আল মাহমুদ চলে গেছেন- এটাই জাগতিক সত্য। তার চলে যাওয়ার ক্ষণ গণনা একটা কঠিন ব্যাপার। কারণ তিনি যে নেই আমাদের মাঝে এটা এখনো অনুভবের দরোজায় টোকা দিতে পারেনি। অন্তত আমার বেলায় এমনটা ঘটেছে। তবে হ্যাঁ, এ-ই অর্থে তিনিত নেই, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি-২০১৯-র পর আমরা আর সচল আল মাহমুদকে খুঁজে পাবো না। জীবিত আল মাহমুদ আমাদের সামনে কোন দিন দেখতে পাবো না। আল মাহমুদের নতুন কোন কবিতা, লেখা আমরা কাগজের পাতায় আর পাবো না।
আল মাহমুদ মানেই একজন সচল আল মাহমুদ – এমনটা পাবো না। কারণ, যতক্ষণ বেঁচে ছিলেন, শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে বেহুঁশ করতে পারেনি – ততক্ষণ তিনি ছিলেন লেখায় সচল- একেবারে মশগুল। দৃষ্টিশক্তি করেনি সহায়তা, হাত দেয়নি শক্তি কলম চালনার- মস্তিষ্ক শক্তি দিয়ে মুখে মুখে রচনা করেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, পত্রিকার জন্য কলাম অন্যের হাতে কলম ধরিয়ে দিয়ে। এ আল মাহমুদ অদ্ভুত এবং ব্যতিক্রম। তাঁর প্রাণশক্তি ছিল অমিত। ঘ্রানশক্তি ছিল তীব্র। আমরা সেই আল মাহমুদকে হয়তো পাবো না আর- এটাই চরম ও নির্মম সত্যি। এ সত্য যতো কঠিন হোক মেনে নিতে হবে।
‘‘ কখনো জানবোনা কেন জীবনের অবসান হল,
তোমার বন্ধুরা শুধু বেদনায় সহসা জাগলো
বিস্মিত চিন্তায় জানলো তুমি নেই, তুমি আর নেই-
তবুও তরঙ্গক্ষেত্রে নৌকা নিয়ে ছুটলো সবাই।’’
-উইলিয়াম মেরিডিথ।
কিন্তু এ সত্যের বিপরীতে আরেক বাস্তবতা হলো আল মাহমুদ ততোদিন বেঁচে থাকবেন, যতোদিন বাঙলা সাহিত্য ও ভাষার মানুষ পৃথিবীর বুকে বেঁচে বর্তে থাকবে। বাঙলা ভাষায় কথা বলেন পৃথিবীতে জন মনিষ্যির সংখ্যা কমত নয়- একুনে পঁচিশ কোটির বেশি। এ ছাড়া এ ভাষার একটা মানচিত্র আছে। স্বাধীন এবং সার্বভৈাম- বাংলাদেশ। আর রাজনৈতিক মানচিত্র বাদ দিলে ভাষার মানচিত্র কম বড়ো নয়। আফ্রিকা মহাদেশের দেশ সিযেরলিওনেও দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে। প্রায় এক কোটি কালো মানুষের দেশে যখন ভালবেসে গেয়ে উঠে ‘‘ আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী……’’ তখন এক কী অনুভূতি জাগে বুকে তা বোঝানো যাবে না।
আর সে কারণে আল মাহমুদের চলে যাওয়ায় শুধু মাত্র বাংলাদেশ মানচিত্র জুড়ে শোকের বেদনামন্থিত হাওয়া বয়ে যায়নি- ভারতের প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গেও আছড়ে পড়েছে। বলা হয়েছে- বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদ- এর প্রয়াণে আমরা শোকস্তব্ধ।
কবি মৃদুল দাশগুপ্ত বলেছেন-
‘‘ আমাদের কালের মহাকবি ছিলেন তিনি। তামাম বাংলা ভাষার কবি আল মাহমুদ প্রয়াত হলেন। ঝপ্ করে অন্ধকার নেমে এলো যেন মনে। বিশ^জগৎ মনে হলো অন্ধকার। সেই আঁধারে, নিকষ আঁধারে ডানার শব্দ শুনতে পেলাম, দেখলামও শে^ত পোশাকের দেবদূতেরা নেমে আসছেন, এই নাস্তিকেরও মনে হলো, ওই তো রামধনুর সাতটি রঙের পথ চলে গেছে শূন্যে, স্বর্গের বেহেস্তের পথ ধরে চলে যাচ্ছেন। ছোটোখাটো চেহারার, কিন্তু পর্বতের চেয়ে উঁচু, উচ্চশির ওই কবি। হিমালয়ের গিরিশৃঙ্গগুলি কি নূয়ে পড়ে তাকে বিদায় জানাচ্ছে না? জানাচ্ছে। রদন করছে না কি অরণ্যগুলি, সমগ্র সুন্দরবন? করছে, করছে। ধান খেতগুলিতে ঢেউ তুলে ঘুরছে ক্রন্দনরত বাতাসের দল।’’
-মাসুম খলিলী- কালের উচ্চশির কবি ( নয়াদিগন্ত)
‘আল মাহমুদ বিষেষ সংখ্যা’ প্রকাশ করেছে পশ্চিম বঙ্গের অন্যতম সাহিত্য পত্রিকা ‘মাসিক কৃত্তিবাস’। আর বাংলাদেশে একের পর এক প্রকাশ পাচ্ছে আল মাহমুদ স্মরণ সংখ্যা। দৈনিক পত্রিকাগুলো প্রকাশ করেছে ‘ক্রোড় পত্র’ আল মাহমুদকে স্মরণ করে। আমার জ্ঞাতসারে আল মাহমুদের মৃত্যু উপলক্ষ্যে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা সাময়িকীর বিষেষ সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছে পাঁচটি। খবর আছে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে স্মরণিকা প্রকাশের নানা উদ্যোগের। ঢাকায় ‘নাগরিক শোকসভা’ হয়েছে। আজকাল এসব কন্টেম্প্রয়ারি খবরা খবর তেমন রাখা হয় না বলে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নই। তবে আমার মত নগন্য আল মাহমুদ ভক্ত লেখকের দরবারে যখন আল মাহমুদকে নিয়ে রচনার তাগিদ একাধিক আসে, তাতে বেশ আন্দাজ করা যায় কিভাবে ঝড় উঠেছে কবিকেন্দ্রিক। এই ঝড়, কথামালা মাতামাতি চলতেই থাকবে।
আল মাহমুদকে নিয়ে যথাযথ লেখা সহজ কাজ নয়। তিনি এমন মাপের লেখক ছিলেন না চট করে গজ ফিতা টেনে মেপে ফেলা যায় দৈর্ঘ্য প্রস্থ। তাঁর বহুমুখী লেখা পাঠ করা এবঙ্ তার যথাযথ মূল্যায়ন করতে সময় লাগবে। এক্ষেত্রে সতর্কতাও একটা প্রয়োজনীয় আবেগ হওয়া উচিত। কারণ আল মাহমুদ শুধুমাত্র কবি ছিলেন না। শুধুমাত্র কবি হলে বলা যেতো- ত্রিশের দশকের পর চল্লিশের কবি ফররুখ আহমদ ( ১৯১৮ – ১৯৭৪) বাদে সবচেয়ে প্রনিধান কবি আল মাহমুদ। এ কথা বললে হয়তো এক শ্রেণির সাহিত্যবোদ্ধাদের আঁতে ঘা লাগতে পারে। কারণ আজকাল সাহিত্যেও ‘ঘরনা’ চালু করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষই নির্ধারক সাহিত্য এবং সাহিত্যিকের মূল্যমান। আমি এখানে সে ধরণের মূল্যায়নে প্রয়াস পাবো না। তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিশ্লেষণ অন্য কোন স্থানে করার বাসনা আপাতত তুলে রাখছি। তবে আশার কথা আল মাহমুদকে নিয়ে তরুণ প্রজন্ম একাডেমিক মূল্যায়নে লিপ্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ‘আল মাহমুদের কবিতাঃ বিষয় ও শিল্পরূপ’ শীর্ষক গবেষনা কর্মে ড: ফজলুল হক তুহিন উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেছেন। এটি সম্ভবত: কোন পূণার্ঙ্গ প্রথম গবেষণা সন্দর্ভ কবি আল মাহমুদের ওপর। এ ধারা অব্যাহত থাকার আশা রাখি। কারণ আল মাহমুদের সাহিত্য রস উদঘাটন ও বিতরণের জন্য আরো শতেক তুহিনের আত্মনিয়োগ করা প্রয়োজন। বাঙালী মুসলমান তরুণরা এ ক্ষেত্রে যতো বেশি মনোযোগী হবেন, ততো শিগ্গির আমাদের গ্লানিকর পরসাহিত্য – সাংস্কৃতি চর্চার মিথ্যা কুহক মোচন ঘটবে।
