত্রা নতুন ভাবে গতি খুঁজে পায় এবং নিজ ছন্দে এগিয়ে চলে—হিজরী পঞ্চম শতাব্দীতে এসে যার সর্বাধিকটা আমরা দেখতে পাই। অতঃপর আরও একটি শাখা উদ্ভূত হয় যা زجل নামে প্রসিদ্ধ। অবশেষে এইরূপ লোকসঙ্গীত দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। যথা—
১) لون الموشحات – যেটা বিশুদ্ধ লেখ্যভাষায় লিখিত হত।
২) لون الأزجال – যেটা চলিত কথ্যভাষায় লিখিত হয়।
এই দুইটি ধারা ক্রমশঃ স্পেন থেকে প্রাচ্যের পথে পা বাড়ায়। সাথে সাথে বাড়তে থাকে এই ধারায় কবিতা রচয়িতার সংখ্যা। এমনকী এর সঙ্গে পরিচিত হয় ইউরোপীয় সাহিত্যও। দক্ষিণ ফ্রান্সে التروبادور (troubadour) নামক কবিগোষ্ঠী, স্পেনের গীতিকাররা এই ধারায় প্রভাবিত হন। ইতালীয় কবিগণ এই কাব্যরীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ধর্মীয় কবিতার পাশাপাশি সঙ্গীতধর্মী (بالآت/ballad) কবিতা লিখতে থাকেন। নিচে একটি الموشح-এর নমুনা দেওয়া হলো-

يقول بعض الأندلسيين:

أيّها الساقي إليك المشتكي
قد دعوناك وإن لم تسمع
ونديمٍ هِمتُ في غُرّته
وبشرب الراح من راحته
كلّما أستيقظ من غفوته
جذب الزقّ إليه واتكا
وسقاني أربعا في أربع
বঙ্গানুবাদ-
ওহে সুরাপাত্রবাহক, অভিযোগ তোমার কাছেই,
আমরা তোমাকে ডেকেছি যদিও তুমি শোনোনি।
কত সুরাসঙ্গীর শুভ্র চেহারার প্রেমে পড়েছি,
ব্যাকুল হয়েছি তার হাত হতে মদ্যপানের জন্য।
যদ্যপি তার খুলেছে চক্ষু ঈষৎ তন্দ্রা হতে,
ওয়াতকা (ভদকা?) তাহাকে নিয়েছে যে টেনে পানপাত্রের প্রতি।
এবং আমারে করায়েছে পান একটু একটু করে।