আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে (২১ জুলাই ১৮৯৯- ২ জুলাই ১৯৬১) বিশ শতকের মার্কিন সাহিত্যের অন্যতম প্রভাববিস্তারকারী প্রবাদপ্রতিম সাহিত্যিক। উক্ত শতকের ফিকশনের ভাষার ওপর তাঁর নির্মেদ ও নিরাবেগী ভাষার ভীষণ প্রভাব ছিল। ১৯৫৩ সালে তিনি কথাসাহিত্যে পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন। ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’ বিশ্বখ্যাত উপন্যাসের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান ১৯৫৪ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তাঁর হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে যা তাঁর অসংখ্য লেখায় ফুটে উঠে। আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস, দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী, অলসো রাইজেস, ফর হুম দ্য বেল টোলস তাঁর বিখ্যাত এবং বহুল পঠিত উপন্যাস। ছোট গল্পের বির্নিমাণেও তিনি অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে।

বেশ ঘটনাবহুল জীবন ছিল আর্নেস্ট হেমিংওয়ের। বার বার দৈহিক-মানসিক আঘাতে জর্জরিত হয়েছে। তাঁর সৃষ্টিকর্মে সেরকম জীবনবোধ প্রবল ছিল। দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’র পটভূমিকায় তিনি অবিনাশী মানবসত্তার কথা বলেছেন। মানুষ ধ্বংশ হয়ে যেতে পারে কিন্তু হারতে পারেনা কিছুতেই। হয়ত এটি মানুষের চিরন্তন অভিপ্রায়। যে কারণে মানুষই পরিবর্তন করেছে এ পৃথিবীকে। মানব সভ্যতার শুরু থেকেই লড়াই করে চলেছে মানুষ জলে স্থলে অন্তরীক্ষে। কখনো সে জিতেছে কখনো ধ্বংশ হয়ে গেছে। কিন্তু পরাভব সে কখনো মানতে চায়নি। সেই চিরকালের সংগ্রামী মানুষের মরণপণ লড়াইয়ের কথাই তিনি বলেছেন তাঁর কালজয়ী ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’ উপন্যাসে। কিউবার এক বৃদ্ধ-অসহায় জেলে সান্তিয়াগোকে নিয়ে লেখা তাঁর ছোট্ট এ উপন্যাসটি, যে কিনা হেমিংওয়ের নিজেরই একরূপ। বুড়ো লোকটি রোগা-পাতলা শরীর। গলা ঘাড়ের নিচে কতগুলো গভীর বলি রেখা। গালফ স্ট্রীমের স্রোতে ছোট্ট নৌকা ভাসিয়ে একাকী মাছ ধরে বেড়ায় বুড়ো জেলে সান্তিয়াগো। সবদেশেই মনে হয় জেলেদের জীবনের কাহিনী একই রকম। এই বাংলাদেশের কুবের মাঝিও (পদ্মা নদীর মাঝি-মানিক বন্দোপাধ্যায়) একই সংগ্রাম করে চলেছে আমৃত্যু-আজীবন। বর্ষণমুখর বিপদ সঙ্কুল রাতে তার কষ্টকর মাছ ধরায় আমরাও তার মানসসঙ্গী হই। তবে কুবের সান্তিয়াগো নয়। কুবেরা প্রশ্ন করে না-জীবনের দুঃখ কষ্টকে মেনে নিয়েছে। তাদের কষ্টের ফল অন্যে ভোগ করবে এটাই বিধিলিপি।
আদিকাল থেকে মানুষ বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। সান্তিয়াগোও সাহসী লড়াকু। মাছের খুঁজে সে গভীর থেকে গভীরতর সমুদ্রে একাকী প্রবেশ করে নির্ভয়ে।
প্রায় তিন মাস ধরে ঘুরেছে সে সমুদ্রের বুকে কিন্তু কোন মাছ পায় নি। তার সাথে একমাত্র ছেলে ম্যানোলিন কাজ করতো, তার বাবা-মা মনে করে বুড়োটা অপয়া। একারণে একপ্রকার জোর করেই তাকে অন্য নৌকায় পাঠিয়ে দেয়। পর পর চুরাশি দিন খালি হাতে ফিরলেও হতাশ হয়না বৃদ্ধ। আশায় বুক বেধে ছোট্ট ডিঙি নিয়ে আবার পাড়ি জমায় সমুদ্রে। ভাগ্য এবার নিরাশ করেনা সান্তিয়াগোকে। পঁচাশিতম দিনে তার বড়শির আগায় আটকে যায় একটি বিশাল আকারের মার্লিন। বৃদ্ধ সান্তিয়াগোর শরীর দুর্বল হলেও মাছ ধরার কলাকৌশলে সে অত্যন্ত অভিজ্ঞ, আর সে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর স্বপ্নের মাছ ধরা দিলেও শুরু হয় মরণপণ লড়াই। নির্ঘুম রাত কাটে তার। খাওয়াার জন্য কাঁচা মাছ ছাড়া কিছু নেই। লবণের সমুদ্র চারপাশে। একটু খাবার লবণও জুটে নি তার। পিঠে আর হাতের ব্যাথায় কাতর সান্তিয়াগো বার বার অনুভব করে তার সাথী ম্যানোলিনের অভাব। সে একাকী। তবু দমে যাওয়ার পাত্র সে নয়। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে মাছটি ধরে রেখে তাকে চলতে দিয়েছে ইচ্ছেমত। ভেসে গেছে আরো দূরে বহুদূরে। কিন্তু হেরে যাওয়ার কথা কখনো স্বপ্নেও ভাবে নি। দড়ির ঘষায় হাত কেটে রক্তপাত হয়েছে-উপশমের জন্য সমুদ্রের পানিতে হাত ধুয়ে ট্রাউজারে মুছে নেয়েছে। মাছটি দাপিয়ে উঠলে সুতোর টানে মুখ থুবড়ে পড়ে সে-চোখের কোণে চোট লাগে, গাল বেয়ে রক্ত গড়ায়। কখনো জ্ঞানও হারিয়েছে-মনে হয়েছে এই শেষ বুঝি হয়ে গেল সে। না, আবার জেগে উঠেছে সে-শুরু করেছে মরণপণ লড়াই। দৃঢ় কঠিন মনোবল নিয়ে বলেছে মাছ-তুইতো জানিসনা কেবল আমার মুত্যুই তোর মুক্তি। সর্বশক্তি দিয়ে নৌকায় থাকা হারপুন ছুঁড়ে ছুঁড়ে মাছটাকে রক্তাক্ত করতে থাকল। সমুদ্রের জল তার স্বাভাবিক রঙ হারিয়ে ক্রমশ লাল হয়ে উঠছিল মাছটার হৃদপিন্ড থেকে বেড়িয়ে আসা রক্তে। একসময় হেরে যায় মাছটি-পানির গভীরে যার বাস ছিল। সান্তিয়াগো নৌকায় তুলতে পারেনা-সে যে নৌকার চেয়েও বড়। অবশেষে ক্লান্ত, শ্রান্ত বহু কষ্টে পরাজিত মাছটাকে নৌকার পাশে বাঁধে। শুরু করবে ফিরতি যাত্রা তীরের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে সে অনেকদূর চলে এসেছে, তাই বন্দরে পৌঁছাতে সময় নেহায়েত কম লাগবে না। এদিকে সমুদ্রে মাছের রক্তের গন্ধ নেশা জাগায় দানবাকৃতির হাঙরদের ভেতর। ধেয়ে আসে একের পর এক। একে এক তারা এসে হামলা চালায় মাছটির উপর, খুবলে নিতে চায় সান্তিয়াগোর এত সাধনার মার্লিনের এক একটি অংশ।

এবার শুরু হয় আরেক লড়াই। লড়াই করে চলে সান্তিয়াগো সব ক্লান্তি ঝেড়ে। হারপুন, বৈঠা, ছুরি, কোঁচ, হালের কাঠি ও মুগর নিয়ে একাকী প্রতিরোধ গড়তে থাকে হাঙরদের বিরুদ্ধে। কঠিন যুদ্ধে জয়লাভ করে যখন সান্তিয়াগো ডাঙায় ফিরে এলো তখন মাছটির ১৮ফিট লম্বা কঙ্কাল ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিলনা। হাঙররা খুবলে নিয়ে গিয়েছিল মাছটির শরীরের সব মাংস। পদ্মা নদীর মাঝিতে তো এমনটিই ঘটে। কুবের মাঝি মাছ ধরে-অন্যেরা নিয়ে গিয়ে স্ফীত থেকে স্ফীততর হয়। হাঙররা শিকার করেনি-কিন্তু শিকার কেড়ে নিয়ে গেল তারা। অর্ধমৃত সান্তিয়াগো ভাবে-নিয়তি কখন কিভাবে যে মানুষের সমনে এসে দাঁড়ায় তা পূর্ব থেকে বুঝা যায় না।