রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল পড়া বাঙালি মুসলমানের জন্য কবি ইকবাল কেন প্রয়োজন

১৯০৫ সালে প্রথম বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়েছিল। কবি ইকবাল তখন একজন তরুণ শিক্ষার্থী। উচ্চ শিক্ষার্থে ইউরোপে গেছেন। প্রথমে ইংল্যান্ড এবং পরে জর্মানী। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। কবি ইকবাল ১৯০৮ সালে উপমহাদেশে ফিরে আসেন। তার কাব্যচিন্তায় পরিবর্তন দেখা দেয়। ১৯১১ সালে প্রথম বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায়। এই সময় কবি ইকবালের আতীয়া ফয়েজীকে লেখা এক চিঠির সূত্রে আমরা জানতে পারি যে এই বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যাওয়া তিনি পছন্দ করেননি। তিনি এই প্রসঙ্গে ব্যঙ্গ করে লেখেন:
“মুন্দমিল জখমে দিলে বঙ্গাল আখির হোগয়া
য়ো যো থি প্যাহলে তামিজে কাফির ও মোমিন গয়ী
তাজশাহী আজ কল্কেত্তে সে দেহলি আ গয়ে
মিল গয়ী বাবু কো জুত্তী, অওর পাগড়ী ছিন গয়ী।”
অনুবাদ:
বাংলার হৃদয়ের আঘাত যেন ক্ষতচিহ্ন হয়ে শেষ হল
কাফির ও মোমিনে ভেদকারী শিষ্টাচার যেন মিটে গেল
রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লীতে সরে আসলো
বাঙালি বাবুর কপালে জুতা জুটল, আর তার পাগড়ীও ছিনে নিল।
এই ব্যঙ্গ কবিতা থেকে অনুমান করা যায় যে কবি ইকবাল বঙ্গভঙ্গ রদ হবার নেপথ্যে কার্যকর বাংলার হিন্দু, মুসলিম ও ব্রিটিশদের ত্রিমাত্রিক নোংরা রাজনীতি সম্পর্কে বেশ ভালোই ওয়াকেফহাল ছিলেন। স্বতন্ত্র মুসলিম আত্মপরিচয় বজায় রেখে একদিকে হিন্দু আধিপত্য ও অন্যদিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন মোকাবেলার বিষয়টি তার কাছে এই সময় থেকেই পরিস্কার ছিল।
কবি ও দার্শনিক ইকবাল লিখতেন ফারসি, উর্দু ও ইংরেজী ভাষায়। এই কারণে তার রচনা বাংলাভাষীদের কাছে খুব বেশি প্রবেশ করতে পারেনি। বাংলা ভাষায় লেখার কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের রচনা বাংলাভাষীদের কাছে বেশি সমাদৃত হতে পেরেছিল। রবীন্দ্র কাব্যে বাঙালি পেয়েছিল গীতিকাব্যের আঙ্গিকে হিন্দু ব্রাহ্ম ঐতিহ্য থেকে ঔপনিষদিক ঈশ্বর বন্দনা, সোনার বাংলার নদ-নদী-নৌকা ও প্রকৃতিলগ্ন মানুষের চিত্রকল্প সমৃদ্ধ অপূর্ব কাব্যশিল্প। সেখানে বাংলার যে সৌন্দর্য পরিস্ফুটিত হয়েছে তা প্রাচীন ভারতের তপোবন থেকে অনেক সহস্রাব্দ ব্যাপী ইতিহাস পেরিয়ে আধুনিক অখন্ড ভারতে দীপ্যমান রয়েছে। এর সঙ্গে তিনি যোগ করেছিলেন বাউল সহজিয়া ও মরমিয়া জীবনচর্যা। এই সব কিছু মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ এক মানুষের ধর্ম প্রস্তাব করেছিলেন এবং এই চেতনাকে বিশ্বজনীন করে তুলতে চেয়েছিলেন। কলকাতা কেন্দ্রিক বাঙালি হিন্দু এলিট শ্রেণির কাছে এই রবীন্দ্র জীবন ও সৌন্দর্য চেতনা আদরণীয় হয়ে উঠেছিল। এই এলিট শ্রেণিতে বাঙালি মুসলমানের যে যৎসামান্য প্রতিনিধিরা ছিলেন তাদের কাছেও রবীন্দ্রনাথ স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে উঠেছিলেন।
বিশ শতকের বিশের দশকে কাজী নজরুল ইসলাম যে কাব্যধারার সূচনা করলেন তা রবীন্দ্রনাথের মত এত এলিটিস্ট ছিল না। তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের যে অগ্নিবীণা বাজালেন তা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বৃহত্তর বাঙালি সমাজে প্রবেশাধিকার পেয়েছিল। অল্পশিক্ষিত শ্রেণির কাছেও তা পৌঁছুতে পেরেছিল। আবার নজরুল যেহেতু আরবি-ফারসি-উর্দু ভাষা থেকে প্রচুর শব্দ ব্যবহার করে তার কবিতার শরীর সাজিয়েছিলেন তাই তিনি বাংলা ভাষাকে প্রাক-ঔপনিবেশিক সুলতানী ও মুঘল যুগের সাহিত্য-ভাষার ঐতিহ্যে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এর ফলে নজরুলের ভাষা ও সাহিত্য সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিল। এক্ষেত্রে কাজী নজরুল বাঙালি মুসলমান সমাজের কাছ থেকে বিশেষ সমীহ অর্জন করেছিলেন।
অর্থাৎ বাংলা সাহিত্যে একাধারে রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুলের উপস্থিতি এমন এক কাব্য বৈভব সৃষ্টি করেছিল যে সেখানে কবি ইকবালের ভিন্ন ভাষায় রচিত কবিতার সম্ভাবনা-পরিসর কমই ছিল বলা যায়। কিন্তু এর পরেও কবি ইকবালের কবিতা বাংলাভাষীদের মধ্যে বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশাধিকার পেয়েছিল।
কেন পেয়েছিল? এর কারণ হল কবি ইকবাল তার কবিতায় সাধারণভাবে মুসলিম উম্মাহর এবং বিশেষভাবে উপমহাদেশের মুসলিমদের অবক্ষয়, পতন ও তা থেকে উত্তরণের সম্ভাবনার এমন এক চিত্রকল্প এঁকেছিলেন যা বাংলাভাষী অন্য কোন কবির পক্ষে সম্ভব হয়নি। কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতার ভাষা ও বিষয়ে বিভিন্ন মুসলিম ভাষা ও ঐতিহ্য থেকে আহরণ করে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে পারলেও তিনি তার কাব্যে চিরায়ত ইসলামের কোনো আধুনিক অথচ গ্রহণযোগ্য ভাষ্য বিনির্মাণ করেননি। নজরুলের কবিতায় রয়েছে দ্রোহের অস্থিরতা ও উচ্ছলতা, কিন্তু সেখানে পরম বিশ্বাসের নিশ্চয়তা ও স্থিরতা নেই। ইকবালের কবিতা ও দর্শনে তা আছে। কুর’আন ও সুন্নাহর চিরায়ত সত্যকে তিনি তার স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী রূপায়িত করেছেন, উপস্থাপিত করেছেন। এই কারণে বাঙালি মুসলিম কাব্যরসিকেরা ইকবালের ভাষার দেয়াল টপকে তাকে আপন করে নিতে চেয়েছে। যারা মূল ভাষায় একাজ করতে পেরেছে তাদের রসাস্বাদন তো সেই মাত্রায় হয়েছে; আর যারা অনুবাদের মাধ্যমে করেছে তারাও কমবেশি ইকবাল চেতনা ও সৌন্দর্যকে স্পর্শ করেছে।