গ্রীকরা গীতিকবিতাকে তৃতীয় শ্রেণীর কবিতা বিবেচনা করতো। তাদের সামগ্রিক কাব্যকর্মের এক তৃতীয়াংশেরও কম গীতিকবিতা। তারা ভাবতো, কবিতার প্রধান কাজ গল্প বলা- মানবজাতিকে একটি অখণ্ড গতির মধ্যে দেখা।
-মার্ক ভ্যান ডরেন

সুবোধ সরকার উৎকৃষ্ট কবিতা কী বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, যে কবিতা একবার পড়লে বিদ্যুচ্চমকের মতো ভালো লেগে যায় এবং অতঃপর বাকি জীবন বারবার ফিরে যেতে হয় সেই কবিতার কাছে, সেটিই হলো উৎকৃষ্ট কবিতা। এরকম কবিতার সংখ্যা একজন শক্তিশালী কবিরও অজস্র থাকে না। রবীন্দ্রনাথেরও নেই। জীবনানন্দের কাছেও আমাদের বারবার ফিরে যাওয়া লাগে তাঁর কিছু উৎকৃষ্ট কবিতার কারণে। আল মাহমুদেরও উৎকৃষ্ট কবিতার সংখ্যা অজস্র না, কিন্তু এ রকম কিছু কবিতা তাঁর আছে যাকে উৎকৃষ্টতর শ্রেণীতে ফেলা চলে এবং যার আবেদন কখনও ফুরিয়ে যাবে না। সোনালি কাবিন এর চৌদ্দটি সনেট এদিক দিয়ে অনন্য, সন্দেহ নেই। প্রতিটি সনেটের নিখুঁত বুনন, আঁটসাঁট গাঁথুনি, আবেগের ঝটিকাবেগ ও টানটান সংযম, কল্পনার অভিনবত্ব, সবকিছু মিলে শৈল্পিক দিক দিয়ে কবিতাগুলো প্রায় শতভাগ সফল। কিন্তু তারপরও সত্যি বলতে কি, আল মাহমুদের এ সনেটগুলো আমাকে ততটা বিস্মিত করে না যতটা না অবাক করে দেয় তার মিথ্যাবাদী রাখাল কাব্যগ্রন্থের ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ কবিতাটি। এই কবিতাটি নানা কারণে শুধু আল মাহমুদের নয়, বাংলা ভাষার জন্যও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বলা চলে ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’-এর আগে আল মাহমুদের দেশদর্শন, নারীদর্শন, ‘আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বন্টন নীতি’ প্রভৃতিই বাংলা কবিতার পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল । এ ধরনের গুণাবলি একজন কবিকে সাময়িকভাবে জনপ্রিয় করে রাখে বটে কিন্তু এর প্রভাব সুদুরপ্রসারী হয় না; সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে এর আবেদনও হ্রাস পেতে থাকে। সময়ের কষ্টিপাথরে একজন কবি টিকে যায় যে গুণটির কারণে, যে বৈশিষ্ট্যের কারণে একটি জাতি তাকে মাথায় তুলে নিয়ে নাচতে থাকে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ও তাকে নিজেদের লোক বলে ভাবতে থাকে, তা হলো তার প্রফেটিক কোয়ালিটি। এটা বোঝা যায় কারো কারো ফোরসিয়িং ক্ষমতা দেখে, কারো মুনী-ঋষী দরবেশের মতো উচ্চারণ দেখে। মানুষ চাঁদে যাওয়ার প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেই নজরুল লিখেছিলেন ‘শুনবো আমি ঈঙ্গিত কোন্ মঙ্গল হতে আসছে উড়ে’; এটা কাকতালীয় মনে হলেও এর বাস্তবতা দেখে অবাক হতে হয় বৈ কি! শেক্সপিয়ার যখন জীবন সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন : ”It is a tale told by an idiot signifyiny nothing’ কিংবা যখন ইয়েটস বার্ধক্যের উপমা দিতে গিয়ে বলেন: ”An aged man is but a paltry thing,/A tattered coat upon a stick’ কিংবা যখন মীর তকী মীর এভাবে উচ্চারণ করেন: ‘দিল রহ নগর নহী কেহ ফির আবাদ হো সকে’ অর্থাৎ হৃদয় এমন নগর নয়, যাকে ভেঙে আবার গড়া যায়’; তখন আমরা টের পাই এটা কোনো সাধারণ মানুষের কন্ঠ নয়, ঘুণ ধরা বাঁশের মতো তা ভঙ্গুরও নয় এর স্থায়িত্ব সিজনড উডের মতোই।

