একজন মহাপুরুষ, রাষ্টনায়ক, দার্শনিক বা চিন্তানায়কের মতো কবিরও থাকে আদর্শ। এই আদর্শ তাকে পরিচালিত করে কবিতার পথে, কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। কবির আদর্শ অবশ্য দুই ধরনের: প্রথমত, জীবনাদর্শ; দ্বিতীয়ত, কাব্যাদর্শ। এই দুই আদর্শ মিলেই হয়ে ওঠের পূর্ণাঙ্গ কবি। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের মধ্যে একজন পূর্ণাঙ্গ- শক্তিমান ও মৌলিক কবি প্রতিভার নাম আল মাহমুদ। বাঙালির দুই হাজার বছরের ভাষিক-সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যিক উত্তরাধিকার তাঁর কবিতায় বাঙময়। উত্তর-ঔপনিবেশিক কাব্যধারার মৌলিক কণ্ঠস্বর। সময়ের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে আল মাহমুদ যেমন কবি হয়ে উঠেছেন, তেমনি একটা নিজস্ব কাব্যাদর্শও বিনির্মাণ করে নিয়েছেন। সব সময় তা একই রকম থাকেনি, রূপের পরিবর্তনও ঘটেছে। জীবনদর্শন, জীবনবোধ ও জীবনাদর্শের বাঁকবদলের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাব্যরীতির রূপান্তর হয়েছে। তবে মৌলিক প্রবণতা বা বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে কবি আগাগোড়া একই রকম।
আল মাহমুদ আজীবন রোমান্টিক ধারায় কাব্যচর্চা করেছেন। কৈশোরে ও যৌবনে মার্কসবাদে বিশ্বাসী হয়েও তিনি কবিতায় রোমান্টিক আদর্শের রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। এ নিয়ে অবশ্য তাঁর মাঝে দ্বন্দ্ব কাজ করেছে: আশ্চর্যের ব্যাপার মার্কসবাদে বিশ্বাসী হয়েও কবিতায় মার্কসবাদের প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। আমি রোমান্টিক আত্মার মানুষ বলেই হয়তো তা হয়েছিল। তখনকার সমালোচকরা আমার কবিতা নিয়ে অন্তরাত্মার সমালোচনাও করেছিলেন ঠিকমত মার্কসীয় সাহিত্য করতে পারছি না বলে। মুখে মার্কসবাদের কথা বলছি, কিন্তু কবিতা লিখছি রোমান্টিক। এই দ্বন্দ্ব সারাজীবন কাজ করেছে। [সাক্ষাৎকার: কবিতা প্রতিমাসে]
তবে ‘সোনালি কাবিনে’ মার্কসবাদের প্রতিফলন ঘটেছে চূড়ান্তভাবে। প্রথম দুটি কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’ ও ‘কালের কলসে’ এর কোন স্বাক্ষর নেই। এ প্রসঙ্গে একটা কথা স্মরণীয় যে, মার্কসবাদ ও রোমান্টিকতা পরস্পর বিরোধী আদর্শ হিসেবে কবিতায় সব সময় কাজ করে না। মিশ্রণ ও সংশ্লেষণও ঘটে। আল মাহমুদের সাম্যবাদী কবিতায় যেমন রোমান্টিক উপাদান ক্রিয়াশীল।
রোমান্টিক কবিতার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আল মাহমুদ রোমান্টিক ধারার কবি। গীতিময়তা (Lyric) এর অন্যতম গুণ। নাতিদীর্ঘ লিরিক কবিতার আঙ্গিক (Form) তাই এই ধারার কবিতার অবলম্বন। আল মাহমুদ ‘লোক লোকান্তর’ থেকে ‘সোনালি কাবিন’ পর্যন্ত প্রধানত লিরিকধর্মী কবিতা সৃজন করেন। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’র পর থেকে গদ্যধর্মী কাব্যের সূচনা। গদ্যকবিতার চর্চা পরবর্তীকালে বৃদ্ধি পেলেও গীতল কবিতা তাঁর প্রতিটি কাব্যেই উপস্থিত। কবি সবসময় একজন ‘গীতি কবি’ হিসেবে নিজেকে ভেবেছেন। সে কারণেই তিনি আজীবন ছন্দবদ্ধ পঙক্তি রচনা করেন। সমালোচকের মতে: কবি মাত্রই রোমান্টিক, জন্ম-রোমান্টিক, তা নাহলে কবিতা কেন। এমন কি বাস্তববাদী, সাম্যবাদী, শ্রেণী-সংগ্রামী কবিরাও জন্ম-রোমান্টিক। তবে তাদের রোমান্টিকতা আলাদা জিনিশ- শ্রেণী-সংগ্রামীদের রোমান্টিকতাকে এরিখ মারিয়া রেমার্ক যথার্থই চিহ্নিত করেছিলেন ‘Romanticism of the Un-Romantics’ বলে। আল মাহমুদ প্রকৃতার্থে রোমান্টিক- সর্ব সময়েই রোমান্টিক- রোমান্টিকতা তাঁর ঢাল এবং একই সঙ্গে রোমান্টিকতা তাঁর তলোয়ার। [আবদুল মান্নান সৈয়দ: আল মাহমুদের সাম্প্রতিক কবিতা: শিল্পতরু]
রোমান্টিক কবিরা কল্পনাকে (Imagination) কবিতার মূল শক্তি ও নিয়ামক মনে করেন। স্বপ্ন, সৌন্দর্য, অদ্ভুত, বিস্ময় ও অতীতের স্মৃতির মাধ্যমে আত্মমুক্তির জগতে তারা সাঁতার কাটেন। আল মাহমুদের দৃষ্টিতে কবিতা হলো কল্পনা ও স্বপ্নের ভাষিক শিল্প: আমার দৃষ্টিতে কবিতা হলো মানবজীবনের সবচেয়ে নিগূঢ় স্বপ্ন, কল্পনার ভাষার রূপ। ছন্দবদ্ধ ভাষা। আমি মনে করি কবিতা হলো একটা জীবনের নিগূঢ় উপলব্ধি। ছন্দবদ্ধভাবে সুন্দর ভাষায় উপমা-উৎপ্রেক্ষাসহ প্রকাশিত ভাষাই হলো কবিতা। যে জীবন আমরা যাপন করতে পারি না কিন্তু স্বপ্নে কবি। স্বপ্নে আমি চিন্তা করি এই রকমই আমি- এই স্বপ্নটার রূপই হলো আসলে কবিতা, যা আমরা শব্দে প্রকাশ করি। [চাড়ুলিয়া: আল মাহমুদ সংখ্যা]
অর্থাৎ কবির বিবেচনায় কবিতা আর রোমান্টিক কবিতা অভিন্ন। এই ধারার কাব্যে ব্যক্তিই প্রধান এবং ব্যক্তির ভাবনায় কল্পনা কেন্দ্রবিন্দু। কল্পনাশক্তির আলোয় কবি ভেতরের ও বাইরের জগতকে দেখেন এবং নিজের মতো সাজান। আল মাহমুদের কবিসত্তা এবং তাঁর কবিতার কেন্দ্রবিন্দুতে কল্পনা শক্তির অবস্থান ও বিচ্ছুরণ অনুভব করা যায়।