বলে রাখা ভালো। আমার বক্ষ্যমান নিবন্ধে আল মাহমুদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের (৪২ বছর) সামান্য ছিঁটে ফোঁটা আলোকপাত করার প্রয়াস পাবো। আল মাহমুদের ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’য় হতে পারে এসব স্মৃতিভ্রষ্ট শুষ্ক পুষ্পগুলো কোন কালের স্বাক্ষী-সাবুদ।
১৯৭৪ সালের মার্চে আল মাহমুদ তৎকালীন একটি র‌্যাডিকাল দলের মুখপত্র ‘দৈনিক গনকন্ঠ’ পত্রিকার সম্পাদক হওয়ার কারণে জেলে যান। এ ব্যাপারে আল মাহমুদের সরল উচ্চারণ- ‘মঞ্জু মিয়া, আমিও নিজেকে তাই ভাবতাম। কর্মজীবনের শুরু থেকে সাংবাদিকতাই করেছি। একজন সাংবাদিকের সম্পাদক হওয়ার আকাক্ষা থাকে। যে কোনো পেশায় প্রত্যেকের স্বপ্ন থাকে শীর্ষ পদটিতে যাওয়ার। কিন্তু সে আকাক্ষা পূরণ হওয়া খুব সহজ নয়। আমি সেই পদ অলঙ্কৃত করার সুযোগ পেয়েছি।’
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু- স্মৃতিতে অমলিন কবি আল মাহমুদ
( অন্য এক দিগন্ত, মার্চ ২০১৯)
পুরো দশমাস তিনি জেলে থাকতে বাধ্য হন। তাঁর গ্রেফতারে সে সময় সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া পড়ল। দেয়ালে দেয়ালে লাল অক্ষরে ভরে গেল- ‘ কবি আল মাহমুদের মুক্তি চাই; গণকন্ঠ সম্পাদকের মুক্তি চাই।’
আমি নিজেও ছিলাম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা অতৃপ্ত তরুণ। তৎকলীন সরকারের লোকজনের জুলুম-অত্যাচার, একদলীয় শাসনের বল্গাহীন আধিপত্য, বিহীরীদের সম্পদ লুটপাটের মচ্ছপ, নারী ধর্ষণের ঘটনার ভয়বহতা, দেশের সম্পদ পাচার হয়ে যাওয়া এন্তার বিষয়-আশয় আমাকেও দেশের অগণিত বিরোধীকারীদের সঙ্গে সামিল করে নিলো।
তাই, দেয়ালে দেয়ালে ‘আল মাহমুদের মুক্তি চাই’ লিখনের লাল আঁচড়ে আমার হাত কোথাও কোথাও অনুভূতি ছড়িয়েছিল। তখন কবি হিসাবে ততোটা অনুভব করে নয়, একজন বিপ্লবী সম্পাদক হিসেবেই আল মাহমুদকে শ্রদ্ধা ভালবাসায় বুকে ধারণ করে।
উল্লেখ্য, সে বৈরী সময়ে ‘গণকন্ঠ’, ‘হক কথা’, ‘জনকথা’, ‘মুখপত্র’, ‘আমাদের কথা’ ইত্যাদি সরকার বিরোধী পত্রিকাগুলো ছিল আমার অবশ্য পাঠ্য। ‘গণকন্ঠ’ তৎকালীন সরকারের নানা নির্যাতনের (বিশেষ করে রক্ষী বাহিনীর) খবর পরিবেশন করতো। তাই, পত্রিকা এবং সম্পাদক আমার প্রিয় হয়ে উঠলো। সেই প্রিয় সম্পাদক আবার একজন বড়ো কবিও। তাই তাঁর প্রতি মুগ্ধতা ছিল জোরালো। তবে আল মাহমুদের জেলে যাওয়ার ঘটনা তাঁকে যেভাবে রাতারাতি বিখ্যাত করলো, তেমনি তৎকালীন সরকারের নিপীড়নের বিষয়টি জনসমক্ষে বিশাল রূপ ধারণ করলো। শেষ পর্যন্ত তৎকালীন রাষ্ট্র প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিষয়টি অনুধাবন করতে পারলেন। তিনি আল মাহমুদকে জেল থেকে মুক্তির নির্দেশ দেওয়া ছাড়া শিল্পকলা একাডেমীতে সহকারী পরিচালক পদে (১৯৭৫ সালে) চাকুরি দিলেন। এ ব্যাপারে কবি আল মাহমুদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল কেন তিনি একটা পত্রিকার সম্পাদক পদের ব্যক্তি হওয়া থেকে এতোটা ছোট চাকুরিতে যোগ দিয়েছিলেন। আল মাহমুদের সরল উক্তি – ‘‘কিন্তু পরিবারকে অসহায় অবস্থার মধ্যে ফেলে যদি কারাগারে কাটাতে হয়, কারাগার থেকে বের হয়ে যদি তুমি দেখতে পাও, যে চাকরিটি করতে তা আর নেই। কী করবে তুমি?’’
