আল্লামা ইকবালের স্বদেশচেতনার দ্বিতীয় পর্যায়

আমরা জানি যে আল্লামা ইকবাল ১৯০৫ সালে উচ্চশিক্ষার্থে ইউরোপে গিয়েছিলেন। ইংল্যান্ড ও জার্মানীতে উচ্চশিক্ষা সূত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করে তিনি তিন বছর পরে ভারতে ফিরে আসেন। এই সময়ে তার মানসগঠনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে; এই পরিবর্তন এত সুগভীর ও মৌলিক ছিল যে একে জ্ঞানকান্ডিক মহাসরণ (Paradigm Shift) আখ্যা দেয়া যায়।
পাশ্চাত্যের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাকে পশ্চিমা আধুনিক এবং সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী সংঘাত ও সংঘর্ষ সম্পর্কে শংকিত করে তোলে। নৃসত্তাগত, ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে গঠিত ইউরোপীয় জাতি ও রাষ্ট্রগুলি কিভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে গণঘৃণা ও হিংসায় লিপ্ত হয় তা তিনি স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করে পর্যালোচনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আধুনিক উদার গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত নাস্তিক্য, বস্তুবাদ, বিজ্ঞানবাদ, উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতালিপ্সা ও প্রকৃতিবিনাশ তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বিশ শতকের শুরুতেই।
আবার এসবের বিকল্প হিশেবে উদ্ভূত কমিউনিজম ও ফ্যাসিজমের শুভংকরের ফাঁকিও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। আল্লামা ইকবাল হলেন আধুনিক কালের মুসলিম মনীষীদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন অগ্রনায়কের একজন; যদিনা তাকে এদের মধ্যে সবচাইতে সমৃদ্ধতম ব্যক্তিত্ব-ই বলা যায়, তাহলেও বলা যায় যে তিনি এনলাইটেনমেন্ট-উত্তর ইউরোপের সেক্যুলার এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার শিখর মুহূর্তেই এর অন্তর্নিহিত অন্তর্বিরোধ, অসম্পূর্ণতা এবং একমাত্রিকতা লক্ষ করতে পেরেছিলেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার এই সংকটের একটি অভূতপূর্ব জ্ঞানকান্ডিক পর্যালোচনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন; এবং এই পর্যালোচনা ও সমালোচনার ক্ষেত্রে তিনি কুরআনভিত্তিক তৌহিদী ইলমকে তার জ্ঞানতাত্ত্বিক উৎস ও সূত্র হিশেবে প্রয়োগ করেছিলেন।
জার্মান সাহিত্যিক গ্যেটে, দার্শনিক নিটশে এবং ফরাসি দার্শনিক অঁরি বের্গসঁ আল্লামা ইকবালের এই প্রতীচ্য পর্যালোচনায় অনুপ্রেরণা ও পুষ্টি জুগিয়েছিলেন। অন্যদিকে ইমাম গাজালী, ইবনুল আরাবী, মওলানা রুমী এবং ল্যাটিন মহাকবি দান্তে তার সৃজনশীল রচনার বিষয়, ভাষা, আঙ্গিক, প্রকরণ ও শৈলীর উপরে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এইসব কিছু বিবেচনায় আল্লামা ইকবাল হলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে আধুনিক যুগের মুসলিম তাজদীদি চিন্তা, রচনা ও কর্মকান্ডের প্রধানতম নকীব — একথা বললে খুব বেশি আপত্তি উঠবে বলে মনে হয় না।
এই প্রেক্ষিতে যদি আমরা আল্লামা ইকবালের ১৯১০ সালে লেখা ‘তারানা-ই-মিল্লী’ পুনর্পাঠ করি তাহলে আমরা ‘তারানা-ই-হিন্দী’র (১৯০৫) সঙ্গে এর শিকড়িক ভিন্নতা অনুধাবন করতে পারব। অর্থাৎ ইউরোপফেরত পরিবর্তিত ইকবাল ইসলামের মর্মবাণী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভারতীয় ভূখন্ডভিত্তিক ও সম্মিলিত জাতিভিত্তিক আত্মপরিচয়ের কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে তৌহিদী চেতনাভিত্তিক আখলাকী ও রুহানী বিশ্বমুসলিম উম্মাহ বা মিল্লাত চেতনায় নিজেকে অভিষিক্ত করলেন।
এ এক নতুন ইকবাল; এ এক নতুন চেতনা ও বিশ্ববোধ যা শুধু তাকেই বদলে দেয় নি; যা সমগ্র ভারতবর্ষের মুসলিম থেকে শুরু করে এমনকি মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য বিভিন্ন অঞ্চলের অন্বেষী মুসলিমকেও প্রভাবিত করেছে। আলজেরিয়ার মুসলিম চিন্তক মালেক বেন্নাবি, ইরানের বিপ্লবী তাত্ত্বিক আলী শরীয়তি থেকে হালের মিশরীয়-সুইস মুসলিম চিন্তক ও লেখক তারিক রমাদান প্রমুখ অনেকেই আল্লামা ইকবালের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন বলে জানা যায়।
আসুন আমরা আল্লামা ইকবালের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আলোকে ‘তারানা-ই-হিন্দী’র প্রতিকবিতা হিশেবে তার ‘তারানা-ই-মিল্লী’ পাঠ করি:
চীন**-ও-আরব হামারা, হিন্দুস্তাঁ হামারা
মুসলিম হ্যায় হাম, ওয়াতান হ্যায় সারা জাহাঁ হামারা
তাওহীদ কি আমানত সিনোঁ মে হ্যায় হামারে
আসাঁ নেহি মিটানা নাম-ও-নিশান হামারা
দুনিয়া কে বুত-কাদোঁ মে পেহলা য়ো ঘর খোদা কা
হাম ইস কে পাসবাঁ হ্যায়, য়ো পাসবাঁ হামারা
তেগোঁ কে সায়ে মে হাম পল কর জওয়াঁ হুয়ে হ্যায়
খঞ্জর হিলাল কা হ্যায় কওমি নিশান হামারা
মাগরিব কি ওয়াদিয়োঁ মে গুঁজি আযাঁ হামারি
থামতা না থা কিসি সে সায়ল-এ-রাওয়াঁ হামারা
বাতিল সে দাবনে ওয়ালে এয় আসমাঁ নেহি হাম
সৌও বার কর চুকা হ্যায় তু ইমতিহাঁ হামারা
এয় গুলিস্তান-এ-উন্দুলুস! য়ো দিন হ্যায় ইয়াদ তুঝ কো
থা তেরি ডালিয়োঁ মে যব আশিয়াঁ হামারা
এয় মৌজ-এ-দাজলা তু ভি পেহচানতি হ্যায় হাম কো
আব তক হ্যায় তেরা দরিয়া আফসানা-খাঁ হামারা
এয় আরদ-এ-পাক! তেরি হুরমত পে কাট মারে হাম
হ্যায় খুন তেরি রগোঁ মে আব তক রাওয়াঁ হামারা
সালার-এ-কারভাঁ হ্যায় মীর-এ-হিজায আপনা
ইস নাম সে হ্যায় বাকী আরাম-এ-জাঁ হামারা
‘ইকবাল’ কা তারানা বাঙ্গ-এ-দরা হ্যায় গোয়া
হোতা হ্যায় জাদা-পেয়মা ফির্ কারভাঁ হামারা [১]

