আল আহমুদ (১১ জুলাই ১৯৩৬- ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯) মাতৃভাষা ও স্বাধীনতা সংগ্রামে এক লড়াকু সৈনিক ছিলেন। তিনি তথাকথিত বুদ্ধিজীবী হয়ে কেবল কাগজে-কলমে লড়াই করেন নি। তিনি মাঠে ময়দানে লড়াই করেছেন দেশ-মাতৃকার জন্য। কিন্তু একটি স্বার্বভৌমত্ব টিকে থাকে যখন সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য দীর্ঘকাল ধরে দেশের জন্য শক্তভীত তৈরি করে। সে ভীত যে-কজন তৈরী করেছিলেন তাদের মধ্যে আল মাহমুদ অন্যতম।
তিনি কবি হিসেবে বিখ্যাত। কিন্তু কথা সাহিত্যিক হিসেবে কোন কোন ক্ষেত্রে আরো শক্তিশালী। তিনি ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটিকা, ছড়া লিখেছেন অনেক। অনুবাদেও সার্থক। সাংবাদিক হিসাবেও তিনি ছিলেন সার্থক। এই সার্থকতার কারণে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে অপ্রতিদ্বন্ধী সাহিত্যিক।
বাংলা সাহিত্যে অনেক খ্যাতিমান শিশু সাহিত্যিক আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীনসহ অনেক সাহিত্যিক প্রত্যেকের হৃদয়ে স্থান করেছেন। এর বাহিরে সুকমার রায় ও সত্যজিৎ রায় ভিন্ন মাত্রায় সবার মাঝে টিকে আছেন। আল মাহমুদও সে পর্যায়ে একজন শিশু সাহিত্যিক। ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ কাব্য একটি জনপ্রিয় শিশু সাহিত্য যেখানে “ভরদুপুরে”, “আকাশ নিয়ে”, “ছড়া”, “একুশের কবিতা”, “নোলক”, “পাখির মতো”, “উনসত্তরের ছড়া”, “মনপবনের নাও”, “পাখির কাছে ফুরের কাছে”, “হাসির বাক্সো”, “রাতদুপুরে”, “বোশেখ”, “তারিকের অভিলাস” ও “ঝালের পিঠা” উল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে ‘একটি পাখি লেজ ঝোলা’ কাব্য গ্রন্থেও বেশ কয়েকটি সমাদৃত কবিতা তিনি লিখেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: “রসায়নের রান্না”, “বোশেক এসো”, “ছড়া”, “হালাল”, ”বাঁচার জন্য”, “একলা মিতু”, “হায়রে মানুষ”, “সবুজের আশ্রয়”, “পড়ার জন্য”, “আমি রাতের পক্ষে”, “বন্ধ ঘরে আমি” ও “বাপীর জন্য” উল্লেখযোগ্য।
গল্পের মধ্যে শিশুদের জন্য রচনা করেছেন “ক্ষুদে পাখির প্রেরণা”, “একটি পাহাড়ি গল্প”, “বেপরোয়া”, “একটি ছবি”, “একটি পাহাড়ি গল্প” ও “বেপরোয়া”। কিন্তু এসবকে ছাড়িয়ে তার কিশোর উপন্যাস “ময়নামতির নেকলেস” আলাদা জায়গা করে নিয়েছে বাংলা শিশু সাহিত্যে।
“ময়নামতির নেকলেস” একটি গোয়েন্দা উপন্যাস। এখানে প্রধান চরিত্র সাদেক চেীধুরী ও আদিবা খান। প্রথম জন গোয়েন্দা কাহিনী লিখে ইতিমধ্যে সবার মনে জায়গা করে নিয়েছেন। অন্যদিকে আদিবা খান কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ইংরেজি পড়ান। সুশ্রী এবং লম্বা। স্বামী আমোরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। আদিবা দেশকে ভালবাসেন বলে স্বামীর সাথে আমেরিকায় অবস্থান করেননি।
কোন এক রাতে আদিবা খান টের পান তার সিন্দুক থেকে সবচেয়ে অবহেলিত রূপার একটি নেকলেস হারিয়ে যায়। তিনি বিষ্মিত হোন সেখানের হীরা ও টাকা থাকার পরও কেন সেগুলি না নিয়ে কেবল সবচেয়ে সস্তা রূপার হার চোরেরা নিয়ে গেল। ফলে তার কৌতুহলী মন জানার আগ্রহ নিয়ে পুলিশের বা কোর্টে যান নি। তিনি ফোন করলেন সাদেক চেীধুরীকে। প্রতিউত্তোরে সাদেক চৌধুরী বললেন “আমি তো আপনাকে বলেছি আমি পুলিশের লোক নই। প্রাইভেট গোযেন্দাও নই। আমি একজন গোয়েন্দা কাহিনীর লেখক মাত্র। আমি