এ প্রশ্ন রেখেছিলেন আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু কবির কাছে। তিনি মূল্যায়ন করেছেন এভাবে- ‘‘তাঁর কথাই হয়তো সত্যি। তবুও আমার মেনে নিতে কষ্ট হয়েছিল। যাই হোক, পরবর্তীতে আমার সেই মুগ্নতা তাঁর প্রতি ভক্তিতে পরিণত হয়। ’’
(স্মৃতিতে অমলিন কবি আল মাহমুদ)
সেই চাকুরির সুবাদে কবি আল মাহমুদ ১৯৭৬ সালের এপ্রিল মাসে সিলেট সফরে এলেন। আল মাহমুদ সিলেট পদার্পণ করেছেন এ খবর বাতাসে চাউর হতে বেশি দেরী হলো না। আম্বরখানা চৌরাস্তা হতে শহরের শেষপ্রান্ত মূরারী চাঁদ সরকারি কলেজ চৌারাস্তা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। একেত এতো বড় কবি, উপন্ত জেল নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রথম সিলেট আগমন- নানা শ্রেণির মানুষের মধ্যে সারা ফেলে। প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও আল মাহমুদকে রাজী হতে হলো সিলেট পৌরসভার পাবলিক লাইব্রেরীর লনে এক কবি সমাবেশে উপস্থিত হতে।
সেদিন ছিল ১৯৭৬-র ১২ এপ্রিল (সোমবার)। বৈশাখের আগমনী বেশ টের পাওয়া যাচ্ছিল। সামনেই ¯্রােতস্বী সুরমা নদী বয়ে চলেছে। নদীর বুক ছুঁয়ে উঠে আসছে উথাল পাথাল বাতাস। সুরমার পার ঘেঁষে পীচঢালা কালো রাস্তা। সেই রাস্তার পাশেই পৌর-লাইব্রেরি। এর আগে রয়েছে সারদাসুন্দরী স্মৃতি মিলনায়তন। লাইব্রেরীর সামনে এক বিশাল উদ্যান। নানা রঙের ফুল গাছে সাজানো উদ্যানটি।
চমৎকার একটা পরিবেশে খদ্দরের কাপড়ের পাঞ্জাবী আর ঢিলে ঢালা সাদা পাজামা, চোখে কালো রঙের চশমা জননন্দিত কবি আল মাহমুদ বসে। তাঁকে ঘিরে আছেন নবীন-প্রবীন একঝাঁক কবি লেখক সম্পাদক রাজনৈতিক কর্মী প্রমুখ। মূলতঃ উপস্থিত কবিদের ‘স্বরচিত কবিতা পাঠ’ এই জমায়েতের উদ্দেশ্য। একে একে ডায়াসে এসে কবিগণ নিজের কবিতাটি পাঠ করে গেলেন। করতালি পড়ছিল শিলা বৃষ্টির মত। কবিদের সংখ্যাও কম নয় । কবিতা পাঠ যেন ফুরোতে চায় না। লম্বা রেলগাড়ির মত চলেছেই। আমিবা এ সুযোগ হাতছাড়া করি কেন। আল মাহমুদকে চোখে দেখাই ভাগ্য, তারপর কবিতা পাঠের মহার্ঘ ক্ষণ উপস্থিত। আমিও গুটিসুটি পায়ে ডায়াসে এসে একটা কবিতা পাঠ করলাম। আবৃত্তির গুণ ছিলই। তবু খানিকটা কাঁপাকাপিতে খুব যে ভাল পাঠ করেছি তা নয়।
বলে রাখা ভাল, আমি তখন সিলেট সরকারি কলেজের (এম.সি কলেজ) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে প্রথম বর্ষের (সম্মান) ছাত্র। স্থানীয় পত্র-পত্রিকা-সাময়িকীতে কেবল বিচরণ করতে শুরু করেছি। উঠতি লেখক, সাহিত্যকর্মী বলতে যা বোঝায়। এর আগে রাজনৈতিক কারণে আমার শৈশবের লেখা অভ্যাসে খানিকটা ছেদ পড়ে। আমি অবশ্য শুরুটায় ছোট গল্প লেখায় আত্মনিয়োগ করেছিলাম। আল মাহমুদের কবিতা জমায়েতে কবিতা পাঠের আগে ( ৯ এপ্রিল,১৯৭৬) স্থানীয় সাহিত্য সংগঠন ‘লেখক সংঘ’ এর সাহিত্যসভায় একটি কবিতা পাঠ করেছিলাম। ষাটের দশকের অন্যতম কবি আমার কলেজের বাংলার অধ্যাপক আফজাল চৌধুরী পঠিত ওই কবিতার প্রশংসা করেছিলেন। আল মাহমুদের সমুখে কবিতা পাঠের সাহস ওই প্রশংসা বাক্যই যুগিয়েছিল নিঃসন্দেহে। কবিতাটির নাম – ভালোবাসা আমার কী! কবিতাটি উদ্বৃত করছি। কারণটা পরে লিখছি।
রক্তশূন্যতায় ভোগছ আজ কতকাল জানি না
অথচ তোমার শয্যা নেবার আগে
ঘুণাক্ষরে তোমার রক্তশূন্যতা চোখে পড়েনি কেন!
