সাতচল্লিশ-উত্তর পূর্ব বাংলা ও একাত্তর-উত্তর বাংলাদেশে ইকবাল কতটা সমাদৃত

প্রাচ্যের কবি ইকবালকে শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখা দ্বিতীয় যে বাংলা কবিতাটি এখন আপনাদের সামনে পেশ করব সেটি লিখেছিলেন এদেশের একজন অগ্রণী ও প্রথম সারির নারী কবি। তিনি হচ্ছেন কবি বেগম সুফিয়া কামাল (১৯১১-১৯৯৯)। একাত্তর-উত্তর বাংলাদেশে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল সাহিত্য ও সংস্কৃতির একজন আইকন হিশেবে সমধিক পরিচিত। কিন্তু সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর পর্যন্ত সময়কালে তিনিও কবি ইকবালের প্রতি তার অনুরাগ ও কর্তব্য প্রকাশে কোনরকম কার্পণ্য করেননি। ১৯৬৭ সালের ২৬ এপ্রিল করাচীর হোটেল মেট্রোপোল-এ অনুষ্ঠিত ইকবাল স্মৃতি বার্ষিকীতে তিনি এই কবিতাটি পাঠ করেছিলেন:

স্মরণে

চাঁদ সিতারার গতিপথে আছে
সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ,
কিন্তু মানব মন!
চপলার চেয়ে সচকিত গতি তার
সাহারার চেয়ে তৃষিত, এবং প্রজ্ঞার পিপাসার
শেষ কভু নাহি হয়,
যে বেসেছে ভালো এই মাটিরে তার জীবন জিগীষাময়।

সন্ধানী আলো জ্বালা দুই চোখে বেদনা মধুর মন
মানব জীবন স্রষ্টারে করে নিতি সে অন্বেষণ।
সৃজিয়া মানুষ মাটির ধূলায়, ধরণীতে মনোরম–
ফুটায়েছ ফুল, ফলায়েছ ফল, বায়ু, বারি প্রাণ সম,
মিলনের সুখ বিরহের ব্যথা, বুকে প্রেম চোখে জল
আবেশ আনন্দ; দুঃখ সুখ কত বিস্ময় বিহবল।
যে সৃজেছে সেই শক্তিমানের লীলাখেলা, কৌতুক
মহা বিশ্বের গাঢ় রহস্য ভেদিবারে উৎসুক,
জাগে এক মহাপ্রাণ,
কী যে বিচিত্র সৃষ্টির লীলা! করে চলে সন্ধান।
সে কবি! সে শিল্পী! সে হয় মানব দরদী প্রাণ
‘সবার উর্ধ্বে মানবতা’ এই কবিকণ্ঠের গান।
দুর্ভাগা দেশ জাতির জীবনে একদা পরম ক্ষণে
আসে সৌভাগ্য মজলুম জনগণে
হেরিয়া ব্যথায় ভরে,
বিশ্ব ব্যাপিয়া এত বৈভব তবু কেন ঘরে ঘরে
ওঠে এত হাহাকার–
শুধাই তোমারে! করি ফরিয়াদ উত্তর দাও তার।
বিশ্বাসী মন, সবল দৃঢ়! প্রত্যয় ভরা হিয়া
স্রষ্টার কাছে ফরিয়াদ করে সবার অভাব নিয়া।
শেকোয়ার কবি! অমর সে মহাপ্রাণ,
ভালোবেসে এই মর্ত্ত মানবে, হয়েছে যে মহিয়ান।

কঠোর কুঠার কাস্তে, হাতুড়ী, লাঙ্গল-বওয়া চাষী
সকলের তরে এই মাটি আর জলবায়ু, আলোরাশি।
স্রষ্টার ফরমান!
নতুন করিয়া এনে দিলে তুমি নব জীবনের গান:
“যে ফসলে নাই গরীবের অধিকার
অগ্নি দহনে ধ্বংস করিয়া তার
চিহ্ন করে দাও দূর”
গেয়ে ওঠে কবি মানুষের তরে তীব্র কণ্ঠ-সুর।
মানুষের তরে এই কথা ওঠে কয়ে,
বড় ক্লান্তির পরে যেন আসে বয়ে
মরুতে বাদল বায়ু;
মরিতে মরিতে ফিরে লভে যেন আয়ু,
বক্ষে লভিয়া বল
নতুন করিয়া জাগে মজলুমদল।

নিশীথ আকাশে তারকার কানাকানি,
চকিতে সে লেখে স্রষ্টার কোন বাণী,
শব্দ বিহীন ঈষৎ সে ইশারা
বুঝিতে পারে না হেথা যারা
তাহাদের তরে
বক্ষের পঞ্জর হতে উৎসারিত করে
দিলে তুমি পর্বতে, অরণ্যে সেই কথা,
জাগো হে মানুষ! জাগো! জাগ্রত হউক মানবতা।

বিথারি আলোক রশ্মি অজ্ঞানের অন্ধকার ভেদি
মহান স্রষতার দান লভি নিরবধি
মৃত্যুহীন হইয়াছে যে মহান প্রাণ
তাঁহারি স্মরণে আজ কণ্ঠে কণ্ঠে বেজে ওঠে গান। [১]

রেফারেন্স:
[১] বেগম সুফিয়া কামাল, স্মরণে, ইকবাল দেশে বিদেশে, সম্পাদনা: মিজানুর রহমান, ঢাকা, পৃ. ২৭৬-২৭৮