মানুষের মনে এই মহা সৃষ্টি জগতের সৃষ্টিকর্তাকে জানার আগ্রহ জন্ম নিতে পারে। স্রষ্টাকে চিনতে পারার পর স্রষ্টা ঠিক কোন উদ্দেশ্যে মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন সেটাও জানার আগ্রহ মানুষের মনে ভাবোদয় হবে। স্রষ্টাকে জেনে তারপর তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাঁর হুকুম মতো সকল বিধিনিষেধ মেনে জীবন অতিবাহিত করাই হচ্ছে স্বাভাবিক ব্যাপার। স্রষ্টাকে যত জানা যাবে ততই স্রষ্টার সাথে মানব হৃদয়ের সম্পর্ক মজবুত হবে। স্রষ্টার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে তাঁর প্রেমে মশগুল হয়ে মন উজাড় করে তাঁর প্রার্থনা করবে।

স্রষ্টাকে জানার আগ্রহ না থাকলে স্রষ্টার প্রদত্ত ধর্মকেই মানুষ চিনতে পারবে না। আর সৃষ্টিকর্তার ধর্ম না জানলে মানুষ মহা ভুলের মধ্যদিয়ে জীবন অতিবাহিত করবে। যে পথকে অন্ধকারের পথ বলা হয়ে থাকে। সৃষ্টিকর্তা কোনো কারণ ছাড়াই মানুষ সৃষ্টি করে দুনিয়াতে শুধু বিচরণ করতে পাঠাননি। তিনি মানুষকে দিশা না দিয়েই শুধু বিবেক দিয়ে প্রেরণ করেননি। তিনি যদি মানুষের জন্য কোনো গাইডলাইনের ব্যবস্থা না করতেন মানুষ তার বিবেক দিয়ে এত সুন্দর জীবন ব্যবস্থা গঠন করতে পারতো না। মানুষ আল্লাহর সত্ত্বাকে বিশ্বাস করুক বা না করুক স্রষ্টার গাইডলাইনের জন্যই মানুষ আজ এতো সমৃদ্ধ একটি জাতি। নতুবা মানুষ পশুর মতো ঐ বন জঙ্গলেই পড়ে থাকতো। এটা বর্তমান সময়ে প্রমাণিত। সেই আলোচনায় পরে আসবো। তো মানুষ যখন স্রষ্টাকে না চিনে ভিন্ন পথ বেছে নেয় তখন সে ভুল পথে থাকে। এই ভুল পথ স্রষ্টার দেখানো পথ নয় বলে একে অন্ধকারের পথ বলা হয়।

স্রষ্টা আকষ্মিকভাবেই কোনো গাইডলাইন পাঠাননি। তিনি মানুষের মধ্য থেকে দুনিয়াতে প্রতিনিধি মনোনীত করেছেন। এরপর তিনি তাদের মাধ্যমেই এই গাইডলাইন মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি মানুষের কাছে গাইডলাইন দিয়েছেন তাঁর প্রিয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে।

স্রষ্টা মানুষকে একেবারেই আকষ্মিকভাবে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনেননি। সেটা স্রষ্টার লক্ষ্য নয়। তিনি পরিচিতি হওয়ার অভিলাষ থেকেই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ স্রষ্টাকে না দেখেই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে মানুষ যেন শুধু তাঁর ইবাদত করেন সেজন্যই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। ইসলামী পরিভাষায় মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যে জীবন এই সময়টুকুকে বলা ইচ্ছে ইহকাল। আর মানুষের মৃত্যুর পর থেকে শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত সময়কে বলা হয় পরকাল। তাহলে মানুষের যে ইহকাল এই সময়কে স্রষ্টা মানুষের পরীক্ষার জন্য সংরক্ষণ করেছেন। এই সময়ে মানুষের যাবতীয় কর্মকাণ্ড আল্লাহ সংরক্ষণ করে রাখেন। মানুষ এই সময়ে নিজের পাপ, পুণ্যের মাধ্যমেই পরকালে ফল ভোগ করবে।

মানুষের মস্তিষ্কে সঠিক মনুষ্যত্ববোধ তৈরি হতে অনেক সময় লেগেছিল। কারণ মানুষ খুব সহজেই আল্লাহকে বিশ্বাস করতে চাচ্ছিল না। তাঁরা খুব তাড়াতাড়ি স্রষ্টার মনোনীত প্রতিনিধিকে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নেয়নি। তাঁর প্রতিনিধির দেখানো দ্বীনের পথ মানুষ এতো সহজে গ্রহণ করেনি। মানুষ বিবেক দ্বারা বুঝে শুনেই ধর্মকে গ্রহণ করেছে।

কারণ কালে কালে ধর্ম শিক্ষা মানুষকে মনুষ্যত্ববোধ কি সেটা শিখিয়ে এসেছে। এই মহা জগতের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে স্রষ্টা প্রদত্ত ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে মানুষের কাছে জানান দিয়েছেন। ধর্ম গ্রন্থসমূহ স্রষ্টার প্রেরিত তাঁর প্রিয় বান্দার উপর অবতীর্ণ করেছিলেন। তাঁর এই প্রিয় প্রতিনিধিরাই মানুষের কাছে স্রষ্টার বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। মানবসৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ এভাবেই ধর্ম শিক্ষা পেয়ে এসেছে। আর স্রষ্টার প্রেরিত সর্বশেষ ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে স্রষ্টার সর্বোচ্চ সুন্দরতম ও স্রষ্টার কাছে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় নাম হচ্ছে আল্লাহ। আর তাঁর প্রেরিত সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থ হচ্ছে পবিত্র আল কুরআন। এই আল কুরআন অবতীর্ণ হয় আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সঃ)। তিনি সর্বশেষ নবী ও রাসুল। আজকে আমরা আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো। এরপর কুরআন যে আল্লাহর প্রেরিত গ্রন্থ সেটারও প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা করবো।

আল্লাহর অস্তিত্ব: বস্তুবাদীরা নাকি কোনো কিছু না দেখলে তা বিশ্বাস করেন না। তাদের সাধারণ যুক্তি তারা স্রষ্টাকে না দেখলে কিভাবে তারা স্রষ্টায় বিশ্বাস করবেন?

প্রথমত বিশ্বাস বিষয়টি কি সেটা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। বিশ্বাস জিনিসটা হচ্ছে একটি অদৃষ্ট অনুভূতি। যেটা মানুষের মস্তিষ্কজাত উপলব্ধি থেকে আসে। মানুষ কিছু কিছু জিনিস না দেখেই সেটাকে বিচার বিশ্লেষণের এতো ঝুটঝামেলা না গিয়ে অন্ধ বিশ্বাস করে ফেলে। কারণ জগতের অনেক জিনিসই রয়েছে সেসব জিনিসের বিচার বিশ্লেষণ না করেই, চোখে না দেখেই বিশ্বাস করতে হয়।

যেমন মানুষ কখনো সুগন্ধি জিনিসটি নিজের চোখে দেখেনি। অথচ ফুলের যে সুগন্ধি আছে সেটা মানুষ সহজেই উপলব্ধি করতে পারে। মানুষকে কেউ বলে নাই যে রাত্রি হলে সেটাকে অন্ধকার বলতেই হবে। তবুও মানুষকে জগতের নিয়ম অনুসারে রাতকে অন্ধকার হিসেবে স্বীকার করতে হয়।

মানুষ কখনো এই পুরো পৃথিবী দেখেনি। তবুও যে পৃথিবী বিশাল সেটা মানুষ বিশ্বাস করে। পৃথিবীর অন্যান্য গ্রহ মানুষ দেখেনি অথচ অন্যান্য গ্রহ যে আছে সেটাও মানুষ অনায়াসে বিশ্বাস করে।

আরেকটু সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে৷ ঢাকার বিমানবন্দরের দিকে রওনা হওয়া একটি প্রাইভেট কারের রেডিওতে হঠাৎ খবর এলো যে বিমানবন্দরের কাছাকাছি খুব গণ্ডগোল বেঁধেছে। সেদিকে মানুষের যাওয়া নিরাপদ হবে না। এখন চালক এই খবর শোনার পর সে আর বিমানবন্দরের পথে আগাইবে না। কারণ সে না দেখেই বিশ্বাস করেছে যে সেদিকে গেলে সমস্যায় পড়বে। তাই সে বিমানবন্দরে যাওয়া থেকে বিরত থাকবে। এই যে মানুষ না দেখেই বিবেকের তাড়নায় নিজেকে নিরাপদ রাখতে অদৃশ্য কিছুকে বিশ্বাস করে বসল এটাকে কি তাহলে অন্ধ বিশ্বাস বলা যাবে?