আল মাহমুদকে আমার সত্যিকার শক্তিশালী কবি মনে হয়েছিল তাঁর ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ কবিতাটি রচিত হওয়ার পর। সত্য যে, বাংলা ভাষায় আল মাহমুদের অবস্থান অনেক আগেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল সোনালি কাবিনে-র মাধ্যমে। তার ছন্দনৈপুণ্য, অন্ত্যমিল সমৃদ্ধি, উপমা উৎপ্রেক্ষা-অনুপ্রাস ও চিত্রকল্পের অসাধারণ ব্যবহার বাংলা সাহিত্যে তাঁর আসনকে এমনিতেই পাকাপোক্ত করে দিয়েছিল । তারপরও এমন একজন গুণবান কবির কী যেন নেই কী যেন নেই এরকম আমার মনে হতো সব সময়। ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ সেই অভাববোধকে যেমন লাঘব করেছে তেমনি কবির তকমায় বাড়িয়ে দিয়েছে আরেকটি তিলক। হাজার বছরের প্রচলিত মিথকে ভেঙে ফেলার ক্ষমতা যিনি রাখেন তিনি নতুন মিথেরও জন্মদাতা বটে।

আল মাহমুদ যখন বলেন:

মাঝে মাঝে ভাবি, ছেলেটি কেন এমন ‘বাঘ বাঘ’ বলে চেঁচাতো?
আমরা ভয়ে বিহ্বলতায় চারদিকে ছুটে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে
বলতাম শুয়োরের বাচ্চা। সে বোকার মতো হাসতো। বিব্রত,
অপদস্থ। তারপর আমরা প্রতিজ্ঞা করলাম,
মথ্যাবাদীর ডাকে আমরা আর সাড়া দেব না।
আমরা কেউ তার শেষ ডাকে সাড়া দেইনি যেদিন
সত্যি এসেছিলো বাঘ। মৃত্যুর নখে ছিন্নভিন্ন হলো সেই ডাক।
সেই কাতর অনুনয় এখনো আমার মনে লেগে আছে।
আজ ভাবি, ছেলেটার কি তবে আগাম মৃত্যুর গন্ধ টের
পাওয়ার কোনো অস্বাভাবিক ইন্দ্রিয় ছিলো ? যার দুর্গন্ধে
শত তিরস্কার উপেক্ষা করে সে চিৎকার করে উঠতো
বাঘ বাঘ বলে, ঠিক কবির মতো?
আহ, আবার যদি ফিরে আসত সেই মিথ্যাবাদী ছেলেটা
জনমত ও তিরস্কারের পাশে দাঁড়িয়ে প্রান্তরের চারণের মতো
বলে উঠতো, ‘মুত্যু এসেছে, হে গ্রামবাসী-
হুঁশিয়ার’।

তখন কি আমাদের মনে হয় না পাঠ্যপুস্তকে ছেলেমেয়েদের শেখানো মিথ্যাবাদী রাখালের কাহিনীটা ভুলই শিখিয়েছি এতদিন? ছেলেটা যদি মিথ্যাবাদী হবেই তবে বাঘ কেন এসেছিল শেষ পর্যন্ত? এটা এক ভয়ঙ্কর আবিষ্কার। এভাবে ঈশপের কাহিনীকে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিয়ে নতুন করে কাহিনী গড়ার দুঃসাহসী অভিযানে নামেন আল মাহমুদ, যে অভিযানে তিনি সফলও হয়েছেন বলা যায়। প্রচলিত প্রতীকী গল্পটিকে ভেঙেচুরে ফেলে আরো বেশি প্রতীকী করে তুললেন তিনি। আপাতদৃষ্টিতে যেসব মহামনীষী সমাজে মিথ্যাবাদী বলে বিবেচিত হন এবং নানা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকারও হন তাদের সত্য ভাষণ ও ভবিষ্যদ্বাণীর কারণে, অদূর ভবিষ্যতে তারাই প্রমাণিত হন কালের কন্ঠস্বর হিসেবে। এর দৃষ্টান্ত হতে পারেন মানবজাতির মধ্যে যুগে যুগে আবির্ভূত হওয়া নবী-রসুলগণ, দূরদষ্টিসম্পন্ন কবি-সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, দার্শনিক প্রমুখ। যারা নতুন বিপ্লবের কথা বলে পচা গান্ধা সমাজ বদলানোর স্বপ্ন ঢেলে দেন যুব সমাজের চোখে, তারাও কি বহন করেন না মিথ্যাবাদী রাখালের অদৃষ্ট?

আল মাহমুদ এই যে এক অসাধ্য সাধন করলেন বাংলা কবিতায়, তার জন্য বাঙালি জাতি অহঙ্কার করতে পারে; পৃথিবীবাসীও কবিতাটির স্বাদ নিয়ে পুলকিত বোধ করতে পারে। টি এস এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতার পর দ্বিতীয় কোনো কবিতা বিশ্ব কবিতার পাঠককে চমকে দেয়ার মতো যদি রচিত হয়ে থাকে তাহলে তা এই ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’। কবিতাটির নানা ত্র“টি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও কথাটি আমি উচ্চকন্ঠেই বলে ফেলতে চাই। এটা খুবই আনন্দের কথা যে, আল মাহমুদের চোখের জ্যোতি যত হ্রাস পেতে শুরু করে – তিনি তো নিজেকে ‘কানা মামুদ’ বলে ঢোল পিটিয়ে দিয়েছেন সারাদেশে – তাঁর ভেতরের চক্ষু ততই জ্যোতিষ্মান হয়ে উঠতে থাকে। আল মাহমুদের ভেতরে যেন জন্ম নেয় চক্ষুবিহীন টিরাসিউস কিংবা প্যারাডাইস লস্টে-র নিশ্চক্ষু মিল্টন। কী অসাধারণ হয়ে উঠেছে তাঁর দিব্যদৃষ্টি তা আমরা টের পাই যখন তাঁকে বলতে শুনি:

