আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং বাঙালি মুসলমানের দার্শনিক দারিদ্র

পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানেরা আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বকে উৎসাহের সঙ্গে সমর্থন করে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগ দিয়েছিল। এর প্রধান কারণ ছিল পূর্ব বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক মুসলিমদের উপর সংখ্যালঘিষ্ঠ হিন্দু জমিদারদের শোষণ ও জুলুম। এই প্রধানত হিন্দু উচ্চবর্ণের অর্থনৈতিক অত্যাচার ও জুলুম এই অঞ্চলের বিপুল কৃষিজীবী বাঙালি মুসলিমদের কাছে আল্লামা ইকবালের স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আত্মপরিচয়ের ধারণাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। এই স্বকীয় পরিচয় ভিত্তিক একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র কায়েমের পরিকল্পনার মধ্যে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্নবর্গীয় মুসলিম কৃষকেরা একটি মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিল।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা বাংলার প্রধানত মুসলিম কৃষকদেরকে একটি অমানবিক কৃষিপ্রজায় (সার্ফ) পরিণত করেছিল। কাজেই আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বকে বাঙালি মুসলমান প্রথমত স্বাগত জানিয়েছে একটি শ্রেণিগত অর্থনৈতিক স্বার্থের অবস্থান থেকে। এই প্রসঙ্গে বামপন্থী ও একাডেমিক উভয় ধারার বুদ্ধিজীবিদের ব্যাখ্যা ও ভাষ্যের মধ্যে আশ্চর্যজনক ঐক্য লক্ষ করা যায়। যেমন বদরুদ্দীন উমর তার ‘সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৬), ‘সংস্কৃতির সংকট’ (১৯৬৭), ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৮), ‘পূর্ববাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ (১৯৭০), ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক’ (১৯৭২) প্রভৃতি বইয়ের মাধ্যমে এই প্রসঙ্গে যে বয়ানটি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন সেখানে দ্বিজাতিতত্ত্বের এই মার্কসবাদী অর্থাৎ শ্রেণিবাদী অর্থনৈতিক আকর্ষণকেই উচ্চকিত করে তুলে ধরেছেন। আবার একাডেমিক স্কলার তাজ উল-ইসলাম হাশমি-ও তার ‘Pakistan as a Peasant Utopia: The Communalization of Class Politics in East Bengal, 1920-1947’ (1992) গ্রন্থে বাঙালি মুসলমানের আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্ব বোঝাপড়া নিয়ে মোটামুটি একইরকম ব্যাখ্যা ও ভাষ্য উপস্থাপন করেছেন। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে এই প্রসঙ্গে বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী উভয় বয়ানই প্রায় একই ধরনের।
তাহলে লক্ষ করা যায় যে আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বের বোঝাপড়ায় বাঙালি মুসলমান তার শ্রেণিগত অর্থনৈতিক স্বার্থচিন্তা দ্বারাই মূলত প্রভাবিত হয়েছিল। অর্থাৎ তাদের জীবন জীবিকার উপরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকারী বর্ণ হিন্দুর বিতাড়নের একটি সুযোগ হিশেবেই তারা দ্বিজাতিতত্ত্বকে দেখেছে। এ কারণে হিন্দু-মুসলিম বাইনারিতে তারা আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বকে বুঝেছিল; কিন্তু আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বের আসল আদর্শিক উৎকর্ষ যেখানে নিহিত অর্থাৎ তার জাতি, বর্ণ, নৃগোষ্ঠী, ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক সীমানা নিরপেক্ষ যে উম্মাহচেতনা বা বিশ্বমুসলিম আন্তর্জাতিক চেতনা সেটি বাঙালি মুসলমানের বোঝাপড়ায় সম্যকভাবে ধরা পড়েনি।
অতএব একথা বলা যায় যে শায়েরে মাশরিক হিশেবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে বিখ্যাত কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবালের তৌহিদ-ভিত্তিক ভৌগোলিক অঞ্চল নিরপেক্ষ বিশ্বায়িত ওয়াতান-চেতনা বা দেশ ও বিশ্বসম্প্রদায়চেতনার প্রতি বাঙালি মুসলিম যতটা না আনুগত্য প্রদান করেছিল তার চাইতে তারা এই মহান আদর্শের একটি বৈষয়িক জীবিকা-নির্ভর স্বার্থ-তাড়িত আঞ্চলিক বোঝাপড়ায় উপনীত হয়েছিল।
আল্লামা ইকবালের এই উৎকৃষ্ট ইসলাম-অনুপ্রাণিত ও দার্শনিক প্রস্তাবনাকে বাঙালি মুসলমান দার্শনিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি তাদের দার্শনিক দারিদ্রের কারণে। আর তাদের এই দার্শনিক দারিদ্রের কারণেই তারা যখন পঞ্চাশ দশকে হিন্দু জমিদারদের চলে যাওয়ার প্রেক্ষিতে তাদের প্রাথমিক স্বার্থ উদ্ধার হয়েছে বলে মনে করেছে তখন থেকেই ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বকে উপেক্ষা করে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক/নৃতাত্ত্বিক ভিন্নতা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বঞ্চণা ও বৈষম্যের বাঙালি জাতীয়তাবাদী বয়ানে আকর্ষিত হওয়া শুরু করেছে। এর অনিবার্য পরিণতিই ছিল ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১-এর বিচ্ছিন্নতাবাদী স্বাধীনতা আন্দোলন।