আল্লামা ইকবাল এবং বাংলাদেশের স্বতন্ত্র ভাষা ও সাহিত্য প্রশ্ন

আল্লামা ইকবাল বাংলাদেশে কেন ও কিভাবে প্রাসঙ্গিক সে বিষয়ের আলোচনার সূত্রে এখানে অবতারণা করা যেতে পারে পূর্ব বাংলার সাধারণ প্রমিত ভাষা এবং বিশেষভাবে সাহিত্যের ভাষার প্রশ্নটি। লক্ষ করলে দেখা যাবে যে পূর্ব বাংলার প্রমিত ভাষা ও সাহিত্যের ভাষায় পশ্চিম বঙ্গের হিন্দু বাঙালি “বাবু” বা “ভদ্রলোক” শ্রেণির সংস্কৃত প্রভাবিত আধুনিক বাংলা ভাষার অনেক প্রভাব রয়েছে। পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক শব্দ এবং এদেশে প্রচলিত আরবি, ফারসি, উর্দু ও তুর্কী শব্দ বিবর্জিত এই “প্রমিত” ভাষা আসলে একটি কৃত্রিম ভাষা। এই ভাষা তৈরি হয়েছিল কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে ব্রিটিশ প্রাচ্যবাদীদের উদ্যোগে সংস্কৃত পন্ডিতদের মাধ্যমে। এরা প্রাক-আধুনিক বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিকদের আরবী-ফারসি শব্দ প্রভাবিত বাংলা ভাষাকে “মিশ্র ভাষা” বলে বর্জনীয় মনে করলেও তাদের সৃষ্ট সংস্কৃত শব্দ প্রভাবিত বাংলা ভাষাকে মিশ্র ভাষা না বলে “প্রমিত ভাষা” মনে করেছেন। এখানেই নিহিত রয়েছে প্রমিত ও সাহিত্যের ভাষা প্রশ্নে ক্ষমতা ও রাজনৈতিক কর্তাসত্তার বোঝাপড়ার বিষয়টি।
পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, কাজী নজরুল, বিভূতিভূষণ, জীবনানন্দ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখের হাতে এই সংস্কৃত প্রভাবিত মিশ্র বাংলা ভাষাটি একটি শৈল্পিক উৎকর্ষ লাভ করেছে। পশ্চিম বঙ্গের এই সংস্কৃত প্রভাবিত মিশ্র বাংলা ভাষাকেই ভাষা আন্দোলন-উত্তর পূর্ব বাংলা তার প্রমিত ও সাহিত্যের ভাষা হিশেবে বরণ করে নিয়েছে।
জসীম উদ্দীন, আল মাহমুদ, আহমফ ছফা, হুমায়ুন আহমেদ ও সাম্প্রতিক কালের অনেক তরুণের হাতে পূর্ব বাংলা/বাংলাদেশের প্রমিত ও সাহিত্যের ভাষায় একটি আঞ্চলিক শব্দ ভিত্তিক বাচন ও লেখন রীতি বেশ প্রচলিত হয়েছে। এটিকে নিঃসন্দেহে এক কদম অগ্রগতি বলা যায়; কিন্তু এরপরেও পূর্ব বাংলা/বাংলাদেশের প্রমিত ভাষা ও সাহিত্য স্বকীয় ভাষাগত ও চেতনাগত বৈশিষ্ট্যে এখনো একটি উৎকৃষ্ট বিশ্বমানে পৌঁছাতে পারেনি। এর কারণ হল পূর্ব বাংলা বা বাংলাদেশের ভাষা ও সাহিত্য এখনো বাঙালি মুসলমানের ইসলাম-ভিত্তিক জীবনচর্যা ও চেতনার আলোকে পর্যাপ্ত পরিগঠিত হয়নি।
ভারতীয় আলেম মওলানা আবুল হাসান আলী নাদভীর পর্যবেক্ষণ এক্ষেত্রে অনেক প্রাসঙ্গিক। তিনি বাঙালি মুসলমানকে বাংলা ভাষার সাহিত্যিক নেতৃত্ব অর্জনে সচেষ্ট হতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। যেভাবে উত্তর ভারতের মুসলিমেরা উর্দু ভাষাকে ইসলামের সংস্কৃতি ও চেতনার আলোকে জারিত করে এই ভাষার নেতৃত্ব অর্জন করেছে, তেমনিভাবে বাংলা ভাষার সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্যকেও ইসলামের আদর্শ ও চেতনা দিয়ে রাঙিয়ে বাঙালি মুসলমানকে বাংলা ভাষার কর্তাসত্তা হয়ে ওঠার তাগিদ মওলানা নাদভী এদেশের মুসলিমদেরকে দিয়েছিলেন। আর এই বৃহৎ ও মহৎ কর্মে আল্লামা ইকবাল হতে পারেন একজন উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা ও বাতিঘর।
এই লক্ষ্য নিয়ে মওলানা আকরম খাঁ, ইবরাহীম খাঁ, গোলাম মোস্তফা, আবদুল কাদির, আবুল মনসুর আহমদ, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, ফররুখ আহমদ, মনিরউদ্দীন ইউসুফ, মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, সৈয়দ আলী আশরাফ, আল মাহমু্‌দ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, এবনে গোলাম সামাদ, মাহমুদুর রহমান, ফাহমিদ-উর-রহমান প্রমুখ অনুসৃত স্বাতন্ত্র্যবাদী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে ঐতিহ্য হিশেবে বরণ করে নিতে হবে। এভাবে পূর্ব বাংলার/বাংলাদেশের ভাষা ও সাহিত্যকে মুসলিম আদর্শ ও চেতনার অসমাপ্ত পথপরিক্রমার সঙ্গে পুনঃসংযোগ সাধন করতে হবে। সমকালীন বৈশ্বিক মিল্লাত ও উম্মাহচেতনার সংশ্লেষে এই ধারাটিকে পুনর্গঠিত ও পরিপুষ্ট করতে হবে। তাহলে বাঙালি মুসলিম একটি বিশ্বমানের অস্তিত্বে নিজেকে উত্তীর্ণ করতে পারবে, ইনশাআল্লাহ!