গ্লোবের পেটে কান লাগিয়ে খোকন শুনে কান্না
বিশ্ব গোলক ফুঁপিয়ে ওঠে আর পারি না, আর না।
মানুষ নামের বিজ্ঞানীরা আমায় নিয়ে খেলছে
আমার সাগর পাহাড় নদী রোলার দিয়ে বেলছে।
ক্লোরোফিলের সবুজ ভরা ছিল আমার গাত্র
সাগর ভরা ছিল আমার লবণ জলের পাত্র।
সব বিষিয়ে দিচ্ছে মানুষ ধোঁয়ায় আকাশ অন্ধ
কলের বিষে তলিয়ে গেছে গোলাপ ফুলের গন্ধ।
(রসায়নের রান্না-আল মাহমুদ)

মানুষ ও প্রকৃতির কবি আল মাহমুদ নিজস্ব সৃষ্টি সত্তায় বাংলা সাহিত্য একটি স্বতন্ত্র গগন নির্মাণ করেছেন৷ তিনি যেমন লিখেছেন সোনালী কাবিন, পানকৌড়ির রক্ত, উপমহাদেশ, কাবিলের বোনের মত কালোত্তীর্ণ ও পাঠক নন্দিত রচনা তেমনি শিশুদের জন্যে দেদারসে লিখে গেছেন আমৃত্যু। তাঁর শিশুতোষ লেখাজোখা অজস্র হলেও গ্রন্থ আকারে প্রকাশ পেয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি। কারণ আল মাহমুদ শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা কবিতাকেও তার আধুনিক রচনা মনে করতেন। তাই আলাদা করে ছড়া ও কিশোর কবিতার বই বের করার তাগিদ অনুভব করেননি৷ আল মাহমুদ আপাদমস্তক একজন শিশুসাহিত্যিক। শিশুসাহিত্যে নিয়ে কাজ করা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। কিন্তু এই কঠিন কাজটা অনায়াসে করে গেছেন এই শিশুপ্রিয় কবি। আল মাহমুদের শিশুতোষ রচনা যেমন তুমুল পাঠক প্রিয় তেমনি ভাব ভাষায় প্রাঞ্জল ও সাবলীল। শুধু শিশুদের জন্যে লিখেই তিঁনি পেয়েছেন শিশু একাডেমি ( অগ্রণী ব্যাংক) পুরস্কার, ১৯৮৩ সালে পেয়েছেন আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার। শিশুসাহিত্যে শিশুদের মানস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুদের কল্পরাজ্যের চাওয়া পাওয়া, আশা-আকাঙ্ক্ষা,আনন্দ-বিষাদের সুনিপুণ বয়ানই হল শিশুসাহিত্য। শিশুসাহিত্যের বিষয়বৈচিত্র্য অফুরন্ত। সাহিত্যের আদি এবং অন্যতম জনপ্রিয় ধারা হল- ছড়া। আল মাহমুদের জনপ্রিয় ছড়ার বইগুলো হল :
পাখির কাছে ফুলের কাছে, মোল্লা বাড়ির ছড়া, একটি পাখির লেজ ঝোলা ইত্যাদি। তার শিশুতোষ বইগুলো শিশুকিশোরদের মাঝে ব্যাপক সমাদর পেয়েছে।
তিঁনি বিভিন্ন পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিনে শিশুকিশোর জন্য লিখেছেন অসংখ্য ছড়া-কবিতা।
‘বাতাসের নূপুর’কবির সংগৃহীত ছড়া-কবিতা সংকলন। আশির দশক থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত ছড়া এবং কিশোর কবিতার একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থনা। প্রতিশ্রুতিশীল প্রকাশনা সংস্থা কিচিরমিচির প্রকাশনী থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২১ এ প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণের কাজ করেছেন ফরিদী নুমান । বইটিতে স্থান পেয়েছে কবির সুনির্বাচিত মোট ৩৮ টি ছড়া-কবিতা। প্রতিটি ছড়া-কবিতা মনোগ্রাহী অলঙ্করণে সাজানো। পুরো বইটি বর্ণিল এবং সচিত্র। সচিত্র এই বইটি শিশুকিশোরদের হাতে তুলে দেওয়ার মতই মানসম্মত ও নান্দনিক। ঈদ, পাখি, ফুল, ঋতু , উৎসব, স্বপ্ন, স্বাদ আহ্লাদ ও পেলব প্রকৃতির ছান্দসিক বর্ণনার স্মারক বাতাসের নূপুর বইটি।

বইটির নাম কবিতাটি এরকম :

আবার এলো ফেব্রুয়ারি ভালোবাসার দিন
ভাষার প্রতি আশার প্রতি বাজলো কি রিন্ রিন্
বুকের ভেতর রক্ত নাচে বাংলা ভাষার মাস
এই দিনে কি সবুজ হলো তেপান্তরের ঘাস।

এটাই বুঝি সব পেয়েছি তৃপ্তিতে ভরপুর
শুকনো পাতায় বাজলো শোনো বাতাসের নূপুর ।
(ছড়ার শিরোনাম : বাতাসের নূপুর)

ভাষা আন্দোলন ও বাংলা ভাষার প্রতি কবির ছন্দবদ্ধ গুঞ্জরণের পাশাপাশি আমরা শুনতে পাই প্রাণ-প্রকৃতিতে ভরপুর বাংলাদেশের চিরায়ত আদল৷

কোথায় যেন ফুল ফুটেছে
গন্ধে আকুল মন
মনের মাঝে ফুলের গন্ধ
দুপুরটা নির্জন।

হাঁটছি একা তোমার সাথে
কাঁধের ওপর হাত
হাত রেখেছি কাঁধে তোমার
বুঝি না দিন-রাত।
(ছড়ার শিরোনাম : বাংলাদেশ )

কবির আশা ফুলে ফুলে দেশটা সুশোভিত হয়ে যাক। ফুলগুলো গন্ধ বিলাক দিক দিগন্তে। কুঁড়িদের সুবাশিত ফুল হয়ে ফুটাতে পেরেশান কবি আল মাহমুদ লিখেছেন :

ফুল ফুটাতেও যুদ্ধ লাগে
কুঁড়ির মুখে পানি
স্বাধীনতার শব্দ দিয়ে
সাজাই বাগান খানি ।
গোলাপ কেন রক্তবরণ
গোলাপ কেন লাল
বাংলাদেশের নিশান জুড়ে
হাসছে মহাকাল।
(ফুল ফুটাতে- আল মাহমুদ)

দুর্ঘটনায় অকাল প্রয়াত তরুণ ছড়াকার বাপী শাহরিয়ার নিয়ে কবি লিখেছেন-

বাপীর জন্য লিখবো ছড়া কি নিয়ে
কথার মালা কে যেন নয় ছিনিয়ে।
দাঁড়ায় না সে, কেবল শুয়ে শয্যাতে
ভাবতে থাকে কষ্টটা তার মজ্জাতে।
ছড়ার ছেলে পারবে বাপী দাঁড়াতে?
বাংলাদেশের পাহাড়-নদী মাড়াতে?
(বাপীর জন্য ছড়া- আল মাহমুদ)

আরো আছে রসায়নের রান্না, ফেরার সাধ, কারফিউ, মন পবনের নাও, তারা গোনা, ঈদের খুশি, ধ্বনি তরঙ্গের মত মজার মজার মোট ৩৮ টি ছন্দবদ্ধ কবিতা।

বইটি সম্পর্কে প্রকাশক মো. ইব্রাহিম হোসেন বলেন- “বাতাসের নূপুর মূলত দেশের ঐতিহ্যবাহী পত্রিকাগুলোতে ছোটদের জন্য কবির লেখা ছড়া এবং কিশোর কবিতার সঞ্চিতি। এছাড়াও আমাদের প্রকাশনী থেকে এবারের বই মেলায় তরুণ লেখক শাকের জামিলের “সুপারমুনের আলো” এবং ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক নাঈম আল ইসলাম মাহিনের “ছড়া নাকি গল্প” বই দুটি পাওয়া যাচ্ছে। আমরা সব সময় শিশুদের হাতে নান্দনিক ও সুন্দর বই তুলে দিতে বদ্ধপরিকর। আশা করি এই বইটি শিশুসাহিত্যে অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।
একজন পাঠক হিসেবে বইটি হাতে পেয়ে আমি নিজেও আপ্লুত। মজার মজার বিষয়, সচিত্র উপস্থাপনা এবং পরিপাটি একটা বই বাতাসের নূপুর। শিশুকিশোর বন্ধুদের হাতে তুলে দেওয়ার মতই শোভন ও সৌন্দর্যমণ্ডিত একটি বই। আশা করি শিশুকিশোরদের পাশাপাশি বয়োজ্যেষ্ঠরাও এই বইটি সংগ্রহ করবেন। শিশুসাহিত্যে তো শুধুমাত্র শিশুদের জন্য নয় বরং সকল বয়সের সকল মানুষের জন্য। বয়োজ্যেষ্ঠরা শিশু সাহিত্যে পাঠ করে শিশুদের বিচিত্র জাদুবাস্তব জগতের খোঁজ খবর রাখতে পারেন। এতে শিশুদের মন মানসিকতা বুঝে তাদের সুস্থ ও সুন্দর পথটি চিনিয়ে দিতে সহজ হয়৷

বইয়ের নাম : বাতাসের নূপুর
লেখক : আল মাহমুদ
প্রকাশনী : কিচিরমিচির প্রকাশনী
প্রচ্ছদ মূল্য : ১৭০ টাকা
অলঙ্ককরণ : ফরিদী নুমান
রিভিউ : হুসাইন দিলাওয়ার