কাব্যসৃজনে রোমান্টিক কবি প্রেরণায় বিশ্বাসী। প্লেটো মনে করতেন, কবিতা কোনো অনুশীলনলব্ধ শিল্প বা কারুকর্ম নয়, বরং ঐশ্বরিক প্রেরণার ফসল। উনিশ শতকের রোমান্টিক কবিরা প্রেরণাকে ঐশ্বরিক বলতে নারাজ। রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’ এই প্রেরণারই অন্য নাম। জীবনানন্দের মতে: নিছক বুদ্ধির জোরে কবিতা লেখা সম্ভব নয়- আরো অনেক কিছুর প্রয়োজন- এবং সে সবের সম্মিলিত সম্বন্ধ-শৃঙ্খলের থেকেই প্রেরণার জন্ম হয়। এ প্রেরণা অবিশ্যি মহাত্মা গান্ধী কিংবা লিঙ্কনের মতন রাষ্ট্রকর্মীর প্রেরণার চেয়ে পৃথক জিনিস- কবি-মানসের আবেগ ও প্রজ্ঞার মিলন ঘটিয়ে মানুষের আবহমান অভিজ্ঞতাকে আরো ঠিক ভাবে বুঝবার সুযোগ দেয় এই প্রেরণা। [জীবনানন্দ দাশ: কবিতার কথা]
জীবনানন্দ দাশের মতো আল মাহমুদও মনে করেন : কল্পনাশক্তি জ্ঞানের ব্যাপকতার সংমিশ্রণের নামই হলো প্রেরণা। [সাক্ষাৎকার: চাড়ুলিয়া] তিনি প্রেরণায় বিশ্বাসী কবি; কাব্যসৃজনে প্রেরণাকে তিনি আত্মীকরণ করে নিয়েছেন শিল্পবোধ দিয়ে। প্রেরণার সঙ্গে অভিজ্ঞতা, শব্দবোধ, ছন্দ ও অলঙ্কার জ্ঞানের মিশ্রণে তাঁর হাত দিয়ে কবিতার জন্ম হয়। কবি একে ‘অলৌকিকের কাছাকাছি’ হিসেবে অভিহিত করেন।
রোমান্টিক ধারার কবি হলেও আল মাহমুদের কবিতায় ক্লাসিক কবিতার বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। ক্লাসিক ধারার কবিতার মধ্যে সংযত ও সংহত কল্পনা, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন দৃষ্টি, প্রশান্ত ও আত্মস্থ মনোভাব, ঐতিহ্যানুসরণ, আঙ্গিকের সংবদ্ধতা-দার্ঢ্যতা ইত্যাদি গুণাবলী লক্ষণীয়। আল মাহমুদের দৃষ্টিভঙ্গি, ভাবাবেগ বা চেতনার দিক থেকে রোমান্টিক এবং প্রকরণের বা কাব্যরীতির দিক থেকে ক্লাসিক। ছন্দ-মিলের বন্ধনের মাধ্যমে আঙ্গিকের ক্ষেত্রে তাঁর কবিতায় সংবদ্ধতা বর্তমান। ‘সোনালি কাবিন’ পর্যন্ত তাঁর কবিতায় পয়ার, মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত ছন্দের ব্যাপক প্রয়োগ হয়েছে। ফলে কবিতায় রূপবন্ধে দৃঢ়তা ও দার্ঢ্যতা এসেছে। ভাবাবেগ ছন্দ-মিলের কূল ছাপিয়ে ভেসে যেতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে তাঁর সনেটের কথা উল্লেখ করা যায়। তাঁর প্রতিটি কাব্যেই সনেটের গাঢ় বুননের বা রূপবন্ধনের চর্চা করেছেন। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ থেকে তিনি গদ্যকাব্যের চর্চা করলেও কখনোই ছন্দের বাঁধুনি ছেড়ে যাননি। ফলে আঙ্গিকের দার্ঢ্যতা সব সময় তাঁর কবিতায় থেকেছে।
ঐতিহ্যানুগত্য ক্লাসিক ধারার কবিতার অন্যতম গুণ। আল মাহমুদের কবিতায় ব্যাপকভাবে ঐতিহ্যানুসরণ করা হয়েছে। তাঁর কাব্যে ভারতীয় ও বাঙালি ঐতিহ্য, সেমেটিক ঐতিহ্য এবং লোকঐতিহ্য- এই তিন ধারার মিশ্রণ ঘটেছে। ঐতিহ্য রূপায়ণের প্রশ্নে তাঁর মাঝে অত্যন্ত সচেতনভাবে সৌন্দর্যতত্ত্বের (Asthatics) ধারণা কাজ করেছে। তিনি নিজেকে এই তিন ধারারই উত্তরাধিকারী ভেবেছেন।
এই যে ভারতীয় সৌন্দর্য ধারণা, আমরা যেটাকে বলি হিন্দু সৌন্দর্য তত্ত্ব, আমরা এর মধ্যে বাস করি, মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও এর মধ্যে বাস করি। আবার যেহেতু আমরা মুসলমান, আমাদের নিজস্ব ধর্মগত সৌন্দর্য ধারণা আমাদের আছে, এটাকেও আমরা কাজে লাগাই। আবার রক্তগতভাবে আমরা আদি বাঙালীদের উত্তরাধিকারী হওয়ায় তাদেরও একটি সৌন্দর্য তত্ত্ব ছিল হিন্দু সৌন্দর্য তত্ত্বের বিরুদ্ধে। যেমন মাছ, প্রকৃতি, নৌকা, নদী এগুলোর মধ্যে তারা একটা সৌন্দর্যের ধারণা দেখতে পেতো, যা হিন্দুরা পেতো না; যেমন হাজার বছরের কবিতায় বাংলা বা সংস্কৃত বা হিন্দি কবিতায় দেখা যাবে চাঁদের সাথে নারী মুখের উপমা দেয়া হয়েছে। আমার প্রেয়সীর মুখটা কেমন? কবিরা বলছেন, চাঁদের মতো। একজন আরব কবি যখন বলতো, আমার প্রেয়সীর মুখটা কেমন? তিনি বলেন, মরুভূমিতে লুকায়িত উট পাখীর ডিমের মতো। কত পার্থক্য! আবার আদি বাঙালীরা নদীর পাড়ে বসবাস করতো; নদী ভেঙে যাচ্ছে, চর পড়ছে, তারা বলতো, আমার প্রেয়সী চরের মতো। …আমরা আরো দুটো সৌন্দর্য ধারণ করে আছি। সবগুলো মিশ্রিত করে আমাদের সৌন্দর্য ধারণা।
[আল আহমুদ: কবির সৃজন বেদনা]
আধুনিক মানুষ যেমন বিচিত্রগামী, আধুনিক কবিতাও তেমনি বৈচিত্র্য-সন্ধানী। পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতা-সংস্কৃতি-সমাজ-ইতিহাসের প্রতি আধুনিক কবির তৃষ্ণা, আকর্ষণ ও প্রীতি থেকেই তাঁর কবিতার নানা ধারার সঙ্গম ঘটে। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ-জসীমউদদীনের কাব্যে এর দৃষ্টান্ত স্থাপিত। আল মাহমুদ পূর্বসূরী কবিদের সম্পদ আত্মস্থ করেই কবি হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, জসীমউদদীন, ফররুখ আহমদÑ এইসব কবির নানা প্রভাব নানাভাবে তাঁর কবিতায় বিন্যস্ত। এছাড়া জার্মান কবি মারিয়া রিলকে, স্প্যানিস কবি গার্সিয়া লোরকা এবং ফরাসি কবি শার্ল বদলেয়ারের প্রভাব বা ঋণ তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন। এক কথায়, পৃথিবীর নানা সভ্যতা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং নানা ভাষার কবিদের কাব্যধারার ঐতিহ্য তিনি নিজস্ব আঙ্গিকে গ্রহণ করেছেন এবং সমৃদ্ধ হয়েছেন। ফলে দেশজতা ও আন্তর্জাতিকতার একটা সমন্বয় ঘটেছে তাঁর কবিতায়। অর্জন করেছেন নিজস্ব কাব্যাদর্শ- অন্যের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকলেও আপন আলোয় ভাস্বর।