অনুবাদ:
চীন** ও আরব আমাদের, হিন্দুস্তান আমাদের
আমরা মুসলমান; সারা বিশ্ব-ই দেশ আমাদের
তাওহীদের আমানত বহন করছি সিনায় আমাদের
সহজ নয় মিটিয়ে ফেলা নাম ও নিশান আমাদের
এই পৃথিবীর মূর্তিশালায় প্রথম ঐ ঘর খোদার
আমরাই তার প্রহরী, সেটিও প্রহরী আমাদের
তলোয়ারের ছায়ায় পালিত হয়েছে যৌবন সকলের
সরু চাঁদের মত খঞ্জর ঐ জাতীয় নিশান আমাদের
পাশ্চাত্যের উপত্যকায় ছড়িয়ে দিয়েছি আযান সুমধুর
থেমে যায় নি কোনো কিছুতেই অগ্রাভিযান আমাদের
হে আসমান! মিথ্যা কভু দাবাতে পারেনি আমাদের
শতবার তুমি পরীক্ষা নিয়েছো আমাদের সকলের
হে আন্দালুসের গুলিস্তান! তোমার কি মনে পড়ে সে প্রহর
যখন তোমার শাখা-প্রশাখায় ছিল আমাদের প্রিয়তম নীড়?
হে দজলার লহরী! তুমিও তো ঠিকঠাক চিনেছো আমাকে
আজও তোমার স্রোতপ্রবাহে আমাদের বীরগাঁথা বয়ে চলে
পবিত্র পৃথিবী! মৃত্যুকে বরণ করে রেখেছি তোমার সম্মান
তোমার শিরায় শিরায় আজও আমাদের শোণিত প্রবহমান
হেজাযের নেতা আমাদের কাফেলার নায়ক
তার নাম-ই আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি-বাহক
ইকবালের গান যেন জাগরণী ঘন্টাধ্বনি আমাদের
আবার যেন হয়েছে চলমান কাফেলাযান সকলের

রেফারেন্স:
**উর্দু ভাষায় চীন বলতে সে সময়ে মধ্য এশিয়ার বৃহত্তর তুর্কিস্তান বোঝায়। আমু ও সির দরিয়া কেন্দ্রিক এই মধ্য এশীয় অঞ্চলে বিভিন্ন দেশ অন্তর্ভুক্ত যেমন উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, জিনজিয়াং ইত্যাদি।
[১] মুহাম্মদ ইকবাল, তারানা-ই-মিল্লী, উর্দু টেক্সটের বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ করা হয়েছে Rekhta.org অবলম্বনে
[২] মুহাম্মদ ইকবাল, তারানা-ই-মিল্লী, বাংলা অনুবাদ: মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত