আল্লামা ইকবাল, কলকাতামুখী পূর্ব বঙ্গীয় এলিট বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশ

পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমান এক ধরনের দোদুল্যমান ও সংশয়গ্রস্ত আত্মপরিচয় নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগ দিয়েছিল। এই দ্বিধা ও সংশয়ের উৎস ও সূত্র হল এ অঞ্চলের বাঙালি মুসলমানের দীর্ঘদিনের শিক্ষা, জ্ঞান ও সংস্কৃতিচেতনায় ইসলামের অগভীর ও উপরিতলীয় অবস্থান। ধর্মীয় শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা- এই দুটি পরিমন্ডলেই এই অগভীর এবং ত্বকভেদে অক্ষম অপর্যাপ্ত ইসলামায়ন প্রক্রিয়া লক্ষ করা গেছে। ফলে এদেশে ইসলাম বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিমন্ডলেই সীমাবদ্ধ থেকেছে; ইসলামের চেতনা পূর্ব বাংলার মুসলমানের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানস কাঠামোর ত্বকভেদ করে গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি।
ফলে পূর্ব বাংলায় বিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে পঞ্চাশ ও ষাট দশক অবধি যে এলিট বাঙালি মুসলিম শ্রেণি গড়ে উঠছিল তার মানস ও চেতনা জগতে ইসলামের নিমজ্জন ছিল অগভীর ও উপরিতলীয়। বরঞ্চ তার মানস ও চেতনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল ইংরেজী শিক্ষা সূত্রে পাশ্চাত্য ভাবধারা এবং সেইসঙ্গে কলকাতায় উদ্ভূত এবং বিকশিত বাঙালি হিন্দু “বাবু” বা “ভদ্রলোক”-এর ভাবধারা ও চেতনা। এর কারণ হল বাঙালি মুসলমানের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যক্রমে এই দুই উৎসের একচ্ছত্র প্রাধান্য ও প্রভাব। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের উপজাত হিসাবে উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে কলকাতায় বাঙালি হিন্দু এলিটের মাধ্যমে যে আধুনিক “বাঙলার রেনেসাঁ” বা নবজাগরণ সাধিত হয়েছিল বিশ শতকের পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলিম এলিট শ্রেণি সেই কলকাতাকেন্দ্রিক নবজাগরণের ছায়াতলেই বিকশিত হচ্ছিল।
প্রশ্ন উঠতে পারে যে বাঙালি মুসলিম শ্রেণি যদি এই কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু “বাংলার রেনেসাঁ”র অনুপ্রেরণাতেই গঠিত হচ্ছিল তবে তারা কেন অখন্ড ভারতের অধীনে অবিভক্ত বাংলা গড়ে তোলেনি? এর উত্তর হল ১৭৯৩ সালে সূচিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অভিঘাতে পূর্ব বাংলার বৃহত্তর মুসলিম কৃষক সমাজ হিন্দু জমিদার শ্রেণির অধীনস্ত জমির মালিকানাবিহীন প্রজায় পরিণত হয়েছিল। কাজেই হিন্দু জমিদার রুপী এলিট শ্রেণির সঙ্গে তার একটি অর্থনৈতিক ও শ্রেণিগত বিরোধ দেখা দিয়েছিল। [১] ফলে তার কাছে স্বতন্ত্র মুসলিম পরিচয় ভিত্তিক পাকিস্তানের ধারণা অত্যন্ত আকর্ষণীয় বলে মনে হয়েছিল। [২]
কিন্তু তার এই স্বাতন্ত্র্যচেতনা তার উল্লিখিত পর্যাপ্ত ইসলামায়নের অভাবে কেবল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলেই সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে সে ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চিন্তার ক্ষেত্রে কলকাতায় উদ্ভূত এলিট হিন্দু বাঙালির ঔপনিবেশিক এবং আধুনিক চেতনা ও ভাবধারায় আচ্ছন্ন ছিল। আর এটিই ছিল তার দোদুল্যমান ও দ্বিধাগ্রস্ত আত্মপরিচয়ের মূল কারণ।
এই প্রেক্ষিতে মিল্লাতী রাষ্ট্র ও উম্মাহচেতনার ধারক আল্লামা ইকবাল কলকাতা প্রভাবিত উদীয়মান বাঙালি মুসলিম এলিট শ্রেণির কাছে ক্রমাগত উপেক্ষিত হতে থাকলেন। বাঙালি মুসলিম তার বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে আশ্রয় করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটাচ্ছিল সেখানে একধরনের উর্দু ভাষা বিরোধীতা ও ঘৃণা তৈরি হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারীতে কয়েকজন বাঙালি মুসলিম নিহত হবার প্রেক্ষিতে পূর্ব বাংলায় এমন একটি আবেগী মিথিক পরিবেশ তৈরি হতে পেরেছিল।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৬১ সালে জন্মশতবার্ষিকীকে উপলক্ষ করে বাংলা ভাষায় বিশ্বমানের সাহিত্য ও সঙ্গীত স্রষ্টা পশ্চিম বঙ্গের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব বাংলার মঞ্চে প্রবল উত্থান ঘটে। রবীন্দ্রনাথ একজন উৎকৃষ্ট কবি ও সঙ্গীতকার এতে কোন সন্দেহ নেই; কিন্তু তার জাতীয় চেতনা ও আদর্শ অখন্ড ভারতের আওতায় অবিভক্ত বাংলার পক্ষে-ই অবস্থান নিয়েছিল; তিনি যেহেতু বাংলা ভাষায় লিখে একজন বিশ্বমানের শিল্পস্রষ্টা হতে পেরেছেন সেহেতু তার প্রতি বাঙালি মুসলমানের-ও আকর্ষণ থাকবে নিশ্চয়ই; কিন্তু তাই বলে তাকে পূর্ব বাংলার স্বাতন্ত্র্যকে ভিত্তি করে যে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে তার জাতীয় চেতনার প্রতিভূ মনে করা অযৌক্তিক। আর তাকে সম্মান জানাতে গিয়ে কেন মুসলিম স্বাতন্ত্র্যচেতনার প্রতীক আল্লামা ইকবালকে বিসর্জন দিতে হবে? কেন উর্দু ভাষাকে ঘৃণা করে উপমহাদেশের মুসলিম সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি উজ্জলতম ঐতিহ্য থেকে পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমানকে বঞ্চিত রাখা হবে?
এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখে বাঙালি মুসলমান তার জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের উন্মেষ ও বিকাশ ঘটাবার ফলে উপমহাদেশের মুসলিম ঐক্য ও সংহতি বিঘ্নিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম শক্তি দুর্বল হয়েছে। আজকে যে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে তা এখনো তার পরিচয় সংকট থেকে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এদেশের জনগোষ্ঠী এর প্রভাবে আজো বিভক্ত ও পরস্পর নির্মূল অভিযানে লিপ্ত। এর থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন স্বতন্ত্র ও স্বকীয় চেতনার আলোকে জাতীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিচ্ছিন্নতার মোচন এবং পুনর্গঠন। বাংলাদেশের এই পুনর্গঠনে আল্লামা ইকবালের সাহিত্য ও দর্শন আমাদের জন্য নিশ্চিতভাবে উপকারী পথনির্দেশনা। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
রেফারেন্স:
[১] বদরুদ্দীন উমর, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ১৯৭২, পৃষ্ঠা ১২২ — ১৩৩।
[২] Taj ul-Islam Hashmi, Pakistan as a Peasant Utopia: The Communalization of Class Politics in East Bengal 1920 — 1947, Westview Press, 1992, p. 219 — 262.