শাদা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে নীলাকাশ উকি দেয়। দখিনা বেলকুনির গ্রীল ধরে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে ফারুক সাহেব। আনমনা হয়ে কী যেন ভাবছে। হাতে বড় চায়ের কাপ ধরা। চায়ের ধোঁয়া উঠা বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। বড় কাপে চা খাওয়া ফারুক সাহেবের নতুন অভ্যেস। আগে এরকম ছিল না। আজ কাল কেমন যেন হয়ে গেছে। সব রুটিন এলোমেলো হয়ে গেছে। শুধু দৈনন্দিন রুটনি কেন, জীবনটাই এলোমেলো হয়ে গেছে। সাগরের মতো মানুষের জীবনেও জোয়ার-ভাটা আসে। সেই জোয়ার-ভাটা সুখের অথবা দুখের, আশার অথবা নিরাশার হতে পারে।
ফারুক সাহেব আগে বিকালে বাইরে বের হতো হাঁটতে। এখন আর ঘরের বাহিরে বের হয় না। এই বেলকুনিতেই বিকালটা কাটে দেয়। গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে দেখে নয়নাভিরাম প্রকৃতির লিলা। নীলাকাশ। শাদা মেঘ। কালো মেঘ। কখনো কখনো দুই-একটা পাখির উড়ে যাওয়া। ইলেকট্রিসিটির তারে বসে থাকা জোড়-বিজোড় কাক। একাকি নিরব ল্যাম্প পোস্ট। কুকুরের ঘেঁউ ঘেঁউ। রাস্তায় হেঁটে যাওয়া ফেরিওয়ালা। পরিচিত-অপরিচিত লোকজন। কখনো বা পিচ ঢালা ফাঁকা রাস্তা।
ফারুক সাহেবেরও ইচ্ছে করে সবার সাথে মিশে চলতে। চায়ের দোকানে বসে গল্প করতে। নিজে গিয়ে বাজার করতে। কিন্তু মন তাতে আর সায় দেয় না।
পৃথিবী দিন দিন ফারুক সাহেবের কাছে ছোট হয়ে আসছে। নিঃশ্বাসও ছোট হয়ে আসছে। ছোট হয়ে আসছে মনের জগৎ।
তাঁর পৃথিবী এখন বেড রুম ডাইনিং রুম আর এই বেলকুনি। ফারুক সাহেব দিন দিন শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন নিজের ভেতর।
এক সময়ের ডাকসাইটে আমলা তিনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়াম্যান ফারুক সাহেব হঠাৎ করেই রিজাইন দিলেন। আর চাকরী করবেন না। তারপর থেকে এই বাড়ি আর বেলকুনি তাঁর সঙ্গি।
কয়েক মাস আগের কথা। ফারুক সাহেবের বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘনিষ্ট বন্ধু তাহেরুল ইসলাম দেশের নাম করা শিল্পপতি। তার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় সাতাশ হাজার লোকের কর্মসংস্থান। জনকল্যাণ বন্ধু হিসেবে তার ব্যাপক পরিচতি আছে। দান-খয়রাত ভালো করেন। টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
ফারুক সাহেবের বাসায় আকস্মিক তাহের সাহেবের আগমন।
-কেমন আছো বন্ধু?
-এই তো ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
-ভালো-মন্দ এখন তোমার হাতে। তাই তো তোমার কাছে ছুটে এলাম বন্ধু।
-এটা কেমন কথা বললে বন্ধু। হা হা হা।
-ফারুক, তুমি ইংল্যান্ডে বাড়ি করার কথা ভাবছিলে। এটা তো তোমার ভার্সিটি লাইফ থেকেই শখ ছিল।
-হ্যাঁ বন্ধু। আশা ছিল ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে আর আসবো না। ল-নে থেকে যাবো। কিন্তু সেই সুযোগ আর হয়নি। আমার শেষ ইচ্ছা ইংল্যান্ডে একটি বাড়ি করা। আমার কলিগরা দুই একজন অলরেডি ফ্ল্যাট কিনেছে। বাড়িও করেছে। আমি এখনো কিছুই করতে পারলাম না। তাছাড়াও ছেলে-মেয়ে ওখানে পড়া-লেখা করছে। মাঝে মাঝে আমাকেও যেতে হয়। অন্তত একটা আশ্রয় তো লাগে। জানিনা বন্ধু সেই স্বপ্ন পূরণ হবে কিনা।
-তেমারো সেই শখ পূরণ হবে। তুমি ইচ্ছা করলেই সেই শখ পূরণ করতে পারো। শুধু হাতটা বাড়িয়ে দিবে, ব্যাস তেমার দীর্ঘ দিনের ইচ্ছা পূরণ হয়ে যাবে।
-বন্ধু, তুমি কি আলাদিনের চেরাগ নিয়ে এসেছো। এতো কনফিডেন্স তোমার?
