আল্লামা ইকবাল এবং আবুল মনসুর আহমদ

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর থেকে উপমহাদেশে মুসলিমরা সাধারণভাবে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ১৭০৭ সালে মৃত্যু থেকেই উপমহাদেশে মুসলিম অবনতির সূত্রপাত হয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ দমনের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশে মুসলিম পতনকে চূড়ান্ত রূপ দেয়।
উপমহাদেশের মুসলিমদের এই অবনতি ও পতনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন রকমের প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। প্রথমেই যে প্রতিক্রিয়াটির কথা উল্লেখ করতে চাই সেটি ছিল ঐতিহ্যবাদী উলামাদের অরাজনৈতিক মাদরাসা-ভিত্তিক ইসলামী শিক্ষা সংরক্ষণের উদ্যোগ। এই উদ্যোগের ফল ছিল উত্তর-পশ্চিম ভারতের দেওবন্দে ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম মাদরাসা। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে সৈয়দ আহমদ বেরেলভীর নেতৃত্বে জিহাদী আন্দোলনের অসফল পরিসমাপ্তি ও পরবর্তীকালে ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের নির্মম ও নিষ্ঠুর দমনের প্রেক্ষাপটে এই ঐতিহ্যবাদী উলামারা সিদ্ধান্ত নিলেন যে তারা প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে দূরে থাকবেন এবং জনগণের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে মাদরাসায় ইসলাম-শিক্ষার স্বাধীনতা সংরক্ষণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন। পূর্ব বাংলার ঐতিহ্যবাদী উলামারাও এই অরাজনৈতিক ও রাষ্ট্র-বহির্ভূত মাদরাসা শিক্ষাকেন্দ্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। মুফতী ফয়জুল্লাহ (১৮৯২-১৯৭৬), মওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (১৮৯৫-১৯৮৭), মওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (১৮৯৬-১৯৬৯) এবং আল্লামা শাহ আহমদ শফী (জন্ম ১৯১৬) প্রমুখ এই কওমী শিক্ষা আন্দোলনেরই ফসল ও নেতৃত্ব।
১৮৫৭-উত্তর উপমহাদেশের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে মুসলিমদের দ্বিতীয় যে শিক্ষাগত প্রতিক্রিয়াটি আলোচনার দাবী রাখে সেটি হল স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮) কর্তৃক ১৮৭৫ সালে প্রবর্তিত আলীগড় আন্দোলন। এই শিক্ষা আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্য ইংরেজী ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে পশ্চিমা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জন করা এবং উপনিবেশিক ভারতের প্রশাসন ও সমাজের নেতৃত্বে আসীন হওয়া। এক্ষেত্রে অধিকতর অগ্রসর উপমহাদেশীয় হিন্দুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে নিজেদের অধিকার ও সুযোগ সুবিধা আদায় করে নেয়াটাও এই লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আল্লামা ইকবাল বিশ শতকের সূচনা থেকে তার কাব্য ও দর্শনে ইসলামের যে চিত্রটি অঙ্কন করেছিলেন তা মূলত উপমহাদেশের তৎকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমিতে মুসলমানদের জন্য একটি নবজাগরণের বার্তা বহন করেছিল। এক্ষেত্রে তিনিও পর্যালোচনা সাপেক্ষে পশ্চিমা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার পক্ষপাতী ছিলেন। সুতরাং আল্লামা ইকবাল এদিক থেকে এক অর্থে স্যার সৈয়দের উত্তরাধিকারী ছিলেন বলা যায়। কিন্তু তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের মোকাবেলায় স্যার সৈয়দের মত অনুতপ্ত ভাষ্যকার বা এপলোজেটিক ছিলেন না। তিনি বরঞ্চ ইসলামের সক্রিয়বাদী ভাষ্যের পাটাতনে দাঁড়িয়ে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার পর্যালোচনা ও সমালোচনায় অসামান্য দক্ষতা ও কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন। এছাড়া তিনি স্যার সৈয়দ আহমদ সূচিত হিন্দু-মুসলিম স্বাতন্ত্র্যের ধারণাকে আরো বিকশিত করে ১৯৩০ সালে এলাহাবাদ ভাষনে একটি পূর্ণাঙ্গ মুসলিম মিল্লাত বা বিশ্বমুসলিম চেতনায় পৌঁছেছিলেন। [১] কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালে ঘোষিত লাহোর প্রস্তাবে এই চেতনাকে দ্বিজাতিতত্ত্বে রূপান্তরিত করে।
বাঙালি মুসলিম স্বাতন্ত্র্যচেতনার নকিব আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯) আল্লামা ইকবালের দ্বারা এক্ষেত্রে স্পষ্টতই প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি ১৯৪২ সালে অন্যান্যদের সঙ্গে মিলে যে ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’তে অংশগ্রহণ করেছিলেন তা ছিল এই চেতনার আলোকে গড়ে ওঠা একটি সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন। তার সঙ্গে পূর্ব বাংলার সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তি ও কৃষ্টিকে এই মুসলিম স্বাতন্ত্র্যচেতনায় জারিত করতে আরো যারা যোগ দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৯), গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪), আবুল কালাম শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৮), হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী (১৯০৬-১৯৬৬), আবুল হোসেন (১৯২২-২০১৪) প্রমুখ। ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪), সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন (১৯২০-১৯৯৫) এবং সৈয়দ আলী আহসান-ও (১৯২২-২০০২) এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।
এবারে দেখা যাক আবুল মনসুর আহমদ পূর্ব বাংলার স্বতন্ত্র মুসলিম জাতি, রাষ্ট্র, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে কি ভেবেছিলেন। তার নিজস্ব লেখার পাঠ পর্যালোচনার মাধ্যমে আমরা তার এই বোঝাপড়াকে বুঝতে চাই। তিনি ১৯৪৪ সালে কলকাতা ইসলামীয়া কলেজে অনুষ্ঠিত ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’র সম্মিলনীতে দেয়া মূল-সভাপতির ভাষনে বলেন:
