আল্লামা ইকবাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হয়। এই সময় উপমহাদেশ বিভক্ত হয়। যা দেশভাগ বলে পরিচিতি পেয়েছে। দ্বিতীয় বারের মত বঙ্গভঙ্গ-ও এই সময় সংঘটিত হয়। পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের মুসলিমদের সঙ্গে পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগ দেয়। কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ এই পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই রাষ্ট্র যে রাজনৈতিক চেতনার আলোকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা দ্বিজাতিতত্ত্ব নামে পরিচিত।
এই দ্বিজাতিতত্ত্বের দার্শনিক প্রস্তাবনা করেছিলেন কবি ও দার্শনিক আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল। ১৯৩০ সালে এলাহাবাদ ভাষণে তিনি এই প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি অবশ্য পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই ১৯৩৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তার সাহিত্যিক ও দার্শনিক অবদানকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা ও পথনির্দেশনা হিশেবে গণ্য করা হয়।
আল্লামা ইকবাল ফারসি ও উর্দু ভাষায় তার মূল রচনাগুলি লিখেছিলেন। ইংরেজী ভাষাতেও লেখা আছে তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা ও চিঠি। কিন্তু তার সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলিম বিদ্বজ্জনেরা ১৯৪৭ এর পূর্বে ও অব্যবহিত পরে যথেষ্ট সমাদর দেখিয়েছেন। সেই সময়ে তার অনেক রচনার বাংলা অনুবাদ হয়েছিল। অনেক যোগ্য ও খ্যাতিমান বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিক ও লেখক এই অনুবাদ কর্মে নিযুক্ত হয়েছিলেন। যেমন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, মনিরউদ্দীন ইউসুফ প্রমুখ।
কিন্তু আজকের বাংলাদেশে আল্লামা ইকবালের সাহিত্য ও চিন্তা কেন প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছে? এই প্রশ্নের উত্তর হল — ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে পূর্ব বাংলায় যে বাঙালিত্ব-ভিত্তিক সাহিত্য ও সংস্কৃতির জোয়ার চলেছে তারই ক্রমবর্ধিষ্ণু অভিঘাতে এটি ঘটেছে। সেই সঙ্গে যোগ করা যায় ১৯৬১ সালে পূর্ব বাংলায় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনকে কেন্দ্র করে এই বাঙালিত্ব-ভিত্তিক চেতনার আরো প্রচার ও প্রসার-কে। এরই ফলশ্রুতিতে বিগত ষাটের দশকে আমরা দেখতে পাই বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি একদিকে ৬ দফা কর্মসূচির আলোকে উদীয়মান আঞ্চলিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার ও তৎপর; আবার অন্যদিকে এর সমান্তরালে বাঙালি শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্ত মননশীল ও সৃজনশীল শ্রেণি রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তী ও পহেলা বৈশাখ পালন এবং সাধারণভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চায় ব্যাপক আগ্রহী হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষিতে ছায়ানটের ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুনেরা পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্ত বিদগ্ধ নাগরিক শ্রেণির সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি রবীন্দ্র-নজরুল-কেন্দ্রিক বলয় তৈরি করতে পেরেছিলেন।
এই কেবলি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের শিল্পরুচিস্নিগ্ধ মানস পরিমন্ডলে স্বতন্ত্র মিল্লাতী রাষ্ট্র ও উম্মাহচেতনার ধারক ও বাহক আল্লামা ইকবাল ক্রমাগত উপেক্ষিত হতে থাকলেন। একথা বললে ভুল হবে না যে পূর্ব বাংলা পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ হওয়া সত্ত্বেও এখানে রবীন্দ্র-নজরুল যুগলবন্দী দিয়ে আল্লামা ইকবালকে ম্রিয়মান করে ফেলা হয়েছিল। পূর্ব বাংলার বাঙালিরা এভাবে পশ্চিম বঙ্গ থেকে রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও সেখান থেকে রবীন্দ্র-নজরুল এই দুই আইকনকে আমদানী করে তাদের সাংস্কৃতিক চাহিদা মিটিয়েছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল এই যে আল্লামা ইকবালকে প্রতিস্থাপনে তারা পূর্ব বাংলার কোন সাংস্কৃতিক আইকনকে খুঁজে পায়নি কিংবা তৈরিও করতে পারেনি। তাদের সাংস্কৃতিক চৈতন্য গঠিতই হল পরদেশনির্ভরতা দিয়ে। এই পরদেশনির্ভর মানস ও সংস্কৃতি দিয়ে আর যাই হোক পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা অর্জন করা যায় না। বরঞ্চ পরনির্ভর সংস্কৃতি পরনির্ভর রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতির জন্ম দেয়।
বাঙালি মুসলমানের এই সংকীর্ণ এবং আঞ্চলিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি চেতনা এবং মানস থেকে ১৯৭১-উত্তর বাংলাদেশে আল্লামা ইকবাল সম্পূর্ণ বর্জিত হলেন। কারণ দ্বিজাতিতত্ত্ব-ভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামো থেকে একটি গণহত্যামূলক স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ গঠিত হয়েছে। পূর্ব বাংলার বাঙালির উপরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের এই অন্যায় বৈষম্য, বঞ্চণা, নিপীড়ন ও গণহত্যার দায় এই বাঙালি জাতিবাদীরা পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা হিশেবে আল্লামা ইকবালের উপরেও বর্তিয়েছে। কাজেই ১৯৭১-উত্তর বাংলাদেশে আমরা দেখতে পেলাম যে আমাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসের নাম থেকে আল্লামা ইকবালের নাম প্রত্যাহার করে নেয়া হল।
বাঙালি মুসলমান তার দার্শনিক দারিদ্র্যের কারণে নিজের আত্মপরিচয় নিয়ে সর্বদা দোদুল্যমান ও সংশয়গ্রস্ত। এই বাঙালি মুসলমান কি কখনো এই আত্মজিজ্ঞাসা করেছে যে আল্লামা ইকবালকে অপাংক্তেয় করে রাখায় তাদের কি ক্ষতিটা হচ্ছে? ১৯৭১ সালে বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতিসত্তা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উপরে ভিত্তি করে গঠিত স্বতন্ত্র আত্মপরিচয়ভিত্তিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়েছিল। কিন্তু একটি উগ্র বাঙালিত্ববাদী গোষ্ঠী এই সুযোগে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় থেকে মুসলমানত্বকে বিসর্জন দিয়ে তাকে সম্মিলিত জাতীয়তার নামে কারো গোলাম করে রাখতে চায় কিনা — সেই ব্যাপারেও তো তাকে যথেষ্ট সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। আর এই সতর্কতা ও সচেতনতা সৃষ্টির জন্য আল্লামা ইকবালের সাহিত্য ও দর্শন বাঙালি মুসলমানের জন্য এখনো অনেক প্রযোজ্য ও প্রাসঙ্গিক।
আল্লামা ইকবাল উপমহাদেশের প্রেক্ষিতে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম আত্মপরিচয় এবং মিল্লাত ও উম্মাহচেতনা কুর’আন এবং সুন্নাহর আলোকে উপস্থাপন করেছিলেন। তা বাঙালি মুসলমানের জাতীয়, সাংস্কৃতিক এবং রাষ্ট্রিক স্বাতন্ত্র্য ও কর্তাসত্তা সুরক্ষায় প্রণোদনা যোগাতে পারে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের তাগিদেই তাই আল্লামা ইকবালকে এখনো প্রয়োজন।