আল্লামা ইকবালের স্বদেশচেতনার প্রথম পর্যায়

আল্লামা ইকবালের উম্মাহচেতনা গড়ে ওঠার একটি বিবর্তনমূলক ইতিহাস রয়েছে। এই চেতনা একদিনে গড়ে ওঠেনি, এটি গড়ে উঠতে সময় লেগেছে। পাশ্চাত্যে উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণের আগে তিনি ‘তারানা-ই-হিন্দী’ (১৯০৪) নামক যে কবিতা লিখেছিলেন সেখানে তিনিও হিন্দুস্তানের ভৌগোলিক সীমানানির্ভর এক জাতীয়তাবাদের প্রতি তার আবেগ ও আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। উপমহাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ কবি ইকবাল এই কবিতায় ভারতীয় ভূখন্ডভিত্তিক ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যভিত্তিক এক সম্মিলিত জাতীয়তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন:
সারে জাহাঁ সে আচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হামারা
হাম বুলবুলেঁ হ্যাঁয় ইস কী ইয়ে গুলসিতাঁ হামারা
গুর্বাত মেঁ হোঁ আগার হাম, রেহতা হ্যাঁয় দিল ওয়াতান মেঁ
সমঝো ওয়াহীঁ হামে ভী দিল হো যাহা হামারা
পর্বত য়োহ সবসে উঁচা, হাম-সায়া আসমাঁ কা
য়োহ সঁনতরী হামারা, য়ো পাসবাঁ হামারা
গোদী মেঁ খেলতী হ্যাঁয় ইস কী হাজারোঁ নদিয়াঁ
গুলশন হ্যাঁয় যিস কে দম সে রশ্ক-এ-জিনা হামারা
অ্যায় আব-এ-রুদ-এ-গঙ্গা য়োহ দিন হ্যাঁয় ইয়াদ তুঝ কো?
উতরা তীরে কিনারে যব কারওয়াঁ হামারা
মাযহাব নেহীঁ সিখাতা আপস মেঁ বেয়র রাখনা
হিন্দী হ্যায়ঁ হাম, ওয়াতান হ্যাঁয় হিন্দুস্তাঁ হামারা
য়ুনান-ওয়া-মিসর-ওয়া-রুমা সব মিট গেয়ে জাহাঁ সে
আব তক মাগার হ্যাঁয় বাকী নাম-ওয়া-নিশানা হামারা
কুচ বাত হ্যায় কে হাস্তি মিটতি নেহি হামারি
সাদিয়োঁ রাহা হ্যায় দুশমন দৌড়-এ-জাহাঁ হামারি
ইকবাল! কোই মাহরুম আপনা নেহীঁ জাহাঁ মেঁ
মালুম ক্যা কিসী কো দর্দ-এ-নিহাঁ হামারা! [১]

অনুবাদ:
সারা বিশ্বের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম আমাদের এই হিন্দুস্তান
আমরা এদেশের বুলবুল, এদেশ আমাদের গুলিস্তান
বিদেশ বিভুয়ে-ও যদি পড়ে থাকি তবুও এদেশ থাকে আমাদের হৃদয়ে
তুমি মনে কোর আমি সেখানেই থাকি যেখানে আমার হৃদয় বিরাজে
ঐ পর্বত সবচেয়ে উঁচু, যেন আসমানের নিকটতম প্রতিবেশী
জেনো ওরা আমাদের সান্ত্রী, ওরা আমাদের নিরাপত্তা রক্ষী
সহস্র নদী আর তটিনী এদেশের কোলে কুলু কুলু বয়
এদেশের প্রাণজ ফুলবাগান জেনো অনেকের ঈর্ষা জাগায়
হে গঙ্গা নদীর তরঙ্গমালা, তোমার কি সেই দিনের কথা মনে পড়ে?
যেদিন তোমার তীরে আমাদের অভিযাত্রীদল স্থায়ী আবাস গড়ে
ধর্ম তো শেখায়নি নিজেদের মধ্যে গড়তে বিভেদ-বিদ্বেষ
আমরা সবাই হিন্দী, হিন্দুস্তান-ই আমাদের দেশ
গ্রীক, মিশর ও রোম সব পতিত হয়েছে এই বিশ্ব থেকে
অথচ আমাদের নাম ও নিশানা আজ অবধি টিকে আছে
একথা বলা যায় যে আমাদের অস্তিত্ব মিটে যাবার জন্য নয়
যদিও শতাব্দীর পর শতাব্দী ছিলাম পরস্পর শত্রু তা নিশ্চয়
ইকবাল! এই জগতে কেউ-ই আমাদের আপনজন নয়
গোপন ব্যাথার সমব্যথী হবে কে আছে এমন এ বিশ্বময় [২]

রেফারেন্স:
[১] মুহাম্মদ ইকবাল, তারানা-ই-হিন্দী, উর্দু টেক্সটের বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ করা হয়েছে Rekhta.org অবলম্বনে
[২] মুহাম্মদ ইকবাল, তারানা-ই-হিন্দী, বাংলা অনুবাদ: মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত