সাতচল্লিশ-উত্তর পূর্ব বাংলা ও একাত্তর-উত্তর বাংলাদেশে ইকবাল কতটা সমাদৃত

জসীমউদ্দীন, বেগম সুফিয়া কামাল এবং আহসান হাবীব প্রমুখ বাংলা ভাষার লব্ধপ্রতিষ্ঠ কবি। বিশেষ করে সাতচল্লিশ-উত্তর পূর্ব বাংলার কাব্যভুবনে তারা প্রত্যেকেই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। এই সময়ে এরা প্রত্যেকেই কবি ইকবালের প্রতি তাদের কাব্যাঞ্জলি অর্পণ করেছেন। কিন্তু আমরা জানি একাত্তর-উত্তর বাংলাদেশে যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমাজতান্ত্রিক চেতনা প্রক্ষেপিত হয়েছে তখন এরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে এই পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন করেছেন।

নিবন্ধের এই পর্বে পূর্ব বাংলার আরেকজন গবেষক, অধ্যাপক ও কবির একটি কবিতা উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি উপর্যুক্ত তিনজনের চাইতে অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং তার কবিযশও অকিঞ্চিৎকর। তিনি সাতচল্লিশ-উত্তর কালে ইকবাল চেতনার প্রতি যেকোন কারণেই হোক আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। ইকবালের উদ্দেশে দীর্ঘ কবিতা নিবেদন করেছিলেন। কিন্তু একাত্তর-উত্তর কালে তিনি এতটাই বাঙালি জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠেছিলেন যে ইকবালীয় চেতনার কোন রেশ আর তার রচনা বা কর্মকান্ডে খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরঞ্চ পরম উৎসাহের সঙ্গে তিনি উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ও কর্মকান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়েছিলেন। পুরস্কার স্বরূপ বাংলা একাডেমির প্রধান হতে পেরেছিলেন এবং অতঃপর তাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও করা হয়েছিল।

একাত্তর-উত্তর বাংলাদেশের বিদ্যাজগতে মতাদর্শিক ও দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে আধিকারিক নিযুক্তির যে প্রক্রিয়াটি এখন সর্বনাশা রূপ ধারণ করেছে এর প্রাথমিক সূত্রপাত হয়েছিল এদেরকে পদায়নের মাধ্যমেই। আমি যার কথা বলছি তিনি হলেন ড. মযহারুল ইসলাম (১৯২৮-২০০৩)। তিনি একজন ফোকলোর গবেষক ও বিশেষজ্ঞ হিশেবে সমধিক পরিচিত হলেও কাব্যচর্চাও তিনি করেছিলেন। ১৯৫৫ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মাটির ফসল’ প্রকাশিত হয়েছিল।

বিদ্যাজগতে এবং স্বারস্বত সমাজে তার একাত্তর-পরবর্তী মতাদর্শিক স্থানাঙ্ক, রচনাবলী ও কর্মকান্ড ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে এটা বেশ বিস্ময়কর মনে হয় যে তিনি একাত্তর-পূর্ব কালে মহাকবি ইকবালের বন্দনায় এত দীর্ঘ একটি কবিতা লিখেছিলেন। এদেশের দোদুল্যমান এবং ডিগবাজীপ্রবণ বুদ্ধিজীবি ও কবি সাহিত্যিকদের একজন টেক্সটবুক কেস হিশেবেই মযহারুল ইসলামকে এই নিবন্ধে বেছে নেয়া হয়েছে।

আসুন দেখি তিনি কবি ইকবালকে তার কবিতায় কিভাবে চিত্রিত করেছিলেন:

হে কবি-সম্রাট

তুহিন রাত্রির ভিড়ে সমুখে হারিয়ে গেল পথ,
বুকের কন্দর হতে মুছে গেল চলবার জোরালো শপথ,
জাতির জীবনে এলো প্রধূমিত রাতের আঁধার –
চলার সবল গতি শ্লথ হয়ে এলো বারবার।

ক্ষয়িষ্ণু দিনের শেষে শুধু জানি রাত এসেছিল,
শুধু জানি চারিধারে দানবেরা ছায়া ফেলেছিল,
পথে পথে তুলেছিল সুকঠিন বাধার প্রাচীর,
কেড়ে কেড়ে নিয়েছিল প্রাণ-বহ্নি এই পৃথিবীর;
মানুষের চোখে মুখে ঘুমের আবেশ ঢেলে দিয়ে
জীবনের স্বাদটুকু সব শুষে নিয়ে
এ মাটিতে দানবেরা এনেছিল কুহেলিকা রাত,
প্রাণে প্রাণে হেনেছিল করাল আঘাত।

তারপর চারিধার নীরব নিঝুম,
মানুষের চোখে মুখে নেমে এলো ঘুম।
কোথাও ছিল না লেশ এতটুকু প্রাণ-সমারোহ—
মানুষের মত হয়ে বেঁচে থাকবার আগ্রহ।
পায়ে পায়ে শৃঙ্খল পথে পথে অর্গল
জীবনের বাঁকে বাঁকে বিষ আর হলাহল
চারিধারে মৃত্যু আর মৃতের নিঃশ্বাস
বিষাদ-ক্রন্দন-রোলে বিষায়িত করেছিল রাতের আকাশ।
পৌরুষের তবু মৃত্যু নাই।
মহান মৃত্যুর মাঝে বেঁচে থাকবার নেশা
একদিন নেমে এলো তাই–
একদিন নেমে এলো প্রাণে প্রাণে মুক্তির পিপাসা
হৃদয়ে হৃদয়ে এলো শৃঙ্খল ছেঁড়ার নব আশা।
পথে পথে কা’রা যেন রক্ত দিয়ে নাম লিখে গেল,
অগ্নির কামনা নিয়ে কা’রা যেন সমুখে দাঁড়ালো!
তাদের বুকের রক্তে মাটি লালে লাল,
হৃদয়ের উষ্ণ রক্ত অকাতরে ঢেলে তবু
দিকে দিকে জ্বেলে দিল প্রদীপ্ত মশাল।
মৃত্যু নেই সেই পৌরুষের

মৃত্যু নেই মুক্তিকামী নির্ভীক বীরের।
ঘুম ভেঙে গেল অকস্মাৎ।
চোখ মেলে চেয়ে’ দেখি—
সমুখে দাঁড়িয়ে তুমি, রজনী প্রভাত:
নতুন সূর্যের স্বপ্নে উজ্জ্বল তোমার দু’নয়ন,
নতুন সৃষ্টির স্বপ্নে উদ্বেল তোমার প্রাণ-মন।
হয়তো বা আর কত কালো কুহেলিকা
জীবনে জীবনে আরো এনে দিত মৃত্যু-বিভীষিকা।
তোমার স্বাপ্নিক মন ভবিষ্যের পানে চেয়ে’ তাই
দেখেছিল জীবনের আশা নাই, কোন আশা নাই;
দেখেছিল যুগব্যাপী শোষণের হীন আয়োজন,
কান পেতে শুনেছি নিষ্পেষিত মানুষের
বুক-ফাটা করুণ ক্রন্দন।

হে দরদী! তাই তুমি হাতের বাঁশরী রেখে
সমুখে দাঁড়ালে।
সমুখে দাঁড়ালে তুমি নব এক পৃথিবীর ছবি নিয়ে হাতে
সেদিন প্রভাতে,
নতুন পৃথিবী পানে চেয়ে’ দিলে ডাক—
পৃথিবী অবাক!
তোমার আহ্বান শুনে ঘুমন্ত জাতির বুকে
হারানো সম্বিৎ এলো ফিরে,
মুক্তিকামী মানুষেরা দলে দলে ছুটে এলো
সবুজ মাটির বুকে কঠিন স্বাক্ষর এঁকে দিল
রঙিন রুধিরে।
অনেক সংগ্রাম শেষে, হে কবি-সম্রাট,
তোমার স্বপ্নের ধূলি শ্যামল পৃথিবী-রূপে
বেঁধেছে জমাট।
এ পৃথিবী তুমি চেয়েছিলে,
প্রাণের গোপন তটে তুমি এর স্বপ্ন দেখেছিলে,
মনে মনে ছবি এঁকেছিলে।

বহু আশা বহু সাধ নিয়ে
তোমার স্বপ্নের ধরা আমরা গড়েছি,
মাঠে মাঠে শ্যামলিম ফসলের ঢেউ দেখে নয়ন ভরেছি –
তবু আহা তবু সেই ফসলের পরিপূর্ণ স্বাদ
তবু মধু-জীবনের সাধ
এখানে আসেনি আজো,
বহু মানুষের আশা বহু মানুষের ক্ষুধা এখনো মেটেনি,
দিকে দিকে স্বার্থপর পীড়নের হুতাশন এখনো নেভেনি;
মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থের যূপকাষ্ঠ-তলে
দিনে দিনে পলে পলে
কোটি কোটি মানুষের প্রাণ-বলিদান,
হয়নি হয়নি আজো ধরাতলে তার অবসান।
তাই তো নতুন ক’রে শপথ নেবার প্রয়োজন
মুছে দিতে এই হীন ঘৃণিত শোষণ।

: তারই আয়োজন আজ বাধা-ভাঙা মানুষের দলে
: তারই আয়োজন আজ মাঠে মাঠে ফসলে ফসলে।

হে সাধক, হে কবি-স্বাপ্নিক,
তোমার বলিষ্ঠ সূর্য আবার দেখাক দিক
আবার রাঙিয়ে যাক তোমারই স্বপন-আঁকা দেশ,
এ লাঞ্ছনা, এ অসাম্য, ব্যথা-বেদনার হোক শেষ!
কোটি কোটি মানুষের সাথে তাই এখানে দাঁড়িয়ে
বেদনা-বিহ্বল দেহে তবু ক্ষীণ বাহুটি বাড়িয়ে
তোমারে জানাই আজ ভক্তিপ্লুত হৃদয়ের হাজার সালাম;
বহু মানুষের সাথে আমারো নরম বুকে
লিখা হোক তোমার কালাম [১]

রেফারেন্স:
[১] মযহারুল ইসলাম, হে কবি-সম্রাট, মহাকবি ইকবাল, ড. আবু সাইদ নূরউদ্দীন, ঢাকা, পৃ. ২৭-৩০