তোমার শাদাটে চোখে দৃষ্টি রেখে
কতবার নীড়ের স্বপ্ন দেখিছি,
কতবার তোমার শীতল হাতে হাত রেখে
শপথ করেছি ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে-
কতবার আমি তোমার ফ্যাকাশে ঠোঁটে
উত্তাপের আশায় চুমো এঁকেছি’
কতবার তোমার দেহের মাধবী গন্ধ
আমায় পাগল করেছে,
এগিয়ে এসেছি এতো দূর তোমার হাত ধরে।
চলার শক্তিটুকু থাকাকালীন তোমার রক্তশূন্যতা
চোখে পড়েনি কেন?
তাহলে কি আমার ভালবাসা তোমার
রক্ত চোষে খেয়েছে?

হয়তো তাই, হয়তো তাই করেছি।

কিন্তু আজ যে তোমার জীবন্মৃত দেহ অসহ্য
আমি তাই তোমার প্রেক্ষিত সুচিকিৎসা চাই।
অনুষ্ঠানে সকল কবিগণের কবিতা পাঠ এবং আল মাহমুদকে নিবেদিত কথামালা গাঁথার পর এলো প্রধান অতিথির পালা। আল মাহমুদকে অনুরোধ করা হলো তিনি যেন তাঁর বক্তৃতার একপাশে পঠিত কবিতার ওপর মন্তব্য রাখেন। আল মাহমুদ উঠেই বিনয়ের সঙ্গে জানালেন- আমি কবিতা লিখলেও কবিতা কম বুঝি। আর কবিতার ওপর মুন্সিয়ানা করা একদম পছন্দ করি না। ওটা সাহিত্য সমালোচকদের কাজ। আপনারা যখন এ ব্যাপারে এতোটা চাপাচাপি করছেন সেক্ষেত্রে বলতে পারি কোন কবিতা আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে, হৃদয় স্পর্শ করেছে। টেবিলের ওপর রাখা একরাশ কবিতা ভীড়ের মধ্য থেকে তিনি আমার কবিতাটা হাতে নিয়ে বললেন, এটি আমার ভাল লেগেছে। কেন ভাল লেগেছে তাও বলছি, এ কবিতায় প্রেম আছে। ভালবাসার কথা আছে। ভালবাসা যে অন্ধ হতে পারে সেই কথা আছে এ কবিতায়। আপনাদের অধিকাংশের কবিতা বড় বেশি গুরু-গম্ভীর – সীরিয়াস। আমার সামনে উপবিষ্ট কবিরা তরুণই বেশি। তরুণদের কবিতায় প্রেম থাকবে না? ভালবাসার কথা থাকবে না, তা হয় না।
সেদিনের ঘটনা আমাকে দারুণভাবে দাগ কেটে গেল হৃদয়ে। আমার কাব্যচর্চায় উৎসাহ গেল বেড়ে। আমি গল্প লেখা পাশে তুলে রেখে কবিতায় মশগুল হলাম। সেই আল মাহমুদই একবার এক সাহিত্যসভায় বললেন কবিরাই গদ্যে ফুল ফোটাতে পারেন। কবিদের হাতেই গদ্য মুক্তি পেতে পারে। কবিদের উচিত গদ্য চর্চায় নেমে পড়া। কেননা কবিরা ভাল গদ্য লিখতে পারেন। ভাবলাম কথাটা আল মাহমুদের ক্ষেত্রে সত্যি হলেও আমার জন্য বিপথগামিতা হবে না তো? কিন্তু গরজ বড় বালাই, গদ্যের বড় প্রয়োজন এমন দাবির মুখে আবার ফিরে এলাম গদ্যের বিস্তীর্ণ মাঠে। পাশাপাশি কবিতাও থাকল। ছুটি জানাইনি কাব্যপ্রিয়াকে।
আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করছি। আল মাহমুদ সিলেট এসেছেন। কে নেবেন তাঁর আতিথ্যের মহার্ঘ সুযোগ? জবাব আসতে পারে, কে নেবেন না এ সুযোগ? অনেকেই আগ্রহী কবিকে তার বাসায় নিয়ে যত্ম আত্তি করে ধন্য হতে। কিন্তু না, কবি আল মাহমুদ স্বেচ্ছায় কবি আফজাল চৌধুরীর বাসায় উঠলেন। রায়নগর সোনার পাড়ায় ফরহাদ খাঁ পুলের নিকটবর্তী টিন শেডের (পাক ভিলা) এক সাধারন গৃহস্থ কবি আফজাল চৌধুরীর বাসা হল তাঁর পছন্দ। চারদিকে গাছে ঘেরা বাড়ি। সুপারি তাল কড়ইগাছ ঢেকে রেখেছে বাড়ির আঙিনা। খবরটা জানাজানি হতেও বেশি সময় লাগল না। কিন্তু আমার জানা ছিল না। যদিও আমার বাসা থেকে আফজাল চৌধুরীর বাসার দূরত্ব মাইল খানেক কি আরও কম। অভ্যাসবশত সেদিন বিকালে আফজাল চৌধুরীর বাসায় উঠলাম। দেখি বৈঠকখানায় কবি আল মাহমুদ বসে। কোথাও যাবেন এমন প্রস্তুত হয়ে আছেন। আল মাহমুদ এখানে আতিথ্য গ্রহণ করবেন তা আমার ভাবনার মধ্যেই ছিল না। আর আমার জানার কথাও না। আমার সঙ্গে আফজাল চৌধুরীর সখ্য তখনো গড়ে উঠেনি। আমি তেমন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মীও নই তখন। অবাক হলাম এ কারণে কবি আল মাহমুদ ছিলেন ‘গণকন্ঠ’ সম্পাদক তাঁর র‌্যাডিক্যাল দলের অনেক নেতা-কর্মী সাহিত্যিকগণের যে কারু বাসায় উঠা ছিল স্বাভাবিক ও সঙ্গত। কিন্তু তাদের বাসায় না উঠে তিনি আফজাল চৌধুরীর বাসায় উঠলেন। পরে জানতে পেরেছি টানাটানি কম হয়নি। তিনি ঢাকা থেকেই মনস্থির করে এসেছেন আফজাল চৌধুরীর বাসায় উঠবেন। আরো পরে জেনেছি ঢাকার দু’একজন বন্ধু (তার মধ্যে ইত্তেফাক সাংবাদিক আখতার উল আলম আছেন) কবিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি যেন আফজাল চৌধুরীর বাসায় উঠেন।
আমাকে দেখে আল মাহমুদ চিনতে ভুল করলেন না। স্নেহ কন্ঠে ডাকলেন – এসো, এসো কবি এসো। আল মাহমুদের মুখে ‘কবি’ সম্বোধন শুনে লজ্জা লাগছিল। কিন্তু কি আর করা আপত্তি করার মত দুঃসাহস নেই। এমন সময় ভেতর হতে আফজাল চৌধুরী এলেন। ভরাট কন্ঠে বললেন- সুলেমান, আপনি এসেছেন। খুব ভালো করেছেন। আমরা একটু পরই কবি সাহেবকে নিয়ে দরগাহ যাবো। জিয়ারত করতে, হযরত শাহজালালের মাজার। আপনিও যেতে পারেন।
উল্লেখ্য, আফজাল চৌধুরী আমার কলেজের সম্মানিত শিক্ষক।
আমি —চলুন বাসায় যাই।আমরা যথারীতি দু’টো রিক্সা যোগে বাসায় ফিরে এলাম। বাসায় এসে দেখলাম বেশ কযেকজন কবি-সাহিত্যিক এসেছেন কবির সাক্ষাতের উদ্দেশে। এদের সঙ্গে হাত মেলালেন কবি। লক্ষ্য করলাম কবির চোখেমুখে একটা ক্লান্তির ছাপ। আফজাল চৌধুরীর বাসা ছিল এমন মেহমান এলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেতর ঘর হতে চা-বিস্কিট এসে হাজির হতো। এই আপ্যায়নের উদার হাতটি আফজাল চৌধুরীর সুযোগ্য স্ত্রীর (দিলারা)। আমাদের মাতৃসম সম্মানিতা ভাবীসাহেব। মেহমানদারির এমন উদার ও সহনশীল চারিত্র্য আর কোন মহিলার মাঝে আমি দেখিনি। আজও ঢাকা থেকে কোন কবি – সাহিত্যিক সিলেট গেলে ভাবী সাহেবের আমন্ত্রন না পাওয়ার ঘটনা কমই ঘটে। আমরা তাঁকে চিরদিনের আপনজন হিসাবে জানি, তিনিও আমাদের ছোট ভাই হিসাবে স্নেহাসিক্ত করেন।
চা-বিস্কিট পর্ব শেষ করে আফজাল চৌধুরী কবিকে উদ্দেশ্য করে বললেন- কবি সাহেব, বলুন আপনি দরগাহে গিয়ে কি দেখতে পেলেন?
