মেঘচোখ

আমাকে গানে বাঁধো গো জোনাকী
পথের বর্ণমালা শিখে কী পেলাম?
কাকের পাখার রঙ আকাশে মেশে না,
তাই পাহাড়ের মুণ্ডুতে নিজের মাথা
খুলে রেখে এসেছি ক্ষোভে।
এ মাসে কাশফুলের দরকারিতা ছিল খুব
সোজা ছেড়া কাঁথার যুগে এবার চলে যাব ভেবে;
পায়ের রগ ফুলুক না ফুলুক
মেঘের পিঠে হাঁটার বয়েস এখনো আছে।
হতভাগা গাড়ির গতি প্রিয় গাছগুলির
দূরে সরে যাওয়ার সমানুপাতিক না,
কোন লোভে মন তবে মেঘাতুর হল—
ছুট দিলাম দড়ির গিঁট বরাবর!
দেয়াল ঘেঁষে এই হাঁটি হাঁটি শেষে
কবে কাশের সাদা কিনতে যাব!
যথার্থ মৌসুম তো হারালো;
বিরক্তিকর মাছির পিঠে উড্ডীয়মান মন
ফিরে পাবে কি মোমের জগত!
…………………………………………..

মেঘের পিঠে হাটবো, দেখিস

পায়ের রগ ফোলার জন্য মাটিই দায়ী
ও শূন্য, ও পাতাল- নিরপেক্ষ থেকো
শতবার হেরে যাবার পরও আমার দুই হাত
একশো আশি ডিগ্রি বরাবর ছিলো।
জোনাকীর প্রিয় গাছ, বাঘের ঘর
আলোকিত হয় সোডিয়ামের সাহায্যে
মন্দিরের মন্দিরাও সন্ধ্যায় গাইলো বিলাভোল।
কেবল শূন্যের সমানুপাতিক মেঘের দিকে তাকালে
পুড়ে যায় চোখের বাহারি পাতা।
এ পাতিলের জাউ পঁচা-খিচুরি হোক;
আর মাত্র দশক দুই পরে
গত তিরিশের শতবর্ষ পূর্তিতে
মেঘমালার যুগে বৃষ্টির শাড়ি উড়াবে ফড়িংরাজ।
…………………………………………..

পুলসিরাত

ছয় বছর আগের বিড়াল গা ধুয়েছিল পৌনে পাঁচে এসে
আমার শেষ ছেলের দ্বিতীয় মৃত্যুর মেঘ
হলুদ হবার যুগে;
কেউ কি খুঁজেছিল– কী দৈর্ঘের শাড়ি ছিল সুইচোরার লেজে!
বন সঁপে দিয়ে বাঘের পায়ে
মহাশূন্যে উপগ্রহ তাক করে
কাছিমের পিঠে যাত্রা করেছিল কচুরির দেশ।
মাঘের ভোর।
রাতারাতি ঘোড়ার গতি ছাপা হলেও
ফড়িঙের মাঠ ছিল আকাশরঙা!
ভুড়িভোজে সবাই এলো ঠিকই-
খোয়া গেল সুপারিবনের কাঠকুড়ালী।
…………………………………………..

ও যদি

নাম-পুরুষের পাশ ঘেঁষা কী বিপজ্জনক! গাছবাওয়া তো ছেড়েছি মাঘেই। পুনরায়
গণনাযন্ত্রের শরণাপন্ন হয়ে দেখব? থাকগে। যে বয়সে হিজলপাতার জিহ্বায় ছিল বিকেলের
রঙ, চড়ুই ভেগে গেল দুখপাখির ঝাঁকে।
পাতার আড়ালে কমলা-অতীতকে সাজতে দেখেছি গো আজ। শাবকসহ তবে কোত্থেকে এল
গুঁই-মেয়ে! দিনের ল্যান্ডস্কেপে প্রতিদিন হাত বাঁধি, মাজা বাঁধি, চোখ বাঁধি গো চশমায়।
তথাচ লেবুবনের অসংখ্য হলদে বাতি ধরিয়ে দিয়ে যায় পূর্বাভাসের খাম।
সব-পাওয়ার-দেশেও যেন অন্য স্বর্গের চিত্রকল্প আকাঙ্ক্ষা জাগায়। ও যদি মেঘ হয়, আমি
ঘরের সব ঘটি-বাটি-গামলা-বালতি নিয়ে বেরিয়ে পড়তে প্রস্তুত। কফিনে শুয়ে দেখতে
পাই, হলুদ নক্ষত্র এসে পড়ে কবিতার সুরভি বইয়ে। রাতের মাকড়সা ভাবার ছলে কি তবে
হলুদ নক্ষত্রের দিকে আরেকটু তাকাব? থাকগে।
…………………………………………..

