বাংলা ভাষায় ইকবাল-চর্চার সেকাল ও একাল

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের আগে থেকেই আল্লামা ইকবালের সাহিত্য বাংলা ভাষায় অনূদিত এবং আলোচিত হয়ে আসছিল। যারা ইকবালের রচনার অনুবাদ অথবা পর্যালোচনা করেছেন তাদের মধ্যে যাদেরকে আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে তারা হলেন গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪), অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-১৯৮৬), আবদুল হক ফরিদী (১৯০৩-১৯৯৬), সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪), হুমায়ুন কবীর (১৯০৬-১৯৬৯), ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪), মনিরউদ্দীন ইউসুফ (১৯১৯-১৯৮৭), শঙ্খ ঘোষ (জন্ম ১৯৩২) এবং সৈয়দ আবদুল মান্নান (?)।
এছাড়া যারা বাংলা ভাষায় ইকবাল চর্চা করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯), শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪), সুফিয়া কামাল (১৯১১-১৯৯৯), আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫), তালিম হোসেন (১৯১৮-১৯৯৯), আবুল হোসেন (১৯২২-২০১৪), সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২), মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-১৯৭১) ও আরো অনেকে।
চলমান ধারাবাহিক নিবন্ধের এই পর্বটি লেখার সূত্রে, বাংলা ভাষায় আল্লামা ইকবালের যেসব রচনা অথবা তার উপরে রচিত পর্যালোচনা আমাকে বিবেচনায় নিতে হয়েছে, সেগুলি হল:
১. কবি গোলাম মোস্তফা অনূদিত ‘শিকওয়া ও জওয়াব-ই-শিকওয়া’ (১৯৬০) ২. তিরিশী পঞ্চকবির অন্যতম অমিয় চক্রবর্তীর লেখা দুটি প্রবন্ধ ‘যুগসংকটের কবি ইকবাল’ এবং ‘ইকবাল কাব্যের নতুন প্রসঙ্গ’ (‘সাম্প্রতিক’ বই থেকে, ১৯৬৪; ‘শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’, সম্পাদনা: ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, ১৯৯৮) ৩. সৈয়দ আবদুল মান্নান অনূদিত ‘আসরারে খুদী’ (১৯৪৫) ৪.আবদুল হক ফরিদী অনূদিত ‘রমূ্য-ই-বেখূদী’ (১৯৫৫) ৫.দুই বাংলার খ্যাতিমান রম্যলেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর ইকবালকে সমালোচনা করে লেখা নিবন্ধ ‘উভয় বাঙলা – নীলমণি’ (সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকা, ১৯৭২; সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী, অষ্টম খন্ড, ১৯৭৭) ৬. প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও লেখক হুমায়ুন কবীরের ইকবাল দর্শনের ব্যাখ্যামূলক নিবন্ধ ‘ইকবাল ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য’ (‘কবি ইকবাল’, সম্পাদক: মোহাম্মদ হবীবুল্লাহ, প্রকাশকাল দেয়া নেই) ৭. মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ অনূদিত ‘ইকবালের নির্বাচিত কবিতা’ (১৯৫২ সালে প্রথম প্রকাশিত সৈয়দ আলী আহসান সম্পাদিত ‘ইকবালের কবিতা’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত) ৮.