আল মাহমুদ মাঝামাঝি একটা সোফায় বসে আছেন। দরগাহ জিয়ারতের সময় সাদারঙের উঁচুলো যে টুপিটি পরেছিলেন তা তখনো তার মাথায় শোভা পাচ্ছিল। নড়েচড়ে বসলেন। সবার দিকে একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে বললেন- চৌধুরী সাহেব, সবকথা কি সবার সামনে বলা যায়? পরে বলব, আপনাকে।
তখনকার মত রহস্যটা চাপা দিলেন। আমার মন তড়পাচ্ছে। কি দেখতে পেয়েছেন তিনি দরগাহ জিয়ারত করতে গিয়ে। সময় গড়িয়ে গেল বেশ খানিকটা। অভ্যাগতরা একে একে বিদায় নিলেন। ভেতর ঘর হতে রাতের খাবার টেবিলে দেয়া হয়েছে এমন খবর এলো। আছে এশার নামাজ। কোনটা আগে হবে তা জানতে চাইলেন আফজাল চৌধুরী। কবি বললেন, খাবারটা যখন টেবিলে দেয়া হয়ে গেছে খাওয়া আগে হোক। তাছাড়া আমরা খেয়ে নিলে ভাবীসাব দায়িত্বমুক্ত হতে পারবেন।
আফজাল স্যার আমাকে রাতে খেয়ে যেতে আগেই দাওয়াত দিয়ে রেখেছেন। তাই, আমার আর যাওয়া হয়নি।
খাবার টেবিলে বসে শুরুতে আফজাল চৌধুরী আবার হেসে বললেন- মাহমুদ ভাই, আপনার মুখ থেকে সেই অভিজ্ঞতার বয়ান শুনতে তড় সইছে না, এবার বলে ফেলুন!
আল মাহমুদ হেসে বললেন- আমারও তড় সইছে না চৌধুরী সাহেব- কিন্তু এসব কথাত সবার সামনে বলা মুস্কিল, বিশ^াসই করতে চাইবে না। আবার অপপ্রচার চালাবে- বলবে আল মাহমুদ মৌলবাদী হয়ে গেছে।
সে এমনিতেই বলবে, নামাজ পড়ছেন, মাথায় টুপিও রাখছেন তবে ঠিক বলেছেন মাহমুদ ভাই সবার সামনে সব কথা না বলাই উচিত। আফজাল চৌধুরী বললেন।
আল মাহমুদ ভাই প্রথম লোক্মা নেয়ার আগেই বলতে শুরু করলেন। তাঁর চেহারায় খানিকটা রঙ বদল ঘটল যেন। তিনি যেন খুব উৎফুল্ল মনে মনে। তিনি যা বললেন তার সার কথা হলো- দরবেশ হযরত শাহজালাল (র:) তাঁকে দেখা দিয়েছেন। জিয়ারত শেষে মূল মাজার কেন্দ্র হতে ফিরে আসার সময় তিনি পুরাতন মসজিদের গম্বুজের দিকে তাকিয়ে দেখেন সামরিক পোশাক পরিহিত মাথায় যোদ্ধার সিরস্ত্রান (তুর্কী সৈন্যের মত) একজন হাতে তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মাহমুদ ভাই বললেন দেখে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। আমার তাৎক্ষণিকভাবে মনে হলো ইনিই হযরত শাহজালাল (র:)।
আফজাল চৌধুরী স্বাভাবসুলভ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বললেন- কাম হো গিয়া কবি সাহেব, আপনি মুল্কে বাঙালার শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক পুরুষের নজর লাভ করেছেন্ আর কি চাই, বহুত সৌভাগ্য আপনার। আমিত কতোদিন ধরে মাজারে যাচ্ছি আমাকেত তিনি আজতক সাক্ষাৎ দিলেন না।
আল মাহমুদ মৃদু কন্ঠে বললেন- চৌধুরী সাহেব, এ বিষয় নিয়ে অন্য কোথাও কথা বলা উচিত হবে না। হয়তো আমার মনে আবেগ অনুভূতি এমন প্রবল হয়ে উঠেছিল, সে কারণে চোখে এমনটা দেখেছি- ব্যাপারটা সম্পূর্ণ কল্পনাও হতে পারে।
ঘটনাটি এ জন্য এতোদিন পর বর্ননা করলাম বলা হয়ে থাকে, আল মাহমুদের জেল জীবনে তাঁর চিন্তার বিশ^াসের পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ তিনি এক কালে মার্ক্সবাদী চিন্তা বা প্রলেতারিয়েতের শাসনব্যবস্থা কায়েমের স্বপ্নে বিভোর আল মাহমুদ থেকে ইসলামী সাম্যবাদী সমাজ কায়েমের বিশ^াসে দীক্ষিত হলেন এটা নিশ্চয়ই এমনি এমনি ঘটেনি। আর এ বিষয়টি নিয়ে তেমন গবেষণা কেউ করেনি। করা উচিত। এ ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব কিছু বক্তব্য আছে, আমরা সেদিকে যাবো।

উদ্ধৃতি-১.
‘‘এক সময় আমি সমাজতন্ত্র দ্বারা অনুপ্রানিত ছিলাম সত্যি, তবে ‘কাঠ নাস্তিক’ যাকে বলে, তা কখনোই ছিলাম না। গণকন্ঠ সম্পাদনার কারনে যখন জেলে যাই, তখন একটা ‘কম্পারেটিভ স্টাডির’ সুযোগ পাই। সব জেনে বুঝে সজ্ঞানে আমি ইসলামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি। আমি নিজেকে একজন বিশ^াসী মুসলমান মনে করি। এটা নিয়ে আমার কোনো রাখঢাক নেই। পরিষ্কার কথা, মানুষ হিসেবে আমার হয়তো হাজারো ভুল আছে, কিন্তু কুরআনই আমার সংবিধান। রাসূল (সা:) আমার পথ প্রদর্শক। এই বিশ^াসের কারণে আমাকে গালমন্দ সহ্য করতে হয়েছে। আমি আনন্দিত আমার বিশ^াসের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে পেরে। আমার ধর্ম বিশ^াসের সাথে কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই। হতে পারে আমার এই বিশ^াসকে কেউ কাজে লাগাতে চেয়েছে।
(আমি, আমার সময় এবং আমার কবিতা)
উদ্ধৃতি-২.
‘‘ এই যে চেতনায় আমি আমাকে ‘আমি’ বলি, আমি মনে করি এই চেতনা থেকে আমি কখনো লুপ্ত হবো না। এটা থাকবে আমার ভেতর। তার আধার পরিবর্তিত হবে কিন্তু এ ব্যাপারে আমার নিশ্চিত বিশ^াস আছে যাকে ঈমান বলা হয়, যে আমার একটা পরকাল আছে। সে কালের মধ্যে আমি প্রবেশ করবো। সে কাল সম্পর্কে ধর্ম গ্রন্থাদিতে নবীগণ ও রাসূল (সা:) বলেছেন। তার উপর দৃঢ় আস্থা রেখেই আমি এতোদিন চলে এসেছি। আমি মনে করি যে সেদিকেই এখন আমার যাত্রা।
(আমি, আমার সময় এবং আমার কবিতা)
উদ্ধৃতি-৩.
‘‘ আমার মনে আদিম মানুষের মতো অতিশয় প্রাথমিক এক দার্শনিক জিজ্ঞাসা জাগে – কে তুমি আয়োজক? তুমিও কবি? না, কবিরও নির্মাতা? তবে তুমি যে অনিশেষ সুন্দর আমি তা সাক্ষ্য দিচ্ছি। আমার সাক্ষ্য গ্রহণ করো প্রভু।
এভাবেই আমি ধর্মে এবং ধর্মের সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ বীজমন্ত্র পবিত্র কুরআনে এসে উপনীত হয়েছি। একবার জেলখানায় খুব ভোরে সেলের তালা খুলে দেয়া মাত্রই বাইরে এসে দেখি আমার বারান্দার সামনে সিঁড়ির দু’পাশে দু’টি বেশ বড় ডালিয়া ফুল ফুটে আছে। একটি গাঢ় লাল। অন্যটি প্রগার হলুদ। উদ্ভিদ বিজ্ঞান সম্বন্ধে আমার যৎসামান্য ধারণা থাকায় আমি একেবারে অভিভূত হয়ে যাই। আমার কেন জানি মনে হলো নির্বোধ প্রকৃতির সাধ্যের সীমানা থেকে অনেক দূরের কোনো অসামান্য ইঙ্গিত ছাড়া এমন অর্ন্তভেদী প্রস্ফুটন এ অসম্ভব ব্যাপার।’’
(আমি ও আমার কবিতা)
উদ্ধুতি-৪.
হে আল্লাহ,
হে সমস্ত উদয়দিগন্ত ও অস্তাচলগামী আলোকরশ্মির মালিক আজকের এ পবিত্র মহাযামিনীর সব রকম বরকত আমাকে দাও। আমাকে দাও সেই উত্তেজক মুহূর্তের স¦র্গীয় পুলক যাতে একটি সামান্য গুহার প্রস্তরীভূত শিলাসহ কেঁপে উঠেছিলে মহানবী মোহাম্মদ সা: