সম্প্রতি বিদায় নিয়েছেন আল্লামা আহমদ শফী (১৯২০-২০২০)। তিনি ১২০ বছরের প্রাচীনতম দ্বীনি মারকায মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে মুহতামিম ছিলেন। তাছাড়া তিনি চলতি দশকে দেশের সবচেয়ে আলোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ‘র আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে একজন নবীন রিপোর্টার হিসেবে আল্লামার একটি সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ আমার হয়। এর আগে-পরে ওয়াজ-নসীহত ও আন্দোলনে আল্লামার চিন্তা-চেতনা আমি পর্যবেক্ষণ করতাম। আল্লামার আরেকটি বড় পরিচয় তিনি বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ শায়খুল হাদীস সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানীর অন্যতম খলীফা ছিলেন। এই মাদানী অখন্ড হিন্দুস্থান প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন। ফলে তিনি হিন্দুস্থান কংগ্রেসের ভাবনা-বলয়ের সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ‘র নেতা ছিলেন। আল্লামা আশরাফ আলী থানভী, আল্লামা শব্বির আহমদ ওসমানী রহ.সহ দেওবন্দের বহু আলিম ও মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদুদী এবং কলিকাতা আলিয়ার আলিমগণ মুসলিম লীগের দ্বিজাতি তত্ত্বের সমর্থক ছিলেন। মূলত এটাই উপমহাদেশে কওমী-আলিয়া মতবিরুধের মূলসূত্র। কংগ্রেসের মুখে ধূলি দিয়ে বৃটিশ থেকে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্র পাকিস্তান অত:পর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে কংগ্রেসী আলিমদের রাজনৈতিক চিন্তাধারার অপমৃত্যু ঘটে। ফলে তারা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে আলিয়া-জামায়াতের রাজনীতির ছিদ্রান্বেষণের পাশাপাশি শরঈ ইখতেলাফি মাসআলা নিয়ে ফতোয়াবাজির মধ্য দিয়ে মাঠ গরম করে রাখতেন আর তাতে উসকানি দিতেন ক্ষমতাসীন ও ইসলাম বিরোধী চক্র। আল্লামা আহমদ শফী এ চেতনা ও কর্মের একজন অবিসংবাদিত গুরু ছিলেন- তাতে কোন সন্দেহ নেই।
আল্লামা আহমদ শফীর জীবন অতিবাহিত হয়েছে উম্মুল মদারিস খ্যাত হাটহাজারী মাদরাসায় দারস-তাদরীসে। তিনি সাক্ষাৎকারে আমাকে জানিয়েছিলেন, “শৈশব ও দেওবন্দ মাদরাসায় অধ্যয়নের ১৪ বছর ছাড়া আমার জীবনের আর সবটুকু সময় কেটেছে হাটহাজারী মাদরাসায়”। ফলে একজন মেধাবী ছাত্র, শিক্ষক, মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস হিসেবে তিন প্রজন্মের লক্ষ লক্ষ তালিবে ইলমকে তিনি পড়িয়েছেন, যারা দেশ-বিদেশে হাজার হাজার মাদরাসা-মসজিদ-সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার মধ্য দিয়ে ইসলামী ভাবধারার জাগরণে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। আর এতে করে সময়ের ব্যবধানে তিনি একজন সর্বজন মান্য আধ্যাত্মিক রাহবারে পরিণত হন। ২০১৩ সালে হেফাজত ইসলামের আন্দোলনে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তার এ গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়।
আল্লামা আহমদ শফী ইবাদত-বন্দেগী ও জ্ঞান-গবেষণায় উচ্চাসনে সমাসীন ছিলেন। তিনি ৬০ বৎসর ধরে বুখারী শরীফের খিদমত করেছেন- এটি চাট্টিখানি কথা নয়। ইলম হল নূর বা আলো। এ নূরের অবগাহনে তিনি নূরানী তাওয়াজ্জুহ লাভে ধন্য হন। তাই তারা চেহেরা থেকে ঠিকরে পড়ত ঈমান ও ইলমের আলো। ছোটকাল থেকে আমি দেখেছি আল্লামা আহমদ শফী শানে রেসালত কিংবা ইসলামী মহাসম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে আলোচনা পেশ করেছেন যুগ-যুগান্তরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সম্ভবত ২০০৪ সালে চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে তেমনি একটি মহাসম্মেলনে আমি প্রধান অতিথি হিসেবে তার মূল্যবান বক্তব্য শোনার জন্য হাজির হয়েছিলাম। কিন্তু দেখি তিনি পাগড়ী পরিধান, ঢিলা-কুলুখের ব্যবহার ও মেসওয়াকের ফজিলত ইত্যকার বিষয় এবং ফেরকায়ে বাতেলা তথা আলিয়াদের বিরুদ্ধে লম্বা আলোচনা পেশ করছেন। অথচ এসময় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ ইস্যুতে দেশ-বিদেশে মুসলিম উম্মাহ কঠিন সময় পার করছিল। এসব বিষয়ে তিনি যেন কিছুই জানেন না, খামোশ। কিন্তু এই আল্লামা ২০১২-২০১৩ সালে রাজধানী ঢাকার শাহবাগে জন্ম নেয়া নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দিলে তাতে আমার হিসেব মোটেই মেলেনি। তবে এতটুকু আন্দাজ করতে পেরেছি যে তরুণ কওমী প্রজন্মের জাগরণের ঢেউ তার গায়ে এসে লেগেছে। এসময় তিনি ঈমান রক্ষার দাবিতে যেভাবে গর্জে উঠলেন তাতে দলমত নির্বিশেষে সবাই সমর্থন জ্ঞাপন করলেন। ফলে তিনি ঈমানদার মুসলমানদের জাতীয় নেতায় পরিণত হলেন। দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় জায়গা করে নেন। কিন্তু তার মজবুত সংগঠন, আধুনিক প্রশিক্ষণ, কুশলী নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা না থাকার কারণে ২০১৩ সালের ৫মে এবং এরপরে হেফাজতে ইসলাম ও তার ভূমিকা বিপর্যস্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যা এখনও সেরে উঠছে না। কওমী সনদের সরকারি স্বীকৃতি অর্জন দারসে নিজামীর শিক্ষার্থীদের বহুদিনের প্রত্যাশা ছিল। আল্লামা আহমদ শফীর প্রচেষ্টায় সেটা সফলতার মুখ দেখে তবে তিনি সম্বর্ধনা মঞ্চে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে মুসাফাহা করায় সমালোচনার শিকার হন।
উত্তর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলাধীন শিলক গ্রামে জন্ম নেয়া আল্লামা আহমদ শফী কর্মজীবনে কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন। তিনি মাদরাসা পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত বুখারী শরীফের দারস প্রদান করতেন। ইসলামী জলসায় প্রধান অতিথি হিসেবে দেশ-বিদেশে সফর করেছেন। এত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি বহু বই-পত্র লিখেছেন। তার ৮টি উর্দু এবং বাংলায় ১১টি বই রয়েছে। হক ও বাতিলের চিরন্তন দ্বন্দ্ব, সত্যের দিকে করুণ আহ্বান, ধুমপান কি আশীর্বাদ না অভিশাপ,বায়আতের হাকীক্বত ও ইসমতে আম্বিয়া ও মি‘য়ারে হক ইত্যাদি বাংলায় লিখিত তার উল্লেখযোগ্য বই সাক্ষাৎকার দানকালে তিনি আমাকে তার এসব বই গিফট দেন। আল্লামার চরিত্রের বড় ব্যর্থতা হচ্ছে এক পুত্র আনাস মাদানীর প্রতি তার অতীব দুর্বলতা ও নির্ভরতা। এই স্বজনপ্রীতি ও মুহতামিম পদের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি তাকে ইসলামপ্রিয় মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলে জীবনের শেষ দিন তিনি আপনজন, ভক্ত-অনুরক্ত ও ছাত্রদের হাতে নাজেহাল হয়েছেন। আনাস মাদানী এমন একটি সিঁড়ি যা ধাপে ধাপে অতিক্রম করে স্বার্থান্বেষী চক্র কওমী অঙ্গন ও হেফাজতে ইসলামের মাজা নষ্ট করে দেয়ার অপপ্রয়াস চালাতে সক্ষম হয়।
যাই হোক, আল্লামা আহমদ শফী তার আমলের ফলাফল বরাবর পৌছে গেছেন। তাই ব্যক্তি হিসেবে নয় কওমের একজন কায়িদ হিসেবে তার বর্ণাঢ্য জীবন পর্যালোচনা করলাম। পরিশেষে দোষে-গুণে মানুষ। যত ইবাদত,তাওবা-ইসতিগফার ও ইলমে হাদীসের খিদমত তিনি করে গেছেন তাতে তার সব দোষ ঢেকে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। আল্লাহ তা‘আলার বাণী “তারপর যার পাল্লা ভারী হবে সে মনের মতো সুখী জীবন লাভ করবে” (সূরা আল কারি‘আহ-৬-৭)। আল্লামা আহমদ শফীর ক্ষেত্রে তদ্রুপ হোক সেটাই একান্ত প্রত্যাশা।