“হারামজাদি আজ তোকে শেষ করে ফেলব! চুরি করে সব খেয়ে ফেলিস, ঠিক মত কাজ করিস না-তোর কোন্ বাপের কামাই সব খাবার সাবাড় করিস!” চুলের মুঠি ধরে সপাং, সপাং বেত্রাঘাত করতে থাকেন শাহিনা বেগম। কয়েক ঘা দেয়ার পর নিজেই হাঁপাতে থাকে। এই কে আছিস পুলিশকে ফোন দে মর্জিনাকে থানায় নিয়ে যেতে। আজ তোকে থানায় দেব।
-মোর্শেদ কই? মোর্শেদ, মোর্শেদ বলে শাহিনা বেগম ডাকে ছোট ছেলেকে।
-কী হয়েছে মা, এত চেঁচাচ্ছো কেন? মোর্শেদ বলে।
-কী বললি? আমি চেঁচাচ্ছি? আর তোরা সবাই বসে বসে দেখ। সব তো শেষ করে দিচ্ছে ওই মগিনী!
-ঠিক আছে। কাল সকাল হোক, এখন এত রাত্রে পুলিশ ডাকা কি ঠিক হবে? আমি ঘুমাতে যাচ্ছি।
-তোরা আরামে ঘুমা, আর আমি চোর নিয়ে সারারাত বসে থাকি!
রাত ১টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। শাহীনা বেগমের চিল্লা-ফাল্লায় বাসার সবাই জড়ো হয়। কেউ কেউ বিরক্ত প্রকাশ করে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়।
ভিটে বাড়ি সব জ্বালিয়ে দিয়েছে বর্মী সৈন্যরা। সহায়-সম্বল কিছু আনতে পারেনি, কিছু নগদ টাকা ও স্বর্ণ সাথে ছিল। স্থানে স্থানে সব শেষ হয়ে গেছে। পানির দরে স্বর্ণগুলো বিক্রি করে। হাত একদম খালি। মা রাখতে দিয়েছিল। এদেশে এসেছে কোনোমতে প্রাণে বাঁচার জন্য। আরেকটুর জন্য ইজ্জত খোয়ায়নি। কিন্তু পাড়ার ময়না, টুম্পা, রেহেনাদের প্রাণও গেছে। ইজ্জতের কথা আর কী বলব? সে রাতের কথা মনে পড়লে গা শিউরে উঠে! এত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে প্রাণটা যে আছে তার জন্য শোকরিয়া আল্লাহর কাছে। আসার পথে দালালদের মোটা অংকের টাকা গুণতে হয়েছে।
আজ গৃহকর্ত্রীর এমন নির্দয় প্রহারেও কিছু মনে হয়নি। আগে পালিয়ে আসা এক আত্মীয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রামের এক বাসায় কাজ নিয়েছে। পথে পথে আসার সময় কতজনের চোখ রাঙানি মোকাবেলা করতে হয়েছে। দরদাম করেনি। যাওয়ার তো স্থান নেই। আশ্রয়ই বড় বড় কথা। টাকা দিয়ে কী করবে? যেখানে জান নিয়ে টানাটানি। মোট ছয়দিন এ বাসায়। প্রচণ্ড খিদে লেগেছিল। কতদিন পেটভরে খায়নি। রাতেও আধ-পেটা খেয়ে ঘুমিয়েছিল। এমন খিদে লেগেছে বলার মত না। অন্ধকার কিচেন রুম। সেখানে তার রাতে শোয়ার জায়গা। তারপরও কোন অসুবিধা হচ্ছে না। মাথাগুজার ঠাঁই অনেক বড় কথা। দোষ একটাই কিছু দেখলে খেতে ইচ্ছে করে। বেশি কিছু না কিছু মুড়ি আর কয়েকটা বেলা বিস্কুট। মজা করে খাচ্ছিল। কিন্তু বিস্কুটের খ্যাচ খ্যাচ আওয়াজে উঠে গেছে গৃহকর্ত্রী। টের পায়নি এসেছে। হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। পেছন থেকে চুলের মুঠি ধরা।
রোহিঙ্গা মুসলমানরা আসছে ওপার থেকে হাজারে হাজারে, লাখে লাখে। কারো হাত শুন্য, কারো পিঠে শিশু, কোনো কোনো মহিলা গর্ভবতী হওয়ায় ভারি শরীর নিয়ে হাঁটতে পারছে না। কয়েকজন বৃদ্ধকে চ্যাং দোলা করে দড়ি দিয়ে কেমন করে বেঁধে একটি ছেলে বহন করছে। এ এক নিঠুর দৃশ্য! ভয়াবহ নির্যাতনে কাহিল। বাংলাদেশ থেকে আরাকান রাজ্যের বাড়ি-ঘর পোড়ার করুণ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। পরিষ্কার আকাশ, হঠাৎ মেঘের কুন্ডলি। বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। আগুন বৃষ্টি হচ্ছে। মগের মুল্লুকের বর্মীবাহিনী একটি জাতিকে পুরো নির্মূল করার অভিযানে নেমেছে। ধর্মকে হাতিয়ার বানিয়েছে। দেশ থেকে তাড়ানো মিথ্যে কাহিনি ফেঁদেছে। ওরা নাকি বাংলাদেশ হতে গিয়েছে সেখানে। অথচ শত-হাজার বছর থেকে বসবাস করে আসছে।
সব ছিল আরাকানে। গোলা ভরা ধান, ধানি জমি, পুকুর ভরা মাছ। মাঠ স্কুল, পাঠশালা, কলেজে, মাদ্রাসা, ক্লাব, হাট-বাজার সব। কিন্তু শান্তি ছিলো না। মাঝে মাঝে ওরা এসে হুমকি দিত। ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালানোর জন্য শসিয়ে দিত। কতজনকে হানাদাররা গুম করে ফেলেছে। ধরে নিয়ে যেত আর হদিস পেত না। মনিরুল ভাইয়ের জন্য মনটা কেমন করে? এক রাতে এসে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। আর তার খবর নেই। কী সুন্দর চেহারা, নায়কোচিত ফিগার। আর মনটাও বেশ! মাঝে মাঝে ইয়ার্কি করত। বলত মর্জিনা, আমি একদিন দূরে কোথাও চলে যাব? আর আমাকে পাবে না! আমার সাথে যাবি? নিরব থাকে সে! পালিয়ে বিয়ে করা সম্ভব না! বাবা সম্মানী মানুষ। বাবা-মাকে না বলে কোথাও যাবে না। বাবার অমতেও কিছু করা যাবে না। সেই ভয়াল রাতের ক’দিন আগে চাঁদনি রাতে হাতটা খপ করে ধরে। ভয়, লজ্জায় আমার বুঝি প্রাণ বেরিয়ে যায়! আমি হাতটা সর্বশক্তি দিয়ে ছাড়িয়ে নিই। তিনি হাসলেন। সেই হৃদয় তোলপাড় করা হাসি! মিষ্টি স্বরে বললেন, এত জোরে টান দিছো কেন? আমি কী বাঘ না ভাল্লুক! তোমাকে কী খেয়ে ফেলতাম। আজ মনিরুলকে অনেক মনে পড়ে! কেমন আছে সে?
মংডুতে আমাদের দোতলা বাড়ি, গরু, জমি জিরাত, চাষবাস সব ছিল। ধার-দেনা করতে হতো না। স্বচ্ছল পরিবার। তার গায়ের বরণ শ্যামলা। সুন্দর ছিম-ছাম ফিগার। প্রথম দেখাতে যে কারো ভালো লেগে যাবে। বিয়ের জন্য প্রস্তাবের পর প্রস্তাব আসে। পড়ালেখায় বেশ ভালো ছিলাম বিধায় বাবা কোন সম্বন্ধের কথা আসলে না করে দিত। বাবা বলতেন, ‘আমার মর্জিনারে প্রফেসর বানামু। শিক্ষিত হইয়া গ্রামের মানুষগুলারে জ্ঞানের আলো বিতরণ করবে।’ সমাজের লোকেরা বেশির ভ্গাই অশিক্ষিত। দেশের মানুষ শিক্ষা না পেলে উন্নতি করতে পারবে না। সচেতন হবে না। বাড়ি ভিটে রক্ষা করতে পারবে না। শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। বাবা-মা কোথায় আছে কেমন আছে খবর পায়নি। ছোট ভাইটাকে চোখের সামনে থেকে ছো মেরে নিয়ে গেল! উহ! খোদা। আর ভাবতে পারছে না। আযানও হয়ে গেছে। ভোরের আলো দেখা যাচ্ছে। কিচেনের কোণায় হেলান দিয়ে ভাবছিল। সাহেব উঠবে মনে হয়। সকালের নামাজ পড়তে দেখে তাকে যতদিন হলো এসেছে। কিন্তু বেগম সাহেবকে সকালে উঠতে দেখেনি। ৯/১০টার সময় তিনি উঠেন।
-কী রে তুই ঘুমাসনি! চোখ তো লাল হয়ে গেছে?