“…রাজনীতিকের বিচারে ‘পাকিস্তানের’ অর্থ যাই হোক না কেন, সাহিত্যের কাছে তার অর্থ তমদ্দুনি আজাদি, সাংস্কৃতিক স্বরাজ, কালচার‍্যাল অটনমি। … … …তমদ্দুনি আজাদি ছাড়া কোন সাহিত্য বাঁচতে পারা তো পরের কথা, জন্মাতেই পারে না। … … …জাতিতে-জাতিতে সংস্কৃতিগত পার্থক্য কত সুস্পষ্ট। হরেক জাতির রাজনৈতিক আজাদি নিশ্চয়ই হবে অদূরাগত ভবিষ্যতের যুগবাণী। কিন্তু সে রাজনৈতিক স্বরাজের সার্থকতা হবে জাতির স্বকীয় নিরংকুশ বিকাশে। এই বিকাশের মর্মবাণী হচ্ছে তমদ্দুনি আজাদি বা কালচার‍্যাল অটনমি। এরই নাম পাকিস্তান। কৃষ্টিগত পরসহিষ্ণুতা পাকিস্তানের বুনিয়াদ।
… … …হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতিকে নিজ নিজ স্বকীয়তায় বাড়তে দিতে হবে। যারা অতীতে হিন্দু-মুসলিম-সংস্কৃতিকে ভেঙ্গেচুড়ে এক করতে চেয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যের সাধুতায় শ্রদ্ধা জানিয়েও আমরা বলতে বাধ্য, তাঁরা ঠিক কাজ করেন নি।
… … …অনেক বন্ধুর ধারণা, পাকিস্তান আন্দোলনটা প্রগতি-বিরোধী। কারণ এতে জোর দেওয়া হচ্ছে ধর্মোন্মাদনার দিকে এবং তাতে করে উপেক্ষা করা হচ্ছে বিজ্ঞান, প্রগতি ও মুক্তবুদ্ধিকে। বন্ধুদের এ কথাটা যে শুধু স্থূলদর্শী ও অজ্ঞতা-প্রসূত তাই নয়, কথাটা অবৈজ্ঞানিকও বটে অনৈতিহাসিকও বটে। কারণ কোনো জাতি বা মানব গোষ্ঠীই নিজের সংস্কৃতিকে এড়িয়ে বা ডিঙিয়ে প্রগতির পথে এগুতে পারে না। যারা সে চেষ্টা করে, তারা অনুকরণ করে মাত্র, সৃষ্টি করে না। দুনিয়ার প্রগতিতে কোনো দান করতে তারা পারে না। অতএব সংস্কৃতিই হচ্ছে সকল জাতির জীবন সাধনার বুনিয়াদ। আর এই সংস্কৃতি হচ্ছে ধর্ম-বীজেরই ফুলে-ফুলে-মঞ্জরিত জীবন্ত গাছ।” [২]
এভাবে আবুল মনসুর আহমদ ‘পাকিস্তান’ ও ‘পূর্ব পাকিস্তান’ প্রসঙ্গে তার যে বয়ানটি এই ভাষনে উপস্থাপন করেছেন সেখানে দেখা যাচ্ছে তার মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধের বুনিয়াদ নিহিত রয়েছে ধর্ম ও সংস্কৃতির এক মিথষ্ক্রিয়ার মধ্যে। এরপরে এই বয়ানে বৈশ্বিক মাত্রা সংযোজন করে তিনি বলেছেন:
“…পাকিস্তান রাষ্ট্র-দর্শনের কথা নয়; এটা জীবন-দর্শনের কথা। পাকিস্তান শুধু মুসলমানের জীবন-বাণী নয়; শুধু ভারতের হিন্দু-মুসলিমেরও বাণী নয়। পাকিস্তান সারা দুনিয়ার অদূরাগত ভবিষ্যতের বাণী।” [৩]
এভাবে পাকিস্তান ধারণাকে একটি বিশ্বজনীন এবং সর্বজনীন ইসলামিকতার উপরে স্থাপন করবার পরে তিনি আবার ফিরে আসছেন একেবারে তার স্থানীয় ও মূর্ত প্রেক্ষিতে অর্থাৎ তার পূর্ব বাংলায় যাকে তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তান’ আখ্যা দিতে পছন্দ করেছেন; তিনি বলছেন:
“এইবার আসুন পূর্ব-পাকিস্তানে। ভারতের হিন্দু ও মুসলমানরা একজাতি নয়। তাদের সংস্কৃতিও এক নয়। … … …কিন্তু হিন্দুরা বা মুসলমানরাই কি নিজেরা এক-একটা আস্ত জাতি? অথবা তাদের সংস্কৃতি এক-একটা আস্ত কৃষ্টি? তা’ নয়। আরবি, তুর্কী, আফগানরা একই মুসলমান হয়েও এক জাতি নয়। … … …এদের ধর্ম এক হলেও তমদ্দুন এক নয়। গাছ ও বীজের মধ্যে যা সম্পর্ক, ধর্ম সংস্কৃতির সম্পর্ক তাই। ধর্ম থেকেই সংস্কৃতির জন্ম। বীজ থেকেই গাছের জন্ম। আবার গাছের মধ্যেও বীজ রয়েছে। সংস্কৃতির মধ্যেও ধর্ম লুকিয়ে আছে। তবু গাছ ও বীজ এক নয়। ধর্ম ও সংস্কৃতি এক জিনিস নয়। ধর্ম ভূগোলের সীমা ছাপিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু তমদ্দুন ভূগোলের সীমা এড়াতে পারে না। বরঞ্চ সে সীমাকে আশ্রয় করেই সংস্কৃতির পয়দায়েশ ও সমৃদ্ধি।
এইখানেই পূর্ব ও পশ্চিম-পাকিস্তানের সরহদ্দ। এইখানেই পূর্ব-পাকিস্তান একটা ভৌগোলিক সত্তা। এই জন্যই পূর্ব-পাকিস্তানের বাশিন্দারা ভারতের অন্যান্য জাত থেকে এবং পশ্চিম-পাকিস্তানের ধর্মীয় ভ্রাতাদের থেকে একটা স্বতন্ত্র আলাহিদা জাত। …. …. …
পূর্ব-পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি তাই পূর্ব-পাকিস্তানেরই রেনেসাঁ আনতে চায়।” [৪]
এরপরে তিনি রেনেসাঁ বলতে কি বোঝেন সেটা স্পষ্ট করে বলেন:
“… … …আমরা শুধু রাষ্ট্র-বিপ্লবে সন্তুষ্ট হতে পারি না। আমরা চাই জাতির সর্বাঙ্গীন বিপ্লব। আর সে বিপ্লব হবে জনগণের কল্যাণে রূপায়িত। শুধু রাষ্ট্র-রূপের পরিবর্তনে বা রাষ্ট্র-নেতার হাতফেরিতে পর্যবসিত হবে না সে বিপ্লব। রিভলিউশনে যে রাষ্ট্র রূপায়ণ হবে, তাতে গণকল্যাণ হতেও পারে, নাও হতে পারে। তাতে বিপ্লবীর জয় হতে পারে, আবার প্রতি-বিপ্লবীরও জয় হতে পারে। কিন্তু রেনেসাঁর পথে যে সর্বাঙ্গীন জয়লাভ হবে, তাতে এ ডিক্টেটর বা ও ডিক্টেটরের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে না; প্রতিষ্ঠিত হবে এক আল্লাহর রাজত্ব। সে রাষ্ট্রে তখন এ-শাসক ও-শাসিত বলে কেউ থাকবে না; সবাই হবে স্বরাট; সকলে হবে সমান। সে রাজ্যে এ-ধনিক আর ও-শ্রমিক বলে কেউ থাকবে না, সব ধনের মালিক হবেন আল্লাহ। আর আল্লার ধনের সমান ভোগী হবে তার সকল বান্দা। এজন্য রেনেসাঁ সোসাইটি রিভলিউশনের চেয়ে রেনেসাঁয় বেশি বিশ্বাসী।” [৫]
এরপরে আবুল মনসুর আহমদ ব্যাখ্যা করেছেন যে কেন তিনি রেনেসাঁ চান কিন্তু রিফরমেশন এবং রিভাইভাল চান না:
“তারপর রিফরমেশন নয় কেন? রিফরমেশন ধর্মীয় সংস্কারের কথা। আমরা মুসলমান। ইসলাম আমাদের ধর্ম। ধর্ম আমাদের দ্বীনে-মোকাম্মে। কোন রিফরমেশনের এতে দরকার নেই; কোন সংস্কারের এতে গুঞ্জায়েশ নেই। ইউরোপে রিফরমেশনের দরকার পড়েছিল। কারণ খৃষ্ট-ধর্ম সেখানে স্বরূপ হারিয়ে গোঁড়া কুসংস্কারে পরিণত হয়েছিল। আমাদের ইসলামে তা হয়নি, এর চারপাশে অনেক আগাছা-আবর্জনা জন্ম নিয়েছে সত্য, কিন্তু কালের বিবর্তন ভূগোলের পরিবর্তন রাজার রাজদন্ড কিছুই ইসলামকে তার স্বকীয়তা থেকে হটাতে পারে নি। কাজেই আমাদের ধর্ম-সংস্কার বা রিফরমেশনের দরকার নেই।
তারপর ধরুন, রিভাইভ্যালিযমের কথা। রিভাইভ্যালিযম হচ্ছে ‘ফিরে চলার’ ডাক, ‘গোয়িং ব্যাকের’ আবাহন। আমরা কোথায় ফিরে যাব? দিল্লি-আগ্রার তখতে-তাউসেও ফিরে যেতে পারবো না, বাগদাদ-দামেশকের খেলাফতেও ফিরে যাওয়া চলবে না। সে আশা হবে বাতুলতা, আর সে চেষ্টা হবে আত্মঘাতী। আমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানকে ফাঁকি দিতে পারবো না। প্রগতিকে এড়িয়ে যেতে পারবো না। সেটা হবে আত্মহত্যারই শামিল।
বিগত গৌরবের যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবিষ্কর্তারূপে মুসলমান ছিল দুনিয়ার শিক্ষক। শিল্প-বাণিজ্যে ছিল তারা বিশ্বের নেতা। প্রগতির ছিল তারা অগ্রপথিক। এ যুগে আমাদের সে গৌরবের পথে ফিরে যেতে হলে, সে নেতৃত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের চলতে হবে যুগের আগে-আগে। প্রগতি থেকে মুখ ফিরিয়ে পিছন দিকে রওয়ানা হলে চলবে না। কাজেই রিভাইভ্যালিযম বা ‘ফিরে চলোর’ ডাক আমাদের আদর্শ হতে পারে না।
পূর্ব-পাকিস্তানের জাগরণের জন্য তাই রেনেসাঁ অপরিহার্য। এটা আমরা বুঝতে পারি ইউরোপের রেনেসাঁর বিচার করলে। ইউরোপীয় রেনেসাঁর প্রাক্কালে তথাকার খৃষ্টান জাতিসমূহের যে দুরবস্থা হয়েছিল, পূর্ব-পাকিস্তানের বাশিন্দাদেরও আজ সেই দুরবস্থা।” [৬]
তাহলে দেখা যাচ্ছে আবুল মনসুর আহমদ তার পূর্ব-পাকিস্তানের তত্কালীন সংকটময় অবস্থার তুলনা করছেন ইউরোপীয় ইতিহাসের একটি সুনির্দিষ্ট পর্ব অর্থাৎ রেনেসাঁ-পূর্ব সময়ের সঙ্গে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য যে সমাধানটি তিনি উপস্থাপন করছেন তাও তিনি আহরণ করছেন ইউরোপীয় ইতিহাসের থেকে। লক্ষণীয় তিনি কিন্তু সমস্যা ও সমাধানের পূর্ব-নজির মুসলিম বা ইসলামিকতার পরিমন্ডল থেকে আহরণ করছেন না। কাজেই ইউরোপীয় রেনেসাঁর একটি নাতিদীর্ঘ বর্ণনা দিয়ে তিনি পূর্ব-পাকিস্তানের জন্য করণীয় নির্ধারণ করে বলছেন:
“… … …রেনেসাঁ … … জাতীয় জীবনের একটা গুরুতর নৈতিক সাধনার বস্তু। একটা সর্বজনীন কর্মোন্মাদনার ব্যাপার। জাতীয় নওজোয়ানির পাহাড় ভাঙা পর্বত ডিঙানো দৃঢ় সংকল্পের রূপায়ন। … … …চিন্তার রাজ্যে জাতির কালেকটিভ মনে বিপ্লব না এলে কর্মে বিপ্লব আসতে পারে না। চিন্তায় বিপ্লব আনবার দায়িত্ব কবি-সাহিত্যিকের। ফরাসী বিপ্লব প্রভৃতি সত্যিকার বিপ্লবের দিকে নজর দিলেই আমরা এটা দেখতে পাই।” [৭]
এবারে তিনি পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্য কেমন হওয়া উচিত সেটা বলতে গিয়ে উনিশ শতকের উপনিবেশিক কলকাতায় উদ্ভূত আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি চুলচেরা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেন; তিনি বলেন:
“পূর্ব-পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলা ও আসামের সাহিত্য বলতে আজ আমরা যা বুঝি তা বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্র-শরৎচন্দ্র যুগের সাহিত্যিকদের সাহিত্য। এটা খুবই উন্নত সাহিত্য। বিশেষত রবীন্দ্রনাথ এ সাহিত্যকে বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে স্থান দিয়ে গেছেন।
তবু এ সাহিত্য পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্য নয়। কারণ এটা বাঙলার মুসলমানের সাহিত্য নয়। এ-সাহিত্যে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য কোনো দান নেই শুধু তা নয়, মুসলমানদের প্রতিও এ-সাহিত্যের কোনো দান নেই। অর্থাৎ এ-সাহিত্য থেকে মুসলিম সমাজ কোনো প্রেরণা পায়নি এবং পাচ্ছে না। এর কারণ আছে। সে কারণ এই যে এ-সাহিত্যের স্রষ্টাও মুসলমান নয়; এর বিষয়-বস্তুও মুসলমান নয়। এর স্পিরিটও মুসলমান নয়; এর ভাষাও মুসলমানের ভাষা নয়।
… … …এ-সাহিত্য হিন্দু-মনীষীর সৃষ্টি। সুতরাং হিন্দু সংস্কৃতিকে বুনিয়াদ করেই তাঁরা সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। ঠিকই করেছেন তাঁরা। নইলে ওটা জীবন্ত সাহিত্য হতো না। হিন্দু ধর্মেরই সন্তান। হিন্দু ধর্ম ত্যাগ বৈরাগ্য ও মুনী ঋষির ধর্ম। হিন্দু সংস্কৃতিও তাই ত্যাগ প্রেম ও ভক্তিবাদের সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতির বুনিয়াদ প্রতীক-পূজা। কাজেই হিন্দুর শিল্পী মন সুন্দরের পূজারী। এতে করে এই বাঙলা সাহিত্যের প্রাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সত্যম শিবম সুন্দরমের সাধনা। … … …[এই] বাঙলা সাহিত্য গড়ে উঠেছে নারী-প্রেমকে কেন্দ্র করে। নারী এখানে সৌন্দর্যের প্রতীক। … … … … … … এইসব আদর্শকে বুনিয়াদ করে নারী-প্রেমকে কেন্দ্র করে হিন্দু শিল্প-মনীষা যে সাহিত্য রচনা করেছে, সে সবই হয়েছে উচ্চাঙ্গের সাহিত্য এবং তা পড়ে অপর সকলের মতই মুসলমান রস-পিপাসীরাও পিপাসা নিবারণ করে থাকে। কিন্তু সত্য কথা এই যে, ঐ সাহিত্যকে মুসলমানরা তাদের জাতীয় সাহিত্য মনে করতে পারে না। কারণ ত্যাগ, বৈরাগ্য-ভক্তি-প্রেম যতই উঁচুদরের আদর্শ হোক, মুসলমানের জীবনাদর্শ তা নয়। হিন্দুর ধর্ম যেমন ত্যাগ বৈরাগ্য ও মুনী ঋষির ধর্ম মুসলমানের ধর্ম তেমনি হক-ইনসাফ ও জেহাদ-শহীদের ধর্ম। প্রতীকবাদী সুন্দর-পূজারী আর্টবাদী হিন্দু সংস্কৃতি যেমন ব্যক্তি-কেন্দ্রিক, মুসলিম সংস্কৃতি তেমন ব্যক্তি-কেন্দ্রিক নয়। হক-ইনসাফবাদী কল্যাণমুখী মুসলিম সংস্কৃতি তাই সমাজ-কেন্দ্রিক।
… … …মুসলমান মূলত কর্মবাদী, ভক্তিবাদী নয়। … … … নারী মুসলমানের নজরে দেবী নয়। … … …সে মানবী। … … …বাঙলার মুসলমান অনর্জিত বিত্তশালী অবসর-প্রচুর শ্রমকুণ্ঠ অভিজাত শ্রেণী নয়। কাজেই… … …নারীমন তাদের কাছে রহস্যপুরীও নয়। এই জন্যই বর্তমান বাঙলা সাহিত্য মুসলিম সমাজ মনে কোনো প্রেরণার স্পন্দন জাগাতে পারেনি। তাই রাধা কৃষ্ণের প্রেমে প্রতিবেশী হিন্দু ভাইকে আনন্দে নৃত্য করতে দেখেও মুসলিম সমাজ-মনের একটা তারও ঝনাৎ করে উঠেনি।” [৮]
এই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পরে আবুল মনসুর আহমদ যখন কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিকে মুসলিম চেতনার রূপায়ন হিশেবে ব্যাখ্যা করেন তখন পরিস্কার হয়ে যায় এই কবিতাটি কেন বাঙালি মুসলিমদের এতটা নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছিল; তিনি বলেন:
“… … …যেদিন এক অচেনা অজানা বালক হঠাৎ জিকির দিয়ে উঠলো: ‘বল বীর বল উন্নত মম শির’, সেদিন রিক্ত ক্লান্ত ঘুমন্ত ও জীবন্মৃত মুসলমান ধচ্‌মচ্‌ করে জেগে উঠে চোখ রগড়াতে-রগড়াতে হুঙ্কার দিয়ে উঠলো: ‘উন্নত মম শির’। কারণ এ যে তারই অন্তরের ঘুমন্ত শিশুর চীৎকার। এ যে তারই জীবনের কথা। তাই নজরুল ইসলামের আকস্মিক আবির্ভাব মুসলিম সমাজ-মনকে এমন করে আলোড়িত করতে পেরেছে। … … …নজরুল ইসলাম এই জীবনকে কেন্দ্র করেই সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। শুধু এই কারণেই নজরুল ইসলাম পূর্ব-পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় কবি।” [৯]
এরপরে আবুল মনসুর আহমদ পূর্ব পাকিস্তানের বাঙলা সাহিত্যের বিষয়বস্তু নিয়ে তার অভিমত ব্যক্ত করেন:
“… … …সাহিত্যের নায়ক-নায়িকা যদি আমরা না হলাম, সাহিত্যের পটভূমি যদি আমার কর্মভূমি না হলো, সাহিত্যের বাণী যদি আমার মর্মবাণী না হলো, তবে সে সাহিত্য আমার সাহিত্য হয় কিরূপে? আমার ঐতিহ্য, আমার ইতিহাস, আমার কিম্বদন্তী এবং আমার উপকথা যে সাহিত্যের উৎস নয়, সে সাহিত্য আমার জীবন-উৎস হবে কেমন করে? … … …
… … … বাঙলার মুসলমানকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে জাগ্রত ও জীবন্ত করে তুলতে হলে, তার জীবনে রেনেসাঁ আনতে হলে তার সাহিত্য সাধনাকে অনুকরণ-অনুসরণ থেকে বাঁচাতে হবে। তাকে নিজস্ব সাহিত্য দিতে হবে। হিন্দুর সৃষ্ট বাঙলা সাহিত্য খুবই বড়। খুবই উচ্চাঙ্গের। কিন্তু তার নকল করে মুসলমান অমন বড় অমন জীবন্ত সাহিত্য রচনা করতে পারবে না; হোমার মিল্টন শেকসপিয়ারকে নকল করে রবীন্দ্রনাথ অতবড় সাহিত্য রচনা করতে পারতেন না। তিনি তাঁর সাহিত্য সাধনাকে নিজস্ব কৃষ্টির উপর দাঁড় করাতে পেরেছেন বলেই তিনি আজ বিশ্ব-কবি রবীন্দ্রনাথ। বাঙলার মুসলমানও তেমনি রবীন্দ্রনাথের নকল করে বড় হতে পারবে না। তাকে বড় হতে হবে তার স্বকীয়ত্বের উপর দাঁড়িয়ে, নিজের কৃষ্টিকে বুনিয়াদ করে। বিশ্ব-কবি রবীন্দ্রনাথের বিশ্ব-ভারতীয় আকাশে কতবার শরতের চন্দ্রোদয় হয়েছে, তাতে শারদীয়া পূজায় ‘আনন্দময়ী মা’ কতবার এসেছে গিয়েছে, কিন্তু একদিনের তরেও সে বিশ্বের আকাশে ঈদ-মোহররমের চাঁদ উঠেনি। সে চাঁদ উঠাবার ভার ছিল নজরুল ইসলামের ওপর। এতে দুঃখ করবার কিছু নেই। কারণ এটা স্বাভাবিক। কাজেই কঠোর সত্য।” [১০]
এরপরে তার ভাষন শেষ করবার আগে তিনি বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য ঐতিহ্য কি সে সম্পর্কে তার মত প্রকাশ করেন এভাবে:
“… … …বাংলার বর্তমান সাহিত্যে মুসলমানের কোনো দান নেই বলে বাঙালি মুসলমানের কোনো সাহিত্যই নেই, এ কথা ঠিক নয়। … … …বস্তুত বাংলার মুসলমানের যেমন একটা নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, তেমনি তাদের একটা নিজস্ব সাহিত্যও আছে। সে সাহিত্যের নাম মুসলমানী বাংলা সাহিত্য বা পুঁথি সাহিত্য। মকতবে-মাদ্রাসায় শিক্ষিত লক্ষ লক্ষ মুসলমান পাঠক ঐ পুঁথি সাহিত্য থেকেই জীবনের প্রেরণা পাচ্ছে।
… … …পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যিক রেনেসাঁ আসবে এই পুঁথি সাহিত্যের বুনিয়াদে। … … …বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যের প্রাণ হবে মুসলমানের প্রাণ এবং সে সাহিত্যের ভাষাও হবে মুসলমানেরই মুখের ভাষা। এই দুই দিকেই আমরা পুঁথি সাহিত্য থেকে প্রচুর প্রেরণা ও উপাদান পাব। … … …পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্য রচিত হবে পূর্ব-পাকিস্তানবাসীর মুখের ভাষায়। সে ভাষা সংস্কৃত ব্যাকরণের বা তথাকথিত বাংলা ব্যাকরণের কোনো তোয়াক্কা রাখবে না। পূর্ব-পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয় সে ভাষায় নিজস্ব সত্যকার বাংলা ব্যাকরণ রচনা করবে।” [১১]
এরপরে আবুল মনসুর আহমদ বাংলা ভাষার হরফ সংস্কারের একটি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন; এবং পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্য ও সংস্কৃতির উজ্জ্বল ভবিষ্যত আশা করে তার এই ঐতিহাসিক ভাষনের সমাপ্তি টানেন।
রেফারেন্স:
[১] Muhammad Iqbal, Presidential Address, 25th Annual Session of All-India Muslim League, Allahabad, December 29, 1930
[২] আবুল মনসুর আহমদ, পাক-বাংলার রেনেসাঁ, (কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অনুষ্ঠিত ‘পূর্ব-পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’র সম্মিলনীতে প্রদত্ত মূল-সভাপতির ভাষন, ৫ মে ১৯৪৪), বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা, ১৯৬৬, প্রথম সংস্করণ, সপ্তম মুদ্রণ, ২০১১, পৃষ্ঠা ৯৪-৯৫
[৩] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৯৬
[৪] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৯৬
[৫] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৯৭
[৬] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৯৭-৯৮
[৭] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৯৯-১০০
[৮] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১০০-১০১
[৯] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১০২
[১০] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১০২-১০৩
[১১] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১০৩-১০৪