পূর্ব বাংলায় মুসলিম স্বাতন্ত্র্যচেতনার কয়েকজন প্রতিভূ

উপমহাদেশের মুসলিম স্বাতন্ত্র‍্যচেতনার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে আল্লামা ইকবালের ব্যক্তিত্বে এই মুসলিম স্বাতন্ত্র‍্যচেতনা স্ফটিক্স্বচ্ছ ও মূর্ত রূপ ধারণ করেছিল। তিনি ১৯৩০ সালে এলাহাবাদ বক্তৃতায় এই চেতনার একটি সামগ্রিক রাষ্ট্রনৈতিক প্রকাশ করেছিলেন। তার এই বক্তৃতায় তিনি বাংলা প্রদেশকে সরাসরি উল্লেখ না করলেও পরবর্তীকালে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে লেখা এক চিঠিতে বাংলা প্রদেশকেও তার পরিকল্পিত মুসলিম রাষ্ট্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
১৯৪০ সালে মুসলিম লীগ কর্তৃক গৃহীত লাহোর প্রস্তাবে এই চেতনার আরো রাজনৈতিক মূর্তায়ন হয়েছিল। এই প্রস্তাবে বাংলার ততকালীন মুসলিম নেতৃবৃন্দের অনেকেই সমর্থন দিয়েছিলেন, যেমন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমউদ্দীন এবং আবুল হাশিম প্রমুখ।
বাংলার মুসলিম সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গন থেকেও এই মুসলিম স্বাতন্ত্র্যচেতনা অনুসমর্থন অর্জন করেছিল। বাংলার মুসলিম সাহিত্যের প্রধান পুরুষ কাজী নজরুল ইসলাম স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের ধারণায় বিশ্বাস না করলেও আল্লামা ইকবালকে একজন বড় কবি হিশেবে গণ্য করতেন। ইকবাল রচনাবলী তিনি মূল উর্দু ও ফারসি ভাষায় গভীর মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করেছিলেন। আমরা একথার প্রমাণ পাই মোহাম্মদ সুলতান কর্তৃক বাংলায় অনূদিত ইকবাল কাব্য নিয়ে নজরুলের করা এই মন্তব্য থেকেঃ
“সুলতান -এর “শেকওয়া ও জওয়াবে শেকওয়া”র কাব্যানুবাদ পড়লাম আসল “শেকওয়া ও জওয়াবে শেকওয়া” পাশে রেখে। অনুবাদের দিক দিয়ে এমন সার্থক অনুবাদ আর দেখেছি বলে মনে হয় না। ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ইকবালের অপূর্ব্ব সৃষ্টি এই “শেকওয়া ও জওয়াবে শেকওয়া”। উর্দ্দু-ভাষী ভারতবাসীর মুখে মুখে আজ শেকওয়ার বাণী। সেই বাণীকে রূপান্তরিত করা অত্যন্ত দুরূহ মনে করেই আমিও এতে হাত দিতে সাহস করিনি। কবি সুলতানের অনুবাদ পড়ে অত্যন্ত বিস্মিত হলাম — অরিজিন্যাল ভাবকে এতটুকু অতিক্রম না করে এর অপরিমাণ সাবলীল সহজ ভাব গতি-ভঙ্গী দেখে। পশ্চিমের বোরকা পড়া মেয়েকে বাঙলার শাড়ির অবগুণ্ঠনে যেন আরো বেশি মানিয়েছে।” [১]
এছাড়া কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্পর্কেও নজরুল বেশ প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছিলেন বলে জানা যায়:
“মুসলিম লীগের আন্দোলন যেরূপ গদাই লস্করী চালে চলছিল তাতে আমি আমার অন্তরে কোন বিপুল সম্ভাবনার আশার আলোক দেখতে পাইনি। হঠাত লীগ নেতা কায়েদে আজম যেদিন ‘পাকিস্তানের’ কথা তুলে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন — “আমরা ব্রিটিশ ও হিন্দু দুই ফ্রন্টে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করব”– সেদিন আমি উল্লাসে চীতকার করে বলেছিলাম — হ্যা, এতদিনে একজন ‘সিপাহসালার’-সেনাপতি এলেন। আমার তেজের তলোয়ার তখন ঝলমল করে উঠল।” [২]
যদিও নজরুল ১৯৪১-৪২ সাল নাগাদ অসুস্থ হয়ে যাবার ফলে মুসলিম স্বাতন্ত্র‍্যচেতনা ভিত্তিক স্বতন্ত্র রাষ্ট্র বিষয়ে তার সুস্পষ্ট কোন অবস্থান নেবার আর সুযোগ হয়নি। তিনি অখন্ড ভারতে বিশ্বাসী ছিলেন বলে যে ধারণাটি রয়েছে সেটি একারণে বহুল প্রচলিত হয়েছে।
বাঙালি মুসলিম প্রধান কবি, সাহিত্যিক ও চিন্তকদের মধ্যে যারা মুসলিম স্বাতন্ত্র‍্যচেতনা সমর্থন করেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি গোলাম মোস্তফা, কবি জসিমউদদীন প্রমুখ।
কিন্তু অপেক্ষাকৃত তরুণ কয়েকজন বাঙালি মুসলিম কবি, সাহিত্যিক ও চিন্তকের কথা বিশেষভাবে বলতে হয় যারা মুসলিম স্বাতন্ত্র্যচেতনার প্রতিভূ হয়ে উঠেছিলেন। যেমন কবিদের মধ্য থেকে কবি ফররুখ আহমদের নাম সর্বাগ্রে চলে আসে। তার সঙ্গে উল্লেখ করতে হয় কবি সৈয়দ আলী আহসান ও কবি আবুল হোসেনকে। বলতে হয় শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী হিশেবে সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়ন ও সৈয়দ আলী আশরাফের সংগ্রাম ও অবদানের কথা। এছাড়া দার্শনিক চিন্তার পরিসরে উল্লেখ করতে হয় দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের নাম। সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বলতে হয় ড. হাসান জামানের গবেষণা ও রচনার কথা।
রেফারেন্স:
[১] মুহাম্মদ ইকবাল, শেকওয়া ও জওয়াবে শেকওয়া, মোহাম্মদ সুলতান অনূদিত, রংপুর, হেরা প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ, ১৯৪৬
[২] কাজী নজরুল ইসলাম রচিত প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃত, সম্পাদনাঃ শাহেদ আলী, আমাদের সাহিত্যে ও ভাবনায় কায়েদে আজম, মুসলিম রেনেসাঁ আন্দোলন, ঢাকা, ১৯৮৯