শূন্যের সিংহাসন

পা বাড়াতেই শহর নিভে যেতে চায়
তুই তো মহারাজ ছিলি না কাঠের ঘোড়ায় কোনোকালে
নদীর প্রাণ ঢেউময়
আজ কুয়াশার দিন
তবু তোর চোখপথে কেরোসিন
বলিভিয়ার বন থেকে পথে উঠে আসতে শৈশব মনে এল;
আমাদের রিক্সা কিন্তু জব্বর— দাবার ঘোড়া!
তোর জন্মদিনে নিজ উদ্যোগে আসিস বনে
‘আসলা’ দেখতে পাবি
চোখের সবুজ চড়কিতে চড়বে মন
গ্যসীয় গ্রহগুলোকে যতই গালি দেই
শেষতক শূন্যই হবে তোর আপনজন।
…………………………………………..

আমি তো ফিরবই, শীলা ম্যাম

অলকানন্দায় ভেজা শার্ট সাইহান তীরে শুকিয়ে
সবুজের ঠিক দুই ইঞ্চি উপর দিয়ে উড়ে উড়ে
মাটির যথার্থ ঘ্রাণ অর্জন করে
আমি শীঘ্রই ফিরব, শীলা ম্যাম।
রশি দিয়ে দালান বেয়ে বেয়ে
অচেনা পথ চিনে নেব
বনজুঁই এর কাছে মন ছুঁই ছুঁইয়ের কথা প্রকাশ করব
আপনার শহরের রাত স্নিগ্ধ
তাই আদরের জোনাকিগুলো বানায় আকাশ-মরিচীকা
পরিচিত কাউকে পেলে তার বুকে ঢেলে দেব লম্বা নিঃশ্বাস
থানকুনি পাতার সকালগুলো আবার ফিরবে, শীলা ম্যাম
সূর্যরশ্মি আমাকে পূর্বঘ্রাণ চেনাবে
গড়িয়ে পড়া ঘাম মুছে নিতে যেটুকু সময় লাগে
তারপরপরই আমি ফিরছি―
এই চিরকুট মেলে রেখেছি অপেক্ষার টেবিলে
দূর থেকে দেখে নেব আপনার রেলগাড়ির গন্তব্য অথবা বিরতিস্থল
বিকল্প পথে হাজির হব আগের বয়সে।
…………………………………………..

কবিতার ফলি

চড়ুইয়ের আজ গৌতমী জ্বর।
কবিতার বনে পথ হারিয়েছে পাখিপ্রাণ।
যদিও অচেনা পথ আবগারি-গম্ভীর; বিড়ালের চোখ চিনে গেছে সাধ্যমত কবিতাপথ।
কবিতার পথচলা ঝুমঝুম অথচ নির্ভয়। অচিন রথই একমাত্র গন্তব্য কবিতামেয়ের।
সময় থামিয়ে চড়ুই কবিতার পিছু ছোটে― দশদিকসহ বাইরের হাজার গলি, নিরেস
মিনারের মাথা বরাবর দিয়ে। কবিতা লাফিয়ে চলে, চড়ুই হুবহু এগোয়, দেখাদেখি থামে,
দেয় পাখসাট আর ফিঙে-লাফ।
চড়ুইয়ের উন্মাদনাই পরের দিন ইতিহাস হয়। সব পথ মিলে আজ খুঁজতে এসেছে চড়ুইয়ের
অভিমান। মূলত, ফলিশিল্পীকে ক’জনাই আর মনে রাখে!
…………………………………………..

লেজে লাল রঙের অপরাধ

অচেনা মুখশ্রীর সাথে চলতে লাগে না মুখোশ
তিতিরের সাথে আমার জমে―
বনের আবেগই স্মৃতিময় করে
দ্বিতীয় আগুন শরীর সয় না
ঘাস-বান্ধবীরা উপবন হবার যুগেও
ফিরে গেছি কাছিমের দেশে।
পথ পেরোবার দ্বিরুক্তি দ্বিচোখ ঝাপসা করে
সূর্য এখনও একই কালার কোড মেনে ঘুমায়
শৈশবের ভোর থেকে কিছু রাগ
ফিরে আসে নতুন বাজারে
গতরাতের খাবার নবায়ন হয়ে গেছে যে,
এসে গেছে কাঠের তেলাপিয়া ভূনা।
বিড়ালে রূপান্তরিত বাঘের চেয়ে
আর কে বা ক্ষুধা বোঝে বেশি!
কাগজের দশ নৌকো পর পর ডুবে যাবার পর
আমিই হব সওদাগরের ডানপা
তখনও শিশুসহ জলপরীদের খোঁজ তো কেউ নেবে না
আলুর বস্তা পিঠেই অবশেষে অভ্যস্থ হবে পৃথিবীতে
পিঁপড়েয় কামড়ে দেয়া চোখ।
…………………………………………..

উন্মাতাল মেঘচোখ

দুর্লভ গাছের সাথে পিঠ ঠেকাই না, এ অক্ষমতা চিত্তকে কাবুও করে না। গণতান্ত্রিক সূর্যালো
কের দিকে এগিয়ে যাই, সমুদ্রগামী উড়ন্ত ফড়িঙের পাখায় পাই সূর্য আর পানির
কারুকাজ।
তাই চোখের পানির মতো পৃথিবীকে যুম-আউট করি না। বরং বিখ্যাত পাহাড় আর মৌমা
ছির আবাস দেখলে উল্টো দৌড় দিই।
সকলে উপদেশ দেয়, আমি যেন আকাশ পথ ছাড়ি, আকাশ নাকি শুধু কুয়াশাময় মাকড়সায়
ধু ধু। রাজগদ্যের গলি দিয়েও দেখেছি, বই আর ম্যাগাজিনের পাতা উল্টালে শুধু কুয়াশাময়
মাকড়সার রাজত্ব।
আমি ভেসে চলি আমার এই একান্ত অভিমানি আকাশে; কোনো নক্ষত্রের দামি পোশাকে গা
ঘেঁষি না।
আমি তো গাছ বেয়ে চলা বিষপিঁপড়ে, শীতের আবির্ভাব টের পেয়ে পিঠে বোঝাই করি হী
রের স্বপ্ন। মাস্তানদের মতো জুলফি রাখি না, সেলফি বুঝি না। নিজ করে ক’রে শস্য
উৎপাদনে এক উন্মাতাল চোখ খুঁজি।
…………………………………………..

বাবার ছাতা ও সরলরেখা

সরলরেখার শেষবিন্দু পর্যন্ত বাবা জোর কদমে চলতেন। তারপর আর বক্ররেখায় এগিয়ে
কারো ঘরে আশ্রয় চাইতেন না। অথচ মাথার আধাহাত উপর দিয়ে যে ছাতাটা বয়ে বেড়াতে
দেখেছি, তার ছায়া কখনোই দীর্ঘতর হত না।
বছর বছর আমাদের জামা-কাপড় ছোট হয়ে শরীর থেকে নেমে যেত, দুই পা কামড়ে ধরত
পুরনো জুতো। আমরা বাবার পা কামড়ে গুটিসুটি হয়ে পড়ে থাকতাম ছাতাটির ক্ষুদ্র ছায়ায়।
সেই থেকে অন্তত একটা বড় আকারের ছাতার প্রয়োজন ছিল। যেটির ছায়ায় ছোটখাট
রাজসিংহাসন থাকবে বাবার জন্য। আমরা সবাই সেখানে ঘিরে দাঁড়াব।
কেবল একটিমাত্র বড়ছাতা বছর বছর খুঁজে বেড়িয়েছি স্কুলের কক্ষে কক্ষে, খেলার মাঠে আর
মহাবিদ্যালয়ে। সাথে বাবার ছাতার মাপ থাকত টুকরো-কাগজে। এবড়ো থেবড়ো কিংবা
পিচপথে শক্ত জুতোয় ভর করে, বাসে ঝুলে ঝুলে গিয়ে তকতকে সাহেবদের সামনে ঘর্মাক্ত
মুখ নিয়ে আনাড়ি চোখে এদিকওদিক ছাতা খুঁজেছি, শুধু একটি বড় ছাতা।
বৃষ্টি চেয়ে আষাঢ়ের আকাশের নিচে গিয়ে বারবার সৌরসেদ্ধ হই। ঘরকুনো ইঁদুরের মতো
বাবার ছাতার নিচে ফিরে আসি ফের। প্রতিবছর এরকম ছলনার আষাঢ় আসে। সংকল্পবদ্ধ
রোদ আর নির্বোধ ভারী বর্ষণ আকাশ ছিঁড়ে নামে; ছাতার দেখা কিন্তু মেলে না।
এযুগে ছাতাগুলো সব মায়াহরিণ। সেকেন্ডে সেকেন্ডে জোরকদম এগিয়ে চলি সরলরেখা
বরাবর; শেষবিন্দু মেলে না, মেলে না। বক্ররেখার আধিপত্যের যুগে দৈনিক পত্রিকায় নতুন
নতুন জ্যামিতিক সমাধান ছাপা হয়। কেবল সরলরেখা আজো অতীত অথচ কী অস্পৃশ্য!
বাবার সরলরেখা কী অদ্ভুত অস্পৃশ্য!