প্রাচ্যের কবি আল্লামা ইকবাল এবং বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারি-উত্তর পূর্ব বাংলার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণের প্রেক্ষিত

প্রাচ্যের কবি ও চিন্তক আল্লামা ইকবালের ইসলামিকতায় প্রভাবিত হয়ে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগ দেয়। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রকল্পনায় শুরু থেকেই বাঙালি মুসলমানদের ভিন্ন বোঝাপড়া ছিল, সেকথা এর আগে বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছি। এর ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দেয়।
উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষাকেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেবার দাবীতে পূর্ব বাংলায় ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে এক তুমুল গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই ভাষা আন্দোলনে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘটিত ঘটনাবলী, বিশেষ করে পুলিশের গুলিবর্ষণে ছাত্রসহ কয়েকজনের মৃত্যু, একটি মাইলফলক হয়ে ওঠে। ছাত্রসমাজ ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এই মৃতদেরকে শহীদ বলে মনে করেছিল। এই শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ থেকে শুরু করে কবিতা, গান, নাটক, গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদির এক জোয়ার সৃষ্টি হয়। পূর্ব বাংলার উদীয়মান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এর মাধ্যমে একধরনের শোকনির্ভর সংকল্প ও বীরত্বের আধুনিক নাগরিক মিথলজি তৈরি করে। এই জীবন থেকে নেয়া মিথলজিকে বিধৃত করে পূর্ব বাংলার ঢাকায় এক বাংলা ভাষা ও বাঙালিত্ব নির্ভর সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণের সৃষ্টি হয়।
বাঙালি মুসলমান ইতিপূর্বে উনিশ শতকের সত্তর দশক থেকে একধরনের আধুনিক রেনেসাঁ বা নবজাগরণের ছোঁয়া পেয়েছিল। [১] কিন্তু সেটা ছিল মূলত কলকাতা ভিত্তিক। এর ভাষা, আঙ্গিক ও প্রকরণে কলকাতার বাঙালি হিন্দু রেনেসাঁর প্রভূত প্রভাব ছিল। এছাড়া এই আংশিক ও সীমিত রেনেসাঁয় পূর্ব বাংলা বা ঢাকার অংশগ্রহণ প্রায় ছিল না বললেই চলে।
এরপরে অবশ্য ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ কর্তৃক “বুদ্ধির মুক্তি” নামক একটি আন্দোলন হয়েছিল। একে অন্নদাশঙ্কর রায় বাংলার দ্বিতীয় রেনেসাঁ বলে চিহ্নিত করেছেন। [২] ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯), আবুল হুসেন (১৮৯৬-১৯৩৮), কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১) এবং অন্যান্যদের মধ্যে কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩) ও মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬) এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ‘শিখা’ পত্রিকা ছিল এদের মুখপত্র। [৩]
এদিকে এর আগেই আমরা জানতে পেরেছি যে ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হবার পরে ১৯৪২ সালে কলকাতায় ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’ গঠিত হয়েছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ (১৯৯৮-১৯৭৯), আবুল কালাম শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৮), হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী (১৯০৬-১৯৬৬) প্রমুখ। [৪] এর সমান্তরালে প্রায় একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ গঠিত হয়েছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন (১৯২০-১৯৯৫) এবং সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২) প্রমুখ। [৫]
এই সোসাইটি ও সংসদের লক্ষ্য ও আদর্শ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে: “মুসলিম জাতীয়তাবাদের আদর্শ প্রচার ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। মুসলমানদের সাহিত্যে ইসলামের আদর্শ ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন থাকবে এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে … পুথি সাহিত্য ও গ্রামীণ সাহিত্যের উপাদান নিয়ে বাংলা সাহিত্য রচনা, আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দের অধিক ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ … [করা ছিল এদের লক্ষ্য]।” [৬]
‘সাহিত্য সংসদে’র মুখপত্র ছিল পাক্ষিক ‘পাকিস্তান’। এর সম্পাদক ছিলেন মুসলিম লীগের ছাত্রকর্মী নাজীর আহমদ। রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার উপরেও এরা জোর দিয়েছিলেন। ১৯৪৪ সালে এই ‘সংসদ’ কবি কায়কোবাদকে সংবর্ধনা দেয়। তিনি তার কাব্যে মুসলমানদের ঐতিহ্য ও জাতীয় গৌরবের জয়গান গেয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে আরো জানা যায় যে: “পাকিস্তান গঠনের প্রস্ত্ততিপর্বে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র, তার সমাজ ও সংস্কৃতিবিষয়ক চিন্তা-ভাবনা সংসদের কর্মকান্ডে প্রতিফলিত হয়েছে। বিভাগপূর্ব কাল (১৯৪৭) পর্যন্ত সাহিত্য সংসদ সক্রিয় ছিল; বিভাগোত্তর কালে বাংলা ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান রাষ্ট্র সম্পর্কে পূর্ববাংলার মানুষের মোহভঙ্গ হলে সাহিত্য সংসদের কর্মকান্ড হ্রাস পায় এবং অচিরেই তা বিলুপ্ত হয়ে যায়।” [৭]
ঢাকায় এই সময় আরো একটি সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। এটি এদেশের উদীয়মান মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেছিল। ইসলামিকতার আদর্শ ও ভাবধারা সমুন্নত করার প্রত্যয় নিয়ে ঢাকায় গড়ে ওঠে এই সংগঠনটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম (১৯২০-১৯৯১) ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এর নামকরণ হয় ‘পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশ’। সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ (১৯০৮-১৯৯৯), শাহেদ আলী (১৯২৫-২০০১), আবদুল গফুর (জন্ম ১৯২৯), বদরুদ্দীন উমর (জন্ম ১৯৩১) প্রমুখ। [৮]
এই সংগঠনের সদস্যরা অনেকটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন উপরে উল্লেখিত কলকাতায় সূচিত ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’র মতাদর্শে। সম্ভবত এরা অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের নেতা আবুল হাশিমের ইসলামিকতা নির্ভর বামপন্থী দর্শনেও প্রভাবিত হয়েছিলেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এবং আরও কয়েকটি ব্যাপারে তাদের প্রত্যয় ও অবস্থান ছিল গণমুখী। [৯]
‘তমদ্দুন মজলিশে’র মুখপত্র ছিল সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’। পঞ্চাশের দশকের মধ্য পর্যন্ত ‘তমদ্দুন মজলিশ’ সমগ্র পূর্ব বাংলায় এর কাজের পরিধি বাড়াতে পেরেছিল। ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বে এদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগের বিরুদ্ধে বস্ত্তত ‘তমদ্দুন মজলিশ’ই প্রথম প্রতিবাদ করে। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শিরোনামে অধ্যাপক আবুল কাশেম সম্পাদিত একটি বই প্রকাশিত হয়। এই ঐতিহাসিক বইতে অন্তর্ভুক্ত লেখাগুলোতে কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ ও অধ্যাপক আবুল কাশেম বাংলা ভাষাকে পূর্ব বাংলায় শিক্ষার মাধ্যম এবং অফিস-আদালতের ভাষা হিশেবে স্বীকৃতির জোরালো দাবী জানান। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিও তুলে ধরেন। [১০]
বাংলা ভাষার আন্দোলনে ‘তমদ্দুন মজলিশ’-এর অবস্থান ছিল পূর্ব বাংলার আম-জনতার আকাঙ্খারই প্রতিফলন। এরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছিল দেশের ইসলামমনস্ক মহল থেকে। বিশেষ করে ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের কাছ থেকে। ভাষা আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনই এর কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতা কর্মীরা সরকারের চরম নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন, কিন্তু পিছপা হননি। [১১]
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক রেনেসাঁ বা নবজাগরণের বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন ধারা উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের বিভিন্ন পর্যায়ে উন্মেষিত হয়েছিল। এর মধ্যে বিশ দশকের ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন ছিল র‍্যাডিক্যাল যুক্তিবাদী, উদারনৈতিক ও আধুনিক ধারার। অন্যদিকে চল্লিশ দশকের প্রথম দিকের ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’ এবং ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ ছিল মূলত মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী ধারার। আর চল্লিশ দশকের শেষ দিকের ‘তমদ্দুন মজলিশ’ ছিল একাধারে ইসলামমনস্ক এবং কিছুটা সমাজতন্ত্র প্রভাবিত।
কিন্তু ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলায় যে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তি এদেশের শিক্ষিত ও নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতৃত্বে ব্যাপক জনসাধারণকে প্রভাবিত করেছিল তা হল বাংলা ভাষা, জাতিসত্তা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক এক সর্বাত্মক চেতনা। এই চেতনাকে এর প্রবক্তারা ইসলামিকতার প্রভাবমুক্ত রাখতে চেয়েছেন; তারা একে বলেছেন “অসাম্প্রদায়িক” এবং “আধুনিক”। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পরে এই চেতনার “ধর্মনিরপেক্ষ”, ‘ইহজাগতিক’ ও ‘সমাজতান্ত্রিক’ ব্যাখ্যাও তারা দিতে চেয়েছেন; যদিও তা জনসাধারণের ব্যাপক সমর্থন পায়নি। সে আলোচনায় আমরা পরে আসব, ইনশা আল্লাহ।
এর পরের পর্বে আমরা দেখে নিতে চাইব বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারী-উত্তর বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রধান নেতৃত্ব কারা দিয়েছেন? তাদের চেতনার প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে একটি নাতিদীর্ঘ আলোচনায় নিযুক্ত হয়ে আমরা এগিয়ে যাব ১৯৭১ সালের মাইলফলক স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যূদয়ের দিকে।
রেফারেন্স:
[১] আনিসুজ্জামান, মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, চারুলিপি, ঢাকা, ২০১২, (প্রথম প্রকাশ, ১৯৬৪), পৃষ্ঠা ৩৩৭
[২] অন্নদাশঙ্কর রায়, বাংলার রেনেসাঁস, মুক্তধারা, ১৯৮৪
[৩] খোন্দকার সিরাজুল হক, মুসলিম সাহিত্য সমাজ, বাংলাপিডিয়া, https://bit.ly/37fUMso, ৯ জুন, ২০২০
[৪] ওয়াকিল আহমদ, পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি, বাংলাপিডিয়া, https://bit.ly/3dSzKT, ৯ জুন, ২০২০
[৫] ওয়াকিল আহমদ, পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ, বাংলাপিডিয়া, https://bit.ly/2YkwjxI, ৯ জুন, ২০২০
[৬] প্রাগুক্ত
[৭] প্রাগুক্ত
[৮] মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান, তমদ্দুন মজলিশ, বাংলাপিডিয়া, https://bit.ly/37cafcG, ৯ জুন, ২০২০
[৯] প্রাগুক্ত
[১০] প্রাগুক্ত
[১১] প্রাগুক্ত