দীর্ঘ পাঁচ দশকব্যাপী অবিরতভাবে কাব্যচর্চা করে আসছেন আল মাহমুদ। এই বিস্তৃত সময়ে তাঁর অসামান্য অর্জনকে সামনে রেখে একটা প্রশ্ন উঠতেই পারে: আজকের আল মাহমুদকে আমরা কি কি অভিধায় বা বিশেষণে চিহ্নিত করবো? এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে এরকম: আল মাহমুদ প্রথমত একজন মৌলিক ও খাঁটি কবি, দ্বিতীয়ত স্বতন্ত্র ও স্বকীয় কবি, একজন শক্তিমান ও প্রতিভাবান কবি, স্বনির্ভর ও স্বভাব কবি, পঞ্চমত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য কবি, বাংলা সাহিত্যের মূলধারার ঐতিহ্যবাদী কবি এবং শেষ পর্যন্ত বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল কবি। এইসব অভিধার অবশ্যই যুক্তিযোগ্য কার্যকারণ সূত্র রয়েছে তাঁর কবিতার বিপুলা জগতে। সেজন্যে শুধুমাত্র বাংলাদেশের কবিতায় আল মাহমুদের মৌলিকতা বা বিশিষ্টতাকে উল্লেখ করা বোধ হয় ঠিক হবে না। এটা করলে তাকে সীমায়িত করা হয়ে যায়। আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় আজকের ‘পরিণত ও পূর্ণাঙ্গ কবি’ আল মাহমুদ সমগ্র বাংলা ভাষায় ও সাহিত্যে একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছেন কাব্যসৃষ্টির মাধ্যমে। আর একথা বলা নিশ্চয় বেশি বলা হবে না যে, বর্তমান বাংলা ভাষার সবচেয়ে ‘শক্তিমান কবি’ হচ্ছেন আল মাহমুদ। স্বাভাবিকভাবে তাঁর কবিতা-ভুবন ‘বৃহৎ বাংলা’ ও বাংলাদেশকে ধারণ করেই নির্মিত হয়েছে আপন আলোয়। বাঙালির দু’হাজার বছরের ইতিহাসের চালচিত্র ও পালাবদল তাঁর কাব্যে অনুরণিত ও বিরজমান।
সে কারণে এদেশের প্রকৃতি, প্রকৃতিলগ্ন মানুষ, গ্রমীণ জনপদ, নদী ও নদীনির্ভর মানব-মানবীর জীবন তাঁর কাব্যে হয়ে উঠেছে প্রধান কয়েকটি বিষয়। বিশেষভাবে নদীকেন্দ্রিক জীবনপ্রবাহ এবং সেই জীবনের নানা রঙ-রেখা-রূপ। ফলে নিসর্গের সঙ্গে নদী আল মাহমুদের কবিতার প্রান্তরে ভাঙা-গড়ার খেলা খেলে এবং দুকূলের জনজীবনকে ঢেউয়ে ঢেউয়ে আন্দোলিত করে সব সময়। নদীনির্ভর সংগ্রামী মানুষের পাশাপাশি পশুপাখিও পদচারণা করে, ডানা মেলে দেয় তাঁর কবিতার মাটিতে-আকাশে। বাংলা ভাষা ও সাাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালি কাবিন’-এ এই নদী ও তুফান অনেক কবিতাকে করেছে বিস্তারিত- অর্থগত ও বিষয়গত উভয় দিক থেকেই। ‘বাতাসের ফেনা’ এ ধরনের একটি সফল কবিতা। এ কবিতায় কবি তুফান ও নদীর ভয়াবহতাকে চিত্রিত করেছেন শব্দের রঙ দিয়ে। প্রথমেই কবির দার্শনিক উচ্চারণ:
কিছুই থাকে না দেখো, পত্র পুষ্প গ্রামের বৃদ্ধরা
নদীর নাচের ভঙ্গি, পিতলের ঘোড়া আর হুকোর আগুন
উঠতি মেয়ের ঝাঁক একে একে কমে আসে ইলিশের মৌসুমের মত।
এ উক্তির পরেই কবির মনে প্রশ্ন জেগেছে: কিছুই থাকে না কেন? কবি তার পরপরই ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে:
করো গেট, ছন কিংবা মাটির দেয়াল
গাঁয়ের অক্ষয় বট উপড়ে যায় চাটগাঁর দারুণ তুফানে
চিড় যায় পলেস্তরা, বিশ্বাসের মতন বিশাল
হুড়মুড় শব্দে অবশেষে
ধসে পড়ে আমাদের পাড়ার মসজিদ।
নদী ভাঙন-ঝড়-তুফানের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি এবং এর ভয়াবহ পরিণতিকে এই রকম চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি কাব্যরূপ দিয়েছেন সাবলীলভাবে। আর ‘মসজিদকে বিশ্বাসের মতন বিশাল’ এই উপমা প্রয়োগের ভেতর দিয়ে কবি যেন পৌঁছে গেলেন আরো গভীরে- চৈতন্যের আরো বিশাল জগতে।
এই কবিতার শেষে এসে কবি মানুষের দুর্দশা-দুর্ভোগ ও করুণ পরিণতিকে আরও প্রাণময় করে কবিতায়িত করেছেন অসাধারণ সব চিত্রকল্পের (ওসধমব) সাহায্যে। বাড়িঘরহারা নিঃস্ব অসহায় মানুষের এই আর্তনাদের জন্য কবি দায়ী করেছেন ‘মেঘনার জলের কামড়’-কে: ‘চড়–য়ের বাসা, প্রেম, লতাপাতা, বইয়ের মলাট।/ দুমড়ে মুচড়ে খসে পড়ে। মেঘনার জলের কামড়ে/ কাঁপতে থাকে ফসলের আদিগন্ত সবুজ চিৎকার।/ ভাসে ঘর, খড়া-কলসট, গরুর গোয়াল’- এইসব চিত্রময়তায় কবি নতুনত্ব এনেছেন নিজস্ব ভঙ্গির অনুসরণে। আর একথা সত্য যে, একজন মৌলিক কবির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রচলিত চিত্রকল্প বা উপমায় নতুনত্ব সংযোজন করা অথবা নতুন অর্থারোপ করা।
বাসস্থান অতঃপর অবশিষ্ট কিছুই থাকে না
জলপ্রিয় পাখিগুলো উড়ে উড়ে ঠোঁট মুছে ফেলে বাতাসের ফেনা
শেষ এ দু’টি চরণ এ কবিতাকে এক অনির্বচনীয় বোধের পৃথিবীতে আনে আমাদেরকে। বিমূর্তকে মূর্তরূপ করে তোলে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপকল্পের মাধ্যমে। কবিতার প্রবাহকে তার গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেয় এবং তা ‘মেধাবী কবিতা’ হয়ে ওঠে। কবির হাত দিয়ে একটি সুকৃতি জন্ম লাভ করে।
এ কবিতায় এমন একটি ‘উজ্জ্বল চরণ’ আছে যা তাঁর কাব্যে ও বাংলা কাব্যে বিরল। এককথায় অসামান্য ও অসাধারণ। চমৎকার একটি উপমার মাধ্যমে এই লাইনটি সৃজিত হয়েছে এভাবে:
‘বুবুর স্নেহের মত ডুবে যায় ফুল তোলা পুরনো বালিশ’।
বাস্তব সংসারে বুবুর স্নেহ-মমতার পরিণতির সাথে নদীতে ডুবে যাওয়া পুরনো বালিশের সাদৃশ্য কল্পনা একজন প্রতিভাধর কাব্যশিল্পী ছড়া সম্ভব নয়। এরকম অপূর্ব চরণ সত্যিই তাৎপর্যময়। এই একটি লাইনের কারণেই কবিতাটি হয়ে উঠেছে অনেক বেশি আনন্দময় এবং চিরায়ত লোকসংস্কৃতির চিহ্নবাহী।
আল মাহমুদ বাংলাদেশের কবিতার পঞ্চাশ দশকে কবিতা সৃজনের মাধ্যমে কবি হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু তিনি অন্যসব কবি থেকে আলাদা হয়ে যান নিজস্বতা, স্বাতন্ত্র্য, মৌলিকতা ও শক্তিমানতার কারণে। আর তাঁর কবিতায় সবসময় এদেশের মাটি-মানুষ-প্রকৃতি নদী-নারী হয়ে উঠেছে প্রধান অবলম্বন। পরবর্তীতে এসবের সাথে সংযুক্ত হয়েছে প্রার্থনা। এ প্রার্থনার আবেগ ও ভাষা তাঁকে পৌঁছিয়ে দিয়েছে একজন সম্পূর্ণ কবির দরজায় এবং প্রজ্ঞাময় জগতের আঙিনায়। একজন স্বনির্ভর কবির এই পরিণতি বাংলা কবিতায় সত্যিই এক সুসংবাদ।