প্রাচ্যের কবি আল্লামা ইকবাল এবং পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন

আল্লামা ইকবাল আধুনিক কালে ইসলামের সক্রিয়তামুখী ও সামগ্রিক একটি ভাষ্য প্রদান করেছিলেন। এটি করতে গিয়ে তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার কয়েকটি মৌলিক ত্রুটি ও দুর্বলতা উন্মোচিত করেছিলেন। আমরা জানি জার্মান শ্রেষ্ঠ কবি গ্যেটে তার একটি রচনায় পাশ্চাত্য চেতনার অসম্পূর্ণতা পূরণের আকাঙ্খায় প্রাচ্য থেকে কোন একটি সমাধানসূত্র অনুসন্ধান করেছিলেন। ইকবালের কাব্য ও দর্শনে যে “পায়ামে মাশরিক” বা প্রাচ্য বার্তা প্রকাশিত হয়েছে সেখানে জার্মান প্রাচ্য বিশারদ আনমারি শিমেল কবি গ্যেটের সেই প্রত্যাশার তৃপ্তিকল্প দেখতে পেয়েছেন। এ কারণে ইকবাল যেমন একদিকে “আল্লামা” অর্থাৎ ইসলামিকতার মহাজ্ঞানী শিক্ষক অভিধা পেয়েছেন, তেমনি তিনি একাধারে “শায়েরে মাশরিক” বা প্রাচ্যের কবি উপাধিও পেয়েছেন।
আল্লামা ইকবালের বৈশ্বিক সম্প্রদায় ও দেশ-চেতনা একটি সুডৌল কাব্যিক ও দার্শনিক প্রত্যয় ও রূপকল্প। এটি কোন চটজলদি, ফরমায়েশি কিংবা মেঠো রাজনৈতিক বা আর্থ-সামাজিক প্রস্তাবনা নয়। এই প্রত্যয়টি ইসলামিকতার বিশ্বজনীন ভাষ্যের উপরে ভিত্তি করে যে বিশ্বসম্প্রদায় ও বিশ্বদেশচেতনা উপস্থাপন করে সেটি বর্ণ, ভাষা, নৃসত্তা, জাতিসত্তা প্রভৃতি সীমান্ত অতিক্রমী একটি বিশ্বমানবিক ধারণা ও প্রত্যয়। কাজেই আল্লামা ইকবালের এই বিমূর্ত ও দার্শনিক প্রত্যয় ও চিন্তাকল্প যারা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা সম্পর্কেও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা সমানুপাতিক হবে সেটাই স্বাভাবিক। তার চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যারা বাস্তব রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক বিনির্মাণে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তাদের কাছে একারণেই অনেক দূরদর্শীতা, সহনশীলতা, ধৈর্য ও উদারতা কাম্য ছিল।
কিন্তু আমরা বাস্তবে কী দেখলাম? আমরা দেখলাম আদর্শের প্রতি আনুগত্য ও অঙ্গীকারের নামে সামষ্টিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই একক, স্বৈরাচারী ও স্বেচ্ছাচারী আচরণ ও উদ্ধত কর্মকান্ড। নেতৃত্বের জাতীয় পর্যায় থেকে প্রাদেশিক পর্যায় পর্যন্ত এই প্রবণতা প্রধান হয়ে উঠলে নেতৃত্ব ও সাধারণের মধ্যে দূরত্ব, বিরাগ, বিভ্রান্তি থেকে শেষমেষ ঘৃণা ও শত্রুতাই উৎপন্ন হতে পারে। এবং তা-ই হয়েছিল। আর সেই প্রেক্ষিতে বলা যায় আল্লামা ইকবাল কত দূরদর্শী ও ভবিষ্যদর্শী ছিলেন যে তিনি অনেক আগেই বলে গিয়েছিলেন যে কবিদের হৃদয়ে জাতিসত্তার জন্ম হয়, আর তার মৃত্যু হয় রাজনীতিবিদদের হাতে।
ইতিহাসের চলমান এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক বয়ানের দস্তুর মেনে এখানে খুঁটিনাটি তথ্য ও অনুপুঙ্খ দিয়ে পাঠককে ভারাক্রান্ত করতে চাই না। অর্থাৎ এই ইতিহাস প্রধানত ঘটনাপঞ্জীর কালানুক্রমিক বিন্যাস নয়; নয় সময়ের ক্যানভাসে তাথ্যিক অনুপুঙ্খের সংকলন বা গ্রন্থনা। এই ইতিহাস মূলত ঘটনাপঞ্জীর নেপথ্যে কার্যরত নিয়ামক বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ববৃন্দের প্রাসঙ্গিক প্রত্যয় কাঠামোর বহুমুখী বয়ানের সমাহার। যদিও এখানে কোনো একটি সুনির্দিষ্ট বয়ানের কমবেশি সময়ানুক্রমিক অগ্রগতির সঙ্গে বাকী সহায়ক ও প্রতিদ্বন্দ্বী বয়ানগুলিকে গ্রন্থিত করা হয়েছে। তাই বলে এটিকে পক্ষপাতমূলক বলা যাবে না; সর্বোচ্চ হয়তো লেখকের প্রাধিকার বলা যেতে পারে।
তো, এই আলোকে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই পূর্ব বাংলায় সংঘটিত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, কারণ ও ফলাফলের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক বয়ান তৈরি করা সম্ভব। একদিকে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা যারা করতে চেয়েছিলেন তারা যেমন প্রাদেশিক বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্যকে না বুঝে গোয়ার্তুমি করেছিলেন; অন্যদিকে যারা উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবী আদায় করেছিলেন, তাদের একাংশ পরবর্তীকালে বাড়াবাড়ি করে এই বাংলা ভাষার প্রতি অতিআনুগত্য দেখিয়ে একধরনের উর্দু ও অবাঙালি মুসলিম বিদ্বেষ ও ঘৃণার চর্চা করেছেন। অর্থাৎ দুটি পক্ষই একধরনের ঘৃণাবাদী জাতিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার তলদেশে নিমজ্জিত হয়েছিলেন। তারা তাদের দার্শনিক দারিদ্র্যের কারণে এই দুর্ভাগ্যজনক পরিণতিতে উপনীত হয়েছিলেন। তারা উভয়েই বর্ণ হিন্দুর সাম্প্রদায়িকতার প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে পাকিস্তান রাষ্ট্রকল্পনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, একথা ঠিক। কিন্তু ঘটনাচক্রের পরিহাসে তারা নিজেরাই পরস্পরের প্রতি উগ্র জাতিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতায় আক্রান্ত হয়ে পড়লেন।
এই প্রেক্ষিতেই আমরা দেখতে পেলাম পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের প্রতিবেদনমূলক ইতিহাস রচয়িতা বদরুদ্দীন উমর (জন্ম ১৯৩১) তার বিভিন্ন গবেষণামূলক গ্রন্থাদির মাধ্যমে এক বাঙালি জাতিবাদী বয়ান খাড়া করলেন। যদিও তার বয়ানে জাতিবাদের সম্পূরক হিশেবে একটি বামপন্থী শ্রেণিবাদী বয়ানও কমবেশি লক্ষ করা যায়। তিনি পাকিস্তানের পঞ্চাশ ও ষাট দশকের বাস্তব রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের বিশ্লেষণ করে একটি নয়া “সাম্প্রদায়িকতা” ও “সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা”র বয়ান হাজির করলেন। এভাবে যে পাকিস্তান বর্ণ হিন্দুর সাম্প্রদায়িকতার একটি সম্ভাব্য সমাধান হিশেবে কায়েম হয়েছিল, বদরুদ্দীন উমরের বয়ানে সেই খোদ পাকিস্তান-ই একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বলে প্রতিপাদিত হল। এখানে তার একটি বই থেকে এই প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতিটি দিচ্ছি যেখানে তিনি ভাষা আন্দোলনকে বাঙালি মুসলিমের “স্বদেশ প্রত্যাবর্তন” বলে আখ্যায়িত করেছেন:
“১৯৪৭ সাল থেকে ভাষা ও সংস্কৃতির সংগ্রাম তাই অনেকাংশে তাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনেরই সংগ্রাম। … …বাঙালী পরিচয়ে সে আর লজ্জিত হল না। যে চিত্ত ছিল পরবাসী, সে চিত্ত সচেষ্ট হল স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে। প্রতিকূল শক্তি এবং সংস্কার এ পরিবর্তনকে প্রতিহত করা সত্ত্বেও ঘরে ফেরার এ সংগ্রাম রইল অব্যাহত এবং তা জয় করে চলল একের পর এক ভূমি — স্বীকৃত হল রাষ্ট্রভাষা বাংলা, বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ঐতিহ্য; স্বীকৃত হল রবীন্দ্রনাথ এবং পয়লা বৈশাখ। এ স্বীকৃতির …সত্যিকার ক্ষেত্র হল পূর্ব পাকিস্তানী মুসলমান মধ্যবিত্তের বিস্তীর্ণ মানসলোক। এদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বর্তমান পর্যায়কে তাই মোটামুটিভাবে বলা চলে মুসলমান বাঙালি মধ্যবিত্তের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।” [১]
পূর্ব-পাকিস্তান সাংস্কৃতিক চেতনার অগ্রনায়ক আবুল মনসুর আহমদও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন; তিনিও বাংলা ভাষার সপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন; কিন্তু তার কাছে বাংলা ভাষার যে আদলটি আদর্শ ছিল তা হল মধ্যযুগের মুসলিম সাহিত্যিকদের হাতে গড়া আরবি-ফারসি ও আঞ্চলিক শব্দ সমৃদ্ধ বাংলা ভাষা। এছাড়া তিনি লাহোর প্রস্তাবের মূল স্পিরিটের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন; কাজেই তিনি ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যূদয়কেও এই লাহোর প্রস্তাবের আলোকেই আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন। তিনি বাংলাদেশ আন্দোলন, ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ১৯৭১-উত্তর বাংলাদেশ রাষ্ট্রে ভারতীয় প্রভাব ও আধিপত্যকে একারণেই বরাবর সমালোচনা করতে পেরেছেন।
আমরা এর পরের পর্বগুলিতে দেখতে চাইব বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কোন রূপকল্পটি বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্টের স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম অস্তিত্বের জন্য সবচাইতে উপযুক্ত? এক্ষেত্রে আবুল মনসুর আহমদ ও তার সমমনাদের আমরা একটি প্যারাডাইম এবং বদরুদ্দীন উমর ও তার সমমনাদের একটি বিপ্রতীপ প্যারাডাইম হিশেবে বিবেচনা করে আমাদের এই পর্যালোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাব, ইনশা আল্লাহ।

রেফারেন্স:
[১] বদরুদ্দীন উমর, সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা, প্যাপিরাস, কলকাতা, ১৯৬০, পৃষ্ঠা ১১