তাহলে প্রমাণিত যে, বিশ্বাস জিনিসটা অদৃশ্য। আল্লাহর অস্তিত্ব সরাসরি কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। কারণ আল্লাহর অস্তিত্ব বুঝতে পারার মতো ক্ষমতা আল্লাহ কাউকে দেননি। তবে আল্লাহ বিভিন্ন নিদর্শন দ্বারা তাঁর অস্তিত্ব বুঝানোর চেষ্টা করেছেন।

প্রথমেই একটা প্রশ্ন করি আসলেই কি এই বিশ্বজগতের স্রষ্টা বলতে কিছু আছে? উত্তর হবে অবশ্যই স্রষ্টা বলতে একজন রয়েছে। কোন প্রমাণ ছাড়া যদি স্রষ্টা আছে বলেই আওড়াইয়া যায় নিশ্চয়ই আমাকেও পাগল আখ্যা দেওয়া হতে পারে! তাই স্রষ্টা যে আছে সেটার একটা সামান্য ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছি।

সৃষ্টিকর্তা আছেন সেটা জানার আছে একটি ঘটনার অবতারণা করছি। পৃথিবীর বড় বড় শহরের সড়কে ট্রাফিক সিস্টেম অনেক উন্নত। এসব শহরের সড়কে রাস্তায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ট্রাফিক সিগনাল ব্যবস্থা রয়েছে। ট্রাফিক সিগনাল সিস্টেমটি মূলত পরিচালিত হয় কয়েকটি সিগনাল লাইটের মাধ্যমে। লাল, হলুদ, সবুজ রঙয়ের বাতিগুলো অটোমেটিক্যালি পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে গাড়িকে দিক নির্দেশনা করা হয়ে থাকে৷ এই যে অটোমেটিক সিস্টেম এই সিস্টেম তৈরি কি আপনাআপনি হয়েছে? এই ধারাবাহিক স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম নিশ্চয়ই কোনো বিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। ঠিক তদ্রূপ এই পৃথিবীর গ্রহ, নক্ষত্র, আলো, বাতাস, দিন, রাত্রী, ঋতুর পরিবর্তন, সাগরের ঢেউয়ের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ আরো কতো কোটি কোটি পৃথিবীর প্রাকৃতিক চলমান এই সিস্টেমও আপনাআপনি চলতে পারে না। এই সিস্টেম নিয়ন্ত্রণের পেছনেও কেউ না কেউ তো অবশ্যই আছে। দুনিয়ার এমন কোনো বস্তু নেই যেটা সৃষ্টির পেছনে কারোই অবদান নেই। তাহলে শুধু প্রকৃতিগত বিষয় কেন আপনা-আপনি হতে থাকবে?

একটা বিষয় লক্ষ্য করে দেখুন পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসের যেমন জন্ম আছে ঠিক তেমনি বিনাশও আছে। সেই আদিকাল থেকেই জীবচক্র বলেন জড়বস্তু বলেন এমন কিছুই কি আছে যেটা অক্ষত থাকতে পেরেছে? কোনো কিছুই অক্ষত অবস্থায় নেই। প্রতিটি জিনিসেরই জন্মও আছে মৃত্যু বা বিনাশও আছে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়লা যে বাণী কুরআনে বলেছেন সব বাণীই সত্য। পৃথিবীর সব কিছুর পরিবর্তন পরিবর্ধন হয়ে থাকে। যে মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা বলা হয় সেই আশরাফুল মাখলুকাতেরও মৃত্যু আছে। অথচ স্রষ্টা এমন একটি বিধান মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন সেই লিখিত বিধান পবিত্র আল কুরআনের কোনো পরিবর্তন পরিবর্ধন আজ-অব্দি হয়নি। এবং হওয়ার কোনো প্রয়োজনও পড়েনি। পৃথিবীর এমন কোনো বিজ্ঞ কেউ কি আছে যিনি এই কুরআনের ভুল ধরার চ্যালেঞ্জ নিয়ে সফল হতে পেরেছেন? পারেননি। কুরআন নাযিল হওয়ার সূচনালগ্ন থেকেই অনেক বিজ্ঞ মানুষেরা সেরা চেষ্টা করে দেখেছিলেন। কিন্তু বারবার তারা নিজেদের অবস্থান থেকে ফিরে এসে হয় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, নতুবা নিজেদের ভুল স্বীকার করে নিয়েছেন না হলে স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস এনেছেন। এর ব্যতিক্রম কোথাও ঘটেনি। কুরআনের একটি মাত্র হরফ পরিবর্তন করার কোনো প্রয়োজনীয়তা আজ-অব্দি কেউ খুঁজে পায়নি। আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়লার পরিচয় সম্পর্কে মানুষকে জানান দিতে পবিত্র কুরআনের সূরা আর রহমান এ বলছেন-

আর রহমা-নু
-করুনাময় আল্লাহ।
‘আল্লামাল্ কুরআ-ন্ ।
-তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন
খলাক্বল্ ইন্সা-না
-তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ
‘আল্লামাহুল বাইয়া-ন্।
-তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাষা
আশ্শামসু অল্ক্বমারু বিহুস্বা-নিঁও
-সূর্য ও চাঁদ আবর্তন করে নির্ধারিত কক্ষপথে
অন্নাজ্ব্ মু অশ্শাজ্বারু ইয়াস্জুদা-ন্ ।
-এবং তৃণলতা ও বৃক্ষাদি সেজদারত আছে।
অস্সামা-য়া রফা‘আহা-অওয়াদ্বোয়া‘আল্ মীযা-ন্
-আর আসমান, তিনি তাকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন দাঁড়িপাল্লা
আল্লা-তাত্ব গও ফিল্ মীযা-ন্।
-যাতে তোমরা সীমালঙ্ঘন না কর দাঁড়িপাল্লায়।
অআক্বীমুল্ অয্না বিল্ক্বিস্ত্বি অলা-তুখ্সিরুল্ মীযা-ন্।
-তোমরা ন্যায্য ওজন কায়েম কর এবং ওজনে কম দিয়ো না।
অল্ র্আদ্বোয়া অদ্বোয়া‘আহা-লিল্আনা-ম্।
-তিনি পৃথিবীকে স্থাপন করেছেন সৃষ্টজীবের জন্যে।
ফীহা- ফা-কিহাতুঁও অ-ন্নাখ্লু যা-তুল্ আক্মা-ম্।
-এতে রয়েছে ফলমূল ও খেজুর গাছ যার ফল আবরণযুক্ত
অল্ হাব্বু যুল্‘আছফি র্অরইহা-ন্।
-আর আছে খোসাযুক্ত দানা ও সুগন্ধিযুক্ত ফুল।
ফাবিআইয়্যি আ-লা-য়ি রব্বিকুমা-তুকায্যিবা-ন্।
-অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে?

এই পবিত্র সূরাটির শুরুতেই আল্লাহ নিজের পরিচয়ের শুরুতেই বলেছেন তিনি করুণাময়। কিসের জন্য করুণাময় তিনি সেটাও মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন উক্ত সূরার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। আল্লাহ নিজেকে করুণাময় বলে তিনি তাঁর বান্দাদের
জন্য করুণা করে সবচেয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ রহমতটি দিয়েছেন সেই কুরআনের শিক্ষা দানের কথা বলেছেন। এরপর আল্লাহ যে করুণা করে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সেকথা বলেছেন। এরপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করে ভাষা শিখিয়েছেন সেটাও বলছেন। আল্লাহ বলেছে চন্দ্র ও সূর্যকে যে নির্ধারিত একটি কক্ষপথে ঘোরান সেকথাও বলেছেন। আল্লাহর ইবাদতে তরুলতা ও বৃক্ষাদিরা সর্বদা সেজদারত আছে সেটাও বললেন। আল্লাহ আসমানকে যেভাবে সমুন্নত রেখেছেন সেভাবেই তিনি দাঁড়িপাল্লার কাঁটাকে সোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ দাঁড়িপাল্লা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ স্বয়ং নিজেই মানব জাতিকে দাঁড়িপাল্লা অর্থাৎ ন্যায় ইনসাফের শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ এই বিশ্বজগত মানুষের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর প্রতিটি গ্রহ, নক্ষত্র, আলো, বাতাস, জল, স্থল, বায়ুমন্ডল এই সবকিছুই আল্লাহ মানুষের বসবাস উপযোগী করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে বিন্দু পরিমাণ খুঁত নেই। এটা জ্ঞান, বিজ্ঞানের সকল শাখার দৃষ্টিতে প্রমাণিত। আল্লাহ মানুষের রিযিকের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ফলমূলের বৃক্ষ দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন৷ নানান রকম ফুলের সুগন্ধি দিয়ে এই পৃথিবীকে সাজিয়েছেন। একই সূরায় আল্লাহ মানুষকে প্রশ্ন করে বলছেন, তোমরা উভয়ই তোমাদের রবের কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে? এখানে উভয়ই বলতে আল্লাহ জ্বীন ও মানবজাতি উভয়কেই প্রশ্ন করেছেন।

আল্লাহ ইরশাদ করেন, আমি জিন ও মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমারই ‘ইবাদাত করার জন্যে। (ছূরা আয্ যা-রিয়া-ত- ৫৬)

উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহ জ্বীন ও মানবজাতিকে উনার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন বলেছেন। যেহেতু আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে এই দুই জাতিকে সৃষ্টি করেছেন সেহেতু আল্লাহ এই দুই জাতিকে তাঁর অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করার ব্যাপারে সতর্ক করবেন এটাই স্বাভাবিক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর পবিত্র কুরআনের প্রতিটি বাণী কত যুক্তিসঙ্গত। সুবহানাল্লাহ।

পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টির বিনাশ আছে। মানুষ থেকে শুরু করে কীটপতঙ্গ, নদী-নালা, খাল-বিল, সাগর, মহাসাগর, যতবড় গাছপালা থাকুক কেউ অহংকারের সাাথে অবিনশ্বর বলে বেঁচে থাকতে পারে না। তাহলে কি এই মহাবিশ্বেরও কি বিনাশ হবে না? যেহেতু আল্লাহর সৃষ্টিকূলের সমস্ত কিছুরই ধ্বংস রয়েছে তেমনি এই পৃথিবীরও একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। যুগে যুগে কত নগরী যে মাটির সাথে মিশে গেছে সেসব ঘটনাও এখন ইতিহাস। ঠিক তদ্রূপ পৃথিবীরও সমাপ্তি রয়েছে। এই ব্যাপারে আধুনিক বিজ্ঞান সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে না পারলেও আল্লাহ তাঁর পবিত্র কিতাব আল কুরআনে বলে দিয়েছেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন- ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে সব কিছু নশ্বর। কিন্তু চিরস্থায়ী তোমার প্রতিপালকের চেহারা (সত্তা)- যিনি মহীয়ান, গরীয়ান। অতএব (হে জ্বিন ও মানুষ!) তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ কোন্ নি‘মাতকে অস্বীকার করবে। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা আছে, সবাই তাঁর নিকট প্রার্থনা করে, তিনি প্রত্যহ এক এক ব্যাপারে রত। (সূরা আর রহমান ২৬-২৯)

পৃথিবীর সমস্ত কিছুই আল্লাহর সৃষ্টি। এই মহাসৃষ্টি একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। পৃথিবীর কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। এমনকি আল্লাহর পবিত্র কা’বাও একদিন আল্লাহ ধ্বংস করে দিবেন। সেদিন শেষ বিচারের দিন হবে। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ এই পৃথিবীর নশ্বর নন। আল্লাহর কাছে প্রতিনিয়ত পৃথিবীর সমস্ত কিছুই প্রার্থনা করে। তাঁর কাছেই প্রয়োজনের কথা বলে। আল্লাহ সবার চাওয়া পাওয়া এক এক করে পূরণ করেন।

আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত আছেন। তিনি জানতেন যে সকল মানুষ বিশ্বাসী হবে না। তাই তিনি যারা অবিশ্বাসী তাদেরকে সঠিক পথে ফেরাতে তাদের কাছে আল্লাহ নিজের ব্যাপারে অবগত করতে আল্লাহ কুরআনে বহুবার মানুষকে হুশিয়ারী প্রশ্ন করেছেন। আল্লাহ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে অনেক প্রশ্ন করেছেন। আল্লাহ বলেছেন,

যে পবিত্রসত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদ স্বরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসাবে। অতএব, আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাকেও সমকক্ষ করো না। বস্তুতঃ এসব তোমরা জান। [সুরা বাকারা – ২:২২]

এতদসম্পর্কে যদি তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, তাহলে এর মত একটি সূরা রচনা করে নিয়ে এস। তোমাদের সেসব সাহায্যকারীদেরকে সঙ্গে নাও-এক আল্লাহকে ছাড়া, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো। [সুরা বাকারা – ২:২৩]

আর যদি তা না পার-অবশ্য তা তোমরা কখনও পারবে না, তাহলে সে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর, যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর। যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফেরদের জন্য। [সুরা বাকারা – ২:২৪]

আল্লাহ ভূমিকে মানুষের জন্য বিছানাস্বরূপ আর আকাশকে মানুষের ছাদ স্বরূপ স্থাপন করেছেন। আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে শস্য-ফলাদির উৎপাদন করেন৷ আর এই ফল ফলাদি খেয়েই মানুষ বেঁচে থাকে। আল্লাহর এই কথার সাথে বিজ্ঞান একমত। বৃষ্টির পানিদ্বারা বৃক্ষ ফসলাদি আহার গ্রহণ করে৷ মাঠির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। আল্লাহর এই নেয়ামত পৃথিবীর অন্য কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না। অতএব আল্লাহ মানুষকে এসব কিছু স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারা যেন আল্লাহকে কারো সাথে সমকক্ষ না করেন সেই নির্দেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ সুবাহানাল্লাহু তায়লা এই আয়াতের পরের আয়াতে মানুষের সাথে চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো তাহলে তোমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য অবতীর্ণ কিতাব কুরআনের মতো একটি মাত্র সূরা রচনা করে নিয়ে এস। আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কাউকে সঙ্গী হিসেবে নাও। তাও আল্লাহর পবিত্র কালামের একটি মাত্র সূরা রচনা করে নিয়ে আসার জন্য আল্লাহ চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করেছেন। পৃথিবীর এমন কোনো জ্ঞানী আজ-অব্দি নির্ভুল কোনো লেখায় লিখতে পারেনি যেখানে সেখানে সূরার মতো করে কিছু রচনা করার মতো কাউকে আজ-অব্দি খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরং কুরআনের ভুল ধরতে গিয়ে পৃথিবীর অনেক নাস্তিকরাও আল্লাহ ও তার কিতাবে বিশ্বাস এনেছেন। অনেকেই একদম পাক্কা মুসলমান হয়ে গিয়েছেন। আল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন কোনো মানুষ আল্লাহর কুরআনের সূরা সমূহের মত একটি মাত্র সূরাও রচনা করতে পারবে না। তাহলে কি এই কুরআন আল্লাহ তায়লার পক্ষ থেকে নাযিল হয়নি? নিশ্চয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে। পৃথিবীর যে মহাজ্ঞানীই থাকুক না কেন তাদের রচিত বইয়ে কোথাও না কোথায়ও একটু না একটু হলেও ভুল থেকে যায়। একদম না হলে প্রিন্টিং মিসটেক হলেও হয়ে যায়। আল্লাহ মানুষের মধ্যে এভাবেই খুঁত দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। যাতে তারা ভুলে না যায় যে তারাও স্রষ্টার সৃষ্টি।