আমি তাদের উরতের পেশিতে বিদ্যুতের চমক দেখে
থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। এই পথেই তারা
গন্তব্যে পৌঁছুবে, যেখানে শ্বাপদারণ্যের পাশেই আছে নদী।
মানুষের জন্য পারাপারের পানসি বাঁধা। গোটানো পালে
জলপুষ্পের প্রতীক। দড়ি আর দাঁড়।

কিংবা যখন তিনি বলেন:

তারপর সত্যি একদিন বাঘ এসে সব খেয়ে ফেলল। প্রথম
সেই বালকটিকে, শেষে নখ আর দাঁত দিয়ে আঁচড়ে ফেলল
মানুষের গ্রাম, ঘরবাড়ি, রক্ত, মাংস।
আমরা এখন কোথায় যাই। আমরা তো সেই মিথ্যাবাদীর খুলির ওপর রোদ চমকাতে দেখে এসেছি। আর
দেখেছি সকল সত্যবাদীদের পঙ্গপালের মতো পালাতে।

‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ একটি নিরেট ছন্দবিহীন গদ্যকবিতা। এ ধরনের কবিতা রচনার পক্ষপাতী অবশ্য আমি নই, কারণ বাংলা এমন একটি ভাষা, যেখানে নিরাবরণ গদ্যকবিতা আটসাঁট ত্বকের তন্বি তরুণীর মতো কখনও সুন্দর হয়ে ওঠে না। বাংলা গদ্যকবিতারও একটা প্রথাসিদ্ধ ছন্দ আছে, যে ব্যাপারে আল মাহমুদ নিজেও অসচেতন নন, কারণ তিনি নিজেও ছন্দবন্ধ গদ্যকবিতা লিখেছেন প্রচুর। কিন্তু তারপরও তাঁর ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ কেন ছন্দহীন হয়ে উঠল তার ব্যাখা দেয়া মুশকিল। শুধু এটুকু বলা যায় যে, কবিতাটি যে মেসেজ ধারণ করছে তা প্রকাশ করার তাড়নায় কবি এতই উতলা হয়ে উঠেছিলেন, বোধহয়, যে, তিনি এদিকে নজর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। এ কারণে যে কবিতাটির ভাষা কোথাও কোথাও একটু ঢিলেঢালা হয়ে গেছে, বোদ্ধা পাঠকমাত্রই তা সহজেই আঁচ করতে পারেন। পাঠকের মনে হতে পারে কেউ বোধহয় সাদামাটা ভাষায় কোনো গল্প শোনাচ্ছে, কিন্তু পরক্ষণেই ভুল ভাঙে যখন চুম্বকের মতো এসব পঙক্তি – ‘আমরা তো সেই মিথ্যাবাদীর খুলির ওপর রোদ চমকাতে দেখে এসেছি’ কিংবা ‘আর দেখেছি সকল সত্যবাদীদের পঙ্গপালের মতো পালাতো। য পলায়তি স জীবতি’ – কানে এসে বাজে, সেখান থেকে গিয়ে বাজতে থাকে অন্তরের গহিনে।

তবে এটা ঠিক, বিশ্বের কোনো সাহিত্যই, সে শেক্সপিয়রের রচিত নাটক হোক, এলিয়ট-ইয়েটস রচিত কবিতা কিংবা গ্যাব্রিয়েল মার্কেজ রচিত কোনো উপন্যাস, শত ভাগ পারফেক্ট কখনও কোথাও হয়নি। সমালোচকদের চোখে ক্ষুদ্র একটি বালিকণারও বিশাল বিশাল ছিদ্র ধরা পড়ে। তা নিয়ে কবি-সাহিত্যিকদের বিচলিত হলে চলে না। প্রশংসা ও নিন্দামিশ্রিত কোনো সাহিত্য, তা উপন্যাস হোক, নাটক কিংবা কবিতা, দেশকাল ও ভাষার দেয়াল অতিক্রম করে বিশ্বপাঠকের অন্তরে গিয়ে সুরের ঝংকার তুলতে পারল কি না সেটাই হলো আসল কথা। ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ যদি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যায় তাহলে আমাদের মতো নাদান কাব্যরসিকরা এর পক্ষে-বিপক্ষে দু’কলম লিখলেই বা কী, না লিখলেই বা কী। যা সত্য তা একদিন না একদিন প্রকাশিত হবেই; ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পানির গতিকে রোধ করা গেলেও দিবসের গতিকে রোধ করার কোনো উপায় আছে কী?