সাতচল্লিশ-উত্তর পূর্ব বাংলা ও একাত্তর-উত্তর বাংলাদেশে ইকবাল কতটা সমাদৃত

কবি ও দার্শনিক আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালকে উৎসর্গ করে লেখা তৃতীয় যে বাংলা কবিতাটি এই নিবন্ধে উদ্ধৃত করছি সেটি লিখেছিলেন চল্লিশ দশকের কবি আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫)। তিনি বাঙালি মুসলিম কবিদের মধ্যে যারা আধুনিক কাব্যধারায় কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন তাদের অন্যতম একজন ছিলেন। কিন্তু আল্লামা ইকবালের মুসলিম স্বাতন্ত্র্যচেতনা তাকেও প্রভাবিত করেছিল।

এছাড়া সাতচল্লিশ-উত্তর সময়কালে রাষ্ট্রচেতনার ধারক কবি ও দার্শনিক ইকবালের প্রতি আনুষ্ঠানিক আনুগত্য প্রকাশের একটা দাবী ছিল। তৎকালীন পাকিস্তানের একজন কবি ও বুদ্ধিজীবি সমাজের সদস্য হিশেবে সেই দাবী মেটানোর দায় তিনি গ্রহণ করেছিলেন। একাত্তর-উত্তর কালে জসীমউদ্দীন এবং বেগম সুফিয়া কামালদের মত তিনিও তার চেতনার অভিমুখ পরিবর্তিত রাষ্ট্রচেতনার দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। যাহোক, এখানে আমরা দেখি তিনি তার কবিতায় কিভাবে ইকবাল বন্দনা করেছিলেন:

ইকবাল স্মরণে

তোমার স্বপ্নের রাজ্য ইঙ্গিতের আবরণ ঠেলে’
কুসুম-সম্ভারে আজ দেখা দিলো স্নিগ্ধ দল মেলে’
সেই স্বপ্ন-সুষমায় গড়া তব সেই পাকিস্তান
হাতে হাতে নতুন নিশান
দিয়েছে এবার।
তারি স্নিগ্ধ ছায়াতলে আজ বারবার
তোমার হৃদয়পদ্মে গুঞ্জরিত তৌহিদের তান
কী বিপুল তরঙ্গ সমান
সারে-জাহানের পথে বিশ্ব-মুসলিমের কানে কানে
আনন্দের উদাত্ত আহবানে
দোলা দিয়ে যায়।
তোমার সৃষ্টির মহিমায়
এ-মহিমান্বিত দিনে এই ক্ষুদ্র স্মৃতির সালাম
হে কবি গ্রহণ করো—সৃষ্টি তব দেবে তার দাম।
সন্ধ্যার স্তিমিত লোকে সঙ্গীহীন বাতায়ন পাশে
ফাল্গুনের বিবাগী হাওয়ায়
অথবা কোমল কোনো কটিলগ্ন সুরভি নিঃশ্বাসে
মাতালের প্রায়
পড়িনি তোমার কাব্য—শুনিনি তোমার কোনো বাণী,
তোমার নতুন কাব্য খড়গের আঘাত গেছে হানি’
অবসন্ন জীবনের তীরে।
তোমার বাণীর স্পর্শ জীবনের চারিদিক ঘিরে
অসীম উদ্দাম হয়ে কী বিপুল তৃষার বন্যায়
দিক হতে দিগন্তরে বয়ে যেতে চায়,
পেতে চায় অসীম আকাশ—
হানে পরিহাস
জ্বরাতুর জরতী রাত্রিরে;
দিনের দুঃসহ তীরে ভীরুচিত্ত দূরের যাত্রীরে
ডেকে যায় তোমার কবিতা
যুগান্তের যৌবন-সবিতা!

আমার সোনালী যুগ ঢাকা ছিল সোনার প্রচ্ছদে,
আমার স্তিমিত যুগ প্রত্যয়বিহীন প্রতিপদে
গর্ব করে সেই প্রচ্ছদের —
তোমার দৃষ্টির কশা অকস্মাৎ গর্বমদের
মৃৎপাত্রে হেনেছে আঘাত;
সে আঘাতে দৃষ্টি মেলি’ দেখি অকস্মাৎ
ক্ষুব্ধ খিণ্ণ জীবনের আছে আছে নতুন ভাষণ
আছে এক স্বর্ণসিংহাসন,
তারি তরে কখনো জেনেছে যে মানুষ
এত বড় এ-জীবন নহে শুধু কথার ফানুস।

এই যে জীবন এই এত বড় বিপুল বিস্ময়
পদে পদে দাসত্বের পথে এর পরিচয় নয়—
পরিচয় কঠিন সংগ্রামে!
যৌবনের মদমত্ত সর্বজয়ী জীবনের নামে
সেই সংগ্রামের পথ দুর্জয় আশ্বাসে
স্বপ্ন দেখে অবিরাম দূরতম আরশের পাশে—
সেই স্বপ্ন কবিতা তোমার—
সেই স্বপ্ন এ জগতে ফেলে-যাওয়া বাণী ক্ষুরধার
তোমার হে কবি,
স্মরণের তীরে নিত্য সেই স্বপ্ন জীবনের ছবি! [১]

রেফারেন্স:
[১] আহসান হাবীব, ইকবাল স্মরণে, মহাকবি ইকবাল, ড. আবু সাইদ নূরউদ্দীন, ঢাকা, পৃ. ১৭-১৮