আল্লামা ইকবাল, দ্বিজাতিতত্ত্ব ও বাংলাদেশ

আল্লামা ইকবাল দ্বিজাতিতত্ত্বের জনক বলে পরিচিত। তার এই দ্বিজাতিতত্ত্বে তিনি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে প্রভাবিত করেছিলেন। ১৯৪০ সালে জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে লাহোর/পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করে। আল্লামা ইকবাল অবশ্য ১৯৩৮ সালেই ইন্তেকাল করেছিলেন।
বাংলার মুসলমানদের নেতা হিসাবে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এই লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। অর্থাৎ বাঙালি মুসলিমদের যে অংশটি মুসলিম লীগ সমর্থক ছিল তাদের এই দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রতি সমর্থন ছিল। শেরে বাংলা অবশ্য পরবর্তীকালে মুসলিম লীগে সক্রিয় ছিলেন না। কিন্তু খাজা নাজিমউদ্দীন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমান- এরা সকলেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রতি সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে দ্বিজাতিতত্ত্বের বোঝাপড়া সবার এক রকম ছিল না। যেমন সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিম দ্বিজাতিতত্ত্ব ফর্মুলার অধীনে যুক্তবাংলা গড়তে চেয়েছিলেন। জিন্নাহর তাতে সমর্থনও ছিল; কিন্তু কংগ্রেস হাই কমান্ডের বিরোধীতায় তা সম্ভব হয়নি। কেবল বাংলার পূর্বাংশ ও সিলেট নিয়ে ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা গঠিত হয়েছিল এবং তা পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিল।
বাংলার মুসলিম নেতাদের দ্বিজাতিতত্ত্ব সম্পর্কে এই রকমের বিভিন্ন বোঝাপড়া থেকে এটা বোঝা যায় যে খোদ বাংলার মুসলমানদের মধ্যেই এই প্রশ্নে একটা অস্পষ্টতা ও দোদুল্যমানতা ছিল। এই অস্পষ্টতা ও দোদুল্যমানতা বাঙালি মুসলিমের সাধারণ আইডেনটিটি ক্রাইসিসেরই প্রতিফলন। বাঙালি মুসলমান বিভিন্ন ঐতিহাসিক কারণে উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের মুসলিমদের মত নিজেদের আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে স্পষ্ট ও দ্বিধাহীন নয়। তাদের পরিচয় নির্ধারণে তারা তাদের বাঙালিত্ব ও মুসলমানত্ব নিয়ে বরাবরই দোদুল্যমান। কারো কাছে তাদের বাঙালিত্ব আগে আবার কারো কাছে তাদের মুসলমানত্ব আগে। এই বিভিন্নতার কারণে বাংলার মুসলমানের আত্মপরিচয় সংকট তৈরি হয়েছে এবং তা এক জাতিগত অনৈক্য ও বিভেদে পরিণত হয়েছে।
এই প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশের উত্থান হল তখন অনেকেই বলেছেন যে দ্বিজাতিতত্ত্ব ভুল ছিল এবং তা বাতিল হয়ে গেছে। তারা বলতে চাইলেন যে যেহেতু বাঙালি আইডেনটিটিকে সামনে রেখে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে সেহেতু দ্বিজাতিতত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু আসলে কি তাই? বাঙালি আইডেনটিটি ভিত্তিক বাংলাদেশ তো একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে উঠেছে এবং এই স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনে এদেশের বাঙালিরা তাদের মুসলমানত্বকেই কাজে লাগিয়ে যাচ্ছে।
এদিক থেকে বলা যায় বাংলাদেশে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। দ্বিজাতিতত্ত্ব মানে এই নয় যে উপমহাদেশে দুটি জাতি তাই শুধু দুটি রাষ্ট্রই থাকতে হবে- হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান। দ্বিজাতিতত্ত্ব মানে আবার এটাও নয় যে উপমহাদেশের মুসলিমরা একজাতি তাই তাদের শুধু একটি রাষ্ট্রই থাকতে হবে আর সেটা হল পাকিস্তান। অথচ আরব মুসলিমরা যেমন এক জাতি হওয়া সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় বিভিন্ন রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে তেমনিভাবে উপমহাদেশের মুসলিমরা এক জাতি হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান ও বাংলাদেশ দুটি রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। আবুল মনসুর আহমদ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে দ্বিজাতিতত্ত্বকে এভাবেই তা’বিল করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন বাংলাদেশ লাহোর প্রস্তাবের মূল স্পিরিটের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।
এছাড়া হিন্দুস্তানেও উপমহাদেশের মুসলিমদের একটি বড় অংশ বাস করছে। আর হিন্দুস্তানে সাম্প্রতিককালে উগ্র হিন্দুত্ববাদের উত্থানে সেখানকার মুসলিমদের উপর যে অত্যাচার ও নিপীড়ন চলছে তা আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বকে বারবার সঠিক বলে প্রমাণ করছে।