-তার চেয়েও বেশি কিছু বলতে পারো।
-তোমার কথায় কেমন যেন রহস্যের গন্ধ পাইতেছি। সেই রহস্য ঘোলা ঘোলা। এখনো তা উদঘাটন করতে পারছিনা।
-পারবে ব্যারিস্টার, পারবে। তোমার মতো আমলার কাছে এই রহস্য কিছুই না। আচ্ছা যাই হোক ভাবিকে তো দেখছিনা বন্ধু।
-রেহেনা তো গত সপ্তাহে ইংল্যান্ডে গেছে। ছেলে-মেয়ের এক সাথে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ডমেসটিক কাজ আর ওদের কেয়ার নিতে চলে গেছে।
-ভাবি কিন্তু তেমার মতো না। তিনি সংসার নিয়ে ভাবেন।
-তা ঠিক বলেছো। সংসার তো সামলাচ্ছে।
-আর তুমি একা একা এখানে কী জন্যে পরে রইছো?
-যাবো। তোমার আলাদিনের চেরাগটা হাতে পেলেই যাবো।
-তাহলে বন্ধু লাইনে আসলে।
-কিসের লাইনে আসা?
-ঐ যে আলাদিনের চেরাগ।
-আরে বন্ধু তোমার সাথে তাল মিলাতে আমিও বলে ফেললাম। এই আর কী ।
-হা হা হা
-হা হা হা
-তোমার বিজনেসের খবর কী? কেমন চলছে সব।
-ভালো চলছে।
-তুমি তো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটা হ্যান্ডস্যাম অবদান রেখে চলেছো। সেদিন এক জাতীয় দৈনিকে তোমার ও তোমার প্রতিষ্ঠানের বিজনেস ফিচার পড়লাম। অনেক প্রাউড ফিল হলো। ভাবতেই ভালো লাগে যে আমার ছোট বেলার বন্ধু সে দেশের বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সমস্যায় এগিয়ে আসছে। এবং দেশের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
-কি যে বলো বন্ধু। কি আর করছি। করার চেষ্টা করছি মাত্র। সবই তো উপরওয়ালার ইচ্ছা। আর তোমাদের দোয়া।
-কনগ্রাচুলেশন বন্ধু। ভাবতেই বুক ফুলে উঠে।
এই ভাবে দুই বন্ধুর গল্প জমে উঠেছে। রফিক চা নিয়ে আসে। রফিক ফারুক সাহেবের বাড়ির কেয়ারটেকার কাম কাজের লোক। ভালো একটা ছেলে। ওর বাড়ি কুড়িগ্রাম। অনেক আগেই ঢাকায় এসেছিল মায়ের চিকাৎসার জন্যে। পরে মাকে বাঁচাতে পারেনি। পেটফুলে মারা যায়। কী কারণে পেট ফুলে গেল তা নির্ণয় করা যায়নি।
মা মারা যাওয়ার পর রফিক রিকসা চালানো শুরু করে। রিকসায় ফারুক সাহেবের সাথে পরিচয়। ফারুক সাহেব ভালো বকসিস দিতেন। তাই তার বাসার সামনে টাইম মতো রিকসা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রফিক। যে দিন মেয়ে-ছেলে, বউ গাড়ি নিয়ে বাহিরে যেত সেই দিন ফারুক সাহেব রফিকের রিকসায় যেত। এভাবেই ফারুক সাহেব আর রফিকের মধ্যে সর্ম্পকের ঘনিষ্টতা বাড়তে থাকে। পরে রফিককে বাসায় কাজরে জন্যে রেখে দেন। ওর উপর বিশ্বাস রাখা যায়। মা পাখির মতো এই বাড়ি আর সংসারটাকে বুকে আগলে রাখছে। বাজার খরচ আর বাড়ির মেইনটেনান্স নিয়ে ফারুক সাহেবকে কোন চিন্তা করতে হয়না। সব ও একাই দেখে। মাঝে মাঝে রান্নার কাজটাও করে।
-হঠাৎ করে আমার বাসায় কি জন্যে এলে জানতে পারি?
-কিযে বলো ফারুক। আমি কি তোমার বাসায় আসতে পারি না? না কি নিষেধ আছে?
-আরে আমি কি তাই বলেছি । যাই হোক তোমার কথা বলো।
-শোন বন্ধু, আমার দিকে শকুনের চোখ পরেছে। তাই একটু সমস্যায় আছি। আজ-কাল মানুষ অন্যের ভালো দেখতে পারে না। দেশটা যে কি হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারছিনা।
-কি হলো বন্ধু ?