ভাবছে সে, সাহেবের তাহলে মনে মনে দয়া-মায়া কিছুটা আছে। দু’ফোটা অশ্রু ঝরে পড়ে।
-ঘুম আসছিলো না।
-এই সকালে কান্না করিস না তো। জিজ্ঞেস করে কিছু খেতে চাইলি না কেন? না বলে এরকম আর করবি না। বুঝেছিস?
-জ্বি।
মনে হল এমন স্নেহ-মায়াময় সুন্দর মুহুুর্ত তার জীবনে খুব কম এসেছে। রাতের মারের কথা ভুলে গেছে। খবরে যেন শুনেছিল রোহিঙ্গা ফেরত নেয়া ব্যাপারে দু’দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছে। শিগগির এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু বর্মী সরকারের কথাকে বিশ্বাস করা যায় না। কোনো এক ফাঁকে টিভিতে আরকান থেকে মানুষের আসার দৃশ্য দেশে চোখের পানি এসেগেছিল। আরেক খবরে ৩০/৩৫ জনের একট নৌকা ডুবে সলিল সমাধি হয়েছে বলে খবরে বলেছে। বাবা, মা, ছোট ভাইটার জন্য মনটা কেমন করে উঠে। কে কোথায় আছে জানি না। তাদের সাথে কী ইহজনমে আর দেখা হবে না!
সকালে মর্জিনার জন্য বিচার বসেছে। শাহিনা বেগমের এককথা, এই চোরনিকে বাসায় রাখা যাবে না। সবাই বলছে আরেকবার সুযোগ দেয়ার জন্য। মর্জিনার দিকে অগ্নিশর্মা হয়ে বলে, কী রে। আমরা তো জানতাম বার্মা মগের মুল্লুক, এখন দেখছি না চোরেরও মুল্লুক! সাহেবও চুপ করে আছেন। কিছু বলছেন না! কোনো লাভ নেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোকে আর রাখব না। ব্যাস!। এই মেয়ে যা আমার দু’চোখের সামনে থেকে দুর হয়ে যা। কাপড়-চোপড় তো কিছু নেই, খালি হাতে এসেছিলি। বাসা থেকে যা দিয়েছি রেখে যা। নইলে পুলিশে দেব। কর্তা কিছু না বলে বেড রুমে চলে যায়। যে যার মতো রুমে চলে যায়। মর্জিনা আর শাহিনা বেগম রয়েছে। পা দুটো জড়িয়ে ধরে মর্জিনা বলে। আম্মা এবারের মত ক্ষমা করে দিন। চেঁচাচ্ছে সমানে। সবশেষ করে দিল। “তোমরা সবাই তামাশা দেখছ, ঠিক আছে দেখো! তাহলে আমিও আর এর মধ্যে নেই। ঘরের সব জিনিস যদি এই চোরনি নিয়েও যায় আমি আর কিছু বলছি না।” বলে গেলাম।
সারাদিন কাজের ফাঁকে ভাবে এ ঘরে তার থাকা সম্ভব হবে না বলে মনে হচ্ছে। রাতে বা আগামিকাল সকালে পালাতে স্থির করে। নইলে গৃহকর্ত্রী যদি পুলিশে ধরিয়ে দেয়, তখন আবার বিপত্তি। কোথায় যাবে? শরণার্থী শিবিরে আবার চলে আসবে কিনা তাও চিন্তা করছে। একবার কৌশলে বেরিয়েছিল। এখন আবার গেলে যদি বেরোতে না পারি? ত্রাণ সাহায্য নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে কিছু করে খাওয়ার চিন্তা করেছিলো। ভাগ্য তো সব জায়গায় মন্দ! আজ এখানে, তো কাল ওখানে। এভাবে আর কতদিন? আমার মত হাজারো মর্জিনা এসেছে পালিয়ে। সবার একই দুরাবস্থা! ভবিষ্যত নিয়ে সংশয়ে আছে। ভাবছে সে, জীবনের লক্ষ্য, স্বপ্ন-সুখ, আশা-আকাঙখা, সাধ-আহলাদ সব কী এখানেই শেষ হয়ে যাবে? তাহলে কী আর কোনোদিন এদেশ থেকে নিজ দেশে ফেরা হবে না!