গোয়েন্দা কাহিনী-অ্যাডভেঞ্চার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা মিশিয়ে গল্প তৈরি করি। আমি কোনো কিছুর সমাধান করার জন্য কোনো অফিস খুলিনি। আপনি আমার সঙ্গে যে আশা নিয়ে দেখা করতে চান সেটা পুলিশের কাজ, লেখকের কাজ নয়। তবুও আপনার আগ্রহে বিষ্মিত হচ্ছি। আসুন, আগামীকাল সকালেই আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করবো। যদি কিছু মনে না করেন তবে এখানে এসেই ব্রেকফাস্ট করবেন। আমি মকাল থেকেই যেহেতু লেখার কাজ শুরু করি সেজন্য আপনাকে আমার সঙ্গে ব্রেকফাস্টের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”
পরদিন আদিবা খান সাদেক চৌধুরীর বাসায় যান এবং সেখানে বিস্তারিত জেনে সাদেক চৌধুরী কৌতুহলী হলেন। তিনি সাম্ভাব্য সকল স্থানে গেলেন। রহস্য উদ্ঘাটনের সময় সাদেক চৌধুরী খেয়াল করলেন আদিবার সমূহ বিপদ। কেননা এক বৌদ্ধ তান্ত্রিক তাকে অনুসরণ করছে। কুমিল্লা ময়নামতি পরিদর্শনে বুঝতে পরলেন এ হারের গুরুত্ব। এটি সাধারণ কোন হার নয়। রাণী ময়নামতির বানানো হার। যা আদিবা উত্তারাধিকার সূত্রে পেলেন।
রাণী ময়নামতি ছিলেন বৌদ্ধ। কিন্তু তার দু’মেয়েকে জোর করে বিয়ে দেন আরাকানের রাজপুত্রের সাথে। দ্বন্দ্ব সংঘাত নানা কিছু হয়ে যায়। পাঠন ছেলের প্রেমে পড়ে আদিমার মা ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হয়ে যায়। অন্য একটি শাখা বৌদ্ধ্য থেকে যায়।
বৌদ্ধরা নানা অপকর্ম ও তান্ত্রিকতার কারণে নিজেরদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে, আরাকানে, লাওসে, শ্রীলংকাসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের আধিপত্য ধ্বংস হয়। অন্যদিকে আদিবার পূর্বপুরুষেরা দ্বন্দ্ব-সংঘাত পরিহার করার কারণে সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তারা ধর্মের চেয়ে মানবতার জয়গানকে স্থান দিয়েছেন।
যেহেতু আদিবার পরিবার তান্ত্রিকতায় বিশ্বাস করে না এবং অন্যের ক্ষতি করার চিন্তা করে না, তাদের কাছে এ হারটি একটি পারিবারিক চিহ্ন ছাড়া আর কিছু নয়। এ হারের রহস্য উ˜্ঘাটনের সময় বেরিয়ে আসে ময়নামতি রাজ বিহার এক সময় সমৃদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এখানে বহু দূর থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসত্। কিন্তু নানা যৌনাচার ও পাপাচারের কারণে সেটি এক সময় ধ্বংস হয়। এমনকি সে-সব বৌদ্ধরা নানা জায়গায় ছড়িযে থাকলেও এবং শিক্ষিত হলেও পুরানো অভ্যাস ত্যাগ করেনি।
ফলে তারা তান্ত্রিকতা দিয়ে হারটি চুরি করেছে এবং তার ব্যবহার শিখার জন্য তালপাতায় লিকিত চিহ্ন সমূহ উদ্ধারে মরিয়া। তাদের কাছে সম্পর্ক বা মানবতা বড় নয়। তাদের স্বার্থ সিদ্ধি বড়। তাই এক পর্যাযে তারা আদিবা ও সাদেক চৌধুররি জীবনকে বিপ্নœ করার পথে হাটে। কিন্তু আদিবার মানবিকতা ও সাহিসিকতায় তারা রক্ষা পায়।
পরিশেষে এ কথা বলা যায় আল মাহমুদ এ উপন্যাসের মাধ্যমে যে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সন্ধান দিয়েছেন, তা যদি বাংলােেদশের প্রত্মতাত্ত্বিক বিভাগ ও ইতিহাস গবেষণা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে তবে বাংলাদেশ এক সময় বিশ্ব দরবারে প্রাচীন এতিহ্য সমৃদ্ধ একটি দেশের স্বীকৃতি পাবে এবং এ অঞ্চলে মুসলিমরা যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছিল তাও উঠে আসবে নিপুণভাবে।