আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্ব, সাম্প্রদায়িকতার বয়ান ও বাংলাদেশ

আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্ব উপমহাদেশের মুসলিমদের একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আত্মপরিচয়ে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এই চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখন্ডগুলি সম্মিলিতভাবে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করেছিল।
কিন্তু আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বের সমালোচনায় ভারতীয় জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস প্রথম থেকেই সোচ্চার ছিল। কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃত্ব তো বটেই এমনকি এর মুসলিম নেতা যেমন মওলানা আবুল কালাম আজাদ দ্বিজাতিতত্ত্বকে “সাম্প্রদায়িক” আখ্যা দিয়ে এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এছাড়া দেওবন্দের মওলানা হোসাইন আহমদ মাদানীও ইকবালের এই দ্বিজাতিতত্ত্বকে “সাম্প্রদায়িক” এবং উপমহাদেশের মুসলিম ঐক্যের পরিপন্থী মনে করে এর সমালোচনায় মুখর হয়েছিলেন। তিনি কংগ্রেসের কথিত “ধর্মনিরপেক্ষ” অখন্ড ভারত ধারণা সমর্থন করেছিলেন।
পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানেরা আল্লামা ইকবালের এই দ্বিজাতিতত্ত্বকে উৎসাহের সঙ্গে সমর্থন করে পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগ দিয়েছিল। এর কারণ ছিল পূর্ব বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক মুসলিমদের উপর সংখ্যালঘিষ্ঠ হিন্দু জমিদারদের শোষণ ও জুলুম। এই অত্যাচার ও জুলুম এই অঞ্চলের মুসলিমদের কাছে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আত্মপরিচয়ের ধারণাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।
কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই পূর্ব বাংলায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একটি বাঙালিত্ব নির্ভর প্রতিবাদী ও স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বয়ানের সূচনা করে। ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েমের পরিবর্তে এমন একটি রাষ্ট্র কায়েম হয় যার নিয়ন্ত্রণে ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সামন্ততন্ত্রের অবশেষ, ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্র। কমবেশি জাতিগত ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল এই রাষ্ট্রের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে পূর্ব বাংলায় ক্রমান্বয়ে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চণার বয়ান জোরদার হতে শুরু করে। এই আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চণার পাটাতনে দ্বিজাতিতত্ত্বের সমালোচক হিশেবে “সাম্প্রদায়িকতা”র ভারতীয় বয়ানটি অনুপ্রবেশের সুযোগ পেয়ে যায়।
এক্ষেত্রে এদেশের বামপন্থী ও বাঙালি জাতিবাদী বুদ্ধিজীবি, সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনীতিবিদেরা একজোট হয়ে ভূমিকা রাখে। এই বয়ানের বিনির্মাণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ থেকে শুরু করে আবদুল গাফফার চৌধুরী, আলতাফ মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, মুনীর চৌধুরী, জহির রায়হান, ওয়াহিদুল হক, সনজীদা খাতুন, আনিসুজ্জামান, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, সিরাজুল আলম খান প্রমুখ নিজ নিজ অবস্থান থেকে অংশগ্রহণ করেছেন।
বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের দুই প্রধান রূপকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম অখন্ড ভারতীয় রাষ্ট্রচেতনার মধ্যে বাঙালি উৎকর্ষের প্রবক্তা ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ দুজনকেই পূর্ব বাংলার এই নব স্বতন্ত্র বাঙালি আত্মপরিচয়ের প্রধানতম বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আইকন হিশেবে আত্মীকরণ করা হয়েছে। এভাবে আল্লামা ইকবালের ইনসাফ ও আদল-ভিত্তিক উম্মাহচেতনা বা বিশ্বমুসলিম চেতনা থেকে বিযুক্ত হয়ে এক আঞ্চলিক/ভৌগোলিক সাংস্কৃতিক বাঙালি চেতনায় পূর্ব বাংলা নিজেকে অভিষিক্ত করেছে। এভাবে ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বের সমালোচনা ও কোন কোন ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নাকচ করার এই প্রক্রিয়াটি যেমন ছিল অর্গ্যানিক তেমনি ছিল একাধারে ভারতীয় সাংস্কৃতিক অনুচরদের অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার সম্মিলিত ফলাফল।
এই প্রক্রিয়ার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হল ১৯৭১ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ রাষ্টের অভ্যুদয়। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পরেও আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্ব সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে যায়নি। এর কারণ হল ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিবেশী বৃহৎ আধিপত্যবাদী ভারত রাষ্ট্র থেকে নিজের স্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা করতে গিয়ে পুনরায় এর নাগরিকদের মুসলমানত্বকেই কাজে লাগাচ্ছে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে যেমন তার “বাঙালি জাতীয়তাবাদ”কে মুসলমানত্ব দিয়ে সম্পূরণ করে নিতে হচ্ছে/ হবে তেমনি বিএনপিকেও তার ভৌগোলিক সীমানানির্ভর আধাখেঁচড়া “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”কে ফাইন টিউন করে নিতে হবে।
এদিক থেকে বলা যায় বাংলাদেশকে যত বেশি আত্মপ্রত্যয়ী এবং মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিশেবে গড়ে তোলা হবে তত বেশি এদেশকে আল্লামা ইকবালের ইনসাফ ও আদল-ভিত্তিক উম্মাহচেতনা বা বিশ্বমুসলিম চেতনায় ফিরে যেতে হবে। এভাবে বাংলাদেশ এই উপমহাদেশে একটি শক্তিমান ও আত্মনির্ভরশীল মুসলিম রাষ্ট্র হিশেবে বিকশিত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্র থেকে একটি স্বকীয় সত্তা বজায় রেখে মুসলিম উম্মাহতে এর যোগ্য স্থান করে নিতে পারবে।