-কি হয়েছে মানে। কি হয়নি সেই কথা বলো। আমার বিরুদ্ধে আমার এন্ট্রি পক্ষ তোমার প্রতিষ্ঠানে মানে দুর্নীতি দমন কমিশনে ক্যারপা লাগিয়ে দিয়েছে। কোন উপায় না পেয়ে তোমার কাছে ছুটে এলাম। এখন তুমিই আমার শেষ ভরসা।
এই কথা শুনে ফারুক সাহের মুখ কেমন যে ফ্যাকাসে হয়ে গেলে। ফারুক সাহেব এখন সহজেই সমীকরণ মিলাতে পারলেন। কী কারণে তাহেরের হঠাৎ বাসায় আসা। ফারুক সাহেব ভাবনায় পরে গেলেন। কারণ, দুদকের ডিপুটি ডাইরেক্টর মি. রাহাত গতকাল একটা নতুন ফাইলের কথা বলেছিল। জটিল ঘটনা। ইতিমধ্যে তদন্তও শেষ হয়েছে। রিপোর্টে বড় ধরনের করাপশন পাওয়া গেছে। যা আগের রেকোর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আগামীকাল ওই ফাইল নিয়ে মিটিং আছে। ফারুক সাহেব মনে মনে ভাবেন “ কী হতে যাচ্ছে জানিনা।”
-মি. ফারুক তন্ময় হয়ে কী ভাবছো? ভাবনার কিছু নাই। এই রকম সমস্যা আসবেই তার সমাধানও করতে হবে। ভালো কিছু করতে হলে বাঁধা আসবেই। আজ-কাল এটাই যেন একটা ট্রেন্ড হয়ে গেছে।
-না বন্ধু কী আর ভাববো। ভাবছি তোমার বলা কথাগুলো।
-এখন এই সমস্যা সমাধান করার দায়িত্ব তোমার। বন্ধু হিসাবে এই অধিকার আমার আছে। না কি বলো?
-তা ঠিক বলেছো।
-তাহলে তো আর কোন প্রোবলেম রইলো না।
-এখনো তো ফাইলই দেখতে পারলাম না। কিসের প্রোবলেম রইল না মানে আবার কী।
-আরে বন্ধু বুঝলে না। তোমার ইংল্যান্ডে বাড়ি কেনার আর কোন প্রোবলেম রইল না।
-মানে কি বন্ধু?
-ইংল্যান্ডে তোমার বাড়ি কেনার দায়িত্ব এখন আমার। এক সপ্তাহের মধ্যে তুমি তোমার বাড়ির চাবি পেয়ে যাবে।
দুদক বোর্ড রুমে মিটিং চলছে। কি ভাবে কি করা যায় এটাই ফারুক সাহেবের মাথায় ঘুরপাক করছে। তার মন এখন আর মিটিং এ নাই। মন পরে রইছে ইংল্যান্ডের কল্পনার বাড়িতে। সেখানে তার বাড়ি চাই চাই। মিটিং শেষ করে নিজের চেম্বারে ঠুকলেন ফারুক সাহেব। মি. রাহাতকে ডাকলেন।
-মি. রাহাত সাহেব, ঐ ফাইলটা আমাকে দেন। এই কেইসটা আমি নিজে দেখবো।
-ঠিক আছে স্যার। ধন্যবাদ স্যার। আসি স্যার।
এক মাস দুই মাস এভাবে চার মাস পর ফারুক সাহেব ফাইলটা অফিস থেকে গায়েব করে ফেললেন। ধামা চাপা পরে গেল সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার পাওয়ার প্লান্ট স্থপন প্রকল্পের দুর্নীতি।
কয়েক মাস পর দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ফারুক সাহেব ও তাহের সাহেবর পাওয়ার প্লান্ট স্থপন প্রকল্পের দুর্নীতি নিয়ে মিডিয়াতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বড় প্রশ্নের মুখে পরে যায় মি. ফারুক সাহেব।
দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে বরখাস্ত হওয়ার আগেই ফারুক সাহেব নিজেই রিজাইন দিলেন। সারা জীবনের সুনাম মেঘে ঢেকে গেল বিলাতে একটি বাড়ির লোভে।
সেই থেকে ফারুক সাহেব একাকি জীবন যাপন করছেন। এটা কী তার কর্মের প্রায়শ্চিত্ব না কি আত্মগোপন না অপমান থেকে দূরে সরে থাকা তা শুধু ফারুক সাহেবই জানেন।