কবি ও অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফ কৃত ইকবাল কাব্যের অনুবাদ-সংকলন ‘ইকবালের কাব্য-সঞ্চয়ন’ (১৯৬০) ৯.কবি শঙ্খ ঘোষের ‘ঐতিহ্যের বিস্তার’ (১৯৮৯) গ্রন্থের দুটি নিবন্ধ ‘ইকবাল: প্রতিভার অপচয়?’ এবং ‘কেন ইকবাল’ ১০. এছাড়া আল্লামা ইকবালের যে গদ্য রচনাটি তার দার্শনিক ও ধর্মীয় চিন্তার মূল আধার হিশেবে বিশ্ববিখ্যাত সেই ইংরেজী ভাষায় লেখা ‘The Reconstruction of Religious Thought in Islam’ (1934)-এর একটি বাংলা অনুবাদ অধ্যয়ন ও অনুধাবনের চেষ্টা করেছি ‘ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন’ শিরোনামে (অনুবাদ সম্পাদক: অধ্যক্ষ ইবরাহীম খাঁ, ভূমিকা: দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, ১৯৫৭)।
এইসব অনুবাদ ও পর্যালোচনার প্রকাশকাল লক্ষ করলেই এটা পরিস্কার হয়ে যাবে যে ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যবর্তী সময়কালেই সর্বাধিক ইকবাল-চর্চা হয়েছে। আবার যদি প্রকাশস্থান খেয়াল করি তাহলে এই সিদ্ধান্তে আসা সহজ হয়ে যায় যে তৎকালীন পূর্ব বাংলাতেই বাংলা ভাষায় সর্বাধিক ইকবাল-চর্চা হয়েছে। এর কারণ অত্যন্ত সহজ; যেহেতু আল্লামা ইকবালের মিল্লাত ধারণা ও উম্মাহচেতনার একটি রূপরেখা হিশেবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যূদয় হয়েছিল সেহেতু তৎকালীন পূর্ব বাংলা, যা “পূর্ব পাকিস্তান” অভিধা পেয়েছিল, সেখানে ইকবাল চর্চা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে দ্রুত বিকাশ লাভ করেছিল।
আবার ১৯৭১ সালে যখন বিউপনিবেশিত হতে ব্যর্থ কামালবাদী পাকিস্তান রাষ্ট্রটি স্বায়ত্ত্বশাসন ও স্বাধিকারের প্রশ্নে পূর্ব বাংলার উপরে একটি রক্তক্ষয়ী গণহত্যা ও নারী ধর্ষণে অভিযুক্ত হয়ে পড়ে তখন একটি বাঙালি জাতিবাদী প্রতিহিংসা ও ঘৃণাবাদী প্রতিক্রিয়া ও আবেগের পরিবেশ তৈরি হয়। এই জিঘাংসা ও প্রতিশোধের আবেগ ও আবেশে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল পরিমন্ডলও প্রভাবিত হয়ে পড়ে। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালে যে কলোনিয়াল সিভিল ও সামরিক আমলাতন্ত্র ও এলিটের অপকর্মের ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ভেঙে পড়েছিল তার দায় আল্লামা ইকবালের উপরেও বর্তানো হয়েছে। কাজেই পূর্ব বাংলায় যে নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির রক্তাক্ত অভ্যূদয় হল সেই রাষ্ট্রটি আল্লামা ইকবালের প্রতি রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য প্রত্যাহার করে নিল। এরই ফলে বাংলাদেশে একাত্তর-পরবর্তী কালে ইকবাল-চর্চা স্তিমিত হয়ে পড়েছে। স্কুলের পাঠ্যবই, বেতার, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির বলয়ে তথা জনপরিসরে ইকবাল অনুপস্থিত, অপাংক্তেয় এবং অস্পৃশ্য অপর।
একাত্তর-পূর্ব ও একাত্তর-পরবর্তী ইকবাল-চর্চার এই বৈপরীত্যকে খোলাসা করার জন্য এখানে কয়েকটি উদ্ধৃতি পেশ করছি:
প্রথম উদ্ধৃতিটি হল তিরিশী আধুনিক কবি অমিয় চক্রবর্তীর লেখা ‘যুগসংকটের কবি ইকবাল’ প্রবন্ধ থেকে। এখানে তিনি গভীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতার সঙ্গে ১৯৩৭ সালে লাহোরে আল্লামা ইকবালের সঙ্গে তার সাক্ষাতের একটি চমৎকার বর্ণনা দিচ্ছেন:
“কবি ইকবালের বাড়ির দরজাটা খুলে মনে হ’ল মধ্য-এসিয়ার বিস্তৃত অঙ্গনে এসে পৌঁচেছি যেদিকে লাহোরের কাবুলি দরোয়াজা খোলা। উত্তর-ভারতের মুক্ত হাওয়া ইকবালের কথাবার্তায়, তাঁর দরাজ ব্যবহারে, ঘরের পঞ্জাবি-আফগানি সরঞ্জামে। তাঁর শরীর অসুস্থ ছিল। [১] কৌচে ঈষৎ হেলান দিয়ে উঠে বসলেন, হাতে গড়গড়ার নল। পরনে তাঁর ধবধবে পিরান, ফুলো পাজামা। তাঁর সৌজন্য সুন্দর বললে সব বলা হয় না, যেন ব্যবহারের একটি শিল্পকাজ; এইরকম আভিজাত্য পুরনো পশ্‌মিনার উপরে কাশ্মীরী ফুলের মতো, দুর্লভ সামগ্রী। অথচ প্রখর যুগসচেতন মন, হাস্যোজ্জ্বল। একেবারে ভারতীয় এবং আধুনিক পারসিক তাঁর চিন্তার সৌকর্য। জানতাম এই কবি দামাসকুস, কাইরো থেকে পঞ্জাব পর্যন্ত পারসিক উর্দু ভাষায় লোকের মন নাড়িয়েছেন; ভারতবর্ষব্যাপী তাঁর ‘হিন্দোস্তান হমারা’ গানের চল; কেম্ব্রিজের ইনি মেধাবী পন্ডিত; এর মত চোস্ত ইংরেজী কম-ভারতীয় লিখেছেন। অথচ কত হালকা তাঁর জ্ঞানের ভার, সহজ দিলদরিয়া ভাব। বুঝলাম একেই আমরা কস্‌মোপলিটান মন বলি, যা স্বদেশী অথচ প্রসারী, যেখানে লেনদেন চলছে বড় চত্বরে, নানাদেশীয় আধুনিকে-প্রাচীনে সমন্বয়।” [২]
এবারে উদ্ধৃত করছি প্রখ্যাত বাঙালি মুসলমান শিক্ষাবিদ, কবি ও সম্পাদক যিনি ভারতের প্রশাসনে উচ্চপদে আসীন হয়েছিলেন সেই অক্সফোর্ডের মেধাবী শিক্ষার্থী হুমায়ুন কবীরের একটি নিবন্ধ থেকে:
“ইকবালের কাব্যপ্রতিভা অবিসম্বাদী, কিন্তু চিন্তানায়ক হিসাবেও তাঁর আসন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষীদের মধ্যে। কবি ইকবাল এবং দার্শনিক ইকবালের মধ্যে কে বড় সে বিষয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কই প্রমাণ করে যে ইকবালের জীবনদর্শন ভারতের ইতিহাসে স্বকীয়তায় পরিপূর্ণ। শিক্ষা এবং সংস্কার, সমাজ ও ব্যক্তির সম্বন্ধ এ সমস্ত প্রশ্নই চিত্তকে আকর্ষণ করেছিল এবং কখনো কাব্যে কখনো গদ্য রচনায় তাঁর চিন্তার ধারা তিনি অমর করে রেখেছেন।” [৩]
কবি ফররুখ আহমদ আল্লামা ইকবালের কবিতার বাংলা অনুবাদে এনেছিলেন এক শিল্পসৌকর্য ও উৎকর্ষ যা আজ অবধি আর কেউ পেরেছেন কিনা সন্দেহ। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত তার এই ইকবাল কাব্যের অনুবাদ সম্পর্কে বিশিষ্ট সমালোচক মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর এই উদ্ধৃতিটি প্রণিধানযোগ্য:
“… [ইকবালের কবিতা অনুবাদ করতে গিয়ে] ফররুখ আহমদ মূল থেকে তেমন দূরে সরে যাননি, বরং মূল ভাববস্তু এবং শিল্পসম্পদের ওপর ভিত্তি রেখেই, তাঁর সৃজনক্ষমতার স্পর্শে এই অনুবাদ কবিতাটিকেও নতুন মহিমা দিয়েছেন, এবং তাতে প্রাণ সঞ্চার করেছেন। আর এক্ষেত্রে তাঁর সহায়ক হয়েছে ভাষা ও ছন্দের ওপর অবাধ অধিকার এবং কল্পনা-প্রতিভা। তিনি যখন উচ্চারণ করেন:
ওঠো – দুনিয়ার গরীব ভুখারে জাগিয়ে দাও। ধনিকের দ্বারে ত্রাসের কাঁপন লাগিয়ে দাও করো ঈমানের আগুনে তপ্ত গোলামী খুন বাজের সমুখে চটকের ভয় ভাঙিয়ে দাও ঐ দেখ আসে দুর্গত দীন-দুখীর রাজ; পাপের চিহ্ন মুছে দাও, ধরা রাঙিয়ে দাও।। কিষাণ-মজুর পায় না যে মাঠে শ্রমের ফল সে মাঠের সব শস্যে আগুন লাগিয়ে দাও। স্রষ্টা ও তার সৃষ্টির মাঝে কেন আড়াল? মধ্যবর্তী মোল্লাকে আজ হাঁকিয়ে দাও… … …
তখন এই রচনা আদৌ অনুবাদ বলে মনেই হয় না, এটি ইকবাল কিংবা অন্য কারো কবিতা কিনা, সে-প্রশ্নও মনে জাগে না, বরং একটি মৌলিক কবিতারূপেই পাঠকের চেতনায় আঘাত হানে, মনে অনুরণন জাগায়। অনুবাদের ক্ষেত্রে এরচেয়ে বড় সার্থকতা আর কি হতে পারে?” [৪]
এভাবে আল্লামা ইকবালের কাব্য ও দর্শন যখন বাংলা অনুবাদের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলায় ক্রমাগত প্রচার ও প্রসার লাভ করছিল তখন ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক সংকট এই ধারায় ছেদ ঘটায়। জাতিবাদী হিংসা ও ঘৃণার সার্বিক প্লাবনে পরিবেশ বিষিয়ে ওঠে। এই পরিবেশের গর্ভ থেকে যে বাংলাদেশের অভ্যূদয় হয় তা আরো কামালবাদী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ প্রতিহিংসায় আরো উগ্র সেক্যুলার, জাতিবাদী, বাঙালিত্ববাদী এবং পাঞ্জাবি-বিহারী জাতিসত্তা ও উর্দু ভাষা বিদ্বেষী হয়ে ওঠে। অসাম্প্রদায়িকতার ছদ্মবেশে এই ধর্মবিদ্বেষী সংকীর্ণ ও কূপমন্ডুক পরিবেশে জ্বলন্ত আগুনে তপ্ত হাওয়া দিতে এগিয়ে আসেন সৈয়দ মুজতবা আলী; তিনি লেখেন:
“….ভূরি ভূরি গর্দভ গর্দভী জর্মনী থেকে – জর্মনী কেন, সর্বদেশেই – নিত্যি নিত্যি ডক্টরেট পেয়েছে ও পাবে। অতএব ইকবাল-‘ভক্ত’ মদোৎকট পচঞ্চনদবাসী কবি ইকবালের ডক্টরেট নিয়ে যতই ধানাই পানাই করুক, ডক্কা-ডিন্ডিম-নাদ ছাড়ুক, তদ্বারা বিন্দুমাত্র বিচলিত হওয়ার কারণ নেই। বিশেষত আমরা যখন বিলক্ষণ অবগত আছি, উচ্চাঙ্গের কাব্য রচনার জন্য দর্শন-শাস্ত্রের প্রয়োজন নেই, এবং ঐ উদ্দেশ্যে ম্যুনিক পানে ধাবমান হওয়াও বন্ধ্যাগমন। বস্তুত কবি ইকবালের ডক্কাবাদক পঞ্চনদ সম্প্রদায় তাঁর যে-সব “দার্শনিক কবিতা”র প্রশস্তিতে পঞ্চমুখ সেগুলি না দর্শন না কবিতা।” [৫]
“… … ইকবাল যখন গাইলেন, “চীন ও আরব আমাদের হিন্দুস্থান আমাদের” তখন এই “আমাদের”-এর আমরা খুব সম্ভব একমাত্র মুসলমানগণ, কারণ চীন ও আরবে হিন্দু আছেন বলে শুনিনি। পক্ষান্তরে তিনি যখন বলেন, “হিন্দুস্থান সর্ববিশ্বে শ্রেষ্ঠতম” তখন নিশ্চয়ই তিনি আপন মাতৃভূমিকে (সে যুগে ভারত) ইসলামের জন্মভূমি আরবের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর আসন দিচ্ছেন। অতএব তিনি প্রথম মুসলিম তারপর ভারতীয়, না প্রথম ভারতীয় তারপর মুসলিম এ-সমস্যা থেকেই যায় – অন্তত আমার কাছে। সর্বশেষ প্রশ্ন, দেশ, ধর্ম, ভগবান ইত্যাদির প্রতি রচিত কবিতা আজ পর্যন্ত বিশ্বকাব্যে কতখানি সফল হয়েছে, কোন পর্যায়ে উঠতে পেরেছে, সেটাও পাঠক বিবেচনা করে দেখবেন।” [৬]
“….স্বধর্মাভিমান যখন অন্য ধর্মকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে এমনকি বৈরীভাবে দেখতে আরম্ভ করে — বিশেষ করে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর – তখন প্রতিবেশী ভারতীয় হিন্দুর প্রতি পাঞ্জাবীদের রাজনৈতিক আচরণও যে বৈরীভাবাপন্ন হবে সেটা নিতান্তই স্বাভাবিক।” [৭]
“দেশ বিভাগের পর পাঞ্জাবীদের ভিতর দেখা দিল দুই প্রকারের আত্মম্ভরিতা। পাকিস্তান পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র অতএব পাকিস্তানীরা বিশ্ব মুসলিমের প্রতিভূ, এবং যেহেতু তাঁরা প্রতিভূ, অতএব তাঁরা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলমান; বলা বাহুল্য সেই সর্বশ্রেষ্ঠদের মুকুটমণি স্বভাবতই, অতি অবশ্যই পাঞ্জাবী মুসলমান। সূত্রটি সত্য কিন্তু তার থেকে যে দু’তিনটি সিদ্ধান্ত হল সেগুলো যুক্তি ও ইতিহাসসম্মত নয়।” [৮]
“… … …পাঞ্জাবী মুসলমানরা পাক-ভারতে শ্রেষ্ঠ — সর্বশ্রেষ্ঠ না – যোদ্ধা হিসাবে বিখ্যাত ছিলেন। পঞ্চাশাধিক বৎসর ধরে আমি সিভিল মিলিটারি উভয় শ্রেণীর পাঞ্জাবীকে চিনি এবং কস্মিনকালেও এই খ্যাতিতে বিশ্বাস করিনি।” [৯]
“… … …ইয়াহিয়ার একাধিক সেপাই দ্বারা পর পর ধর্ষিতা অগণিত নারী সঙ্গে সঙ্গে প্রাণত্যাগ করেছে। অফিসারদের জন্য প্রতি কেন্টুনমেন্টে নির্মিত হয়েছিল ব্রথেল – অনেক মেয়েকেই লুট করে আনা হয়েছিল মেয়ে-বোর্ডিং থেকে। ঢাকাস্থ সাধারণ পাঞ্জাবী সেপাই ঢাকার সামান্য বাইরে মুক্তি ফৌজের ভয়ে…মুক্ত পাজামা হয়ে গিয়েছিল। ….এবং পরাজয় অনিবার্য জানামাত্রই অফিসার গোষ্ঠী প্রাইভেটদের না জানিয়ে প্লেন, হেলিকপ্টার, লঞ্চ চুরি করে পালায়… …এদের আমি শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা বলি কি করে?” [১০]
সৈয়দ মুজতবা আলী এভাবে ইকবালের উচ্চশিক্ষার জার্মান ডিগ্রীকে লক্ষ করে একধরনের নোংরা ব্যক্তি আক্রমণ দিয়ে শুরু করেছেন। এরপরে তিনি ইকবালের বৈশ্বিক মিল্লাত ও উম্মাহচেতনাকে ঠিকমত না বুঝে একে সাম্প্রদায়িক, জাত্যাভিমানী, ধর্মাভিমানী ইত্যাদি বলেছেন। মুসলমানদের ধর্মভিত্তিক জাতিবোধ এবং দেশচেতনার পার্থক্য না বুঝে এগুলিকে পরিচয় সংকট সৃষ্টিকারী ও বিভ্রান্তিকর বলেছেন। ধর্মচেতনা দিয়ে মহৎ সাহিত্য সৃষ্টির কোন নজির নেই বলেছেন। অথচ ল্যাটিন মহাকবি দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ কিংবা ইংরেজ মহাকবি মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ তো ধর্মচেতনা দ্বারা প্রারম্ভিক আধুনিক কালের মহৎ সাহিত্য সৃষ্টির নমুনা; এছাড়া বিশ শতকীয় আধুনিক ইংরেজী কাব্যে রয়েছে কবি ডব্লিউ বি ইয়েটসের আইরিশ লোকজ ইতিহাস ও খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি বিপুল উল্লেখে ভরপুর কাব্যের নমুনা। এছাড়া মার্কিন-ব্রিটিশ আধুনিক কবি টি এস এলিয়টের রয়েছে ক্যাথলিক চৈতন্যকে ধারণ করে অসামান্য কবিতা লেখার উৎকর্ষ ও সাফল্য। কাজেই সৈয়দ সাহেবের এসব অভিযোগ ও আপত্তি ধোপে টেকে না।
আর সর্বশেষে তিনি ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধকালীন পাঞ্জাবী মুসলিম সৈনিক ও অফিসারদের বিচ্ছিন্ন কিছু অপকর্মের অতিরঞ্জিত বয়ানের উপরে নির্ভর করে যেভাবে পাঞ্জাবী মুসলিমদের সম্পর্কে সাধারণীকরণ করেছেন এবং স্টেরিওটাইপ আকারে চিত্রিত করেছেন তা অনেকটাই বর্ণবাদী এবং জাতিবিদ্বেষী রূপ পরিগ্রহ করেছে। সৈয়দ সাহেব এই কাজটি খুব সচেতনভাবে করেছিলেন ইকবালের পাঞ্জাবী জাতিসত্তাগত পরিচয়কে হেয় করার হীন উদ্দেশ্যে। যদিও ইকবাল পাঞ্জাবের অধিবাসী হলেও কাশ্মীরী ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূত ছিলেন।
মোদ্দা কথা হল সৈয়দ মুজতবা আলী একজন প্রকাশ্য মদ্যপায়ী, সম্ভোগবাদী, নন-প্রাকটিসিং মুসলিম। তিনি একজন প্রান্তিক সেক্যুলার, আধুনিক ও অতি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী, পাশ্চাত্যমনা মানুষ। তার এই পক্ষপাতদুষ্ট চশমা পরা চোখে ইকবালের কুর’আন-নির্ভর জাতি ও ধর্মবোধ এবং জীবনদর্শন ও শিল্পচৈতন্য যে অপ্রিয় এবং বিভ্রান্ত বলে মনে হবে সেটাই স্বাভাবিক।
সৈয়দ মুজতবা আলীর এই তীব্র নেতিবাচক ইকবাল সমালোচনার এক দশকেরও বেশি পরে শঙ্খ ঘোষ নিয়ে এলেন তার ‘জাভিদনামা’র বাংলা অনুবাদ। সেখানে তিনি কম বেশি ইকবালকে একজন ‘মানবতাবাদী’ কবি হিশেবে দেখিয়েছেন; যেখানে ইকবাল তার নির্দিষ্ট সম্প্রদায়চেতনারও উর্ধ্বে। শঙ্খ ঘোষ এটা ভালই বলেছেন। আসলে এই কথিত ‘মানবতাবাদী’ বায়বীয় দৃষ্টিভঙ্গীটি ইকবাল সম্পর্কে ভারতের যে অফিসিয়াল পলিসি রয়েছে তার সঙ্গেই অনেকটা সাযুজ্যপূর্ণ।
তবে শঙ্খ ঘোষ ইকবালের সঙ্গে এক নারীর ব্যাক্তিগত প্রেমের সম্পর্কের আলাপও তুলেছেন। এই সম্পর্ক পারিবারিক ও সামাজিক বাধা পেরিয়ে বিবাহে পরিণত হতে না পারায় ইকবাল দারুণভাবে হতাশাগ্রস্ত ও অসুখী ছিলেন বলে তিনি মনে করেন। ঐ নারী লিখিত একটি ছোট্ট পুস্তিকার বরাতে তিনি আরো বলতে চেয়েছেন যে ইকবাল-জীবনের এই ব্যক্তিগত ট্রাজেডির কারণে ইকবালের আরো বড় ও মহৎ হবার সম্ভাবনা নাকি পূরণ হয়নি। এভাবে একটি তীর্যক দৃষ্টিপাত যোগ করে শঙ্খ ঘোষ বলতে চেয়েছেন যে ইকবাল এরপর যা করেছেন তাকে কী তার প্রতিভার অপচয় বলা যেতে পারে কিনা? [১১]
এই অবান্তর প্রশ্নের জবাবে আমরা বলব যে আমরা ইকবালের মতো কোনো ইতিমধ্যে মহৎ ও সফল ব্যক্তির জীবন ও কর্ম সম্পর্কে এই ধরনের ব্যক্তিগত একটি ঘটনা দিয়ে অনুমানমূলক কল্পনাবিলাসে নিযুক্ত হওয়াকে অবাঞ্ছিত ও অশোভন বলে মনে করি।
ইকবাল একজন অত্যন্ত গভীর বিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ ছিলেন। সেকারণেই তিনি তার সমকালে ও উত্তরকালে বিশ্বের বিপুল মানুষের কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন ও থাকবেন।


রেফারেন্স:
[১] ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে ইকবালের সঙ্গে কবি অমিয় চক্রবর্তীর প্রথম পরিচয় হয়েছিল।
[২] অমিয় চক্রবর্তী, যুগসংকটের কবি ইকবাল, (‘সাম্প্রতিক’ (১৯৬৩) বই থেকে), শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, সম্পাদনা: ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ১৯৯৮, পৃষ্ঠা ১২২
[৩] হুমায়ুন কবীর, ইকবাল ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, ‘কবি ইকবাল’, সম্পাদক: মোহাম্মদ হবীবুল্লাহ, ঢাকা, প্রকাশকাল দেয়া নেই, পৃষ্ঠা ৩৬
[৪] মোহাম্মদ মাহ্‌ফুজউল্লাহ্‌, ভূমিকা, ফররুখ আহমদ অনূদিত ‘ইকবালের নির্বাচিত কবিতা’, ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র রাজশাহী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮০, (১৯৫২ সালে প্রথম প্রকাশিত সৈয়দ আলী আহসান সম্পাদিত ‘ইকবালের কবিতা’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত), পৃষ্ঠা ১৫-১৬
[৫] সৈয়দ মুজতবা আলী, ‘উভয় বাঙলা – নীলমণি’ (পঞ্চতন্ত্র, সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকা, ১৯৭২), সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র ও অন্যান্য সম্পাদিত, অষ্টম খন্ড, উভয় বাঙলা, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৭৭, পৃষ্ঠা ৩২৩
[৬] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩২৪
[৭] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩২৪-৩২৫
[৮] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩২৫
[৯] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩২৫
[১০] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩২৬
[১১] শঙ্খ ঘোষ, ইকবাল: প্রতিভার অপচয়? ঐতিহ্যের বিস্তার, প্যাপিরাস, কলকাতা, ১৯৮৯, পৃষ্ঠা ৭৪ – ৮৬